নজরুল সাহিত্যে নারী

আনোয়ারা আলম, ২৮ মে, এবিনিউজ : “কন্যাকে পুত্রের মতই শিক্ষা দেওয়া যে আমাদের ধর্মের আদেশ তাহা মনেও করিতে পারি না। আমাদের কন্যা জায়া জননীদের শুধু অবরোধের অন্ধকারে রাখিয়াই ক্ষান্ত হইনাই, অশিক্ষার গভীরতর কূপে ফেলিয়া হতভাগিনীদের চির বন্দিনী করিয়া রাখিয়াছি। … ইহাদের কিসের দুঃখ কিসের অভাব তাহা চিন্তা করিবার শক্তি পর্যন্ত ইহাদের উবিয়া গিয়াছে” (তরুণের সাধনা, নজরুল রচনাবলী, ৪র্থ খণ্ড, পৃ: ৯৬)

নজরুল সমকালে নারী মুক্তির লক্ষ্যে যিনি ছিলেন আলোকবর্তিকা তিনি বেগম রোকেয়া। আবদুল মান্নান সৈয়দের “পত্র প্রবন্ধ” গ্রন্থের সূত্রে,

“বেগম রোকেয়াকে নজরুল নিজের হাতের লেখা উপহার প্রদত্ত ‘ছায়ানট’ বইটি পেয়ে গেলাম। সেখানে কবি তাঁকে সম্বোধন করেছেন ‘নানী আম্মা’–বলে। . . .

বেগম রোকেয়ার অন্তরঙ্গ দুই শিষ্য মিসেস এম. রহমান, বেগম শামসুন্নাহার মাহমুদ এর সঙ্গে নজরুলের ঘনিষ্ঠতা ছিল। মিসেস এম. রহমানকে নজরুল মা বলতেন। তাঁকে গ্রন্থও উৎসর্গ করেন–এরা দুজনেই নজরুলের ধূমকেতু পত্রিকায় লিখেছেন।”

নজরুল তাঁদের সংগে চিন্তা চেতনা ও কর্মে প্রেরণায় যুক্ত ছিলেনণ্ড তাঁর সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় ঐ সময়ে বহু নারীবাদী লেখা ছাপা হতোণ্ড যাদের রচনাশৈলীণ্ড চিন্তার আধুনিকতা ছিল অসাধারণ। বিদ্রোহ প্রেম সাম্যবাদের মশাল হাতে বাংলা সাহিত্যে ধূমকেতুর মতোই যিনি এলেন তিনি আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামণ্ড তাঁর সাম্যবাদী চেতনা মানব ইতিহাসের বৈপ্লবিক বিকাশ সম্পর্কে জাগ্রত ছিলণ্ডসৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে যেমন কমিউনিস্ট ইশতেহার পাঠ করেছেনণ্ডআবদুল হালিমের সাথে একত্রে অনুবাদে প্রয়াসণ্ড পাঠ করলেন ক্যাপিটেল, ইবসেন, এশিল জোলা, লেনিন, বার্ট্রান্ড রাসেলের বলশেডিসিজম ইন রাশিয়া, একই সাথে রবীন্দ্রনাথের ঘরে বাইরে শরৎচন্দ্রের পথের দাবী। তাঁর বৈপ্লবিক চিন্তাধারা শক্তি সংগ্রহ করেছে ফরাসী ও রুশ বিপ্লবের ঐতিহ্য এবং শেলি হুইটম্যান, গোর্কি’র সাহিত্য থেকে। স্বাধীনতা প্রীতি জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী আবেগের সমন্বয়ে তার সাম্যবাদী চেতনা পরিপূর্ণতা লাভ করেছিল।

কবি তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির সূচনা লগ্ন থেকেই ব্রিটিশ শাসন শোষণের বিরোধিতাসহ সমাজের শোষিত বঞ্চিত মানুষের পক্ষে তার লেখনী পরিচালনা করেছেন–নজরুল যুগে বাংলার সামাজিক জীবনে যেমন–তেমনি সাহিত্যেও নারীরা ছিল উপেক্ষিত–মুসলিম নারীদের অবস্থান একেবারে শোচনীয়ণ্ড এ অবস্থার উত্তরণে নজরুলের কলম ছিল সোচ্চার– কবিতা গল্প বা উপন্যাস এবং প্রবন্ধে নারী জীবনের জাগরণে যুক্ত হলো মানবতা ও সাম্যবাদের চেতনাণ্ড যদিও নজরুলের নারীবাদী যে ভাবনার তা বর্তমান যুগের নারীবাদী ধারণা থেকে দর্শনগতভাবে ভিন্ন। সৃষ্টির অর্ধেক কৃতিত্বের সাথে নারীকে জাগাতে চেয়েছেন বহ্নিশিখা রূপে– একইসাথে নারী যে প্রেয়সী বা মমতাময়ী সেটিও বিভিন্নভাবে প্রকাশ করেছেন। রুশ বিপ্লবের কঠিন সময়ে বিভিন্ন আন্দোলনে নারীর নেতৃত্ব তাঁকে প্রভাবিত করেছে নানাভাবে। যেমন ১৯০৫ সালের স্মরণীয় ‘ব্লাডি সানডে’ বা ‘রক্তাক্ত রবিবারের শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দানকারী একজন নারী শ্রমিকের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘জীবন বন্দনা’ কবিতায় শ্রদ্ধা জানিয়ে লেখেন–

“শ্রম কি নাঙ্ক কঠিন যাদের নির্দয়

মুঠি তলে

এস্তা ধরণী নজরানা দেয় ডালি ভরে

ফুলে ফুলে।”

সমকালীন বাংলা সাহিত্যের অন্য দুই কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জীবনানন্দ দাশ থেকে কিছুটা ভিন্ন রূপে নারীর চিত্রায়ণ নজরুল সাহিত্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিধাতার কাছে দাবি করলেন-‘নারীর ভাগ্য জয় করিবার কেন নাহি দেবে অধিকার।’ নজরুল এক ধাপ এগিয়েণ্ড যেখানে নারী হয়ে উঠেছে মুক্ত জীবন সন্ধানী–নারীর সমানাধিকার প্রশ্নে

‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি

চির কল্যাণকর

অর্ধেক তার করিয়াছে

নারী, অর্ধেক তার নর।’

একই সাথে নারীর জাগরণ ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাদের অগ্রগামী হওয়ার আহ্বানে

“জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা। জাগো

মাতা–কন্যা–বধূ, জায়া ভগ্নি।”

নজরুলের সাম্যবাদী (১৯২৫) ও সর্বহারা (১৯২৬) প্রকাশিত হলে সেখানে তার নারী জাগরণের পূর্ণ চেতনা প্রকাশিত হয় সুস্পষ্টভাবে। ইতিহাসে নারীর অবদানের বিষয়টি উপেক্ষিত–নজরুল লেখেন-“ইতিহাসের পাতায় শুধু পুরুষের গৌরব গাথা, পৌরুষ, পূজা, পুরুষের দম্ভ চিৎকার–কর্ম–বন্দনা–বীরত্ব–কৃতিত্ব সব তাদেরণ্ড যেন পৃথিবীটা পুরুষের একার। তাই নজরুলের কাছে মনে হয়েছে ‘পুরুষ আজ জালিম নারী আজ মজলুম।’

(নজরুল রচনাবলী, ৪র্থ খণ্ড পৃ. ৯৬)

নারী ও পুরুষের সাম্যের ক্ষেত্রে নজরুল সময়ের তুলনায় অতি প্রগতিশীল ১৯২৫ সালে নারীর যে সংগ্রাম ও অবদানের কথা– তা ১৯৭৬ সালে প্রতিধ্বনিত হয় এরণভডদ এণবধভর্ধ্র ঔণফণভ ডধসমল্র এর প্রবন্ধে।

সমাজ সচেতন ও মানবতার কবি নজরুলের ‘বারাঙ্গনা’ কবিতা যেন এক বিপ্লব–

“কে তোমায় বলে বারাঙ্গনা মা, কে

দেয় থুথু ও গায়?

. . . নাই হলে সতী, তবুও তোমরা

মাতা–ভগ্নিরই জাতি

তোমাদেরই ছেলে আমাদেরই মতো,

আমাদেরই জ্ঞাতি . . .

. . . অসতী মাতার পুত্র সে যদি তবে

জারজ পুত্র হয়,

অসৎ পিতার সন্তানও তবে জারজ

সুনিশ্চয়।’

১১/৮/২৬ তারিখে এক পত্রে নজরুল শামসুন্নাহারকে লেখেন-‘আমাদের দেশের মেয়েরা বড় হতভাগিনী। কত মেয়েকে দেখলাম কত প্রতিভা নিয়ে জন্মাতে, কিন্তু সব সম্ভাবনা তাদের শুকিয়ে গেল সমাজের প্রয়োজনীয় দাবিতে। তাইতো নারীদের বিদ্রোহীনি হতে বলি”।

সামগ্রিকভাবে নজরুলের নারী এক স্বতন্ত্র স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠিত তার কাব্যে। তার জীবনে নানাভাবে এসেছে নারী যাদের তিনি ভালোবেসেছেন। দুঃখে কাতর হয়েছেন এবং ব্যথাতুর অভিজ্ঞতায় একের পর এক কবিতা– বারে বারে নারীর ভেতরের শক্তিকে উন্মোচিত করে যেন সময়কেই অতিক্রম করেছেন।

‘হে মোর রাণী! তোমার কাছে

হার মানি আজ শেষে।

আমার বিজয় কেতন লুটায় তোমার

চরণ তলে এসে।

নজরুল কাব্য সাহিত্যে নানা ধর্মের, বর্ণের নারীদের আগমন। মোগল সম্রাজ্ঞী নূরজাহান, মমতাজ, চাঁদ সুলতানা, শিরি–ফরহাদ কাহিনীর শিরি, ইরানি বালিকা পল্লি বালিকা, দারু দ্বীপের নারী, পুতুল, বেদেনি থেকে শুরু করে কৃষ্ণের আরাধ্য রাধা পর্যন্ত মমতাজ মহল বা চাঁদবিবিকে যেমন সুন্দর করে তুলেছেন, তেমনি সমান মর্যাদায় রাজদাসী আনারকলিকেও সমান মূল্য দান করেছেন।

নজরুলের উনিশটি গল্পের মধ্যে মানুষকে, প্রকৃতিকে, সময়কে, রসবোধকে, মননকে নানা মাত্রিকতায় উপলব্ধি করতে পারি নিঃসংশয়ে। তাঁর গল্পে আবেগের প্রাবল্য বা অতি নাটকীয়তা থাকলেও জীবন ঘনিষ্ঠতাও সমাজ নিরীক্ষণের সাথে নজরুলের চৈতন্য ক্রিয়াশীল বিশেষ করে নারীর জন্য নজরুলের ভালোবাসা দেখি স্বামী হারা গল্পে যেখানে কথক একজন নারী–যার কাছে বর্ণনা করছে সেও নারী– বেগমের কথনের মধ্য দিয়ে যখন একে একে উন্মোচিত হয় গল্পের শাঁস– তাতে এত জীবন ঘনিষ্ঠতা যা মনে করিয়ে দেয় জসিম উদ্দীনের কবর কবিতা– একই সাথে এ গল্পে পাঠকের উপলব্ধিতে সমাজের নিম্ন ও উচ্চ বংশের পারস্পরিক মমত্বহীনতার জায়গা থেকে নারীরা যে অপশক্তির বলি–সে চিত্রও তুলে ধরেন নজরুল পরম মমতায়। তেমনিভাবে ব্যথার দান গল্পের গুলশান, রাক্ষুসী গল্পের বিন্দি, পদ্মগোখরা গল্পের জোহরা–এদের চরিত্রের মাঝেও দেখি ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের বহিঃপ্রকাশ। আবার কুহেলিকা উপন্যাসের জাহাঙ্গীরের মা, কিংবা জয়তী ও চম্পা, বাঁধন হারার আয়েশা যেন প্রান্তজনের লক্ষণ রেখা ছিন্ন করে বেরিয়ে আসে আলোকিত পৃথিবীতে। ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে নজরুল জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার আলোকে– কি অপূর্ব বিদ্রোহী চেতনায় সৃষ্টি করেন মেজ বৌয়ের মতো এক দীপ্ত চেতনার নারীকে। ‘গায়ত্রী চক্রবর্তী প্রান্তজনের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন-‘উটভর্ দণ ওলঠটর্ফণরভ ্রযণটপ’ (ঐটহর্টরধ ১৯৯০ : ৩১)? এই প্রেক্ষাপটে নজরুলের কথা সাহিত্যের অন্তর্নিহিত মর্ম উপলব্ধি করে বলা যায়, ‘চণ্র,র্ দণ ্রলঠর্ফণরভ ডটভ টফ্রম ্রযণটপ’. (ড. বিশ্বজিৎ ঘোষ)

নজরুলের কণ্ঠে ও বাণীতে নারী জাগরণের কথা–অবদানের কথা– ছিল না নারী ও পুরুষে বৈষম্য বরং তিনি নারীকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন– নারী মুক্তি ছিল তাঁর স্বপ্ন ও সাধ তাই নারীত্বের জয়গানে মুখর হয়েছেন বারে বারে– তার সঙ্গীত জগতে আমরা দেখি অজস্র নারী সঙ্গীত শিল্পীকে-’! নারীর মেধা ও সম্ভাবনাকে শ্রদ্ধা করেছেন নানাভাবে–তার কল্পনায় ও ধ্যান ধারণায় ‘নারী তার জ্ঞান ও শ্রম– সৌন্দর্য আর সুষমায় বুদ্ধিমত্তায় ত্যাগে বদলে দিতে পারে বিশ্ব’–দৃপ্তকণ্ঠে তাঁর উচ্চারণ ছিল– ‘জ্ঞানের লক্ষ্মী, গানের লক্ষ্মী, শস্য লক্ষ্মী, নারী–সুষমা লক্ষ্মী নারীই ফিরেছে রূপে রূপে সঞ্চারি।

নজরুল যুগ পার হয়ে একবিংশ শতাব্দীতে নারী সর্বক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রাখলেও নারীকে এখনো সুন্দর এক নিরাপদ পৃথিবী দিতে ব্যর্থ হচ্ছি নানাভাবে–তাঁর প্রকৃত সম্মান ও মর্যাদা দানে কত কৃপণতা।

তবে জীবনের নানা ঘাত প্রতিঘাতে–কাজী নজরুল ইসলাম–যিনি মানবতার জয়গান গেয়েছেন–তাঁর যথাযথ মূল্যায়ন সে যুগে যেমন এখনো কি যথার্থভাবে করছি আমরা? তাইতো পরম অভিমানে জীবনের সর্বশেষ অভিভাষণে বলেছিলেন – ‘বিশ্বাস করুন আমি কবি হতে আসিনি– আমি নেতা হতে আসিনি। আমি প্রেম দিতে এসেছিলাম– সে প্রেম পেলাম না বলে আমি এই নীরস পৃথিবী থেকে নীরব অভিমানে চিরদিনের জন্য বিদায় নিলাম।

লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, আগ্রাবাদ মহিলা কলেজ
(সংগৃহীত)

এবিএন/ফরিদুজ্জামান/জসিম/এফডি