তপন বাগচীর কবিতায় ‘যাত্রা’ প্রসঙ্গ

  মিল্টন বিশ্বাস

০৭ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৯:৫৬ | অনলাইন সংস্করণ

‘আমরা জেনে না জেনে প্রতিনিয়ত কবিতা রচনা করে চলছি। সাধারণ মানুষও মুখে মুখে কবিতা রচনা করে থাকেন।  সাধারণ কথাকেই একটু ঘুরিয়ে বলা, একটু অলঙ্কার পরিয়ে বলা, একটু ছন্দের দোলা রেখে বলা, একটু মিলিয়ে মিলিয়ে বলার প্রবণতা মানুষের সহজাত। একসময় মানুষ কবিতা রচনা করত পদের সঙ্গে পদ মিলিয়ে। মনে রাখার জন্যই এই কৃৎকৌশল। ছন্দোবদ্ধ বাক্য খুব সহজেই স্মৃতিতে ধারণ করা যায়। তাই মায়েরা শিশুদের ঘুম পাড়াতে ছড়া বলত সুরে সুরে। মনের সুখে গান গাইত। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতার কথকতা প্রবাদ হয়ে উঠল। সবিই তো এক ধরনের কবিতা। রবীন্দ্রনাথের পরের যুগে অন্ত্যমিল সরে গেল, ছন্দ কবিতার শরীর থেকে চলে গেল অন্তরে। কবিতার একটা নতুন চেহারা পেলাম। কিন্তু কবিতা মানুষকে ছাড়েনি। আমাকেই বা ছাড়বে কেন?’- কথাগুলো বাংলাদেশের একজন পরিশ্রমী সাহিত্যসাধক তপন বাগচীর। এই কবির মতে, কবিতায় অনেক কম কথায় বেশি কথা বলা যায়। সাদামাটা শব্দে অনেক তাৎপর্য সৃষ্টি করা সম্ভব। যেমন, ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’ ভারতচন্দ্র রায়গুণাকরের এই সহজ-সরল উক্তি চিরায়ত হয়ে উঠেছে। আসলে কবিতার ভেতর দিয়েই তপন বাগচীর সাহিত্যজগতে প্রবেশ। কবিতার প্রতিই তাঁর প্রধান আগ্রহ। কিন্তু এক কবিতায় তো আর আটকে থাকে নি তাঁর মন। ছড়া লিখেছেন, গান লিখেছেন। এসবও কবিতারই সম্প্রসারণ! আজীবন কবিতা নিয়েই থাকতে চান তিনি। নব্বই দশকের কবি তপন বাগচী। বাংলাদেশের উত্তাল রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিতের মধ্যে তাঁর লেখক হিসেবে বেড়ে ওঠা। তিনি এই দশকের গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের অন্যতম কর্মী।

ম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য লড়াই আর মুক্তবুদ্ধির চর্চায় সর্বদা অগ্রণী ড. তপন বাগচী অসীম ধৈর্য আর পরিশ্রমের যোগফলে নিজের স্থানটি পাকাপোক্ত করেছেন বাংলা সাহিত্যে। বলা যায়, তিনি নব্বই দশকের একমাত্র লেখক যাঁকে কেন্দ্র করে দু’ই বাংলার লিটল ম্যাগাজিনের বিশেষ সংখ্যায় তাঁর জীবন ও সাহিত্যকর্মের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ প্রকাশিত হয়েছে; রচিত হয়েছে একাধিক গ্রন্থ। নিরন্তর তাঁর এগিয়ে চলা। সংগীত থেকে শুরু করে কথাসাহিত্য, ছড়া, প্রবন্ধ আর গবেষণার একনিষ্ঠ চিন্তক ও স্রষ্টা। ছাত্রজীবন থেকে তাঁকে কাছ থেকে দেখে যতটুকু সংবাদ নেওয়ার চেষ্টা করেছি তাতে শিল্প-সাহিত্যে নিবেদিতপ্রাণ একজন দরদী মানুষ হিসেবেই খুঁজে পেয়েছি। নির্বিরোধ ও প্রচ- আড্ডাবাজ কিন্তু পরোপকারী তপন বাগচী এ যুগের ব্যক্তিক্রমী সাহিত্যিক। 

তপন বাগচীর জন্ম ১৯৬৮ সালের ২৩ অক্টোবর মাদারীপুরের কদমবাড়ি গ্রামে। গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতায় স্নাতকোত্তর পাস করে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন বাংলাদেশের যাত্রাগানের উপর। বর্তমানে তিনি কর্মরত আছেন বাংলা একাডেমির উপ-পরিচালক হিসেবে। তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থগুলো বাংলা গবেষণা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। তাঁর আগ্রহের বিষয় বাংলা সাহিত্য, সংগীত, লোকসংস্কৃতি, লোকনাট্য, গণমাধ্যম, মুক্তিযুদ্ধ, আঞ্চলিক ইতিহাস, জীবনী প্রভৃতি। এছাড়া গল্প, কবিতা, ইতিহাস ও ছড়া নিয়ে প্রাবন্ধিকের নিজস্ব অনুচিন্তন স্থান পেয়েছে তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থে। তাঁর ‘সাহিত্যের সা¤প্রতিক পাঠ’ (২০০১), ‘সাহিত্যের কাছে-দূরে’ (২০১৩), ‘সাহিত্যের সঙ্গ-প্রসঙ্গ (২০১২), ‘চলচ্চিত্রের গানে ডক্টর মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান’ (২০১০), ‘সাহিত্যের এদিক সেদিক’ (২০১৩), ‘লোকসংস্কৃতির কতিপয় পাঠ’ (২০০৮), ‘বাংলাদেশের যাত্রাগান : জনমাধ্যম ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত’ (২০০৭), ‘মুক্তিযুদ্ধে গোপালগঞ্জ’ (২০০৭), ‘নির্বাচন সাংবাদিকতা’ (২০০১), ‘নজরুলের কবিতায় শব্দালঙ্কার’ (২০০০) প্রভৃতি গবেষণাগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তপন বাগচী রচিত দু’টি জীবনী ‘বিপ্লব দাশ’(২০০১) ও ‘রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ’(১৯৯৮) বেশ পাঠক প্রিয় গ্রন্থ। ছড়া রচনায় তপন বাগচী সিদ্ধহস্ত। কারণ ছন্দ তাঁর অনায়াসলব্ধ বিষয়। ‘সমকালে তমকালে’(২০১০), ‘খাচ্ছে ছুটি লুটোপুটি’ (২০০৯), ‘মঙ্গা আসে ঘরের পাশে’(২০০৮), ‘স্বপ্নেবোনা তূণীর সোনা’(২০০৭), ‘চড়কাবুড়ি ওড়ায় ঘুড়ি’(১৯৯৫), ‘রাতের বেলা ভূতের খেলা’(২০০৮), ‘রুখে দাঁড়াই বর্গী তাড়াই’(১৯৯৪) শিশুদের মন জয় করে বড়দের আনন্দে ভাসিয়েছে। তাঁর গল্পগ্রন্থ ‘শখের গোয়েন্দাগিরি’(১৯৯৩) ও ‘সাতদিনের সাতকাহন’(২০১১) অসাধারণ সব গল্পের সংকলন। আনন্দনাথ রায়ের ফরিদপুরের ইতিহাস (২০০৭) ও একুশের নতুন কবিতা (১৯৯২) তাঁর উল্লেখযোগ্য সম্পাদিত গ্রন্থ। দেশ-বিদেশে সেমিনার-সিম্পোজিয়াম এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিতে তপন বাগচী উজ্জ্বল নক্ষত্র। নতুন গতি সাহিত্য পুরস্কার (কলকাতা ২০১১), বগুড়া লিটল ম্যাগাজিন মঞ্চ সংবর্ধনা (নদীয়া ২০১০), সুনীল সাহিত্য পুরস্কার (২০০৯), কবি বাবু ফরিদী সাহিত্য পুরস্কার (২০০৯), ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ সম্মাননা (২০০৯), মহাদিগন্ত সাহিত্য পুরস্কার (কলকাতা ২০০৮), জেমকন সাহিত্য পুরস্কার (২০০৮), অমলেন্দু বিশ্বাস স্মৃতি পদক (২০০৮), জসীম উদদীন গবেষণা পুরস্কার (১৯৯৬), মুনীর চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১), এম নূরুল কাদের শিশুসাহিত্য পুরস্কার (২০০৮) লাভ করেছেন তিনি।

ছড়াকার, প্রাবন্ধিক ও ঔপন্যাসিক হিসেবে পুরস্কৃত হলেও তপন বাগচীর প্রধান আগ্রহ কবিতার প্রতি।  কবিতার বই ‘নির্বাচিত ১০০ কবিতা’ (২০১০), ‘সকল নদীর নাম গঙ্গা ছিল’ (২০০৭), ‘অন্তহীন ক্ষতের গভীরে’ (২০০৫), ‘শ্মশানেই শুনি শঙ্খধ্বনি’ (১৯৯৬), ‘কেতকীর প্রতি পক্ষপাত’ (১৯৯৬) পাঠকের অন্তরে স্থায়ী আসন দখল করে নিয়েছে। তিনি কবিতায় মিছিল ও সংগ্রামের পথে রক্তেভেজা শার্ট জড়িয়ে হেঁটে চলেন। তিনি বারুদের গন্ধে নিজের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর জাগ্রত করেন। তিনি ছন্দ ও অলঙ্কার নির্মাণে সচেতন ও সুদক্ষ; তাঁর ইতিহাস-ঐতিহ্য চেতনা প্রাগ্রসর। ইতিহাস-ঐতিহ্য চেতনায় নিরীক্ষণে তাঁর ‘সকল নদীর নাম গঙ্গা ছিল’ স্মরণ করা যেতে পারেÑ ‘সকল নদীর নাম গঙ্গা ছিল/আমার বাড়ির পাশে আড়িয়াল খাঁ/একদিন তার বুকে বাইচের নৌকা নিয়ে/সারাদিন খেলায় মেতেছি/এই যে পাশেই দেখি কুমারের পরিক্লান্ত দেহ/পদ্মার রূপের মোহে সে-ও তো বিভোর ছিল/প্রথম যৌবনে।/মধুমতী নদীর জলের মিষ্টিস্বাদ/এখনো রয়েছে কি না জানি না/কীর্তিনাশা তার নাম/সার্থক করেছে জানি অক্ষরে অক্ষরে।/গাঙ বলি কুমারকে, আড়িয়াল খাঁ-ও পূর্ণ গাঙ/গঙ্গা থেকে গাঙ/গাঙ থেকে গাঙ/গাঙ মানে পৃথিবীর যে কোনো নদীর জলধারা/একদিন সকল নদীর নাম গঙ্গা ছিল শুধু।’(সকল নদীর নাম গঙ্গা ছিল)
‘নদী’ তপন বাগচীর কাছে কবিতার প্রিয় উপজীব্য। এই কবির কাছে প্রেম রোমান্টিক এক অনুভূতি। আর প্রকৃতির অপার রহস্যের মধ্যেও থাকে রোমান্স। বাংলার এই উদার প্রকৃতি- নদী, খাল, মাঠ, আকাশ দেখে তাঁর মন উদাস হয়ে যায়। তাই তো তাঁর পঙক্তির পর পঙক্তিতে থাকে প্রকৃতির স্পর্শ। তাঁর কবিতায় গল্পও থাকে। একটি চরণের কবিতায় থাকতে পারে এক হাজার পৃষ্ঠার ইতিহাসের গল্প। কিন্তু সেই গল্প যেন গল্পের কাঠামোতে না থাকে, যেন তা কবিতার কাঠামোতে থাকেÑ এই প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায় তপন বাগচীর সৃষ্টিতে। গল্প বলার দায় নিয়ে তিনি কবিতা লিখতে বসেননি। গল্প এসেছে কবিতার প্রয়োজনে। তাঁর অনেক কবিতার ভেতরে গল্প এসেছে, কিন্তু পাঠকের মনে হয়েছে কবিতা পড়ছেÑ আর এখানেই কবির দক্ষতা। ‘নদীকাহিনী’ সিরিজ কবিতাগুলো এক্ষেত্রে তাঁর জীবনের অনাবিল আনন্দের রঙে উদ্বেলিত। জন্মভূমি বিধৌত কুমার থেকে আড়িয়াল খাঁ ও কীর্তিনাশার গভীরে ডুব দিয়েছেন তিনি। কবিতায় গল্পের শরীর বুদবুদ তুলেছে কুশিয়ারা; ডাকাতিয়া দ্রোহের চিত্র উজ্জীবিত করে তাঁকেÑ ‘প্রাণ যদি নদী হয় স্বচ্ছ কুশিয়ারা/ ফেনিল সাগরে ছোটে অনন্ত মিছিল/ কীর্তিনাশা বুক হবে শোণিতের ধারা/ সুফলা যুবতী যেন ডাকাতিয়া বিল।’(দ্রোহ) তাঁর কবিতায় এভাবে ইতিহাস-ঐতিহ্য আর প্রকৃতির সঙ্গে মিলেছে মানব হৃদয়। নারীর প্রেম জীবন্ত হয়ে উঠেছে কেয়াপাতার স্পর্শে- ‘কেতকী আমার পাল এই ভাঙা-জীবনের নায়ে।’(ষোড়শী) উল্লেখ্য, তপন বাগচী নাগরিক জীবনের চেয়ে সাধারণ গ্রামীণ প্রকৃতি ও লোকায়ত জীবনের নিবিড় পর্যবেক্ষক। শহরে শেয়াল ডাকে না বলে তাঁর খুব দুঃখ। তাঁর শিল্পযাত্রা বৃষ্টিতে ভিজে প্রসারিত হয়েছে ‘সাংস্কৃতিক সমীক্ষা’য়।  

এই সাংস্কৃতিক সমীক্ষার ফল হলো তাঁর ‘যাত্রা’ নিয়ে সিরিজ কবিতাগুলো। কবি তপন বাগচীর সিরিজ কবিতা রচনার তাগিদ এসেছিল একই বক্তব্যকে যখন তিনি একটি কবিতার ফ্রেমে আটকাতে পারছিলেন না তখন। কবির বক্তব্য এসব ক্ষেত্রে অনিঃশেষ; কেবলি ডালপালা মেলে বিস্তার পেতে চায়। আমরা জানি, একটিমাত্র উপলব্ধি নিয়ে একটি কবিতাই রচিত হতে পারে। এজন্য ভিন্ন কবিতা হলে সম্পর্কের সুতোর রঙ ফিকে হয়ে আসে। তাই তিনি সিরিজ কবিতাতেই বেঁধে রেখেছেন নিজের অনুভূতি ও ভাবনাগুলো। এটা পুরানো টেকনিক হলেও তাঁর বিষয়বস্তু অভিনব।

শেকড়সন্ধানী কবি তপন বাগচীর যাত্রাগান নিয়ে নিরীক্ষাধর্মী পর্যালোচনামূলক গবেষণাগ্রন্থ ‘বাংলাদেশের যাত্রাগান : জনমাধ্যম ও সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত’(২০০৭) ইতোমধ্যে খ্যাতি অর্জন করেছে। প্রযুক্তির দাপটে বিলুপ্তপ্রায় যাত্রাগানের নানাবিধ সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে আলোকপাত করেছেন তিনি। পাশাপাশি লোকসংস্কৃতি নিয়ে দীর্ঘ গবেষণাও রয়েছে তাঁর। আবিষ্কার করেছেন লোকসংস্কৃতির অজানা অনেক তথ্য। বর্তমান সভ্যতায় অবেহেলিত যাত্রাশিল্প নিয়ে দীর্ঘ গবেষণায় আদ্যোপান্ত ওই শিল্পসম্পৃক্ত মানুষের সামগ্রিক সংকট তুলে ধরেছেন পাঠকের সামনে। যাত্রাগানে নারীর অংশগ্রহণ ও উপস্থাপন কৌশল নিয়েও তাঁর নিবিড় পর্যবেক্ষণ রয়েছে। কবি তপন বাগচীর ‘যাত্রাকাহিনী’ সিরিজ বিশ্লেষণের সময় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মঞ্জরী অপেরা’ উপন্যাসের কাহিনির কথা মনে পড়ছে। তবে যাত্রা’কে কেন্দ্র করে তপন বাগচীর অনুভাবনার গভীরতা ভিন্ন, উদ্ভাসনও স্বতন্ত্র। তাঁর ‘নির্বাচিত ১০০ কবিতা’য় সংকলিত ‘যাত্রাকাহিনী’ সিরিজ কবিতাগুলো সত্যিই পাঠককে নাড়া দিতে সক্ষম।

 ‘যাত্রাকাহিনী : এক’Ñ যাত্রায় যেসব নট-নটী অভিনয় করে তাদের কথা বলা হয়েছে। তারা কেউ কেউ সারারাত মঞ্চে অভিনয় করে যায়। আবার তাদের কেউ আছে সেরা অভিনয় শিল্পীর খেতাবের জন্যও নাচে, গায়। তাদের সবাই কাঁচা নয়, যাত্রার সকল বিষয়ে পারদর্শী। দেখা যায় যাত্রায় যে সব নট-নটীরা অভিনয় করে তারা বেশির ভাগই পতিতা। তারা নিজের পেটের দায়ে অন্যকে সেবা দেয়। অথচ তারাও সাধারণ আর দশটা মানুষের মতো, একই মাটি-জল-বায়ুর সন্তান। কিন্তু তারা সমাজের কাছে ঘৃণার পাত্র। তারা টাকার জন্য মঞ্চে নাচে, বিনোদিত করে অপরকে। আবার মঞ্চের বাইরেও বড় মজলিসে, দালানে নাচতে দেখা যায়। তারা পেটের দায়ে অন্যকে রূপ দেখিয়ে, সেবা করে দিনাতিপাত করে। তারা অভাগিনী। কিন্তু ততটা খারাপ নয় তারা যতটা সমাজের মানুষ তাদের সম্পর্কে ভাবে। কবির ভাষায়-‘পতিতারা ভালো- আহা, তারা নয় মন্দ অভাগিনী। কেবল পেটের দায়ে তারা করে রূপ-বিকিকিনি।’(নির্বাচিত ১০০ কবিতা, পৃ ৫৬) 

কবি জানেন যাত্রাপালা স্বভাবত কার্তিক মাসে, মানুষের অবসর সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। ‘যাত্রাকাহিনী : দুই’ কবিতায় তপন বাগচী একজন পুরুষ পতিতার কথা বলেছেন। তাকে কবি চার বছর ধরে চেনেন। বয়স ৬০ বছরের কাছাকাছি। এতে বোঝা যায় যে, পতিতারা বৃদ্ধ হলেও পতিতাবৃত্তি করেই জীবন নির্বাহ করে। কিছু পতিতা আছে যারা যার কাছ থেকে উপকার পায় তাকেই আবার নিজের স্বার্থের জন্য ক্ষতির মুখে ঠেলে দেয়। পতিতারা কবিতা আর গান গেয়ে মানুষকে আনন্দ দেয়, জোর করে মানুষের কাছ থেকে বাহবা পেতে চায়। তারা রাতের অন্ধকারে দল বেঁধে সিনেমা পাড়ায় বা অভিজাত এলাকায় ঘুরে বেড়ায় শিকারের খোঁজে; রাস্তায় যাতায়াত করে। পুরুষ পতিতারা বিভিন্ন প্রসাধনি মেখে মঞ্চে নেচে-গেয়ে মানুষকে আনন্দ দেয়। তারা বোকা মানুষকে ভুলিয়ে তাদের হাত করতে চায়। বোকা মানুষগুলো লাভের চেয়ে বেশি ক্ষতি নিয়ে বাড়ি ফেরে। কিছু পতিতা আবার হিংসাতুর হয়ে থাকে। এভাবেই পতিতাদের বিভিন্ন আচার-আচরণ তুলে ধরেছেন কবি। কবিতার একটি অনন্য বাক্য হলোÑ ‘পতিতারা ভালোÑ তারা নিষ্ঠা রাখে নিজের পেশায়।’ ‘যাত্রাকাহিনী : তিন’- এ আছে ঘুণে ধরা সমাজের কাহিনি। শকুনির পালার কথা আর নটী বিনোদিনী কবিতায় উচ্চারিত হয়েছে গভীর মমতায়। কবি যাত্রার অলিখিত ইতিহাস লিখেছেন এখানে। যারা আঁধারের মুসাফির তবু গ্রামীণ মানুষের কাছে আকাক্সিক্ষত।

‘যাত্রাকাহিনী : চার’- আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, যাত্রাকাহিনীগুলো সাধারণত কার্তিক মাসে পরিবেশনা শুরু হয় এবং শীতকাল পর্যন্ত চলতে থাকে। কারণ এই সময় গ্রামের মানুষের কাজ থাকে না। তারা অলস সময় পার করে। হেমন্তের জ্যোৎস্না শোভিত রাতে বা শীতের রাতে এই যাত্রা উত্তরবঙ্গের কানসাটের রেখাচিত্রে উদঘাটিত। তা বসন্তের কর্মব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত চলতে থাকে। এই যাত্রাপালায় বিভিন্ন বিখ্যাত গান, ঐতিহাসিক চরিত্রের রিভিউ তুলে ধরা হয়। যাত্রাতে কখনো বিদ্রোহ, কখনো সমাজ সচেতনতামূলক কাহিনির অভিনয় চলে। যাত্রার অভিনয়ে লালনগীতি, সারিগান, জারিগান, পালা-গান যুক্ত হয়। কবির ভাষায়Ñ ‘অবোধের মন জুড়ে জেগে থাকে লালন ফকির।’(পৃ ৫৮) যাত্রাপালাগুলো সাধারণত খোলা মাঠে অথবা বাজারে কিংবা লোকালয়ে অনুষ্ঠিত হয়। যাত্রাকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে সমাজের মাঝে অসামাজিক কাজকর্ম সঞ্চারিত হতে পারে। যাত্রাপালা মানুষকে আনন্দ ও স্বপ্ন দেখালেও এর ভেতরে অনাকাক্সিক্ষত চিত্র ধরা পড়েছে কবির চোখে। 

‘যাত্রাকাহিনী : পাঁচ’-এ কবি যাত্রা আসরের পরিচয় আরো বিশদভাবে উন্মোচন করেছেন। মঞ্চে যে যখন অভিনয় করতে আসে তখন সে নিজেকে রাজা ভাবে এবং সে বিভিন্ন চরিত্রের প্রতিনিধিত্ব করে। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন চরিত্র সেজে আড়ালে অথবা প্রকাশ্যে সমাজের বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরে। যাত্রার এই অভিনয় শিল্পীরা সাধারণত খোলা মঞ্চে অভিনয় করে থাকে। কিছু কিছু সময় দেখা যায় পতিতাদের নিয়ে রাতের আঁধারেও চলে বিভিন্নভাবে এই যাত্রার আসর। যাত্রার অভিনয় শিল্পীরা মুখস্ত সংলাপ অবিরাম বলে চলে। এ সূত্রে শহরের অনেক নটী দেখতে পাওয়া যায় তারা অচেনাই থেকে যায়। তারা যেদিকে আশার আলো দেখতে পায় সেদিকেই গা ভাসিয়ে দেয়। আড়ালের পাপগুলো একা সেই ‘ভগ্নি বিনোদিনী’রাই বয়ে নিয়ে বেড়ায়। তাদের সাথে যারা আনন্দ করে, বিলাসিতা করে তারা থাকে নিষ্পাপ। 

‘যাত্রাকাহিনী : ছয়’-এ কবি যাত্রার অভিনয় চিত্র গল্পে গল্পে বলে গেছেন সাবলীলভাবে। পরিবেশনার মধ্যে কি কি হয়, কে কি করেনÑ এসব। যেমন অতীতের কোনো চরিত্র বা ঘটনা বা কোনো কাহিনি বর্ণনা করা হয় যাত্রার মঞ্চে। কবি নিজের চোখে দেখা একটি যাত্রার কথা বলেছেন সুন্দরভাবে। একদিন এক মঞ্চে মাইকেল চরিত্রের অভিনয় হয়। অমলেন্দু বিশ্বাস নামের বিখ্যাত অভিনেতা ঠিক মাইকেলের মতো সেজে তার মতো বেশ ধারণ করেন। পরিবেশনার সময় দরাজ কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সংলাপ করেছেন; পোশাক, হাঁটা, কণ্ঠ সবই যেন একই রকম কবি যেমনটা শুনেছেন। অমলেন্দু মাইকেলের মতো দেখতে হলেও বাস্তবে আসলে মাইকেল নন। কিন্তু দর্শকসারির সবাই তাকে মাইকেল হিসেবেই ধরে নিয়েছে। ‘আরে ওই তো আমাদের মাইকেল! অমলেন্দু বিশ্বাস।’ (পৃ ৭০) ‘যাত্রাকাহিনী : সাত’Ñ এ কবি তপন বাগচীর হৃদয়সিংহাসনে যাত্রার নায়িকা স্থান করে নিয়েছে প্রেমাঙ্কুরের তৃষায়। এখানে কবি মন্ময় চেতনায় ছন্দের জাদুতে নিজের অনুভবের জানালা খুলে দিয়েছেন। ‘কার্তিকী মেঘ ভিজিয়ে দিয়েছে রিহার্সেলের বাড়ি/ আমরা দুজন প্রতিদিন বসি মুখোমুখি আড়াআড়ি।’(পৃ ৭০) 

‘যাত্রাকাহিনী : আট’ কবিতায় তপন বাগচী যাত্রার অতীত-বর্তমান চিত্র অঙ্কন করেছেন। যখন বিদ্যুৎ ছিল না তখন জ্যোৎ¯œায় অথবা হ্যাজাকের আলোতে মেকআপ করা অভিনয় শিল্পীরা এসে খোলামঞ্চে অভিনয় করত। মঞ্চের কোনো নিরাপত্তা ছিল না। একই অভিনেতা ভিন্ন ভিন্ন দিনে ভিন্ন ভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করে থাকে। গতদিনে যে ছিল রাজা-রাণী পরের দিন সে হয়ে যায় কেরানি কিংবা কেরানি-বধূ। যাত্রার কথা শুনে দূর-দূরান্ত থেকে ধনীর সন্তানেরা এসেও আনন্দ উপভোগ করতো এবং এখনো করে। তারা উপভোগ শেষে চলে যায়। কিন্তু যার সাথে আনন্দ করে সময় কাটিয়ে গেলো তার কোনো খবরও রাখে না। সেই ধনীর সন্তানেরা মেকআপ করা চেহারা দেখে উত্তেজনায় মাতোয়ারা হয়ে উঠে। অতীতে টিভিসহ আধুনিক উপকরণ ছিল না বলে মানুষ মঞ্চের এই আনন্দ কিছু সময়ের জন্য উপভোগ করত। যাত্রার সময় উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা দিত। কবি এমনও দেখেছেন যে যাত্রার নটীরা বিয়ে করে আর ফিরে যায়নি আসরে। এভাবেই চলে যাত্রার শুরু-শেষ; তবে যাত্রার কথা শুনলেই মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে এখনো ছুটে আসেÑ এতেই এই লোকশিল্পের কদর বোঝা যায়।  

‘যাত্রাকাহিনী : নয়’-এ আছে যাত্রার মঞ্চে অভিনয় শিল্পীরা জনপ্রিয় গান গেয়ে চলে নাচের তালে তালে। কখনো কখনো সারারাত চলে নাচ, গান। যারা কখনো নাচের স্কুলেই যায়নি তারাই  গানের তালে তালে নাচে ও গায়তে থাকে। যারা কখনো যাত্রা দেখতে যায়নি কিন্তু শুনেছে তাদের মনের মঞ্চেও কল্পনার যাত্রাপালার মঞ্চ ভেসে ওঠে। যাত্রাপালা নিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ব্যক্তি প্রেমের নারীকে অভিনেত্রী কল্পনা করেছেন। প্রচলিত সংসারে তার চলাফেরা। তেমনি একটি পালা হলো ‘নন্দরাণীর সংসার’।  

‘যাত্রাকাহিনী : দশ’ কবিতাটিতে একজন নটীর মনের কথা তুলে ধরেছেন কবি সুন্দরভাবে। সে মঞ্চে উঠে বিভিন্ন ধরনের মন মাতানো গান গায়, শব্দ করে। তারও যে মনের বাসনা আছে, তারও যে একা থাকতে যন্ত্রণা হয়- এসব বলেও সে সবার মন ভুলাতে চায়। অনেক নাগর এসে উপস্থিত হয় তাকে খিলি পান খাওয়ার আহ্বান জানায়, আলাপ করতে এবং একা সময় কাটাতে চায়। নায়িকা মঞ্চে নেচে-গেয়ে দর্শক মাতাবেÑ এটাই তাদের পেশা। তারা মঞ্চের সাথে যে মায়ায় বেঁধে যায় তার জন্যই সাজে, নাচে। তারা সবার নায়িকা, কারো একার নয়। আসলে যাত্রার অভিনেত্রীদের জীবনে প্রতিদিন নতুন করে নাগর আসে কিন্তু কেউ তাদের আগের চেনা নয়। আপন হয় না কেউ। কবি এভাবেই ‘যাত্রা’র অনুপুঙ্খ চিত্র সিরিজ কবিতাগুলোতে তুলে ধরেছেন।  

মূলত তপন বাগচীর ‘যাত্রাকাহিনী’র সিরিজকবিতাগুলো পড়লে আমরা উপলব্ধি করতে পারি ‘কবিতা বলার চেয়ে বেশি বলে’। যেমন বড় কিছুকে আমরা তুলনা করি কবিতার সঙ্গে। তাই বঙ্গবন্ধুকে বলা হলো ‘রাজনীতির কবি’। ফুটবল ভালো খেললে বলি ওর পায়ে কবিতার ছন্দ আছে। আগে একবার উল্লেখ করা ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’ চরণের কথাই ধরা যাক। এই সন্তান ছেলে বা মেয়ে নয়Ñ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তর বোঝায়। দুধেভাতে মানে কেবল দুধ আর ভাত নয়; এটা প্রতীকী। এই দুধভাত মানে সুষম খাবার, মানে বেঁচে থাকার ন্যূনতম অবলম্বন, মানে শুদ্ধ খাবার। এখনকার বিচারে ভেজালমুক্ত খাবারও বোঝানো যায়। এই প্রার্থনা বাক্যের মধ্য দিয়ে আমাদের কৃষিসংস্কৃতি, আমাদের অর্থনীতি এবং সমাজতত্ত্বও ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এভাবে একটি দুটি শব্দ দিয়েও আঁকা হতে পারে বৃহৎ চালচিত্র। কবিতা যত পুরনো হয়, ততই গভীর হয়। এজন্য রবীন্দ্রনাথের লেখা এখনো আমরা প্রাসঙ্গিক বলে ভাবি। ‘যাত্রাপালা’ বিষয়বস্তু হিসেবে পুরানো হলেও কবি তপন বাগচীর কবিতায় নতুন মহিমায় উচ্চকিত। এভাবে তপন বাগচীর কবিতার বিষয়বস্তুর প্রতিফলন আছে নানান মাত্রিকতায়। তাঁর বাড়ির কাছে কুমার, আড়িয়ালখাঁ, মধুমতী নদীর কথা লিখেছেন, আবার মরা নদী ‘হুন্দা’কে জাগিয়ে তুলেছেন। তিনি লিখেছেন তাঁর প্রকৃতির কথা। লিখেছেন রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জসীম উদদীনের কথা। তাঁর পূর্বসূরীদের তিনি কবিতায় ধরে রেখেছেন। তাঁর ‘যে যাবে সে যাবে তাতে দুঃখ কে বুকে/ আমি তো সুখেই আছি অনন্ত অসুখে’Ñএর মতো অনেক চরণের ভেতরে বহু ব্যঞ্জনা খুঁজে পান অনেক পাঠক। মাদকবিরোধী কিছু চরণ রচনা করেছিলেন তিনি। তার কিছু ঢাকার রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুলের দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানার হোসেনপুর কলেজের দেওয়ালেও তাঁর কবিতার চরণ মুদ্রিত রয়েছে। এসবই কবি হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তার কথা বলে। এভাবে পাঠকের স্মৃতিতে, পাঠে বেশি করে তপন বাগচী উচ্চারিত হতে থাকবেন মহাকাল অবধি এই প্রত্যাশা আমাদের।

লেখক: মিল্টন বিশ্বাস, অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email : writermiltonbiswas@gmail.com)  

এই বিভাগের আরো সংবাদ