আমার শিক্ষক, জাতির শিক্ষক ‌‌‘আনিসুজ্জামান’

অভীক ওসমান, ৩০ জুন, এবিনিউজ : ‌‌‌‌আনিসুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম, জামিলুর রেজা চৌধুরী এই তিন কিংবদন্তী শিক্ষাবিদ আগামী পাঁচ বছরের জন্য জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে বরিত হয়েছেন। আনিসুজ্জামান। “বামুনের দেশে মহাকায় তিনি।” আরেক মহাকায় হচ্ছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। “জ্ঞান তাপস আবদুর রাজ্জাক স্মারক গ্রন্থ’টি আনিসুজ্জামান সম্পাদনা করেছেন (আগস্ট ২০১২)। এই গ্রন্থে আনিসুজ্জামান কর্তৃক লিখিত প্রফেসর রাজ্জাকের উপর লেখাটির নাম “সার্‌ (প্রাগুক্ত–১১৫) আনিসুজ্জামান আমার স্যার। সরাসরি শিক্ষক। তিনি শিক্ষকের শিক্ষক, লিডার অফ দি লিডার্স। শুধু বাংলাদেশে নয়, ওপার বাংলায়, এমনকি নিখিল বিশ্বে তিনি পণ্ডিতজন হিসেবে খ্যাত। এক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে প্রায় তিনি বুদ্ধদেব বসুর সাথে তুলনীয়। এই মুহূর্তে মনে পড়েছে স্যার শুধু শিক্ষক নন। তার অভিসন্ধর্ভ ইঙ্গিত করেছে আজকের বাংলাদেশকে। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণ ও প্রবাহমান রাখা, ’৭১ পূর্ব বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের উত্থানপর্বের সচেতক, মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক। ’৭১ পরবর্তী প্রতিটি স্বৈরশাসন বিরোধী ও গণতন্ত্রকামী আন্দোলনে স্রষ্টা, দ্রষ্টা ও স্বাপ্নিক। তাকে আলোর সাথে তুলনা করে বাঙালীর বাতিঘর, বৃক্ষের সাথে উপমায় বটের মহিমা, কালের খেয়ার যাত্রী, উষার দুয়ারে, মা ঃ আনিসুজ্জামান) অভিধা অঙ্গরীয়গুলো পরিয়ে দেয়া হয়। জীবিতকালে তিনি হয়ে ওঠেছেনে মহাকাব্যিক উপান্যাসের নায়ক।

তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে বরিত করার জন্য তাঁর ছাত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ জানাই। কোন এক রাজকীয় অনুষ্ঠানে শুনেছি আনিসুজ্জামান পাশে ছিলেন বলে প্রধানমন্ত্রী রেড কার্পেটেরে উপর দিয়ে হাঁটেন নি। আমি তার ছাত্র। কিন্তু গণ্যমান্য ছাত্র নই। তার লক্ষ কোটি ছাত্র দেশে বিদেশে ছড়িয়ে আছে। তার সম্পর্কে লেখার কোন যোগ্যতা নেই। তবুও লিখছি।

প্রথম বাঙলা সম্মিলন

একদম শেষ থেকে শুরু করি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন বিভাগ –বাংলা বিভাগ। এর অর্ধশত বছর (১৯৬৬–৬৭) পূর্ণ হয়ে গেছে। একবিংশের শুরুর দিকে বাংলা বিভাগের সতীর্থরা একটা পুনর্মিলনীর জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছিলো। তখন বিভাগ বা ব্যাচ ভিত্তিক এত পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান হতো না। সম্ভবত ঃ ২০০৭ এর শেষের দিকে বাইচান্স আমি বাঙলা সম্মিলনের সভাপতি নির্বাচিত হই। এর জন্য তরুণ বন্ধু এডভোকেট শিহাব উদ্দিন রতন, আইয়ুব ভ্থঁইয়া (কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ), সমীর কান্তি দাশ (বোয়ালখালি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কলেজের অধ্যক্ষ)সহ অনেকের কাছে কৃতজ্ঞ। নগরীর ইসলামাবাদী মেমোরিয়াল হলে অস্থায়ী কার্যালয় স্থাপন করে আমি প্রতিশ্রুতি দিই ৬০ দিনের মধ্যে প্রথম বাঙলা সম্মিলন অনুষ্ঠান করবো। প্রীত হবার বিষয়ে যে ২৯ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ ২০০৮ ফয়’স লেকে ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিখিল বাংলাদেশ থেকে হাজার খানেক সতীর্থের অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাঙলা সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়।

মনে পড়ে ২৯ ফেব্রুয়ারি প্রাতে চট্টগ্রাম এয়ারপোর্টে উদ্বোধক ও প্রধান অতিথি আনিসুজ্জামানকে আমরা রিসিভ করতে গিয়েছিলাম। এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষকে বলেছিলাম ভিআইপি রুম নয়, ভিভিআইপি রুম খুলে দেন। বলেছিলাম তিনি সাধারণ নন, অসাধারণ। শোনা যাচ্ছিলো তখন দেশের “মহামান্য” পদে স্যারের নাম বিবেচনায় ছিল। স্যার আমাদের গাড়ীতে উঠলেন। আবেগে আমি শিহরিত হয়ে উঠি।

‘আমি বাঙলায় গান গাই/আমি বাঙলার গান গাই/আমি আমার আমিকে চিরদিন এই বাঙলায় খুঁজে পাই’ জনপ্রিয় এ গানের কলিগুলো বুকে ধারণ করে নগরীর ফয়’স লেকের জলকাকলিতে আনন্দঘন ও মনোরম পরিবেশে শুরু হয়েছে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের সংগঠন বাংলা সম্মিলনের দু’দিনব্যাপী প্রথম পুনর্মিলনী ও স্মৃতিচারণ উৎসব। শুক্রবার সকালে রং–রেরবেঙের বেলুন উড়িয়ে এ বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ ড. আনিসুজ্জামান। এ উপলক্ষে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাঙলা সম্মিলন এর সভাপতি কবি অভীক ওসমান। সূচনা বক্তব্য রাখেন কমিটির সাধারণ সম্পাদক জিন্নাহ চৌধুরী। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন কমিটির কার্যকরী সভাপতি বিশ্বজিৎ চৌধুরী। উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. আনিসুজ্জামান চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর ষোলো বছরের শিক্ষকতা প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, ‘এ সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে সম্মান ও আন্তরিকতা পেয়েছি তা কখনই ভুলবার নয়। তিনি শিক্ষাবিদ আবদুর রাজ্জাকের উদ্ধৃতি টেনে বলেন, শিক্ষকের বয়স বাড়ে, কিন্তু ছাত্রছাত্রীদের বয়স বাড়ে না। বাংলা বিভাগের ছাত্র–ছাত্রীদের মধ্যে যে পারস্পরিক সম্পর্ক রয়েছে। তা অন্য কোন বিভাগের তুলনায় অনেক বেশি। মাতৃভাষা বাংলায় বাংলা বিষয়ে পড়ার কারণে এ সম্পর্কটা আন্তরিক এবং অত্যন্ত দৃঢ়। ছাত্র–শিক্ষকদের চির অটুট বন্ধন কামনা করে তিনি বলেন, প্রীতি বন্ধনের নিরবচ্ছিন্ন মায়ায় গড়ে উঠুক আমাদের আগামী জীবন।’ বিনয় বাঁশীর উত্তরাধিকার বাবুল জলদাশের নেতৃত্বে ঢোলক বাদনের তালে তালে নেচে–গেয়ে আনন্দে মেতে ওঠেন বাংলা বিভাগের ১৯৬৮ ব্যাচ থেকে ২০০৫ ব্যাচের ছাত্রছাত্রীরা। (জনকণ্ঠ ১ মার্চ ২০০৮) প্রথম সম্মিলন উপলক্ষে ‘এক সে পদ্ম তার চৌষট্টি পাখনা’ নামে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

স্যার আরো বলেছিলেন, ‘মাতৃভাষা বিষয়ে পড়ার কারণে বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অনেক গভীর। এ ধারাটি সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারলে অব্যাহত হৃদ্যতা আরো প্রস্ফুটিত হয়ে সবার মধ্যে একটা স্থায়ী বন্ধনের সৃষ্টি হবে। যা আমাদের সমাজে অত্যন্ত বিরল ও অমূল্য।’

ভালোবাসি ভালোবাসি এই সুরে জলে, স্থলে বাজায় বাঁশি

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিন অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। অধ্যাপক সৌরেন বিশ্বাসের নেতৃত্বে সম্মিলনে অংশগ্রহণকারীদের লাল গালিচা সংবর্ধনা দেয়া হয়। প্রায় ১ কিলোমিটার জুড়ে পুষ্প বৃষ্টি ছড়ানো হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষকরা ও নবীন ছাত্ররা সম্মিলিতভাবে এর জন্য প্রচুর পরিশ্রম করে।

বাংলা বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী ও বিভাগের শিক্ষকদের ভালোবাসার প্রতি নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বললেন, ‘কোথাও দেখা মাত্রই শিক্ষার্থীরা যখন হাসিমুখে কাছে ছুটে আসে, তখন মনে হয় আমার দীর্ঘ অধ্যাপনা জীবন বৃথা যায় নি। আজ জীবনের শেষপ্রান্তে এসে দেখি মানুষের ভালোবাসাই আমার সঙ্গী। এটা ছাড়া আমি নিঃস্ব।’ (সুপ্রভাত বাংলাদেশ ১ মার্চ ২০০৮)

সেদিন স্যার বলেছিলেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাঙলা সম্মিলনের এ দুটি দিন আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ আনন্দঘন সময়। এর আগে অন্যকোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাথে এতো বেশি খোলামেলা আড্ডা দেয়ার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। স্যার আরো বললেন, “এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমার যে হৃদ্যতা বৃদ্ধি পেল তা কখনো ফুরোবার নয়।” একটি স্থানীয় পত্রিকা স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা, আবেগকে নিম্নোক্তভাবে রিপোর্টিং করেছেন।

“বিভাগের বর্তমান শিক্ষার্থীদের নিয়ে বেলা ১১ টার দিকে বাংলা বিভাগ প্রাঙ্গন থেকে র‌্যালি দিয়ে শুরু হয় অনুষ্ঠানের যাত্রা। বর্ণাঢ্য র‌্যালি শেষে দুপুর ১২ টার বিশ্ববিদ্যালয় মুক্তমঞ্চে শুরু হয় আড্ডা আর স্মৃতিচারণের পালা। একটি বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান হলেও বাঙলা সম্মিলন আকৃষ্ট করেছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সকল বিভাগের শিক্ষার্থীকে। এ ধরনের একটি প্রাণবন্ত অনুষ্ঠান উপভোগ করতে অন্যান্য বিভাগের শিক্ষার্থী জড়ো হয়েছিলো মুক্তমঞ্চে। এমনই একজন ছাত্র পদার্থবিদ্যা বিভাগের আরিফুর রহমান। গবেষণা আর পড়াশুনা নিয়ে প্রতিনিয়ত ব্যস্ত থাকা ওই ছাত্রও গতকাল ছুটে এসেছিলেন বাঙলা সম্মিলনে। অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, “বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত বাংলা বিভাগের এ রকম হৃদয় ছোঁয়া একটি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করতে না পারলে খুবই খারাপ লাগতো। অন্যদিকে আনিসুজ্জামান স্যারকেও এতো কাছাকাছি পাওয়ার সৌভাগ্য হারাতে চাইনি। সব মিলিয়ে বাঙলা সম্মিলনে চলে এলাম।” “বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার মাত্র এই কদিনের মধ্যেই আনিসুজ্জামান স্যারের সাথে এতো প্রাণবন্ত আড্ডার সুযোগ পাবো তা ভাবতে পারিনি। বাঙলা সম্মিলন আমাদেরকে দেশবরেণ্য এই বিখ্যাত শিক্ষকের এতো কাছাকাছি আসার সুযোগ করে দিয়েছে। আমাদের জন্য এটা একটা দুর্লভ পাওয়া।” চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৭–২০০৮ শিক্ষাবর্ষে বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার এক মাস পার হওয়ার আগেই বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের সাথে এতো খোলামেলা আড্ডার সুযোগ পেয়ে আবেগ মেশানো এ কথাগুলি বলে গেলেন বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী রাজীব, শিমুল, রেহানা পারভিনসহ বিভাগের একাধিক শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের মাঝে উচ্ছল আড্ডায় মেতে ওঠা এই দেশবরেণ্য শিক্ষককে যেন নতুনভাবেই আবিষ্কার করলেন তারা।”

পরবর্তীতে ২০ মার্চ ২০১০ সালে একই কমিটির নেতৃত্বে দিনব্যাপী ফয়’স লেকে সি ওয়ার্ল্ডে দ্বিতীয় বাংলা সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’ নামের প্রকাশিত স্মারক গ্রন্থে স্যার ‘ফিরে দেখা’ নামে একটি নিবন্ধ লেখেন। “১৯৬৯ সালে অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান আমাকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগে নিয়ে এসেছিলেন। আমি এই বিভাগ ছেড়ে যাই ১৯৮৫ সালে। মাঝখানে সুখদুঃখের দোল দোলানো ষোলো বছরের কিছু বেশি সময়। চট্টগ্রামে থাকতে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার সৌভাগ্য ঘটে আমার। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে এখানে বাংলা বিভাগ গড়ে তোলার সুযোগ পাই। কৃতী শিক্ষকদের সম্মিলনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলা বিভাগ এক সময়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। একবার আন্তর্জাতিক যোগাযোগও গড়ে উঠেছিল। ফলে দেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে এবং বাইরের বিদ্বজ্জনদের সঙ্গে করে দুটি বড় সেমিনার আয়োজন করাও সম্ভব পর হয়েছিল। ছাত্রছাত্রী–সহকর্মীদের নিয়ে বাংলা বিভাগের চমৎকার পরিবেশ গড়ে উঠেছিল। আন্তরিকতার সেই বন্ধন আজও অটুট রয়েছে। বিভাগের চল্লিশ বৎসরপূর্তি উপলক্ষে সে পুনর্মিলনীর আয়োজন হয়েছে, সেটা তারই নিদর্শন। আশা করি প্রাণের স্পর্শে এই পুনর্মিলনী সার্থক হবে।” (আনিসুজ্জামান : এক সে পদ্ম তার চৌষট্টি পাখনা ২০০৮) । গ্রন্থের প্রচ্ছদ করেছিলেন সতীর্থ খালিদ আহসান।

সর্বশেষ স্যারের সাথে দেখা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সূবর্ণ জয়ন্তীতে। তিনি স্টেইজ থেকে নেমে এলে বাংলা বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগের ছাত্র–ছাত্রী শিক্ষকরা তাকে ঘিরে একটি ক্ষুদ্র সমাবেশ গড়ে তুলেন। গম্ভীর, স্নেহময় দৃষ্টিতে গ্রহণ করছিলেন সবার কদমবুচি, সম্ভাষণ এবং কাউকে কাউকে জড়িয়ে ধরা। মনে হচ্ছিল বিরাট বটের শীতল ছায়ায় শিক্ষার্থীরা আশ্রয় চাচ্ছে।

বাংলা সমিতির নির্বাচন : স্যারের সহনশীল ভূমিকা

স্যার পদাধিকার বলে বাংলা সমিতির সভাপতি ছিলেন (আনিসুজ্জামান স্যার সম্মাননা গ্রন্থ : মাহবুবুল হক) চট্টগ্রাম কলেজে অনার্স পড়াকালীন সময়ে মমতাজ উদ্‌দীন আহমদ বাংলা সংসদের পদাধিকার বলে সভাপতি ছিলেন, আমি নির্বাচিত, জিএস.ভিপি ছিলাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ. পড়তে গিয়ে বাংলা সমিতির নির্বাচনে ভি. পি পদে প্রার্থী হতে চাইলাম। সতীর্থ আবু হেনা আগে থেকে জি.এস. ছিল এবং ভি.পি পদের প্রার্থী ছিল। ভিন্ন প্রেক্ষাপটে তখন আমি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে আগত সতীর্থ হাসান ইমাম মজুমদার ফটিককে (বর্তমান অজিত গুহ কলেজের অধ্যক্ষ) প্রার্থী করার প্রস্তাব দিলাম। ফটিকের ভোট ব্যাংক ছিল ভিক্টোরিয়া কলেজ, আর সিলেট এন এম সি কলেজ। আমার সাথে চট্টগ্রাম কলেজে অনার্সে পড়তো সব গৃহবধু ও আপারা। বয়সে বড় বিত্তবান গৃহনী সতীর্থরা আমাকে একাডেমিকভাবে নির্ভর করতো, ব্যক্তিগতভাবে স্নেহ করতো। ভোটের দিন প্রাতে আমি ৩টা টেঙি করে ১২টা ভোট নিয়ে হাজির। ভোটাভুটি সমান সমান হল। পরবর্তীতে লটারী। এতে হাসান ইমাম মজুমদার জিতে গেলেন। ডিপার্টমেন্টের করিডোরে মিছিল, আনন্দ উৎসব। আনিস স্যার ফটিককে ডেকে বললেন, তোমার সমর্থকদের শান্ত থাকতো বলো। এমনই ভারসাম্যমূলক মহীয়ান শিক্ষক আনিসুজ্জামান।

অফিস অব দ্যা ডিন, ফ্যাকাল্টি অফ আর্টস

১২ সেপ্টেম্বর ১৯৮০ ইং থেকে ২১ সেপ্টেম্বর ১৯৮২ পর্যন্ত ডিনের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ৪ঠা নভেম্বর দ্বিতীয় বারের মতো ডিন নির্বাচিত হন, ৩ নভেম্বর ১৯৮৪ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।

এ বিষয়ে স্যারকে উদ্ধৃত করছি। ‘আবুল ফজল সাহেব রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নিযুক্ত হলে অধ্যাপক আবদুল করিম হলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। তাঁর জায়গায় কলা অনুষদের ডিনের দায়িত্ব আমার ওপর বর্তালো–কর্মে শ্রেষ্ঠতার জন্যে এ নিয়োগের বৈধতা নিয়ে আর একজন প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুললেন, কিন্তু তা টিকলো না। নতুন করে ডিন–নির্বাচনের সময় যখন এলো, তখন আমি প্রার্থী হলাম। কারো কাছে ভোট চাইতে যাই নি। সে কারণে কিনা জানি না নির্বাচনে পরাজিত হলাম। এক মেয়াদ বাদ দিয়ে পরপর দুবার প্রার্থী হলাম। এবারে সকলের কাছে ভোট চাইলাম এবং দুবার জয়ী হলাম। সিন্ডিকেটে থাকলাম অনেকদিন। সে নিয়ে এক কাণ্ডই ঘটে গেল। তখন ড. আবদুল আজিজ খান উপাচার্য। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের প্রতিনিধি হিসেবে আমি সিন্ডিকেটে চ্যান্সেলরের–তখন চ্যান্সেলর জেনারেল এরশাদ–মনোনীত সদস্য নিযুক্ত হয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের তখন বেশ খানিকটা দলাদলি চলছে। আমাদের দলের আরেকজনকে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল থেকে সিন্ডিকেটে আনা যাবে মনে করে আমি নির্বাচিত পদ ত্যাগ করে মনোনীত পদটাই রাখলাম। অল্প দিনের মধ্যে চ্যান্সেলর আমাকে দেওয়া মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিলেন। ভাগ্যিস অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল থেকে সিন্ডিকেট তখনো প্রতিনিধি নির্বাচিত হয় নি। আমি দ্বিতীয়বার নির্বাচত হয়ে চ্যান্সেলরকে বুঝিয়ে দিতে পারলাম যে তার বিরাগে আমার অবস্থার পরিবর্তন হয় নি পরে সিনেট থেকে উপাচার্যের প্যানেলে নির্বাচিত হই দ্বিতীয় স্থান পেয়ে আমি মনে করি নি যে, আমার প্রতি জেনারেল এরশাদের মনোভাব পরিবর্তিত হয়েছে, সুতরাং উপাচার্য না হতে পেরেও আশাহত হই নি।’ (জল পড়ে পাতা নড়ে, ২য় বাঙলা সম্মিলন স্মারক ২০১০) এখন প্রত্যেক ফ্যাকাল্টি ডিনের ওয়েল ফার্নিসড অফিস হয়েছে। আনিস স্যারের ছিল ছোট একটা রুম, একজন ম্যানুয়াল টাইপিস্ট। তবুও আমাদের স্যার যে ডিন তাকে দেখে এবং ভেবে গর্ববোধ হতো।

রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে সব লেজেন্ড ও হিপনোটিক টিচাররা ছিলেন। আবু হেনা মোস্তফা কামাল, মনিরুজ্জামান, আনিসুজ্জামান তাদের মধ্যে অন্যতম। স্যার আমাদের রবীন্দ্রনাথ পড়াতে গিয়ে ক্লাসে ঢুকেই বললেন– “তোমরা এম. এ. পাসের পর কোথাও ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে আনিসুজ্জামান তোমাদের রবীন্দ্রনাথ পড়িয়েছেন এটা বলবে না।” কি চমৎকার বিনয়। অথচ এই আনিসুজ্জামানই পাকিস্তান আমলে ১৯৬৭ সালে রবীন্দ্রনার্থ সম্পর্কে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ১৯ জন নাগরিকের বিবৃতিতে স্বাক্ষর সংগ্রহ ও তা প্রকাশনায় ব্যবস্থা করেন। ১৯৬৮ সালে স্টুডেন্ট ওয়েজ প্রকাশ করেন স্যারের সম্পাদিত প্রবন্ধ সংকলন–রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথের বলাকা পর্বের কবিতা সম্পর্কে যখন পরীক্ষায় খাতায় লিখেছিলাম। এখনও ভাবি, খুব মুগ্ধতা লাগে। বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে আমি একটু কনফিউস্‌ড ছিলাম। স্যার কি চমৎকারভাবে যুক্তি দিয়ে অসাম্প্রদায়িক বঙ্কিমচন্দ্রকে বুঝিয়ে দিয়েছেন। বলেছিলেন মুঘল আমলে দিল্লীর দরবারের রাষ্ট্রীয় সংঘর্ষ কিভাবে বাংলার প্রত্যন্ত পারিবারিক ক্ষেত্রে অভিঘাত সৃষ্টি করেন। আমরা যখন পরীক্ষাপত্রে কাব্যিক ও জটিল ইন্ট্রু লিখেছি। ছাত্র জীবনের পরবর্তীতে ভেবেছি তা ভূল করেছি। স্যারের লেখালেখি ও ভাষণে মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সহজ সরল বাংলায় লেখা ও বলা। চর্যাপদ পড়াতে গিয়ে তিনি হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর নামের আগে আচার্য ও মহা মহোপ্যাধ্যায় অভিধাটি সব সময় সংযুক্ত করতেন। পণ্ডিতজনকে আজীবন আনিসুজ্জামান সম্মান করে গেছেন। তাই তিনিও দেশে ও বিদেশে সম্মানিত হয়েছেন। পরিতাপের বিষয়, তাঁর আন্ডারে আমি এম.এ তে থিসিস করতে চেয়েছিলাম কিন্তু তা পারিনি।

আমার একাত্তর : মহান মুক্তিযোদ্ধা

আমি ব্যক্তিগতভাবে “শহীদ মেজর নাজমুল হক, সেক্টর–৭ এর নিস্মৃত কমান্ডারের উপাখ্যান” লেখা শুরু করি। ২০১০–১২ পুরো একবছর কাজ করতে হয়েছে। বিস্তর বই পড়তে হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মুজিব নগর সরকারের মূখ্য সচিব মুক্তিযুদ্ধের সাহসী সংগ্রামী নুরুল কাদের খান এর ‘আমার একাত্তর’ বইটি পড়তে হয়েছে। আনিস স্যারের আমার একাত্তর পড়তে গিয়ে জানতে পারি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, নগরে, রাউজানের শহীদ নূতন চন্দ্র সিংহের বাসভবনে পরবর্তীতে কলকাতা ও বহির্বিশ্বে একজন মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে চরকির মতো ঘুরে কাজ করেছেন। এ গ্রন্থে তাঁর একটি বাক্য ছিল ‘আমি তেমন ভাব কাতর লোক নই’। পাঠক হিসেবে আমি যুগপৎ বিস্মিত ও শিহরিত হই। যিনি বাংলা ভাষা সাহিত্যের শিক্ষকের শিক্ষক। আবেগের মুঘল অশ্বারোহী তাঁর মুখে এ কথা। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইমোশানের স্মার্ট ম্যানেজম্যান্ট বলে একটি শব্দ শুনছি। কত আগে আমাদের গুরু এই মূল্যবোধ ধারণ করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের উপর এর একটা তথ্য চিত্র ‘নাইন মান্থস টু ফ্রিডোম’ তৈরি হয়েছিলো। সেখানে শুরুতে নুরুল কাদের খান স্ক্রীনে দৃশ্যমান হয়ে বলে উঠেন “দিস ইজ নুরুল কাদের।” এ রকম দৃঢ়, কনফিডেন্ট উচ্চারণ শুধু নুরুল কাদের খানই করতে পারেন। স্যারের ভাষায় বলি, ‘আমার বন্ধু নুরুল কাদের অনেক দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে দৈনিক জনকণ্ঠে তার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকথা লিখেছিল ‘আমার একাত্তর’ নামে। সে যে এতো দেরিতে কেন এ–লেখায় হাত দিল, এটাই বিস্ময়ের বিষয়। মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে লেখার যোগ্যতা তার অনেকের চেয়ে বেশি; লেখার সামর্থ্যও কম নয়। তবুও খুব দেরিতে সে মুখে–মুখে এই স্মৃতিকথা বলতে শুরু করে, সেই মৌখিক বক্তব্য সংশোধন করে ভেঙে ভেঙে প্রকাশ করে ‘আমার একাত্তর’ নামে। ততোদিনে ওই একই নামে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছে। তার কাছে একথার উল্লেখ করামাত্র সে বলেছিল, ‘ভালোই তো, আমাদের দু’জনেরই এক নামে বই থাকবে।’ তার বই প্রকাশিত হচ্ছে যখন সে নেই এবং একই প্রকাশনী থেকে। প্রকাশকের ইচ্ছায় এর নাম দেওয়া হয়েছে একাত্তর আমার। নুরুল কাদের বেঁচে থাকলে এ পরিবর্তন সে করতে চাইতো কি না সন্দেহ। নুরুল কাদেরের জীবন ছিল বর্ণবহুল। তার কায়িক সৌন্দর্য ছিল ঈর্ষণীয়। (আনিসুজ্জামান ১৯৯৯)

নজরুলের জন্মশতবর্ষ

চট্টগ্রামে সর্বস্তরের নাগরিকগণ কর্তৃক নজরুলের জন্মশতবর্ষ পালন করা হয়। পরবর্তীতে ড. শিরীণ আখতার (বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ–উপাচার্য) ও আমার সম্পাদনায় একটি স্মারক গ্রন্থ বের হয়। এর সংক্ষিপ্ত অথচ মূল্যবান ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন প্রিয় শিক্ষক ড. আনিসুজ্জামান। “কাজী নজরুল ইসলাম সম্পর্কে নতুন–পুরোনো ২৬টি রচনা সংকলন করেছেন অভীক ওসমান। এই সংগ্রহে প্রতিফলিত হয়েছে ব্যক্তি ও সাহিত্যস্রষ্টা নজরুলের নানা দিক। লেখকদের মধ্যে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সমালোচক আছেন, প্রবীণ ও নবীন আছেন, ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মানুষ আছেন। নজরুলকে ঘুরিয়ে–ফিরিয়ে দেখে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও রচনার বহুবর্গ ও দ্যুতিময়তা দেখা হয়েছে এসব লেখায়। তাঁর কাব্য ও সংগীত, উপন্যাস ও নাটকের বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। তাঁকে স্থাপন করা হয়েছে বৃহৎ পটভূমিকায়, তুলনা করা হয়েছে ভিন্নদেশের বিশ্বনন্দিত কবির সঙ্গে। তাঁর জীবনের কোনো কোনো দিক, তাঁর চিন্তার কোনো কোনো ধারা, তাঁর প্রত্যয়ের কোনো কোনো এলাকা এতে ফুটে উঠেছে। নজরুলকে নিয়ে যে আমাদের মধ্যে এক–ধরনের সংকীর্ণতা প্রকাশ পায়, সেদিকও দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। নানা বৈচিত্র্যের মধ্যে নজরুলের সমগ্রতা ধরে তোলার যে–প্রয়াস আছে এই সংকলনে, তা কবিকে ভালো করে বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে। সম্পাদককে আমার অভিনন্দন।”

উপসংহার

তাঁর সম্পর্কে শেষ কথাটি বলা এই অকৃতী অধমের পক্ষে সম্ভব নয়। সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম আনিসুজ্জামান সম্মাননা গ্রন্থে স্যারকে পাবলিক ইন্টেলেকচুয়াল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি আরো বলেছেন, ‘এই দীর্ঘ জীবনে তিনি তাঁর জ্ঞান, পাণ্ডিত্য, সৃজনশীলতা, উদার মানবিকতা এবং সত্য ও সুন্দরের নিরন্তর সাধনায় নিজেকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যে এখন তিনিই তাঁর তুলনা। এ জন্য তাঁর নামের আগে–পরে কোনো বিশেষণের প্রয়োজন পড়ে না। কোনো আসরে অথবা সভা–সম্মিলনে প্রথা মেনে তাঁকে পরিচিত করানোর জন্য তাঁর নামটি উচ্চারণ করাই যথেষ্ট। আমাদের দেশে তাঁর মতো বয়োজ্যেষ্ঠ মানুষকে সম্মান করা হয়। কিন্তু অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে শুধু এই কারণে কেউ যদি সম্মান জানায়, তাহলে তাঁর স্বভাবজাত তারুণ্যের জন্য তাঁকে অভিবাদনও জানাতে হবে। এই তারুণ্য তাঁর জীবনকে অনুভব এবং উপভোগ করার, এক আশাবাদী এবং সম্মুখ–নিবদ্ধ দৃষ্টিতে উজ্জীবিত হবার এবং বাঙালির সংস্কৃতি ও লোকায়ত দর্শন থেকে শক্তি সংগ্রহের। তাঁর সঙ্গে যাঁরাই পরিচিত হয়েছেন, তাঁরাই প্রশংসা করবেন তাঁর প্রাণশক্তির প্রাচুর্যের, তাঁর সূক্ষ্ম রসবোধের, তাঁর সৌজন্যের।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান একজন সক্রিয় চিন্তার মানুষ, মার্কিন চিন্তাবিদ–লেখক–প্রকৃতিপ্রেমী র‌্যালফ ওয়াল্ডো এমার্সনের ভাষায় ‘ম্যান থিঙ্কিং’। এই সক্রিয় চিন্তার মানুষ তাঁর আবেগকে রাখেন বুদ্ধির শাসনে, ইতিহাস ও সময়কে দেখে বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিতে, সংকটে–সন্তাপে থাকেন স্থিরচিত্ত। এই মানুষের কাছে মানবিকতা আর সামাজিক অংশগ্রহণ গুরুত্ব পায়। সক্রিয় চিন্তার মানুষ অতীতকে আবিষ্কার করেন বইয়ের মধ্য দিয়ে, গবেষণার মধ্য দিয়ে; প্রকৃতিকে কল্পনা করেন মান সংগঠনের পেছনে বড়ো একটি প্রভাব হিসেবে এবং সংস্কৃতির শক্তিতে পেতে চান তার সকল শুদ্ধতা নিয়ে। এসবই আমি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মধ্যে পাই। সমকালীন ইতিহাসকে তিনি এক দীর্ঘদৃষ্টিতে দেখেন, ফলে রাজনীতির পালাবদলে অথবা বিপর্যয়ে তিনি বিচলিত হন না। দেশে যখন সাম্প্রদায়িকতা শক্তি অর্জন করে, তিনি আমাদের শঙ্কিত না হতে বলেন, যেহেতু তিনি জানেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সমাজ বিবর্তনের পথে এই ধরণের বাধাবিপত্তি আসে। এগুলো অবিচল থেকে সামাল দিতে হয়।

বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কপালে যদি একাত্তরের ঘাতকরা একটা কলঙ্কতিলক এঁকে দেয়, আরেকটি এঁকে দিল পঁচাত্তরের আগস্টের ঘাতকেরা। এ দুই ঘাতকদলের বিরুদ্ধে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান সরাসরি দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি দেশের অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠনের পেছনে অনুপ্রেরণাকারীর ভূমিকায় আছেন।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে অনেকভাবেই দেখা যায়, তাঁর কাজ অনেকভাবেই পড়া যায়। তিনি শিক্ষক, চিন্তাবিদ, সাহিত্য ও সমাজগবেষক; তিনি সংস্কৃতি (এবং শুধু বাংলাদেশের নয়, বাংলার বাইরের সংস্কৃতিও) নিয়ে তাত্ত্বিক একটি ভূমি তৈরি করেছেন–বলা যায় এ অঞ্চলে সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের পঠন পাঠনেরও তিনি একজন পথিকৃৎ। তিনি সামাজিক–রাজনৈতিক নানা আন্দোলনের একজন নিষ্ঠাবান কর্মী। তিনি সম্পাদক এবং সমাজসচেতক। বাংলাদেশের সংবিধানপ্রণেতাদের মধ্যে তিনি ছিলেন, একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের জন্য স্থাপিত গণ–আদালতের তিনি একজন সদস্য ছিলেন। অর্থাৎ আইন ও বিচারের ক্ষেত্রেও তাঁর স্পষ্ট মানবতাবাদী, বৈষম্যবিরোধী একটি অবস্থান আছে। তিনি বাংলাদেশের হলেও আফ্রো–এশীয়–লেখক–শিল্পীরা তাঁকে আপনজন ভাবেন। ভারত সরকার তাঁকে ‘পদ্মভূষণ’ উপাধি দিয়েছে। তিনি বিশ্বের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করেছেন। দেশের নানা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে তাদের নানা পরিষদে রাখতে চায়, যেহেতু শিক্ষা নিয়ে তাঁর একটি দর্শন আছে, যার মূল্য ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে।’ (আনিসুজ্জামান সম্মাননা গ্রন্থ : সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম অক্টোবর ২০১৭)। মোট কথা “শ্রদ্ধাবান লভতে জ্ঞানম” প্রাচ্যদর্শনের এই চিরায়ত সত্যটি আনিসুজ্জামান তাঁর জীবন ও কর্মে আত্মস্থ করেছেন। স্যারকে অভিনন্দন, অভিবাদন। শতায়ু হোন।
(সংগৃহীত)

এবিএন/ফরিদুজ্জামান/জসিম/এফডি