কবিয়াল মনিন্দ্র লাল দাশ ও তাঁর সাধনা

অধ্যাপক স্বদেশ চক্রবর্তী, ০৯ জুলাই, এবিনিউজ : ‘অবধুত’ সাধনার ফল্গুধারাটির নিশ্চল মানুষী তনু স্বামী নিশ্চলানন্দজী অবধুত। বাহ্যিক আচার–অনুষ্ঠানসমূহে সদা নিষ্ক্রিয় অধ্যায় সাধনার মাধ্যমে মানবকল্যাণে নিবেদিত যাঁর জীবনাদর্শ, তাঁরই সুউজ্জ্বল উত্তর পুরুষ শ্রীমৎ স্বামী মোহনানন্দ অবধুত। পূর্বাশ্রমে মোহনানন্দ ছিলেন মনিন্দ্র লাল দাশ নামে সমধিক পরিচিত এক বহুমাত্রিক গুণাধার। তাঁকে নিয়ে কিছু লিখতে যাওয়া মানে অথৈ সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে জলরাশির অপ্রমেয়াতাকে খর্ব করা। তবুও অন্তর–কন্দরের আহ্বান আর তাঁরই অনুকম্পাকে পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে কলমের অগ্রভাগকে সামনের দিকে সমপ্রসারণ করার মতো সাহসী পদক্ষেপ আমার। প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি সুধি পাঠকবর্গের কাছে। কারণ বৈচিত্রময় জীবনকে ক’টি লাইনে সীমায়িত করতে গিয়ে বেশ অসঙ্গতি খুঁজে নিতে পারেন বিজ্ঞ জনেরা। মহতের কাজটিই হলো পরকে ক্ষমা করা। আমার মতো অভাজনের জন্যও তাঁদের ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি আরোপিত হবে এ লেখনীতে, এমন প্রত্যাশা। এভাবে মোহনানন্দ স্বামীজিকে নিয়ে এগিয়ে চলা।

ভোগ আর যোগ দু’টো উল্টো শব্দ। এদের প্রথমটি আমাদের মনকে স্বার্থগন্ধময় পৃথিবীর বিষয়–বাসনা, রূপ–রস–শব্দ–গন্ধ–স্পর্শ এ পঞ্চ প্রকার জাগতিক সুখের দিকে আকৃষ্ট করে। আর শেষেরটি মনকে নিয়ে যায় জড়জগতের অসীম সীমা ছাড়িয়ে অপ্রাকৃত দিব্যানন্দের অতলার্ন্ত গভীরে। ভোগময় সংসার ক্ষেত্রকে যোগময় ভূমিতে রূপ দেয়া যায় যদি চলমান জীবনের গতিপথে ‘সদ্‌গুরু’ প্রদর্শক হিসেবে এসে কৃপাপূর্বক হাত–দু’টি শক্তহাতে ধরেন। সর্বশ্রী মনিন্দ্র লাল দাশের জীবনেও এমন সকরুণ কৃপাদৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিলো। স্বয়ং পিতৃদেব নিশ্চলানন্দ মহারাজই মনীন্দ্র লালকে ভোগভূমিকে যোগভূমিতে রূপান্তরের পথ দেখাতে এগিয়ে এসেছেন। এখানে এক অভিনব সংবাদ ঘোষিত হয়েছে। আর তা হলো, যিনি পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন, পিন্ড দিয়ে উদ্ধার করবার সুবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছেন, তিনিই পরবর্তীতে হাড়–মাংসের দেহ খাঁচার ক্ষণিকের ক্ষুধাবৃত্তির দুর্বার লোভবলয় থেকে মহাজাগতিক ক্ষুধার বলয়ে ফিরিয়ে নিয়ে পরমাত্মার সাথে মহামিলনের পথটি বাতলিয়ে দিয়েছেন। জানিয়ে দিলেন সুদ্‌গুরু– “নাল্পে সুখমস্তি”। ভূমিতে সুখ নেই, ভূমাতেই প্রকৃত সুখ। এই ভূমাকে লাভ করতে গিয়েই মনিন্দ্র লাল দাশ মহোদয় বাহ্যিক বৈরাগ্যের প্রাধান্য না দিয়ে অন্তর–লালিত বৈরাগ্যের তীব্র দহনে নিজেকে পুড়িয়ে খাঁটি করে আত্মমুক্তিতে জগমুক্তির মার্গে বিচরণ করেছেন।

মোহনানন্দ অবধুত–পরা ও অপরাবিদ্যার সমন্বিত এক শাশ্বত নাম। ধৈর্য, ত্যাগ, সংযম ও মানবতার দিশারী হিসাবে সকলের কাছে সমাদৃত তিনি। পরমতত্ত্বকে জানার অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং কঠোর সাধনা তাঁকে আজ বিশ্বমনিষার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। এজন্য তাঁর রাত কেটেছে কখনো কোন আশ্রমে, কখনো রেলষ্টেশনে, কখনো রেল–বগিতে, কখনো ফুটপাতে, কখনো গাছতলায়, কখনো খোলা আকাশের নীচে, কখনোই বা অর্ধাহারে, অনাহারে। কেউ তাঁকে দেখে পাগল বলেছেন, কেউ বলেছেন ভবঘুরে, আবার কেউ বা বলেছেন সর্বত্যাগী সন্ন্যাসী। একাধারে তিনি ঘোর সংসারী, লব্ধপ্রতিষ্ঠ চিকিৎসক, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সহযোদ্ধ, গ্রাম–বাংলার সংস্কৃতি ঋদ্ধ লোককবি কবিয়াল। আবার অন্য আধারে অধ্যাত্ম জগতের মুকুটমান আর্য চিন্তাধারার বাহক সর্বজনপূজ্য অনন্যভজনশীল অবধুত সাধনপথের মাধুর্যময়ী মূর্তি প্রেমকা– মানবতাবাদী ‘লোক গুরু’। কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রাস পাশের পর গৃহত্যাগ করে কোলকাতায় এসে লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে দীর্ঘ নয়, বছর যোগ সাধনা করে যোগশক্তির অধিকারী হন। এরই মধ্যে কোলকাতার কলেজ স্কোয়ারে গীতা দেবী নামে এক বিধবা ভদ্র মহিলার সান্নিধ্যে এসে ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবাত্মক ভাঙা পূজারী, পরাধীনতার অভিশাপ, ব্রিটিশ বলি, সাদা চামড়ায় আগুন ও ব্রিটিশ খেদাবো – এ পাঁচটি বই লিখে আনন্দবাজার পত্রিকায় বিভিন্ন জনের নামে ছাপিয়েছেন। শুধু তাই নয়। যখন তিনি ৭ম শ্রেণির ছাত্র তখন তিনি বিভিন্ন বই–পুস্তক পাঠের মাধ্যমে জানতে পেরেছেন যে, ব্রিটিশরা ভারতবাসীকে গোলামের মতো ব্যবহার করে। এ সময় ইংরেজরা লবণ করও বাড়িয়ে দেয়। এর প্রতিবাদে মনিন্দ্র কুমার দাশ ‘ঠক্‌বাজ’ নামে একটি কবিতা লিখে স্কুলের ছাত্র–শিক্ষক দ্বারা পুরষকৃতজন। হোমিও ডাক্তার হিসেবেও তাঁর সুখ্যাতি ছিলো প্রচুর। সীতাকু–ের নির্মলা দাশকে বিয়ে করার পর রাজর্ষি জনকের মতো জীবন–যাপন শুরু করেন তিনি এবং দিনে ডাক্তারী ও রোগী দেখা নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন আর রাতে কবিগান ও আধ্যাত্মিক ভজনে রাত কাটিয়ে দিতেন। সকল ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল মনিন্দ্র কবিয়াল হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান এমনকি পাহাড়ী–উপজাতিদের ধর্ম–দর্শন নিয়ে কবির লড়াই করে এপার বাংলায় স্বনামে খ্যাত হন। তাঁর কবিগানে গ্রাম–বাংলার সমাজ–সংস্কৃতি, সুখ–দুঃখ, প্রেম–ভালবাসা থেকে বিভিন্ন ধর্মতত্ত্বের মর্মবাণীগুলো সর্বমহলে ভূয়সী প্রশংসিত হয়েছে। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক জে.এস. সেন হলে কবিয়ালদের মিলন মেলায় সিলেট থেকে আগত উপমহাদেশের খ্যাতিমান কবি সম্রাট ফণী বড়ুয়া কবিয়াল বি.এ এর সাথে চট্টগ্রামের তরুণ কবিয়াল মনিন্দ্র লাল দেহতত্ত্বের বাক্‌যুদ্ধে ‘ষট্‌চক্রের’ বর্ণনায় জয়লাভ করে চট্টগ্রামের গৌরবকে সমুজ্জ্বল করেন। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলনের সময়ও ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে ‘কঠিন বাংলা ভাষা বনাম সহজ বাংলা ভাষা’ শীর্ষক কবিগানের সম্মেলনে মনীন্দ্র লাল দাশ প্রকাশ মনিন্দ্র সরকার বিজয়কেতন উড়িয়ে বহুভাষাবিদ ও মনস্বী শিক্ষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কাছ থেকে স্বর্ণপদক লাভ করে এপার–ওপার বাংলার মধ্যে মর্যাদার আসন গ্রহণ করেন। শুধু কী তাই। ঢাকার কার্জন হলে কবিগানের মুকুটহীন সম্রাট অন্নদাচরণ কার্জন হলে কবিগানের মুকুটহীন সম্রাট অন্নদাচরণ সরকারকে তর্কযুদ্ধে পরাজিত করে মনিন্দ্র সরকার পুরো দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি করেন। সেদিন থেকে অন্নদা কবিয়াল আমৃত্যু আর কোনদিন কবিগান করেননি। সমাজদরদী ও মানবদরদী কবিয়াল মনিন্দ্র লাল এভাবে সুদীর্ঘ অর্ধ–শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কবিগান গেয়ে অসংখ্য মানুষের ভালবাসা ও শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়েছেন। তাঁর এ অবদান আমাদের জন্য বিরাট এক গৌরবময় ইতিহাস বটে।

নশ্বর ঐশ্বর্য্যে কেবল অস্থিরতাই বৃদ্ধি পায়। পরমার্থিক ঐশ্বর্যই আনে জীবনের পূর্ণতা ও ভূমানন্দী অবস্থা। তখনই মানুষ প্রশান্তির বাতাবরণে অসীমের আহ্বান শোনেন এবং নিখিল জগতের পরম সত্য বস্তুটি অর্থাৎ পরম শ্রেয় যিনি, তাঁকে বরণ করে পরিপূর্ণ জীবনের অধিকারী হন। সত্যকে জেনে হন সত্যাশ্রয়ী, পরমের সান্নিধ্য লাভে হন সত্যদ্রষ্টা-‘মহর্ষি’। সংসারী মনিন্দ্র–সংসার অর্ণবে থেকেও ঐ পরমের প্রেমময় আহ্বান শুনেছেন। শুধু শুনেছেন যে তা নয়। সে প্রিয়জনের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সংসার কোলাহলের মধ্যে থেকেও অমৃতপুরুষকে জেনে অমৃতালোকে উদ্ভাসিত হয়েছেন। আর এজন্য তাঁকে কঠোর সাধনার ক্ষুরধার পথে সন্তর্পনে এগুতে হয়েছে। অবশ্য সফলও হয়েছেন শ্রদ্ধেয় মনিন্দ্র লাল মহাশয়। গুরু প্রদর্শিত পথে এগিয়ে গিয়ে সেদিনের চন্দনাইশস্থ বৈলতলীর মনিন্দ্র লাল দাশ মহোদয় হয়ে গেলেন, বিশ্বমানবতার মূর্তপ্রতীক ঋষি পন্থার অমিয় আদর্শবাহী অবধুত সমপ্রদায়ের পূজ্য ‘শ্রীমৎ স্বামী মোহনানন্দ অবধুত পরমহংস’।

– “যদি তুমি অনুক্ষণ ভগবানের দিকে উর্ধ্বে অগ্রগতি ও উত্তরণ চাও, তিনি আসবেন তোমাকে উত্তোলন করতে এবং তিনি সেখানেও উপস্থিত থাকবেন, খুবই নিকটে, নিকটতরভাবে, চিরন্তন নৈকট্যে।” ঋষি মোহনানন্দের জীবনে তাই ঘটেছিলো। বিশ্বনিয়ন্তার প্রতি তাঁর বৈরাগ্যানন্দ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে হৃদ্‌–কন্দরে হুতাশনের ন্যায় প্রজ্বলিত হয়ে উঠায় তাঁর সাক্ষাৎ–দর্শনে তিনি তীর্থ পরিক্রমা– গয়া, কাশী, মথুরা ও বৃন্দাবন দর্শনে অভূতপূর্ব ভগবদ্‌শক্তি অর্জন করে কাশীর বিশ্বনাথ–লিঙ্গ চরণে সমর্পন করেন আন্তরিক ভক্তির অর্ঘ্য। পরে কলকাতা হয়ে সুদীর্ঘ এক দশক সন্ন্যাসজীবন যাপনান্তে তীর্থরাজের কৃপা লাভ করে মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেন মোহনানন্দজী। এবার নিজেকে একেবারে গুটিয়ে নিয়ে সংসারে থাকলেও সংসারের ‘সং’ কে চিরতরে ত্যাগ করে ‘সার’ অর্থাৎ ‘পরব্রহ্ম’–কে নিয়েই মানবসেবা ও ভগবদ্‌সেবায় নিবিষ্ট করেন। ‘অবধুত’ পন্থী সাধক যাঁরা মূলতঃ তাঁরাই এরকম জীবন–যাপনে নিত্যসিদ্ধ। স্বামী মোহননন্দের ক্ষেত্রেও সেরকম।

সাধনরাজ্য দীর্ঘ–পথপরিক্রমায় ‘ব্রহ্মবিদ’ হলেন স্বামী মোহনানন্দ অবধুতজী। কৃচ্ছ সাধনায় একে একে অষ্টাঙ্গিক যোগমার্গে সবকটি স্তর পার হয়ে ‘অবধুত’ উপাধিপ্রাপ্ত হন। অতি গোপনে চলে সে যোগসাধনা। আর এই চরম সুযোগটি এসে যায় ব্রিটিশ বিরোধী সন্দেহে জেলখানায় অন্তরীন থাকার সময়ে। পুরো একটি বছর নির্জনে কারাগারকে যোগভূমিতে রূপান্তরিত করে জীবনের শ্রেষ্ঠ বস্তুকে আবিষ্কার করেন। এ যেন– “বাসুদেব : সর্বমিতি” অবস্থা। এ প্রসঙ্গে বিপ্লবী ঋষি শ্রীঅরবিন্দের গোপন যোগ–সাধনার খানিকটা মিল খুঁজে পাই। আলীপুর বোমার মামলার আসামী হয়ে শ্রী অরবন্দি আলীপুর জেলে নীত হন এবং পূর্ণ বারো মাস পূর্নযোগের সাধনায় সংসিদ্ধি অর্জন করেন তিনি। প্রসঙ্গক্রমে তিনি বললেন– “এতো অবরোধের প্রাচীর নয়, যেন মনে হলো সর্বত্রই স্বয়ং বাসুদেব আমাকে ঘিরে রেখেছেন।” এখানেই তিনি দিব্যজ্যোতি দর্শন করেন। শ্রী অরবিন্দ বিপ্লবী থেকে হয়ে ওঠলেন পূর্নযোগের দিব্যজীবনাদর্শ। আর শ্রী মনিন্দ্র লাল দাশ শ্রদ্ধাষ্পদেষু ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সহকর্ম ও কবিয়াল থেকে হয়ে ওঠলেন যোগাশিষ্ট মোহনানন্দপরমংসজী। তাঁর অন্তরে হিমালয় এবং কর্মে লোকালয়। হিমালয়–লোকালয়ে যোগসেতু স্থাপন করলেন পূজনীয় মোহনানন্দ মহারাজ। সনাতনী সমাজের জন্য এ এক অনবদ্য অবদান। বইটিতে বাকুড়ার অলৌকিক একটি ঘটনা, সাঁওতালদের ঘটনা ও জেলখানায় তাঁর সাথে কারারক্ষীর আলাপ–চারিতার কিছু তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে, যা বইটিকে পাঠকদের কাছে লোভনীয় করে তুলবে। শ্রীমৎ স্বামী মোহনানন্দ অবধুত মহারাজকে নিয়ে লেখা শামসুল আরেফীন সম্পাদিত ”কবিয়াল মনিন্দ্র দাস ও তাঁর দুসপ্রাপ্য রচনা” বইটির প্রকাশনার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে জানাই সাধুবাদ। তাঁদের এ প্রচেষ্টা সার্থক হবে, এমন বিশ্বাস আমার। (সংগৃহীত)

এবিএন/ফরিদুজ্জামান/জসিম/এফডি