তিনি দূরবর্তী এক আলোকবর্তিকা

  শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

১৪ মে ২০২০, ২৩:০১ | আপডেট : ১৪ মে ২০২০, ২৩:০৮ | অনলাইন সংস্করণ

সদ্যপ্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ও কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়।
দূরবর্তী এক আলোকবর্তিকার মতোই ছিলেন তিনি, অন্তত আমার কাছে। পরিপূর্ণতার কোনও বিচ্ছুরণ নেই ঠিকই, কিন্তু আভা আছে নিজস্ব, আছে ঔজ্জ্বল্য। সেসব দূর থেকে দেখে মন ভাল হয়ে যায়, কিন্তু কাছে যেতে বাধে। সম্ভ্রমে, শ্রদ্ধায়, নিজের আন্তরিক দীনতার কারণেই। তবু, অনুষ্ঠানে বা আড্ডায় দেখতে পেয়েছেন যখনই, কাছে ডেকে কথা বলেছেন, কুশল জিজ্ঞাসা করেছেন, লেখালেখির খবর জানতে চেয়েছেন। আর আমি বিস্মিত হয়েছি বারবার এই ভেবে যে, এত বড় মাপের একজন মানুষ, সারা পৃথিবী যাঁর পরিধি, তিনি আমাকে পর্যন্ত মনে রেখেছেন? প্রণাম করলে পিঠে ভারী শান্তভাবে রাখতেন তাঁর হাতের ভারী পাতা। প্রাপ্তির প্রাচুর্যে নত হয়ে উঠতাম আরও একটু। 

শিখতে পারিনি কিছুই। শিক্ষার্থীর যোগ্যতা অর্জন করাও একজীবনের কাজ। কিন্ত বুঝতে চেষ্টা করেছি। প্রজ্ঞা আর অহং যে সহাবস্থান করতে পারে না কিছুতেই, যে-ক’জন মানুষকে দেখে এ-কথা মনে হতো, শ্রদ্ধেয় আনিসুজ্জামান তাঁদের অন্যতম। ধী ও জ্ঞান একধরনের প্রশান্ত পরিণতি নিয়ে আসে অন্তঃকরণে। আর বাইরে তারই পরিমিতি ছড়িয়ে পড়ে। যতবার দেখেছি ওঁকে, মনে হয়েছে এ-কথা। যে-কয়েকজন হাতে গোনা ব্যক্তিত্বের জন্য বাঙালি আজও পৃথিবীর দরবারে গর্ব প্রদর্শন করতে পারে, আনিসুজ্জামান সাহেব তাঁদেরই একজন। 

এঁরা চলে যাচ্ছেন। নিয়মও তাই। দুঃসময় কখনও একা আসে না। বহু দুঃসংবাদ সে উপহার দিতে জানে। আজ যখন সংকীর্ণতা আর অজ্ঞানতার দম্ভে গোটা পৃথিবী ফুঁসছে, তখন প্রাজ্ঞ, মুক্ত, অপার এমন একজন মানুষের চলে যাওয়ার ক্ষতি আমরা পরিমাপে আনতে পারব না। অবশ্য সে-ই হয়তো স্বাভাবিক। এই পৃথিবীতে আনিসুজ্জামানকে আর মানাচ্ছিল না। প্রণাম জানাই আরও একবার। ওঁর কবরের মাটি যেন আমাদের ব্যর্থতা হয়ে জেগে থাকে, চিরকাল।

লেখক : ভারতীয় কবি

এই বিভাগের আরো সংবাদ