‘কিরীটি রায়’খ্যাত ঔপন্যাসিক নীহার রঞ্জন গুপ্তের ১০৯তম জন্মবার্ষিকী আজ

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২০, ০০:৩৬

বাংলা সাহিত্যের অমর কথা শিল্পী গোয়েন্দা চরিত্র ‘কিরীটি রায়’ খ্যাত জনপ্রিয় ঔপন্যাসিক নীহার রঞ্জন গুপ্তের ১০৯তম জন্মবার্ষিকী আজ শনিবার। বাংলা সাহিত্যের অমর এই কথা শিল্পীর বাড়ি নড়াইলের লোহাগড়ার ইতনা গ্রামে।

জনপ্রিয় উপন্যাসিক নীহার রঞ্জন গুপ্ত ১৯১১ সালের ৬ জুন পিতা সত্যরঞ্জন গুপ্তের কর্মস্থল কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সত্যরঞ্জন গুপ্ত ও মায়ের নাম লবঙ্গলতা দেবী।

নীহার রঞ্জন গুপ্ত গোয়েন্দা ও রহস্য কাহিনী লেখক হিসেবে যেমন জনপ্রিয়, তেমনি চিকিৎসক হিসেবেও স্বনামধন্য। বিখ্যাত গোয়েন্দা চরিত্র ‘কিরীটি রায়’ এর স্রষ্টা হিসেবে উপমহাদেশে স্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি। চিকিৎসক হিসেবে অতি কর্মচঞ্চল জীবন-যাপনের মধ্যেও নীহার রঞ্জন রেখে গেছেন অসংখ্য সাহিত্যধর্মী সৃষ্টি যা আপন সত্তার ভাস্কর। নীহার রঞ্জন গুপ্ত ১৯৮৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। সরকারি ভাবে ঔপন্যাসিক নীহার রঞ্জন গুপ্তের জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী পালনের দাবি এলাকাবাসীর।

নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার মধুমতি নদীর তীরে ইতনা গ্রাম তাঁর পৈত্রিক নিবাস। তার পিতার নাম সত্যরঞ্জন গুপ্ত। লোহাগড়া শহর থেকে নবগঙ্গা আর মধুমতির তীর ধরে আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে পূর্ব-দক্ষিণে ৫ কিলোমিটার গেলেই ইতনা গ্রাম। গ্রামটি খুব প্রাচীন। এর পূর্বে নাম ছিল ইটনা, সমস্ত ঘটক-গ্রন্থে এবং দলিল পত্রে ইটনা নামই দেখা যায়। আর ১৯০০ সালে এই গ্রামে স্থাপিত হয় একটি ইংলিশ বয়েজ স্কুল। ওই বছরই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্কুলটির স্থায়ী ভাবে স্বীকৃতি দেয়। ফলে গ্রামের শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বেশি।’ এই গ্রামের গুপ্ত পরিবার খুব নামকরা। আর এই গুপ্ত পরিবারের সন্তান হলো নীহার রঞ্জন গুপ্ত। পিতার চাকুরীর সুবাদে পড়াশোনা করেছেন গাইবান্ধা, রংপুর, কৃষ্ণনগরসহ বিভিন্ন স্থানে। ডাক্তারি পাশ করেন রংপুর কার মাইকেল মেডিকেল কলেজ থেকে। কিছু দিন নিজস্ব ভাবে প্র্যাকটিস করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় সামরিক বাহিনীতে চিকিৎসক হিসাবে যোগ দেন। কিন্তু সামরিক বাহিনীর চাকরি ভালো না লাগায় ফিরে যান কলকাতায়। শুরু করেন লেখালেখি। প্রথম উপন্যাস ‘রাজকুমারী’ প্রকাশ হয় তাঁর বয়স যখন মাত্র ষোল বছর। জীবনে লিখেছেন প্রায় দুই শত উপন্যাস। তাঁর উপন্যাস হয়েছে চলচ্চিত্রায়িত। এরমধ্যে উত্তর ফাল্গুনী, হাসপাতাল, মায়ামৃগ, উল্কা, লালুভুলু, মেঘকালো, রাতের রজনীগন্ধা, বহ্নিশিখা, নিশিপদ্ম, নুপুর, ছিন্নপত্র, বাদশা, কোমল গান্ধার, কাজললতা, কন্যাকুমারী ছবি মানুষের হৃদয়ে এখনও দাগ কেটে আছে।

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর ১৯৫২ সালে নীহার রঞ্জন গুপ্তের বংশধররাও চলে যান ভারতে। তারপর পাকিস্তান সরকার তাঁর বাড়িসহ সম্পত্তিকে শত্রু সম্পত্তি হিসাবে ঘোষণা করলে আস্তে আস্তে তাঁদের জমি দখল হতে থাকে। এরপর আবার শুরু বাড়ি দখলের ষড়যন্ত্র। বুঝতে পেরে গ্রামের মানুষ আবার এগিয়ে আসেন। বরেণ্য চিত্র শিল্পী এসএম সুলতান বেঁচে থাকতে ১৯৯৩ সালের ২৪ নবেম্বর নড়াইলের জেলা প্রশাসক আলী হোসেন নীহার রঞ্জন গুপ্তের বাড়িতে ‘শিশুস্বর্গ-২’ নামের একটি স্মৃতি ফলক ঝুলিয়ে দেন। যাতে ওই বাড়ির দিকে নজর না পড়ে ভূমি দস্যুদের। এখনও ওই ফলক আছে নীহার রঞ্জন গুপ্তের বাড়িতে। ইতনা গ্রামে ঔপন্যাসিক নীহার রঞ্জন গুপ্তের আপনজন কেউ নেই। পৈত্রিক বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে ভগ্নদশায় থাকার পর ২০১৭ সালে সরকারের প্রত্মতাত্ত্বিক বিভাগ বাড়িটি সংস্কার করেছে। তার পৈত্রিক ভিটায় রয়েছে দ্বিতল বাড়ি, পুকুরসহ গাছপালা। বর্তমানে নীহার রঞ্জন গুপ্তের বাড়িটি সরকারের প্রত্মতাত্ত্বিক বিভাগ দেখ-ভাল করছে।

কর্মজীবন: ডাক্তারি পাস করে বেশ কিছুদিন নিজস্ব ভাবে প্র্যাকটিস করেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় স্থানান্তরিত হন। তিনি মেজর পদেও উন্নীত হন। চাকুরী সূত্রে চট্টগ্রাম, বার্মা (বর্তমান মায়ানমার), মিশর পর্যন্ত বিভিন্ন রণাঙ্গনে ঘুরে বহু বিচিত্র অভিজ্ঞতা লাভ করেন। এক সময় চাকরি ছেড়ে কলকাতায় ব্যক্তিগতভাবে ডাক্তারি শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কলকাতায় বিশেষ পরিচিত হয়ে ওঠেন। ভারত বিভক্তির পর ১৯৪৭ সালে পরিবারসহ স্থায়ী ভাবে কলকাতায় বসবাস করেন।

সাহিত্য কর্ম: নীহাররঞ্জন গুপ্তের সাহিত্যে হাতে খড়ি শৈশব থেকেই। একসময় শান্তিনিকেতনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদ গ্রহণসহ তার স্বাক্ষর বা অটোগ্রাফ সংগ্রহ করেন তিনি। ১৬ মতান্তরে ১৮ বছর বয়সে তার প্রথম উপন্যাস ‘রাজকুমার’ মতান্তরে ‘রাজকুমারী’ প্রকাশিত হয়। নীহার রঞ্জন গুপ্ত পেশায় চিকিৎসক হলেও মানব-মানবীর হৃদয়ের কথা তুলে ধরেছেন সুচারু ভাবে। ‘রহস্য’ উপন্যাস লেখায় ছিলেন সিদ্ধহস্ত। লন্ডনে অবস্থানকালীন সময়ে গোয়েন্দা গল্প রচনায় আগ্রহী হয়ে উঠেন তিনি। ভারতে এসে প্রথম গোয়েন্দা উপন্যাস ‘কালোভ্রমর’ রচনা করেন। এতে গোয়েন্দা চরিত্র হিসেবে ‘কিরীটি রায়’কে সংযোজন করেন, যা বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যে এক অনবদ্য সৃষ্টি। পরবর্তীতে ‘কিরীটি রায়’ চরিত্রটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে বাঙালি পাঠকমহলে। তিনি বাংলা সাহিত্যে রহস্য কাহিনী রচনার ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী লেখক ছিলেন। কেবলমাত্র রহস্য উপন্যাস নয়, তার সামাজিক উপন্যাসগুলোও সুখপাঠ্য। যা পাঠক হৃদয় আকৃষ্ট করে এখনো। এ পর্যন্ত অন্তত ৪৫টি উপন্যাসকে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় চলচ্চিত্রায়ন করা হয়েছে। এছাড়া শিশুদের উপযোগী সাহিত্য পত্রিকা ‘সবুজ সাহিত্য’ এর সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

উপন্যাসের সংখ্যা: নীহার রঞ্জন গুপ্তের উপন্যাসের সংখ্যা দুইশতেরও বেশি। এর মধ্যে প্রকাশিত উপন্যাসগুলো-‘মঙ্গলসূত্র’, ‘উর্বশী সন্ধ্যা’, ‘উল্কা’, ‘বহ্নিশিখা’, ‘অজ্ঞাতবাস’, ‘অমৃত পাত্রখানি’, ‘ইস্কাবনের টেক্কা’, ‘অশান্ত ঘূর্ণি’, ‘মধুমতি থেকে ভাগীরথী’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘অহল্যাঘুম’, ‘ঝড়’, ‘সেই মরু প্রান্তে’, ‘অপারেশন’, ‘ধূসর গোধূলী’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’, ‘কলোভ্রমর, ‘ছিন্নপত্র’, ‘কালোহাত’, ‘ঘুম নেই’, ‘পদাবলী কীর্তন’, ‘লালু ভুলু’, ‘কলঙ্ককথা’, ‘হাসপাতাল’, ‘কজললতা’, ‘অস্থি ভাগীরথী তীরে’, ‘কন্যাকুমারী’, ‘সূর্য তপস্যা’, ‘মায়ামৃগ’, ‘ময়ূর মহল’, ‘বাদশা’, ‘রাত্রি নিশীথে’, ‘কনকপ্রদীপ’, ‘মেঘকালো’, ‘কাগজের ফুল’, ‘নিরালাপ্রহর’, ‘রাতের গাড়ী’, ‘কন্যাকেশবতী’, ‘নীলতারা’, ‘নূপুর’, ‘নিশিপদ্ম’, ‘মধুমিতা’, ‘মুখোশ’, ‘রাতের রজনী গন্ধা’ ও ‘কিশোর সাহিত্য সমগ্র’ উল্লেখযোগ্য। চিকিৎসক হিসেবে অতি কর্মচঞ্চল জীবনযাপনের মধ্যেও নীহার রঞ্জন রেখে গেছেন অসংখ্য সাহিত্য সৃষ্টি। যা আপন সত্তার ভাস্কর।

নীহার রঞ্জনের অন্তত ৪৫টি উপন্যাস চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘উল্কা’, ‘বহ্নিশিখা’, ‘উত্তর ফাল্গুনী’, ‘লালুভুলু’, ‘হাসপাতাল’, ‘মেঘ কালো’, ‘রাতের রজনীগন্ধা’, ‘নিশিপদ্ম’, ‘নূপুর’, ‘ছিন্নপত্র’, ‘বাদশা’, ‘কোমল গান্ধার’, ‘মায়ামৃগ’, ‘কাজললতা’, ‘কন্যাকুমারী’, ‘কলঙ্কিনী কঙ্কাবতী’ প্রভৃতি। এই চলচ্চিত্রায়িত উপন্যাসগুলো আমাদের চলচ্চিত্র জগতকে সমৃদ্ধ করেছে। তার কালজয়ী উপন্যাস ‘লালুভুলু’ পাঁচটি ভাষায় চিত্রায়িত হয়েছে। ১৯৮৩ সালে উপন্যাসটি বাংলাদেশেও চিত্রায়িত হয় এবং দর্শকদের কাছে প্রশংসা অর্জন করে। নীহার রঞ্জনের অনেক উপন্যাস থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছে। বিশেষ করে তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘উল্কা’ থিয়েটারের দর্শকদের আকৃষ্ট করে।

নড়াইল প্রেসক্লাবের সাবেক সহ-সভাপতি সাংবাদিক ও ফোকলোর গবেষক সুলতান মাহমুদ বলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম পশ্চিমবঙ্গে জন্মগ্রহণ করেও আমাদের দেশে জনপ্রিয় কবি। তাদের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য সরকার সবসময় সচেষ্ট। কিন্তু বরেণ্য ঔপন্যাসিক নীহার রঞ্জন গুপ্তের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য তেমন কোনও উদ্যোগ নেই। আমরা ভুলতে বসেছি নীহার রঞ্জনকে। তরুণ প্রজন্মের অনেকেই জানেন না, নীহার রঞ্জন গুপ্ত কে? তিনি কি ছিলেন?

এবিএন/শংকর রায়/জসিম/পিংকি

এই বিভাগের আরো সংবাদ