ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়ক ভোগান্তির অবসান চাই

জিনাত আজম, ১৫ মে, এবিনিউজ : স্কুল জীবনে জার্নি বাই ট্রেন, বাই বোট এমন কত রচনাই না পরীক্ষার আগে মুখস্থ করতাম। ইংরেজিতে যাকে বলে ঋ্র্রটহ. শুরু আর শেষ মোটামুটি একরকম রেখে মাঝের অংশের বর্ণনায় প্রকৃতি, নদী, ইত্যাদি ইত্যাদি…..। এখন এই বয়সে এসে আবারো রচনা লিখার সাধ মনে জেগে উঠলো কেনো সেটা নিশ্চয়ই আপনাদের কাছে বিস্ময়ের লাগতে পারে। কিন্তু আমি যে ই নমলরভণহ ঠহ ডটর আপনাদের সাথে শেয়ার না করে কিছুতেই পারছি না।

সপ্তাহখানেক আগে আমার স্বজন এবং আমিও (সবাই একা একা)আলাদা আলাদা চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় গিয়েছিলাম বিভিন্ন কাজে। এক এক জনের যথাক্রমে ৮ ঘণ্টা ৯ ঘণ্টা করে লেগেছিলো। সব চাইতে সৌভাগ্যবান হলাম আমি আর আতিক। আমাদের লাগলো তের ঘণ্টা। ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম। আমার পুত্রকে বলেছিলাম ট্রেন কিংবা প্লেনে যাই। অবশ্য আমি একা। কিন্তু সাথে আছে ওর গাড়ি। ট্রেনের টিকেট এখনতো মহা আরাধনার ধন। অতএব প্লেনে করেই আসতে চাই। কিন্তু পুত্র আমার একা একা আসবে। কিছুতেই রাজি নয়। আমিও একা….। অতএব ক্ষান্ত দিয়ে তার সাথে আসাই সাব্যস্ত করলাম। কে জানতো এই সম্মতির আর এক অর্থ–জেনে শুনে করেছি বিষপান। ক’দিন আগে আমার বেয়ান বিকেলে ৪টার বাসে উঠে রাত সাড়ে তিনটায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ফিরেছেন। তাঁর আবার আরো ফ্যাঁকরা। মোবাইলের চার্জ শেষ। কারো ফোন নাম্বার স্মরণে ঠিকমত নেই। অবশেষে শেষ রক্ষা হলো। চান্দগাঁও আবাসিকে অবস্থানরত পুত্রের নম্বর মনে পড়লো। একজনকে অনুরোধ করে তার মোবাইলে ওখান থেকে সে ও. আর. নিজাম রোডে আতিককে ফোন করে। ভাগ্য ভালো আতিক সবে জাহাজ থেকে ফিরেছে। মধ্য রাতে গাড়ি নিয়ে গিয়ে শাশুড়িকে উদ্ধার করে আনলো এই মহাবিপদ থেকে।

এবারে আমার কথায় আসি। এতজনের এত ভোগান্তির পর (আমিও বাদ নই) আল্লাহ আল্লাহ করে বিকেল চারটায় চট্টগ্রাম অভিমুখে আমরা মা–ছেলে রওনা দিলাম। যাকে বলে ই নমলরভণহ ঠহ ডটর. পুত্র আমার গাড়িতে উঠেই গুগল মামার একাউন্টে সার্চ করতে শুরু করলো। যাত্রাবাড়ি কাঁচপুর সব পথ এড়িয়ে অন্যপথে ডেমরার ওদিক দিয়ে যানজট এড়ানোর জন্য আর একটা নতুন পথের নির্দেশ দিয়ে যেতে লাগলো সে ড্রাইভারকে। মনে মনে মহাখুশি আমি বাহ্‌! কোন জ্যাম্‌ নেই। অবাধে চলছে আমাদের গাড়ি। যাত্রাবাড়ী–কাঁচপুরের চেহারা দেখতে হলো না। ঠিক সাড়ে ছয়টায় হাইওয়ে ইনে (কুমিল্লার অদূরে) আমরা ইন করলাম। ওখানে বিকালে চা নাস্তা শেষ করে সন্ধ্যা সাতটার দিকে আবারো রওয়ানা হলাম। রাস্তা খালি। ভাবছিলাম এবারে বোধ হয় ভাগ্য সুপ্রসন্ন। আতিক অবশ্য বললো ফেনী পার না হলে কিছুই বলা যাবে না। কিন্তু মনে বড় আশা আজ নিশ্চয়ই ভালোয় ভালোয় পৌঁছে যাবো…। পথে পথে তরমুজের স্তূপ। মনের সুখে বেশ কয়েকটা কেনা হলো। কিন্তু বেশি সুখ কপালে সইলো না। ফেনীর অদূরে এসেই গাড়ি থেমে গেলো। সামনে পিছনে লম্বা লাইন । এখন আর আগ্‌ পিছু করার কোন সাধ্য নেই। অন্যদিকের পথ দিয়ে ঢাকা অভিমুখে গাড়িগুলো শাঁ শাঁ করে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই– এর যেন কোন শেষ নেই। আর হতভাগ্য চট্টগ্রাম অভিমুখের যাত্রীরা বসে আছে তো আছেই। ঈর্ষান্বিত চোখে চেয়ে আছি। মনে মনে নিজেকে গালি দিচ্ছি। আচ্ছা ন্যাড়া ক’বার বেল তলায় যায়। বলুন তো? বেল তলায় তো আসলাম ফেরার আর কোন পথ নেই। রাত দশটা এগারোটা বারটা বেজে গেলো। গাড়ি দুই চার চাকা ঘুরে আর থামে। পেছন থেকে এক ট্রাক ড্রাইভার বলে উঠলো আজিয়া ফজর হই যাইবো (আজ ভোর হবে) আমার আশান্বিত মন একথা বিশ্বাস করলো না। মনে মনে বল্লাম অর্থাৎ মনকে প্রবোধ দিলাম ধ্যাত অতসময় কি আর লাগবে। ফালতু ভয় দেখাচ্ছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে ব্যাটা নিশ্চয়ই ভবিষ্যদ্বাণী করার ক্ষমতা রাখে। তা নইলে…।

গাড়ি থেকে নামছি না। ড্রাইভার নেমে দেখছে আর হাই তুলছে। রাত প্রায় দেড়টা–পেছনে ঠুক করে একটা শব্দ। ছেলে আর ড্রাইভার নামলো। দৈত্যের মত বিশাল এক কাভার্ড ভ্যান ঠুকে দিয়েছে আমাদের গাড়িকে। ভাগ্য ভালো বলতে হবে। জোরে হলে মাতা–পুত্র গাড়ি সমেত নিশ্চয়ই উড়ে যেতাম? ঐ ঠুক শব্দতেও কম হলো না। গাড়ির ব্যাক লাইট ভেঙেছে। বডিও অল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেখা গেলো অল্প বয়সী এক ছেলে গাড়ি চালাচ্ছে। আমরা সম্ভবত দ্রুত সময়ের মধ্যে মাত্র ১০/১২ গজের মত পথ এগুতে পেরেছি। এর মধ্যেই এই কাণ্ড। এরপর শুরু হলো নতুন নাটক। কিশোর ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করা হলো– লাইসেন্স কই। সে তখন আতিকের পা ধরে বসে আছে– মাফ কইরা দ্যান। বুঝতে পারি নাই। লাইসেন্স কই। কান্নাজড়িত কণ্ঠে জবাব আসে “আমি হেল্‌পার। লাইসেন্স নাই। ড্রাইভার কই? ইঙ্গিতে দেখিয়ে দেয় ভিতরে ঘুমায়। জবাব শুনে আমাদের তো আক্কেল গুড়ুম। এইটুকু একটা ছেলের হাতে ইয়া বড় কাভার্ড ভ্যান দিয়ে মাঝরাতে ড্রাইভার নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। হায়। আমরা কোথায় আছি? কেমন দেশে বাস করছি !!

অনেক ডাকাডাকির পর ড্রাইভারকে ভ্যানের ভিতর থেকে টেনে বের করা হলো। সে চোখ মুছতে মুছতে বাস্তবে ফিরলো। এবারে দু’জনের কাকুতি মিনতি। গরিব মানুষ..। আতিক ওর গাড়ির নাম্বার প্লেট, ইত্যাদির ছবি নিলো। মেসার্স পদ্মা সার্ভিস চট্টমেট্রো–ট–১১–২৫২২। সব পথ বন্ধ পালাবার কোন পথ নেই। আতিক হম্বি তম্বি করছে, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি ঠুকছো। ওদের এক জাত ভাই নসিহত করলো পা ছাড়িস না। রাত প্রায় দেড়টা। অনেক ভুল স্বীকার মাফ চাওয়ার পর পকেট থেকে ১৫০০ টাকা বের করে দিয়ে বললো গরীব মানুষ…। আতিকের মেজাজ তুঙ্গে। পনেরো হাজার টাকার লাইট। পনের শ টাকা দিয়ে কি করবো। ইতোমধ্যে আরো কয়েকজন ড্রাইভার এক জোট হয়েছে। আমি তো আল্লাহর কাছে শুকরিয়া করছি, এই ভেবে যে, অজ্ঞ হেলপার ছেলেটি যদি আরো জোরে গাড়িকে ধাক্কা দিতো… কথায় বলে তর্ক করতে চাইলে এর কোন শেষ নেই। সব বিচার মানি, কিন্তু তাল গাছটা আমার। এখানেও তাই। ভুল মানছি, অন্যায় মানছি। কিন্তু কি করবো…। এভাবে আরো কতক্ষণ চলতো কে জানে। রাত সোয়া ২টায় আমাদের জ্যাম ছুটলো। অর্থাৎ বন্দী দশা থেকে ছাড়া পেলাম। পেছনে কয়েক কিলোমিটার লম্বা গাড়ির লাইন। সামনেও কম নেই। অতএব ক্ষান্ত দিয়ে আমাদের গাড়ি এগুলো। পেছনে প্রচুর হর্ণের শব্দ…। পুলিশকে ডাকলেও যে কি হবে সেতো ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন।

এই হচ্ছে ৪ ঘণ্টার স্বপ্ন দেখানো ঢাকা–চট্টগ্রাম হাইওয়ের প্রকৃত দশা। যাত্রীদের হেনস্থা। ভাবছিলাম কতরকম যাত্রীরাই তো থাকেন। বৃদ্ধ, অসুস্থ গর্ভবতী….। রাস্তার মাঝে এত লম্বা সময় দাঁড়িয়ে থাকা। নেই কোন টয়লেটের বিকল্প ব্যবস্থা…। মানুষ কি করবে? মহিলারা কোথায় যাবে? এখন শুনছি বুলেট ট্রেনের সুখবর। মাত্র আড়াই ঘন্টায় যাওয়া–আসা। আরো আছে কর্ণফুলীর ভিতর দিয়ে টানেল…। আমরা উন্নতির চরম শিখরে এগুচ্ছি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে আসার সামান্য মাত্র বাকি…। এই রাস্তা সংস্কারের প্ল্যানের সাথে যারা সম্পৃক্ত তাঁরা কখনো কি অসহায় যাত্রীদের এই নিগ্রহ–যন্ত্রণার কথা ভেবেছেন? কিংবা ভাবেন! দুইপাশের আসা যাওয়া আর একটু কি প্ল্যান মতো করা যায় না! পৃথিবীর কোন দেশেই বোধ করি যাত্রীদের এত দুর্দশা সইতে হয় না। জার্মানিতে দেখেছিলাম গাড়িতে রেডিও বেজে উঠে। পথ বদলাও, সামনে জ্যাম। ফ্লাইওভারের ওপর হেলিকপ্টারে করে ব্যানার ট্যঙ্গিয়ে দেয়। ওকইৃ অর্থাৎ জ্যাম। অতটা আশা করি না। কিন্তু একটা দেশের রাস্তা–ঘাট সংস্কার করতে গেলে যারা সংশ্লিষ্ট তারা কেন যাত্রীদের কষ্ট লাঘবের কথা ভাববেন না।

কেন থাকবে না কোন নীতিমালা। এটাই আমাকে অবাক করে। খানিকপরেই মূল রাস্তা বাদ দিয়ে বিকল্প একটা রাস্তায় আমরা চল্লাম, ভাঙা–উঁচু–নিচু গর্ত থাকে বলে বড় বড় খাড্ডা। বড় বড় ট্রাক, কাভার্ড ভ্যানও কাত হয়ে যাচ্ছে। লাফাতে লাফাতে আমরাও চলছি আর আল্লাহকে ডাকছি। ভাবছিলাম কর্তৃপক্ষ তো কয়েকদিনের জন্য এইসব প্রাইভেট কারকে বিরত রাখতে পারে না কি জানি– আমরা বোকা সোকা সাধারণ মানুষ। অতো বুদ্ধিতো আর মগজে ধারণ করি না। তাই এত সব অদ্ভুত প্রশ্ন মাথায় আসে। আর লাইসেন্সবিহীন আনাড়ী গাড়ি চালকরা কিভাবে অনায়াসে কম বয়সে অত বড় বড় গাড়ির চালক হয়? সত্যিই এ যেন এক মহা বিস্ময়।

অবশেষে ও আর নিজাম রোডের আমাদের বাসায় দুয়ারে যখন ঢুকছি, আমি সেই ভবিষ্যত বক্তা ড্রাইভারের অমূল্য বাণীকে সত্য করে পাড়ার মসজিদের মোয়াজ্জিন ভোরবেলা ‘ডাকছেন’ আস্‌ সালাতু খাইরুম মিনান্‌নাওম’।

কোন মতে সেই উত্তম কাজটি সেরেই বিছানায় তাড়িয়ে পড়লাম। আর যে কিছু ভাবার মত মনটাও যে হারিয়ে গেছে। তবে যাই হোক এটাই ছিলো আপাতত আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম ‘জার্নি বাই কার’ এ কথা বলাই বাহুল্য।

বি: দ্র: কয়েক জনের সাথে আলাপ হয়েছে তাঁরা চালাকি করে, অথবা পদাধিকার বলে উল্টো পথে রওনা হয়ে যথাসময়ে পৌঁছে গেছেন। পুলিশ ও ফ্ল্যাগ রেখে সালাম ঠুকে ছেড়ে দিয়েছে। কিংবা পাশ নিয়ে অর্থাৎ এই দেশে তারাই চরম বোকা যারা আইন মানতে চায়। আইনের যথাযথ প্রয়োগ করে চলতে চায়।

সুতরাং আইনকে ফাঁকি দিয়ে চলতে শিখুন, এই বাক্যকে বেদবাক্য বলতে হবে–সেদিন বুঝি আর দূরে নেই…।

লেখক : রম্য সাহিত্যিক, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট, চট্টগ্রাম লেডিস ক্লাব
(সংগৃহীত)