আজকের শিরোনাম :

সভ্য মানুষ কিংবা সভ্য সমাজের সংজ্ঞা কি?

  মোশাররফ হোসেন মুসা

০৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১৪:৫৪ | অনলাইন সংস্করণ

মোশাররফ হোসেন মুসা
সম্প্রতি চিত্রনায়িকা পরিমনীর রিমান্ড ও জামিন প্রসঙ্গে মাননীয় হাইকোর্ট বেঞ্চ মন্তব্য করেছেন- 'সভ্য সমাজ এভাবে চলতে পারে না।'

অন্যদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন আফগানিস্তান প্রসঙ্গে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেছেন- 'তালেবান আফগানিস্তানে সভ্য আচরণ করবে, যাতে বিশ্ব সম্প্রদায় কাবুলের সঙ্গে কুটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারে।'

স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্ন জাগে- সভ্য মানুষ ও সভ্য সমাজ বলতে কি বুঝায়? 

আমাদের  দ্বাদশ শ্রেণীতে " A Dialogue On Civilization" নামক গ্রন্থের একটি অংশ প্রবন্ধাকারে পাঠ্য পুস্তকে অন্তর্ভুক্ত ছিল(গ্রন্থটির লেখক-C.E.M.Joad)। তিনি (সম্ভবত তাঁর কন্যা) লুসির সঙ্গে কথাপোকথনের উপর ভিত্তি করে বইটি লিখেছেন। বইটির এক জায়গায় উল্লেখ আছে- এ্যারাবিয়ান নাইটের খলিফা ও রাজপুত্ররা সভ্য নন। কারণ তাদের প্রাসাদ, আড়ম্বরপুর্ণ পোশাক, খাবার-দাবার, পান করার জন্য পানীয় ইত্যাদির মধ্যে কোনো নতুনত্ব নেই। চিন্তারও কোনো বৈচিত্র্য নেই। অর্থাৎ একই চিন্তা ও একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তি মাত্র। তিনি বলেছেন- 'সভ্য হওয়া মানে সুন্দর জিনিস তৈরি করা, পছন্দ করা, স্বাধীনভাবে চিন্তা করা,  সঠিকভাবে জীবন যাপন করা এবং মানুষের মধ্যে সমানভাবে ন্যায়বিচার বজায় রাখা।'

মানুষের সভ্য হওয়ার সঙ্গে সভ্যতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। তথা-বস্তুগত পুনরুৎপাদনের জন্য মেধা ও শারিরীক শ্রমের নিযুক্তিই সভ্য হওয়ার লক্ষণ। সভ্যতা হলো মানুষের উন্নত চিন্তার বস্তুগত নিদর্শন। যেমন- মায়া সভ্যতা, গ্রীক সভ্যতা, রোমান সভ্যতা, আসিরিয়ান সভ্যতা, মহেঞ্জোদারো সভ্যতা ইত্যাদি। আর সংস্কৃতি হলো মানুষের দৈনন্দিন  জীবন প্রণালী।  প্রশ্ন হলো, তালেবানদের কেন সভ্য বলা যায় না। কারণ তারা সামন্তযুগীয় চিন্তায় ঘুরপাক খাচ্ছে। তাদের  চিন্তায় নতুনত্ব নেই এবং তারা  স্বাধীন চিন্তায়  বিশ্বাসী নয়। অর্থাৎ নতুন কিছু আবিস্কারে মেধা ও শ্রম ব্যয় করাকে অনর্থক কিংবা ধর্ম বিরোধী মনে করে। ফলে তারা নিজস্ব মেধায় ও শ্রমে উৎপাদন কিংবা আবিস্কার করতে অসমর্থ হয়। ফলে পপি  চাষই তাদের কাছে প্রধান চাষাবাদ। একই কারণে এ্যারাবিয়ানরা বিদেশের কাছে তাদের খনিজ সম্পদ লিজ দেয় ও নিরাপত্তার জন্য অস্ত্র ক্রয় করে। এখানে 'কাবুলিওয়ালার বাঙালি বউ' উপন্যাসের লেখিকা সুস্মিতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। 

লেখিকা একজন কাবুলিওয়ালাকে ভালবেসে বিয়ে করে (১৯৯৪ সালে) আফগানিস্তানে যান। সেখানে গিয়ে তিনি মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। বার বার পালাতে গিয়ে ব্যর্থ হন। অবশেষে খুবই কষ্ট করে পালিয়ে ভারতে চলে আসেন। উপন্যাসটি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতার উপর রচিত। তিনি উপন্যাসে উল্লেখ করেছেন, তাকে তালেবানরা কাফের ও মুশরিক বলে গাল দিতো। কিন্ত তালেবানরা ধর্মের নামে ও শরিয়া আইনের নামে মেয়েদের উপর অকথ্য নির্যাতন করে। তালেবানদের  মধ্যে কেউ যদি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তাহলে সামান্য তওবা করলেই ক্ষমা পাওয়া যায় (লেখিকা দ্বিতীয়বার আফগানিস্তানে গেলে তালেবানরা গুলী করে হত্যা করে। উপন্যাসটির উপর ভিত্তি করে 'Escape from Taliban' নামে একটি হিন্দি মুভি নির্মিত হয়েছে )। গণতান্ত্রিক শাসন ছাড়া সভ্য সমাজ পাওয়া যায় না। আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসন এসেছে রেনেসাঁস-এর হাত ধরে। রেনেসাঁস এর মুল কথা হলো যুক্তি মেনে নেয়া, ভুল স্বীকার করা ও ভিন্ন মতকে শ্রদ্ধা করা। সেই মানদণ্ডে ইউরোপিয়ান দেশগুলোকে সভ্য দেশ বলা যায়। কিন্তু ইরান, সৌদি আরব, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া প্রভৃতি দেশগুলোকে সভ্য দেশ বলা যায় না। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কোন পর্যায়ে রয়েছে? 

মাননীয় হাইকোর্ট বেঞ্চ যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন তার সঙ্গে দ্বিমত করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে (ইতোমধ্যে বিরোধীদলের কয়েকজন নেতা  দ্বিমত প্রকাশ করা শুরু করেছেন)। কারণ বিরোধী  মতের  বহু ব্যক্তিকে বার বার রিমান্ডে নেয়ার ঘটনা রয়েছে, জামিন যোগ্য মামলায় আটক রাখার ঘটনাও রয়েছে। বিবিধ কারণে সভ্য সমাজ নিয়ে একেক দেশে একেক  সংজ্ঞা রয়েছে । তবে দেশের উন্নতির জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য ও  শান্তিময় জীবনযাপনের জন্য বিধিবদ্ধ নীতি ও নৈতিকতার মধ্যে যে সমাজ পরিচালিত হয়, সে সমাজকে  সভ্য সমাজ বলা যায়। 

লেখক: গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ক গবেষক।

এই বিভাগের আরো সংবাদ
ksrm