নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার এক প্রতীক ‘অকাস’ চুক্তি

  রানা মিত্তার

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ১২:০২ | অনলাইন সংস্করণ

অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা জোটের ঘোষণা সম্পর্কে বরিস জনসন ও স্কট মরিসনের সঙ্গে আলোচনায় জো বাইডেন।
ফ্রান্স ক্ষুব্ধ। থেরেসা মে চিন্তিত। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা জোটের ঘোষণা (অকাস) এবং পূর্ববর্তী ফ্রান্স-অস্ট্রেলিয়া সাবমেরিন চুক্তি বাতিলের ফলেই ক্ষুব্ধ হয়েছে ফ্রান্স। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী জিন-ইভেস লে ড্রিয়ান এই চুক্তিটিকে ফ্রান্সের 'পিঠে ছুরিকাঘাত' বলে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে, প্রাক্তন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে, তাইওয়ানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্রিটেনকে যুদ্ধে টানা হচ্ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

কিন্তু অদ্ভুতভাবে, এ সবকিছুর প্রতিক্রিয়ায় বেইজিং অনেকটা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। তবে হ্যাঁ, চীন পশ্চিমের বিরুদ্ধে 'স্নায়ুযুদ্ধের মানসিকতা'র অভিযোগ এনেছে অনেক আগেই, এবং শি জিনপিং বিদেশি সরকারদের এই অঞ্চলে হস্তক্ষেপ না করার জন্যও সতর্ক করেছেন। সেইসঙ্গে চীন 'পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে', এমন একটি সতর্কবার্তাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, এ ধরনের বক্তব্য অনেকটা গতানুগতিক প্রতিক্রিয়ায় পর্যায়েই পড়ে।

চুক্তির প্রকৃত বিষয়বস্তুর চেয়ে এই তিন অংশীদারের চিন্তাধারার জন্যই 'অকাস' বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। কিছু পর্যবেক্ষক এটিকে 'পারমাণবিক' চুক্তি বললেও এটি আসলে এমন কিছু নয়। বিবিসি ওয়ানে সম্প্রচারিত 'ভিজিল' ড্রামা অনুযায়ী, সাবমেরিনগুলো পারমাণবিক অস্ত্র বহন করেছে না, বরং টেকসই জ্বালানী হিসেবে জাহাজগুলোয় পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এখন পশ্চিমাদের জন্য আউকুস নিয়ে প্রধান দুশ্চিতার বিষয় হল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হবেন! সম্ভবনা রয়েছে পরবর্তী নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে পারেন; আর তিনি না আসলেও তার কোনো অনুসারীই হয়তো প্রেসিডেন্ট হবেন।

এদিকে, বরিস জনসন দৃঢ়ভাবে অকাসের টিকে থাকার মেয়াদকে কয়েক দশক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার এই বক্তব্যের অর্থ হল, এই সময়ের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট যেই হোন না কেন, অকাস দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রকে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আবদ্ধ করতে চলেছে।

এই সাবমেরিন চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে ইউরোপীয় সুরক্ষা বলয়েও আবদ্ধ করে ফেললো, যেখানে হয়তো ন্যাটোর প্রাসঙ্গিকতা অনেকটাই কম। এ সপ্তাহে অস্ট্রেলিয়ান জোট এবং সাবমেরিন চুক্তি হারিয়ে ফ্রান্সের ক্ষুব্ধ হওয়াটা খুব অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু পরবর্তী দশকে, একটি ভিন্ন ব্যবস্থা দেখার প্রত্যাশাও রয়েছে; যুক্তরাজ্য এবং ফ্রান্স উভয়ই ইউরোপীয় নিরাপত্তা বলয়ের খুঁটি হতে চলেছে (একটি নতুন ইইউ বাহিনীসহ)। এবং একটি বড় ইউরোপীয় শক্তির (যদিও যুক্তরাজ্য এখন ইইউ-এর সদস্য নয়) সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যোগদানের ফলে অকাসের মাধ্যমে ইউরোপীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে বলেই ধরে নেওয়া যেতে পারে।  

এক্ষাত্রে স্নায়ুযুদ্ধ সম্পর্কে চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে উপেক্ষা করে যাচ্ছে। আর সেটি হল, স্নায়ুযুদ্ধের সেই যুগের কাঠামো ছিল যথেষ্ট অনমনীয়। কিন্তু অকাসের কাঠামো পুরোপুরি উদারপন্থী, যেখানে শক্তিগুলো 'মিনিলেটারাল' চুক্তিতে প্রবেশ করতে পারবে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে তাদের একসঙ্গে কাজ করারও সুযোগ থাকবে। এখন পর্যন্ত জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'কোয়াড' চুক্তি'র সবচেয়ে সুপরিচিত উদাহরণ। তবে অকাসের পরিসর আরও বড় হতে পারে।

এই চুক্তিগুলো তাৎক্ষণিকভাবে স্বতন্ত্র সদস্যদের মধ্যে ক্ষোভের কারণ (আফগানিস্তান ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে উপর ব্রিটেনের ক্ষোভ, আউকুস ইস্যুতে অস্ট্রেলিয়ার প্রতি ফ্রান্সের ক্ষোভ) হয়ে দাঁড়ালেও, উদারনৈতিক চুক্তিগুলো যে বৈশ্বিক গোলমেলে রাজনীতির চেয়ে বেশি শক্তিশালী তা বোধয় সবাই জানে। এটি কোনো স্নায়ুযুদ্ধ নয়, বরং বৈশ্বিক রাজনীতির ক্রমাগত পরিবর্তনের প্রেক্ষিতে অভিযোজন প্রক্রিয়ার একটি ছোট্ট অংশ।

আর বেইজিং এটা জানে বলেই হয়তো অকাস নিয়ে তেমন জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। এ বিষয়ে চীনের কম উদ্বিগ্ন হওয়ার আরেকটি কারণ হল, ইতোমধ্যে এশিয়া অঞ্চলে পশ্চিমাদের সামরিক উপস্থিতি রয়েছে। চীনের কাছে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হল, নতুন এই চুক্তিকে তার কিছু প্রতিবেশী দেশ কেন সমর্থন করছে? এই অঞ্চলে কূটনীতির ক্ষেত্রে সিঙ্গাপুর সব সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রেখেছে। তবে এখন দেশটি আশা প্রকাশ করেছে, অকাস 'আঞ্চলিক স্থাপত্যের পরিপূরক' হিসেবে কাজ করবে, যা আনেকটা সিনো-মার্কিন সম্পর্কের আগুনে ঘি ঢাকার মতোই।

অকাসের দুর্বলতার জায়গা নিরাপত্তা নয়, বরং এটি হতে পারে বাণিজ্য। চীন তার সব প্রতিবেশীর জন্য সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বহির্বিশ্বেও এই অঞ্চলের একমাত্র প্রধান বাণিজ্যিক অংশীদার হল চীন। এই সপ্তাহে একটি ব্রিটিশ ফরেন পলিসি গ্রুপের প্রতিবেদনে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, চীনের সিপিটিপিপিতে যোগদানের পদক্ষেপ, আঞ্চলিক কূটনীতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ভালো কৌশল হতে পারে। অকাস ঘোষণার পরের দিনই, বেইজিং সিপিটিপিপিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগদানের আবেদন করেছে।

এটি একটি স্মার্ট পদক্ষেপ হলেও, যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। সিপিটিপিপি-এর বাণিজ্য এবং বিশেষ করে শ্রমের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড বা মান নির্ধারণ প্রয়োজন, যা নিশ্চিতভাবেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্ধারিত নিয়মের তুলনায় যথেষ্ট দুর্বল। তবে এক্ষেত্রে অন্যান্য ছোট সদস্যদের তুলনায় বেইজিং-এর স্বাধীনতা অনেক বেশি; অবাধে শর্তাবলী আলোচনার সুযোগ রয়েছে দেশটির।

কিন্তু ধীরে ধীরে সিপিটিপিপি জোটের সদস্য রাষ্ট্রের পরিধি বাড়বে। ২০২২ সালেই এই জোটের নতুন অংশীদার হিসেবে যুক্তরাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। এমনটি হলে, জাপানের পরে এই গ্রুপের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি হবে ইউকে। জোটের অংশীদার হওয়ার পর, ইউকে যদি চীনের বাণিজ্য এবং শ্রম অধিকারের মানদণ্ড উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব রাজনীতিতে অকাসের কার্যকারিতাকেও বজায় রাখতে পারে, তাহলে এটি তার 'গ্লোবাল ব্রিটেন' ধারণার যথার্থতা আরও একবার প্রমাণ করতে পারবে।

টিপিপি চুক্তি থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে এনেছিলেন। তবে এখন চুক্তিতে চীনের যোগদানের ফলে মার্কিনীরাও আবার ফিরে আসতে প্রলুব্ধ হতে পারে। যদি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্র টিপিপি-তে ফিরে আসে তাহলে, অকাসের জন্য সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনার জায়গা হবে, 'বিশ্বের বৃহত্তম দুই অর্থনীতি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিভক্ত; অথচ অর্থনীতি ও বাণিজ্যের মাধ্যমে আবার তারা একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।' 


মূল লেখা- রানা মিত্তার, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক চীনের ইতিহাস ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ভায়া দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।

এই বিভাগের আরো সংবাদ
ksrm