শবদেহের উপর নৃত্য করার ছবিটি বলে, এক দুঃস্বপ্নের দেশ ভারত

  সুকান্ত চৌধুরী

০৪ অক্টোবর ২০২১, ১২:০৪ | আপডেট : ০৪ অক্টোবর ২০২১, ১২:১২ | অনলাইন সংস্করণ

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাক্ষাতে স্বভাবতই দুই দেশের সহমত ও সৌহার্দ নিয়ে আলোচনা হল। উঠে এল উভয় রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের কথা, গাঁধীর অহিংসা আর সহিষ্ণুতার বাণী। ওই দিনই দুই দেশের আর দুটো খবর প্রকাশিত হল, যাতে এই মূল্যবোধের তাৎপর্য আছে। দুঃখী দেশ হাইতির এই মুহূর্তে বিশেষ ভাবে বিধ্বস্ত জনগণ আমেরিকার সীমানায় ভিড় জমিয়েছেন, ঢোকার মরিয়া চেষ্টায়। মানবিক দাবি যতই জোরালো হোক, আমেরিকায় ঢোকার কোনও আইনি অধিকার এঁদের নেই। খেয়ালমাফিক কাউকে ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে, বাকিদের আটকে বা হটিয়ে দেওয়া হচ্ছে। সবার উপরই চলেছে নানান হেনস্থা আর অত্যাচার, বিশেষত ঘোড়সওয়ার পুলিশ দিয়ে।

আমেরিকা খুব কোমল মানবিক দেশ, এমন দাবি তার অন্ধ স্তাবকও করবে না। দুই শতক ধরে তার শক্তির সহিংস আস্ফালন তথা নেপথ্য অনাচারে দুনিয়া জর্জরিত। দেশের পর দেশ তাৎক্ষণিক আমেরিকান স্বার্থসিদ্ধির বলি হয়েছে: টাটকা উদাহরণ আফগানিস্তান। কিন্তু দেশটায় কিছু গণতান্ত্রিক ও মানবিক ধারাও সজীব আছে, তার রক্ষাকবচ আছে সংবিধানসিদ্ধ বাক্‌স্বাধীনতায়। দেশের দক্ষিণ সীমান্তে শরণার্থী, এমনকি অনুপ্রবেশকারীদের প্রতি আচরণের নিন্দা রীতিমতো প্রবল, অনেকটা বাইডেনেরই দলের ভিতর থেকে।

বাইডেন তাই বাধ্য হয়েছেন— বা হয়তো সত্যিই অনুপ্রাণিত হয়েছেন— হাইতির ওই শরণার্থীদের কিছুটা রেহাই দিতে। বলেছেন, “আমি প্রেসিডেন্ট, এই পরিস্থিতির দায় আমার। যারা অত্যাচার করেছে, তাদের শাস্তি পেতে হবে। এমন আচরণ আমাদের স্বরূপ নয়।” কী মতলবে বলেছেন, বললেও প্রতিশ্রুতি রাখবেন কি না, তা পরের কথা। বলেছেন তো বটে, তাও দ্ব্যর্থহীন ভাষায়। আর সরিয়ে দিয়েছেন ঘোড়সওয়ার পুলিশকে।

একই দিনে অসমে দখলদার উচ্ছেদ ঘিরে প্রবল হিংসা ও অশান্তি হল। পুলিশের গুলিতে দু’জন মারা গেলেন— এক জনের বয়স মাত্র বারো। এমন মৃত্যু ভারতে ডাল-ভাত, খবরে দেখলে পাতা উল্টে যাই। এ ক্ষেত্রে কড়া-পড়া মনগুলো ঘা খেল এই দেখে যে, পুলিশের সহযোগী এক ব্যক্তি মৃত (না কি, তখনও জীবিত?) ব্যক্তিকে পেটাচ্ছে, লাথি মারছে, লাফিয়ে থেঁতলে দিচ্ছে। চার দিকে পুলিশের ভিড়, সব ঘটছে তাদের চোখের সামনে।

দেশবাসীর দুর্দশার মতো অপ্রিয় অগোছালো বিষয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী খুব একটা মুখ খোলেন না। লকডাউনের সময় পরিযায়ী শ্রমিকের কাতার পথে নামলেও খোলেননি; অতিমারির দ্বিতীয় ঢেউয়ের বিপর্যয়েও না। রাষ্ট্রীয় হিংসার কুশীলবদের, বা তাদের সঙ্গে আত্মিক যোগ আছে এমন কাউকে সহসা ভর্ৎসনা করেন না— এ ক্ষেত্রেও করেননি। রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে নেননি ঘটনার নৈতিক দায়, যেমন নিয়েছেন বাইডেন। সরাসরি দায় অবশ্য সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারের, যা এ ক্ষেত্রে তাঁরই দলের হাতে।

ঘটনার তদন্ত করতে অসম সরকার এক প্রাক্তন বিচারপতিকে নিয়োগ করেছে। উচিত পদক্ষেপ; এর পর আর কিছু বলার থাকতে পারে কি? থাকছে, কারণ আইনি নিয়মরক্ষার বাইরে মানবিকতা, সহমর্মিতা বা নিছক জনসংযোগের একটা ব্যাপার থাকে, সেই স্তরে বার্তাগুলো বেজায় গোলমেলে। মৃতদেহে লাথি মারাটা বাড়াবাড়ি, ব্যাড অপটিক্স— যে করেছে সে সরকারের লোকও নয়— তাকে বলির পাঁঠা করা যেতে পারে। যে পুলিশের দল দাঁড়িয়ে দেখেছে, তারা আপাতত খালাস— কোনও দিন কেউ দোষী প্রমাণিত হলে যথাবিধি নিয়মরক্ষা হবে। ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা দায়মুক্ত। কয়েকশো বাস্তুচ্যুত পরিবারের টিকে থাকার উপায় নিয়ে কথা নেই; নেই নিহত ব্যক্তিদের প্রতি, এমনকি কিশোরটির প্রতি, সহানুভূতির লেশ।

অর্থাৎ, যে মানুষগুলোর জীবন চলে গেল বা ছারখার হয়ে গেল, তারাই হল কর্তাদের প্রতিপক্ষ। এরা কিন্তু দীর্ঘ কাল বা আজীবন ভারতের বাসিন্দা— নিহত ছেলেটি আধার কার্ড সংগ্রহ করেই ফিরছিল। আধার নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়, কার্ডেই ছাপা আছে। অসমের নাগরিক সমস্যার অভেদ্য গোলকধাঁধা এখানে বিচার্য নয়। বিচার্য এই যে, সেই জটিলতার অন্ধ অমানবিক সরলীকরণের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ বিপন্ন। তাঁরা আর মানুষ থাকলেন না, হয়ে গেলেন ভূমিপুত্র-বহিরাগত, অসমিয়া-বাঙালি, হিন্দু-মুসলিম— হরেক কিসিমের ‘আমরা-ওরা’ বিভেদের শতরঞ্জের ঘুঁটি।

উৎখাত-হওয়া পরিবারগুলি ‘ওরা’র দলে, অতএব পরিত্যজ্য। ধরে নেওয়া যাক, তারা সত্যিই বেআইনি দখলদার। তবু যে মাটিতে তারা কয়েক দশক বাস করছে, সেখান থেকে শিশুবৃদ্ধ সকলকে কি বর্ষা মাথায় করে, পুনর্বাসনের কার্যকর ব্যবস্থা না করে, এমন পত্রপাঠ উচ্ছেদ করা আবশ্যক ছিল? তাদের মধ্যে খাবার বিতরণের ‘অছিলায়’ নাকি কিছু লোক গন্ডগোল পাকিয়েছে। হতেই পারে, কুচক্রীর অভাব নেই; কিন্তু তারা সেই সুযোগ পেল কেন? ছিন্নমূল মানুষগুলোকে, এমনকি তাদের শিশুদের, ন্যূনতম খাদ্য বা আচ্ছাদনের অন্য ব্যবস্থা ছিল কি?

এখানেই মূল প্রশ্ন, যা নিয়ে না ভাবলেই নয়। এ জন্যই আমাদের অন্য রাজ্যে বসে, নিজেদের গায়ে আঁচ না লাগলেও এমন ঘটনায় বিচলিত হওয়া দরকার। কোনও বিশেষ ক্ষেত্রে খুঁটিনাটি যা-ই হোক, দায়-দোষ-অভিযোগের যা-ই চাপান-উতোর চলুক, ভারতীয় সমাজে একটা নতুন অমঙ্গলের ধারা গত কয় বছরে দেখা দিয়েছে। প্রবল উৎকট হিংসা ভারতে চিরন্তন, সম্রাট অশোকের আমলেও নিশ্চয় ছিল। কিন্তু সম্প্রতি তাতে একটা নতুন বীভৎসতা যোগ হয়েছে। লোকে কেবল মারছে কাটছে, ধ্বংস বলাৎকার উৎপীড়ন করছে তা-ই নয়, করছে একটা নতুন প্রদর্শন বা আস্ফালনের মেজাজে। বেপরোয়া দুষ্কৃতী সব যুগেই থাকে; তাদের ভঙ্গি, ‘দেখ আমাদের এলেম, যা খুশি করছি, ঠেকাতে পারছিস কই?’ এখন যা ঘটছে সেটা তার বাড়া। প্রচার বা আতিশয্যের দ্বারা হিংসাকে একটা নতুন মাত্রা, যেন নতুন সার্থকতা, দেওয়া হচ্ছে: এ হল দুর্বৃত্তায়নের দেখনদারি।

ফলে ধর্ষণ থেকে শুরু করে ভিন্‌রাজ্যবাসীর উপর উৎপীড়ন, দলিত ও মুসলিম নিধন, সবেরই ভিডিয়ো তুলে সমাজমাধ্যমে প্রচার হচ্ছে। নগণ্য মানুষের ব্যক্তি-স্তর থেকে ধাপে ধাপে উত্তীর্ণ হয়ে তা জ্বলজ্বল করছে রাজনীতির ছোট-সেজো-মেজো কারবারির দৃপ্ত উক্তিতে, ফলে জনগণের দৃষ্টিতে সিলমোহর পেয়ে যাচ্ছে। এবং সর্বোচ্চ মহান নেতাদের যে হেতু এই কারবারিদের নিয়েই কারবার, এই জনগণকে বশে আনা আবশ্যক, তাঁরাও কথায়-কাজে হয়ে উঠছেন আরও আগ্রাসী, আরও বেপরোয়া। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ব্যবহার— যার প্রয়োগ বরাবরই নির্দয় ছিল— এখন ভাবাদর্শের স্তরে উত্তরোত্তর নির্মম, অমানবিক। যেটুকু না হলেই নয়, তার চেয়ে বেশি কঠোর হওয়া; যেটুকু আপসে সৌহার্দ বজায় থাকে, তাও পরিহার করা; প্রতিপক্ষকে বাঁচার খাতিরে যেটুকু জমি ছাড়া দরকার, তাও কেড়ে নেওয়া— এটাই ক্ষমতাবানের মূলমন্ত্র, সেখান থেকে চুইয়ে নামছে সমাজ-পল্লি-ব্যক্তিজীবনে। নির্বিচারে লাঠি-গুলি দিয়ে জনপদ উৎখাত করলে এমন পোষ্য জুটতে বাধ্য, যে নিহতের দেহের উপর উদ্দাম নৃত্য করবে। সে লোকটা এই শাসনব্যবস্থার সৃষ্টি ও অলঙ্কার।

উচ্ছেদপর্বের ছবি নিয়ে শেষ একটা বক্তব্য। অবশ্যই এটা লম্বা ভিডিয়োর আধ মিনিটের অংশ। কিছু কথা কিছু কাজ কিন্তু স্বমহিমায় আসীন, আগে-পরে যা-ই থাকুক এসে যায় না। এমন কোনও ঘটনাপ্রসঙ্গ কল্পনার অতীত, যা ওই আধ মিনিটের দৃশ্যকে পরিশুদ্ধ করে তুলবে।

বিভিন্ন সময়ের কয়েকটা ছবি গোটা বিশ্বের কাছে দুঃস্বপ্নের প্রতীক হয়ে উঠেছে, তুলে ধরেছে মনুষ্যত্বের চূড়ান্ত বিপর্যয় আর অবনমন— আমেরিকান বোমার আগুনে সর্বাঙ্গ জ্বলতে থাকা ভিয়েতনামের আর্ত কিশোরী; অনাহারে মৃত্যমুখী সুদানের বালক, পাশে লোলুপ প্রতীক্ষারত শকুন; তালিবানের কবল এড়াতে উড়ন্ত বিমানের ডানা প্রাণপণে আঁকড়ে একটি মানুষ। অসমের ওই অত্যুৎসাহী লোকটার শবের উপর লাফানোর প্রতীকী তাৎপর্য কিছু কম নয়; বরং তাতে আছে একটা বাড়তি উপাদান, তাণ্ডব করে এক বিচিত্র ফুর্তি।

এ ছবি দুনিয়ার চোখে দেশের সম্মান বাড়ায় না। নেতা-শাসক হই বা শিক্ষিত সম্ভ্রান্ত নাগরিকই হই, চার পাশে অশেষ পাপ-শোক-অনাচারে আমাদের তেমন হেলদোল নেই, কিন্তু নিন্দামন্দ শুনলে মনে বড় লাগে। সেই মনঃপীড়া থেকে বাঁচার জন্যই নিশ্চিত করা দরকার, এমন ঘটনা যেন না ঘটে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।


সৌজন্যে: দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা।

এই বিভাগের আরো সংবাদ
ksrm