অাত্মহত্যা'কে 'না' বলি

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭ অক্টোবর ২০১৮, ১৬:৫২

'অাত্মহত্যা' কি সবকিছুর সমাধান হতে পারে?আত্মহত্যার মাধ্যমে কি জীবন যুদ্ধে জয়ী হওয়া যায়?এক কথায়,না।

তাহলে কেন অাত্মহত্যা?

প্রতিনিয়ত কম বা বেশি এমন ঘটনা দেশের অানাচে-কানাচে ঘটে থাকে;পত্র-পত্রিকার বদৌলতে ঘরে বসে সহজেই জানতে পারি।

দৈনিক পত্রিকা এবং বিভিন্ন জনের দেয়া ফেসবুক স্ট্যাটাসের মাধ্যমে জানতে পারলাম,ঢাবির দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের জাকির নামে একজন শিক্ষার্থী অাত্নহত্যা করেছে।এবং সুইসাইড নোটে লিখে গেছে, 'অামার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়'।

উল্লেখ্য,তার পারিবারিক অবস্থা খুবই শোচনীয় ছিলো;দিন অানে দিন খায় গোছের।এমনকি জাকিরের ঢাকায় থাকা এবং বর্তমানে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ ম্যানেজ করা তার পক্ষে অসম্ভব ছিলো।

এরও কিছু দিন অাগে দেখলাম, ঢাবির মুশফিক মাহবুব নামে সঙ্গীত বিভাগের একজন শিক্ষার্থী সরকার, গণতন্ত্র এবং বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয় এবং পরবর্তীতে অাত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।

এ দুটি ঘটনাকে উপজীব্য করে অাজকের লেখাটাকে এগিয়ে নিতে চাই।

প্রথমটির দিকে যদি দৃষ্টি নিবদ্ধ করি তাহলে দেখতে পাই,জাকির একজন হত দরিদ্র ছেলে।তার পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত অর্থ সংগ্রহ করার কোন উপায় সে বাতলাতে পারে নি। জীবন যুদ্ধের ভয়াবহ কোলাজের বলি হয়ে সে অাত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।

তার মৃত্যুকে ঘিরে অনেকেই মনের মাধুরী মিশিয়ে অনেক কথা লিখেছে,হা-হুতাশ করেছে, সরকারকে সমালোচনা করেছে,কোন কোন মন্ত্রীকে সমালোচনা করেছে,অাবার কেউ সমাজ ব্যবস্থাকে এক হাত নিয়েছে।  দূর্ভাগ্যজনক হলেও এটা সত্য যে,কাউকে তেমন করে জাকিরকে দোষারোপ করতে দেখিনি।  এটা অামার ভালো লেখেছে! হাদিস শরীফে অাছে,"যে ব্যক্তি জীবদ্দশায় অন্য কোন মুসলিম ভাইয়ের দোষ গোপন রাখে,অাল্লাহ্ তায়ালা কেয়ামতের দিন তার দোষ গোপণ রাখবে"।তবে হাদিসের মর্মার্থটা হুজুগে বাঙালী বুঝে নি।যাইহোক সেদিকে যাওয়ার ইচ্ছে অামার নাই।

একজন সুস্থ মস্তীস্কের মানুষ অামাকে বলুন,ঢাবিতে অাবাসিক হলে থাকা একজন শিক্ষার্থীর মাসিক খরচ কত? যতদূর অামি জানি, ৩০০০ টাকার মতো। ধরলাম সে অাবাসিক ছাত্র না মেসে থাকে।মেসে সর্বসাকুল্যে মাসিক খরচ ৫,০০০ টাকার মতো ;কমবেশি হতে পারে। অনেকের কাছ থেকে জেনে এভারেজ লিখছি, কেউ ভাবতে পারে অামি মনগড়া লিখছি তেমনটি নয়।

এবার অামাকে বলুন,ঢাবির একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে এমন টাকা ম্যানেজ করা অসম্ভব ব্যাপার কি? অনেকের কাছে অসম্ভব হতে পারে,যাদের মাথা মোটা।
একেবারে সহজ যে সেটা অামি বলছি না,তবে একটু চেষ্টা এবং কৌশলী হলে সহজেই এমন টাকা ম্যানেজ করা যায়। এখন শিক্ষার্থীদের জন্য অর্থ উপার্জনের নানা সুযোগ বিদ্যামান; যেমন: টিওশন, কোচিং, ফ্রি-ল্যান্সিং, পার্ট-টাইম চাকরিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা।

অামি অনেককেই দেখেছি এবং জেনেছি হোটেলে রাত ১০ টা থেকে সকাল ৬ টা পর্যন্ত একটানা কাজ করে সকালে এসে শ্রান্ত শরীরে বরাবরের মতো ক্লাস করে,পরীক্ষা দেয় ভালো ফলাফল করে হাসিমুখে দিব্বি কাটাই দিন।  অনেকেই শহরের শপিং মল, মোবাইলের শো-রুম, বিভিন্ন অফিসে চাকরি করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস করে, পাশ করে বের হয়, পরবর্তীতে পরিবারের হাল ধরে অারো কত কি?

এতো এতো সুযোগ-সুবিধা, সম্ভাবনা থাকার পরেও কেনো অাত্মহত্যা করে শিক্ষার্থীরা অন্তত অামার বুঝে অাসে না? অাত্মহত্যা করলেই কি সবকিছু থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, না সমস্যাগুলো অারও ঘোরতর হয়।

এই যে জাকির অাত্মহত্যা করলো সে কি শুধু নিজের ক্ষতি করলো;একাধারে নিজের, পরিবারের,সমাজের, রাষ্ট্রের।যে হত দরিদ্র বাবা-মা তাকে জন্ম দিয়ে, বড়  করে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে পাঠিয়েছে মানুষের মতো মানুষ করার জন্য,সমাজের বুকে স্থানের জন্য,দু'বেলা খেয়ে পরে বাঁচার জন্য। অার সে প্রতিদান স্বরুপ কি দিলো?সে কি এতটুকু ঝুঁকি নিতে শেখে নি?অাত্মহত্যা কি বাঁচার একমাত্র সহজ পথ ছিলো।সে কি একবার ভাবলো না,তার জন্মদানের সময় গর্ভধারিণী মা কত বড় ঝুঁকি নিয়েছিলো জীবনের?তার বাবা কত গায়ের ঘাম পানি করে সংসারে অর্থের জোগান দিয়েছিলো,তার পড়াশুনার ব্যয়ভার বহন করেছিলো?একবারও কি এগুলো ভাববার প্রয়োজন পড়েনি! শতধিক তার প্রতি!

দ্বিতীয় ঘটনার দিকে  যদি একটু নজর দিই তাহলে দেখি,মুশফিক মাহবুব সরকার, গণতন্ত্র এবং শিক্ষাব্যবস্থাকে সমালোচনা করেছে।অবশ্যই সচেতন শিক্ষার্থী হিসেবে এবং প্রজাতন্ত্রের সুনাগরিক হিসেবে তার কাজ যুক্তিযুক্ত এবং প্রশংসার দাবিদার।কারণ বর্তমান সময়ে কতজনের বুকে হিম্মত অাছে এমনটা করার।তবে পরবর্তী সময়ে সে যা করেছে তা নিশ্চয়ই জঘন্য এবং অত্যন্ত গর্হিত।

একুশ শতকের সুশীল সমাজ অামাকে বলুন,তার অাত্মহত্যার মাধ্যমে কি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়েছে, সরকার ব্যবস্থায় অামূল পরিবর্তন এসেছে না দু'পরিবারের মধ্যে এখনো সীমাবদ্ধ অাছে নাকি শিক্ষা ব্যবস্থার বড্ড অাধুনিকায়ন হয়েছে;বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরা কি ঘরে ঘরে রোবট বানাচ্ছে,নতুন নতুন যন্ত্রপাতি,কলা-কৌশল অাবিস্কার করছে,বাণিজ্যের শিক্ষার্থীরা কি জনে জনে বড় উদ্যোক্তা হচ্ছে,না সম্মানের শিক্ষার্থীরা দক্ষ প্রশাসক এবং যথাযথ মানবিক হচ্ছে?উত্তর-কোনটিই নয়।

তাহলে কেন অাত্মহত্যা?

অাত্মহত্যা'ই যদি সবকিছু হতো তাহলে এদেশের স্বাধীনতার জন্য এত সংগ্রাম,রক্তক্ষয়ী বিভীষিকাময় যুদ্ধ,বুদ্ধিজীবীর কলম,মা-বোনের সম্ভ্রম, দীর্ঘ ২৬৬ দিনের প্রতীক্ষা ;এগুলোর তো কোন প্রয়োজন ছিলো না।কয়েক জন মানুষ অাত্মহত্যা করলেই তো দেশ স্বাধীন হয়ে যেতো।তাই নয় কি?


অাত্মহত্যার কারণ যদি পর্যালোচনা করি,সেখানে শুধু ব্যক্তি যে দায়ী তা নয় ;পাশাপাশি সমাজ,রাষ্ট্র,পারিপাশ্বিক অবস্থাও বহুলাংশে দায়ী।রাষ্ট্রকে এ বিষয়টা বিবেচনায় নেয়ার যথেষ্ট সময় হয়েছে।অাশা রাখি,ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এটা দ্রুত অামলে নিবে।

অামরা নিজের, পরিবার,সমাজ রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থের কথা চিন্তা করে নতুন ভাবে বাঁচার মতো বাঁচতে শিখি।মনে রাখতে হবে,'Life is not a bed of roses' অর্থাৎ জীবন পুষ্প শয্যা নয়।  জীবনে অনেক বাঁধা-বিপত্তি,ঝড়-ঝাপটা অাসবে।  কখনো কখনো মনে হবে, অামার বুঝি জীবন প্রদীপ এখন'ই নিভে যাবে, সামনে এক পা অগ্রসর হওয়া অামার পক্ষে সম্ভব নয়; তখন'ই বুঝতে হবে জীবনটাকে নতুনভাবে চেনার সময় হয়েছে?

অাসুন,অামরা জীবনকে নতুনভাবে জানি,চিনি এবং নিজেদেরকে অাবিস্কার করি অনন্য এক উচ্চতায়।

লেখক : অাব্দুল্লাহ্-অাল-মামুন, শিক্ষার্থী সমাজকর্ম বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

এবিএন/মোস্তাকিম ফারুকী/জসিম/রাজ্জাক

এই বিভাগের আরো সংবাদ