অপ্রতিরোধ্য সড়ক দুর্ঘটনার দায় কার

  রেজা মুজাম্মেল

২২ অক্টোবর ২০১৮, ১৩:৩৩ | অনলাইন সংস্করণ

সময় এবং ঘটনার প্রেক্ষিতে বলা যায়, সড়ক দুর্ঘটনা এখন মহামারি আকার ধারণ করেছে। বাস্তবতার প্রেক্ষিতে এ কথাটি মোটেও অতিরঞ্জন বলা যাবে না। নানা সময় নতুন-পুরাতন ঘাতক রোগ মহামারি হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রোগ-ব্যাধিকে ছাপিয়ে এখন শীর্ষেই অবস্থান করছে ‘সড়ক দুর্ঘটনা’। কোনো মতেই এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। নানা উদ্যোগ, কর্মসূচি, আইন প্রণয়ন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হচ্ছে। কিন্তু কোনো কিছুতেই কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও কার্যকর হয় না। কার্যকর হলেও তা স্থায়ী রূপ পায় না। ফলে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।

দুই. গত ২৯ জুলাই শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের একদল শিক্ষার্থীর ওপর বাস তুলে দিয়ে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় সড়কে শৃঙ্খলার এতটুকু আলোর ঝলকানি দেখা দিয়েছিল। ওই ঘটনার পর টানা কিছুদিন দেশজুড়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী সড়কে অবস্থান করে শৃঙ্খলা ফিরাতে তৎপর ছিলেন। তখন শিক্ষার্থীরা ক্লাসের পরিবর্তে তাদের ভাষায় ‘দেশ সংস্কারের’ কাজে নেমেছিল। বলা যায়, তখন সড়কে সাময়িক সময়ের জন্য হলেও শৃঙ্খলা দেখা দেয়। জনগণ সাময়িক সময়ের জন্য হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা রাজপথ থেকে ক্লাসে ফিরে যাওয়ার পর আবারো পূর্বের অবস্থায় বিরাজ করতে শুরু করে। শিক্ষার্থীদের রেখে যাওয়া শৃঙ্খলা ফের নষ্ট হয়ে যায়।

এখন প্রশ্ন, সড়ক দুর্ঘটনার দায় কার? কি কারণে সড়কে প্রতিনিয়ত জ্যামিতিক হারে দুর্ঘটনা বাড়ছে। কেনই বা এর লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। কেন দিনের পর দিন এটি অপ্রতিরোধ্য হয়ে ঠেকছে? সরকারের দায়িত্বশীল বিভাগ কি সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যর্থ? নাকি দক্ষতা ও আন্তরিকতার অভাব? তদুপরি সড়ক দুর্ঘটনার কথা আসলে পাশাপাশি আরো কিছু বিষয়ও সামনে আসে- চালক, যাত্রী, পথচারি, সড়ক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত ট্রাফিক বিভাগ, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ বিভাগ বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) এবং সড়ক সংস্কার-সম্প্রসারণের দায়িত্বে থাকা সড়ক ও জনপথ (সওজ)। সড়ক দুর্ঘটনার কথা বললে অবধারিতভাবেই এসব পক্ষও সামনে আসে। কোন একটি পক্ষকেও উপেক্ষা করে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। চালক অদক্ষ হলে যেমন যানবাহন সঠিক নিয়মে চলে না, তেমনি যাত্রীরা অসচেতন হলেও চলবে না। অন্যদিকে, সড়ক ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত থাকা ট্রাফিক বিভাগ যদি যথা নিয়মে সড়ক পরিচালনা না করে, তাহলে সড়কে বিশৃঙ্খলা থাকবেই। তাছাড়া বিআরটিএ যানবাহনের ফিটনেস, যানবাহনের লাইসেন্স নবায়ন, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চালককে লাইসেন্স প্রদান এবং নবায়ন না করলেও সড়কে শৃঙ্খলা থাকবে না। একই সঙ্গে নিরাপদ সড়কের পূর্ব শর্ত সড়ক যান চলাচলের উপযোগী থাকা। সড়ক যদি যানবাহন চলাচলের অনুপযোগী হয়, তাহলে দুর্ঘটনা-বিশৃঙ্খলাসহ নানা সমস্যা দেখা দেবে। তাই কোনো পক্ষকেই বাদ দিয়ে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা অনেকটাই অসম্ভব।

কিন্তু এসব পক্ষগুলো কি যে যার দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করছেন? বুকে হাত দিয়ে কেউ বলতে পারবে না, যে তিনি তার কাছে অর্পিত দায়িত্বটুকুন যথা নিয়মে, যথা সময়ে পালন করছেন। করলে আজ সড়ক দুর্ঘটনা এমন অপ্রতিরোধ্য হতো না। ধরা যাক, সড়ক ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশের কথা। পুলিশের সামনেই মূল সড়কে প্রাইভেট কার পার্কিং করে রাখা, পুলিশের সামনেই চালক দেদারসে মোবাইলে কথা বলছে, অনিয়মিত ওভারটেকিং করছে, আগে যাওয়ার জন্য অসম প্রতিযোগিতা করছে, ইচ্ছামত যত্রতত্র গাড়ি থামিয়েই যাত্রী উঠানামা করছে। অথচ এসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাই নেয় না সড়কেই কষ্ট করে দায়িত্ব পালন করা ট্রাফিক পুলিশ। হাতেগুণা কিছু মামলা বা অন্য কোন শাস্তি দেওয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় বড়ই অপ্রতুল। অন্যদিকে, বিআরটিএ? সংস্থাটি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা শেষে চালকের লাইসেন্স দেওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা কতটুকু পালন করা হচ্ছে, তা সচেতন মহল মাত্রই জানেন। একই সঙ্গে যানবাহনের ফিটনেস প্রদানের ক্ষেত্রে নানা অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গাড়ি বিআরটিএ কার্যালয়ে না নিয়ে ফিটনেস দেওয়া কিংবা চালক না গিয়েও লাইসেন্স দেওয়ার ঘটনাও আছে। পক্ষান্তরে চালক? বর্তমানে চালক মহাশয় তো অতিশয় ক্ষমতাশালী। সে যেমন ইচ্ছা তেমনই গাড়ি চালায়। যাত্রী ভর্তি গাড়ি, অথচ একহাতে মোবাইল অন্য হাতে স্টিয়ারিং! এমন অবস্থায়ও চলে আগে যাওয়ার জন্য অপর গাড়ির সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা। নিয়ম না মেনে ডানে ওভারটেকিং করার ঘটনাও অহরহ। ফলে এ সব অবস্থা দুর্ঘটনাকে কাছেই টানে সব সময়। এ ক্ষেত্রে যে চালকের একক দায় থাকে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর যাত্রী? তাদেরও যথেষ্ট সতর্ক ও সচেতন থাকা উচিত। কানে মোবাইল নিয়ে সড়ক পার হওয়াটা দুর্ঘটনাকে হাতছানি দেওয়ারই নামান্তর। তাছাড়া চালক যখন অসম প্রতিযোগিতা করে, অনিয়মিত ওভারটেকিং করে তখনই যাত্রীর উচিত চালকের এ ভূমিকার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা। নিয়ম মানতে বাধ্য করা। কেবল যাত্রীদের নীরবতাই চালকরা দিন দিন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে। একদিন প্রতিবাদ করলে আরেক দিন এ জাতীয় অনিয়ম করতে সাহস পাবে না। সবশেষে বলতে হয় সড়ক ও জনপথের কথা। সংস্থাটি যদি যথা সময়ে সড়ক সংস্কার ও সম্প্রসারণ করে তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমবে। কারণ সড়ক ঠিক থাকলেই যানবাহন যথাযথভাবে চলতে পারবে। অন্যথায় এ্যাবড়োথেবড় সড়কে দুর্ঘটনা ঘটবেই। বাড়বে দুর্ঘটনা।

তিন. আমাদের দেশে নিম্নস্তর থেকে উচ্চতর, মন্ত্রী, এমপি, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে আমলা- সবারই মুখেই সব সময় ‘সচেতনতা’ নামে একটা শব্দ শুনা যায়। এই একটি শব্দ দিয়েই অনেকেই দায়িত্ব এড়াতে চান। একটি শব্দ ব্যবহার করেই নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্বটুকু শেষ করতে চান। সব অনুষ্ঠানেই বলা হয় ‘আমাদের সচেতন হতে হবে’। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কে কাকে কখন কিভাবে সচেতন করবেন। জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব কার, কে নেবে? বিড়ালের গলায় ঘণ্টিটা বাঁধবে কে? সাধারণ নিয়মে বলা যায়, সড়ক পরিচালনার দায়িত্ব ট্রাফিক বিভাগের। সড়কে চালক-যাত্রী যে-ই অনিয়ম করুক তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পুলিশের। এখন পুলিশ যদি অনিয়মকারীদের সঙ্গে নেপথ্যে সখ্যতা তৈরি করে, কারো বিরুদ্ধে আইন বাস্তবায়ন না করেন, তাহলে দায় কার? এখানে কে কাকে সচেতন করবে? রাষ্ট্র কর্তৃক দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ প্রশাসন যদি তার কাজটুকুন যথাযথ পালন করেন, তাহলে জনগণ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সচেতন হয়ে যাবে। প্রয়োজন কেবল জনগণকে সচেতন হওয়ার জন্য একটুকু জাগিয়ে তোলা, চেতনা তৈরি করা। একইভাবে সরকারি সংস্থা বিআরটিএ, সওজ ও চালকদের যদি দায়িত্বপ্রাপ্তরা যথা নিয়মে সচেতন করার কাজ করেন, তাহলে অনেক ক্ষেত্রে পরিবর্তনের ছোঁয়া পড়বে।

চার. আর কত অকাল প্রয়াণ দেখতে হবে। কত প্রাণ ঝরবে সড়কে, পথে-প্রান্তরে। আর কত রক্ত দেখতে হবে। পিচ ঢালা রাজপথ রক্ত দিয়ে আর কত রঞ্জিত হবে। আদরের সন্তানের অকাল মৃত্যু আর কত দেখতে হবে মা-বাবাকে। পিতার কাঁধে পুত্রের লাশ আর কত দেখতে হবে। মমতাময়ী মাকে আর কত দেখতে হবে নাড়ি চেড়া ধনের রক্ত। কোমলমতি শিশুকে আর কত দেখতে হবে মায়ের লাল রক্তের স্রোত। অতএব, আর নয় সড়ক দুর্ঘটনা। সচেতনতা আসুক সবার মধ্যে। নিজের মধ্যে জাগিয়ে উঠুক চেতনাবোধ। নিরসন হোক অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠা সড়ক দুর্ঘটনা। (দৈনিক আজাদী থেকে নেয়া)

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী

এই বিভাগের আরো সংবাদ