এক অঙ্গে দুই রূপ, নাম তাঁর নজরুল

  সুপান্থ মল্লিক

২৫ মে ২০১৯, ১২:৪৮ | অনলাইন সংস্করণ

কবি নজরুল ইসলামের লেখনীতে প্রেম ও দ্রোহ একই শক্তির দুই ভিন্ন প্রকাশ। যে যৌবন শক্তির তাড়নায় তিনি ছিলেন প্রেমিক, সেই জীবন শক্তিই তাঁকে করে তুলেছিল বিদ্রোহী। তাঁর প্রেম ও দ্রোহ সমান্তরাল অবস্থায় আছে বলেই সেখানে তিনি প্রকৃত বিদ্রোহী! যেমন সেখানেও প্রেমিক হৃদয়ের যথার্থ উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা যায়। একই সাথে স্পষ্ট উচ্চারণ করেছেন- মম এক হাতে বাঁকা, বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণ-তূর্য! ‘বিদ্রোহী’ কাব্যে কখনো গর্জে উঠেছেন এভাবে- আমি ভরা তরী করি ভরাডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভাসমান মাইন/ আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর/ আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সূত্র বিশ্ব-বিধাতৃর! ৃ আমি উম্মাদ,আমি ঝঞ্ঝা/ আমি মহামারি, আমি ভীতি এ ধরিত্রীর; আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ণ চির-অধীর। আবার কখনো হয়ে ওঠেন তিনি এরকম প্রকৃত প্রেমময়- আমি বন্ধন হারা কুমারীর বেণু, তন্বী-নয়নে বহ্নি, আমি ষোড়শীর হৃদি-সরসিজ প্রেম উদ্দাম, আমি ধন্যি!  ...আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনী, ছল করে দেখা অনুখন, আমি চপল মেয়ের ভালোবাসা, তার কাঁকন-চুড়ির ক›-ক›। আবার মনের আনন্দে প্রেমিকার উদ্দেশ্যে গেয়ে উঠেছেন- আলগা করো গো খোঁপার বাঁধন, দিল ওহি মেরা ফাঁস গ্যেয়ি। বিনোদ বেণীর জরীণ ফিতায়, আন্ধা ইশক মেরা কাছ গ্যেয়ি। তোমার কেশের গন্ধে কখন লুকায়ে আসিলো লোভী আমার মন।
গীতি কবিতার পথ ধরে নজরুল তাঁর প্রেমের কবিতায় রোমান্টিক কবি স্বভাবের যে পরিচয় দিয়েছেন তার প্রেম ও প্রকৃতির উপলব্ধি এবং দেহ উত্তাপের পরিচয় পাওয়া যায়। কাজী নজরুল ইসলাম বিহারী লালের মত মিস্টিক কবি নন, রবীন্দ্রনাথের মত দার্শনিককবি তিনি নন। তিনি সহজ-সরল মানবীর প্রেমের রূপকার। তাঁর প্রকাসভঙ্গিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে অত্যান্ত সহজ, সরল ও ঋজু- প্রিয়াকে তিনি মানবী থেকে দেবিতে রূপান্তরিত করেছেন এবং বলেছেন- তুমি দেবী চিরশ্রদ্ধা তাপস কুমারী, তুমি মম চির পূজারিণী। (পূজারিণী) আবার প্রেমিকাকে বলছেন- তুমি আমায় ভালোবাসো তাইতো আমি কবি, আমার এরূপ- সে যে তোমার ভালোবাসার ছবি। (কবিরানী)
কবির প্রেমিক হৃদয় নানা ঝঞ্ঝাটে প্রবঞ্চিত ও ক্ষত-বিক্ষত হয়েছে। তাই, যে মানসপ্রিয়াকে তিনি দেবীর আসন দিয়েছিলেন শুধু তার প্রতি নয়, তাকে কেন্দ্র করে সমগ্র নারী জাতির প্রতি একসময় তিনি অসহিষ্ণু-বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলেন এবং বলেছেন- এরা দেবী, এরা লোভী, যত পূজা পায় এরা চায় তত আরো। ইহাদের অতি লোভী মন, একজনে তৃপ্ত নয়, এক পেয়ে সুখী নয়, যাবে বহুজন। 
চির বোহ্যামিয়ন এই মানুষটি নানা বিচিত্র অভিজ্ঞতার অধিকারী ছিলেন বলেই তাঁর কাব্যে ঘটেছিল ভালোবাসা, ঘৃণা, শ্রদ্ধা, অবজ্ঞা আর অভিমানের মিশ্র অনুভুতির প্রকাশ। যা দিয়ে তিনি নারী সত্তার সন্ধান করতে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন হৃদয়বাদী কবি। মানুসের উপর ছিল তাঁর অপরিসীম বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস ভঙ্গের বেদনায় তিনি কোন যুক্তির মধ্যে যেতে চাননি। তিনি অকপটে ¯পষ্ট উচ্চারণ করেছেন- আজি হেরি তুমি ছলনাময়ী, তুমি হইতে চাও মিথ্যা দিয়া জয়ী ৃ আবার এও বলেছেন- জানি, তোমার নীরব মনে নিত্য নূতন পাওয়ার পিয়াস/ হটাৎ কেন জাগলো সেদিন, কণ্ঠ ফেটে কাঁদলো তিয়াস... 
তারপরও প্রেয়সীর প্রতি প্রেমিক কবি বিমুখ থাকতে পারেন না। এরপরও তিনি বলেন- ও’গো বন্ধু প্রিয়/ এমনই করিয়া ভুল দিয়া ভুলাইও/ বারেবারে জন্মে জন্মে গ্রহে গ্রহান্তরে। ও আঁখি আলোক যেন ভুল করে পড়ে/ আমার আঁখির পরে। গোধূলি লগনে/ ভুল করে হই বর তুমি হও কনে ক্ষণিকের লাগি ক্ষণিক চমকি/ অশ্রুর শ্রাবণ মেঘে হারাইও সখী। কবি তাঁর মানস প্রিয়াকে হারিয়ে ফেলেছেন। তাই, হারানো স্মৃতিকে পুঁজি করেই তিনি খুঁজে ফিরছেন বারবার- হারিয়ে গেছ অন্ধকারে পাইনি খুঁজে আর/ আজকে তোমার আমার মাঝে সপ্ত পারাপার... (চৈতী হাওয়া)
বিদ্রোহী কবি যেন চির বিরহী হয়ে উঠেছেন, তাঁর বিরহ কাতরে প্রকৃতি হয়েছে একাÍা- উর্ধে শূন্য নিুে শূন্য- শূন্য চারিধার, মধ্যে কাঁদে বারিধার, সীমাহীন রিক্ত হাহাকার। ভালোবাসা হারিয়ে প্রচণ্ড আÍঅভিমানী কবির অন্তর কেঁদে উঠেছিল, তাই তিনি বলছেন- যেদিন আমি হারিয়ে যাবো বুঝবে সেদিন বুঝবে, আস্তপারের সন্ধ্যাতারায় আমার খবর পুজবে- বুঝবে সেদিন বুঝবে। ...আসবে আবার  ‘আশ্বিন’ হাওয়া শিশির ছোঁয়ারাত্রি। (অভিশাপ)
প্রেমিক নজরুলের হৃদয়ের সাথে প্রকৃতির এ সমন্বয়ে তিনি অমর হতে পড়েছেন। কবি তাঁর প্রাণপ্রিয় প্রেমিকাকে প্রকৃতির সাথে তুলনা করেছেন। নারীর জগজ্জননী রূপে তাকে করে তুলেছেন মহীয়সী- শস্য ক্ষেত্র উর্বর হল, পুরুষ চালাল হাল/ নারী সেই মাঠে শস্য রোপিয়া ভরিল সুশ্যামল/ নর বাহে হাল, নারী বাহে জল, সেই জল মাটি মিশে/ ফসল হইয়া ফলিয়া উঠিল সোনালী ধানের শীষ...(নারী)
কবির এই ‘নারী’ জননী রূপেই পৃথিবীকে øেহ ভালোবাসা দিয়ে স্বর্গের মহিমা প্রদান করেন- দিবসে দিয়াছে শক্তি সাহস নিশীথে হয়েছে বধূ, পুরুষ এসেছে মরুতৃষ্ণালয়ে- নারী যোগায়েছে মধু...(নারী)
আবেগ-উচ্ছ্বাস তাড়িত রোমান্টিক কবি স্বভাবের কারণে কাজী নজরুলের প্রেমের কবিতায় নর-নারীর চিরন্তন দেহজ উত্তাপও বেশ পাওয়া যায়- তোমার বাহুতে বুকের শরম ছোঁয়ার কাঁপন লেগে আছে ...আমি চুমোয় চুমোয় ডুবাব এই সকল দেহমন, এদেশ হতে বিদায় যেদিন নেব প্রিয়তম। (পরশ পূজা)
হৃদয়বাদী কবি ছিলেন নজরুল কাব্যে যতটা আবেগ আছে ততটা হয়তো শিল্পিত নয়। নজরুল যদি শুধু প্রেমের কবিতা লিখতেন তাহলে বিদ্রোহবোধক কবিতার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল তা হয়তো পারতেন না! না পাওয়ার বেদনা ও পেয়ে হারানোর রিক্ততায়, তাঁর প্রলম্বিত দীর্ঘশ্বাস সমুদ্রের মত ফুঁসে ওঠে অভিমানে- হে দুরন্ত, আছে তব পার, আছে কূল, এ অনন্ত বিরহে নাহি পার, নাহি কূল- শুধু স্বপ্ন ভুল। মাগিব বিদায় যবে নাহি রবে আর, তব কল্লোলের মাঝে বাজে যেন ক্রন্দন আমার/ বৃথাই খুঁজিয়ে যাবে প্রিয়া, উত্তরিও বন্ধু ওগো সিন্ধু মোর তুমি গরজিয়া! তুমি শূন্য, আমি শূন্য, শূন্য চারিধার, মধ্যে কাঁদে বারিধার, সীমাহীন রিক্ত হাহাকার!
রবীন্দ্র যুগে যে ক’জন কবি স্বকীয় গুণ প্রদর্শন মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে হিরণময় আসন লাভে সমর্থন হয়েছেন এবং থাকবেন যতো দিন বাংলা সাহিত্য টিকবে, কাজী নজরুল ইসলাম তাঁদের অন্যতম একজন। রবি কিরণে উদ্ভাসিত বাংলা কাব্যাঙ্গনে যখন লালিত কোমল রাগিণী বেজে চলছিলো যখন তপোবন সদৃশ শান্ত সমাহিত ভাব বিরাজ করছিলো, তখনই হটাৎ করে শোনা গেল কালবৈশাখীর প্রচণ্ড উম্মাদনা। শোনা গেল বিপ্লবের তূর্য নিনাদ। আবির্ভূত হলেন ঝাঁকড়া চুলের বাবরি ওয়ালা এক মহান পুরুষ। অগ্নিবীণা হাতে সদর্পে বেরিয়ে এলেন এক নতুন কবি! কণ্ঠে তাঁর ভৈরবী গীত, রুদ্র বীণার উদ্দীপ্ত ঝংকার।  বাংলা সাহিত্যে সংযোজিত হলো এক নতুন অধ্যায়ের, এক অদ্বিতীয়া মহাপুরুষের কাব্যগাঁথা;  অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে উজ্জ্বল ও  বৈচির্ত্যপূর্ণ সৃষ্টি সম্ভারে বাংলা সাহিত্যকে ঐশ্বর্যমণ্ডিত করেছেন বিশ্ব সাহিত্যে, আমাদের জাতিয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। যা বাঙালি হিসেবে আমাদের কাছে অত্যান্ত গর্বের! আজ ১১ জ্যৈষ্ঠ, তাঁর ১৫০তম জন্মজয়ন্তী। তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ্য!!

লেখক : প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক
ই-মেইল : shupantho_mallick@yahoo.com

এই বিভাগের আরো সংবাদ