দ্বিতীয় মেয়াদে মোদি এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক

  আবদুল মান্নান

২৬ মে ২০১৯, ০৯:৫০ | আপডেট : ২৬ মে ২০১৯, ০৯:৫৩ | অনলাইন সংস্করণ

সাত কিস্তিতে অনুষ্ঠিত ভারতের ১৭তম  লোকসভা নির্বাচনের ফল গত বৃহস্পতিবার ঘোষিত হয়েছে। দেশটির ক্ষমতাসীন দল ‘হিন্দুত্ববাদী’ বিজেপি প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সাফল্য অর্জন করেছে। এই নির্বাচনে বিজেপি এককভাবে ৫৪৩টি আসনের মধ্যে ৩০২ আসনে জয়ী হয়েছে, আর জোটবদ্ধভাবে পেয়েছে ৩৫৪টি আসন। সরকার গঠন করতে প্রয়োজন ২৭২টি আসন। এই নির্বাচনটি বিধ্বংসী এই কারণে যে নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে একসময় সর্বভারতীয় কংগ্রেস পার্টি ৫৬ আসনে জয়ী হয়ে অনেকটা আঞ্চলিক দলে রূপান্তরিত হয়েছে। আর বামপন্থীদের ভয়াবহ ভরাডুবি হয়েছে। যে কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম পশ্চিম বাংলায় সেই রাজ্যে দলটির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হলো। যেখানে লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসের ৩৪ জন সদস্য ছিল তা এক ধাক্কায় ১২তে নেমে এসেছে। ২০২১ সালে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য বিধানসভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। পরিস্থিতি যদি সদ্য সমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনের মতো হয়, তাহলে বুঝতে হবে সেই নির্বাচনে জয়ী হওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তৃণমূলের জন্য কঠিন হবে। এই রাজ্যে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিজেপি দুটি আসনে জয়ী হয়েছিল। এবার তাদের ঝুলিতে ১৭টি আসন। বর্তমান রাজ্যসভার তৃণমূলের পাঁচজন সদস্য তাঁদের পদে ইস্তফা দিয়ে লোকসভায় লড়েছিলেন। একজন মাত্র বিজয়ী হয়েছেন। ২০১৪ সালের ঠিক উল্টো চিত্র। নিঃসন্দেহে এটি তৃণমূলের জন্য একটি অশনিসংকেত। 

ভারতের লোকসভা নির্বাচন বেশ জটিল এবং একটি বিশাল কর্মযজ্ঞ। ১.৪ বিলিয়ন (১০০ কোটি ৪০ লাখ) জনসংখ্যার দেশে ৯০০ মিলিয়ন (৯০ কোটি)  ভোটার, যার মধ্যে এবার ২.৭ শতাংশ ভোটার প্রথমবার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার যোগ্যতা অর্জন করেছে। বিশাল ভারতবর্ষ একটি রাষ্ট্র বটে, তবে জাতিরাষ্ট্র নয়। কারণ এই একটি রাষ্ট্রের ভেতর ২৯টি রাজ্য আছে, সঙ্গে আছে সাতটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল (ইউনিয়ন টেরিটরি)। দেশটির আছে সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত ২৩টি দাপ্তরিক ভাষা। কেন্দ্র সরকার হিন্দি ও ইংরেজিকে দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও দেশটির মাত্র ৫৩.৬ শতাংশ মানুষ এই ভাষায় কথা বলে, যাদের বেশির ভাগের বাস উত্তর ভারেত। ১৭তম লোকসভা নির্বাচনটি মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। কিছু খুনখারাবি হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। এই নির্বাচনের আগে ভারতের পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া হয়নি। নরেন্দ্র মোদি শুধু প্রধানমন্ত্রী পদেই ছিলেন না, তিনি প্রাপ্য সব প্রটোকল নিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালিয়েছেন। মানুষের একটি ধারণা ছিল পশ্চিমবঙ্গে মোদি কিছু আসন পাবেন, আর তৃণমূলের ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছিল তারা জিতবে, তবে দু-একটি সিট হারাবে। কদিন আগে পেশাগত কাজে দিল্লি ও কলকাতা গেলে সেখানকার সাধারণ মানুষ আমাকে এই ধারণাই  দিয়েছিল। তবে পশ্চিমবঙ্গে এমন অপ্রত্যাশিত ফলাফল কেউ আশা করেনি। তৃণমূলের এই দশার জন্য প্রধানত দায়ী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুর্বল নেতৃত্ব আর বামদের বিজেপিকে নীরবে সমর্থন দেওয়া। অন্যটা  ছিল তৃণমূলের ছদ্মাবরণে বিজেপির পক্ষে অনেক কর্মীর কাজ করা।

ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বাংলাদেশ তার অবস্থানগত কারণে ভারতের জন্য কৌশলগতভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় অথবা পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোর নিরাপত্তা সংরক্ষণে বাংলাদেশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একসময় উত্তর-পূর্ব ভারতে বিভিন্ন বিচ্ছিনতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশকে তাদের অভয়ারণ্য বানিয়েছিল। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে এই বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বাংলাদেশ থেকে উত্খাত করেন। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় ফিরলে তারা আবার বাংলাদেশে ঘাঁটি গাড়ে। ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় ফিরলে তারা বাংলাদেশে নিজেদের কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ নিজের দেশের ওপর দিয়ে ভারতকে ট্রানজিট দেওয়া  ভারতের জন্য এক বিরাট অর্থনৈতিক প্রাপ্তি। বাংলাদেশ যে প্রতিবেশী বন্ধুর জন্য কতটুকু ছাড় দিতে পারে তার একটি বড় উদাহরণ বাংলাদেশের আশুগঞ্জ নদীবন্দর ব্যবহার করে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে বিদ্যুেকন্দ্র  স্থাপনের জন্য বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহার করে বড় বড় যন্ত্রপাতি পরিবহনে সাহায্য করা। এ কাজের জন্য বাংলাদেশের একটি নদীতে অস্থায়ী বাঁধ দিয়ে সড়ক তৈরি করা হয়েছিল, যা নিয়ে সে সময় সরকার বেশ সমালোচিতও হয়েছিল। ভারতের নতুন সরকারের কাছে বাংলাদেশের চাহিদার তালিকা খুব লম্বা নয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তিস্তাসহ দুই দেশের মধ্যে যেসব অভিন্ন নদী আছে ন্যায্যতার ভিত্তিতে তার পানির বণ্টনবিষয়ক দীর্ঘদিনে অমীমাংসিত সমস্যার সমাধান। এ বিষয়ে এর আগে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং আর তারপর নরেন্দ্র মোদি চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একগুঁয়েমির কারণে তা সফল হয়নি। তাঁর এমন আচরণ তাঁর নিজ দেশের দুই প্রধানমন্ত্রীকে বিব্রত করেছে। অথচ কেন্দ্রে যখন দেব গৌড়া প্রধানমন্ত্রী আর পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বামফ্রন্টের জ্যোতি বসু তখন কত সহজে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের সমস্যা গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর হয়ে গিয়েছিল। কেউ জিকির তোলেনি গঙ্গার পানি বাংলাদেশের সঙ্গে ভাগাভাগি করলে রাজ্য পানি পাবে না। দুটি পাশাপাশি দেশের মধ্যে সমস্যা থাকাটা বিচিত্র কিছু নয়, আর তা সহজে মীমাংসা করা যায় উভয় দেশের রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে সদিচ্ছা থাকলে। নরেন্দ্র মোদির প্রথম মেয়াদে উভয় দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত সীমান্ত চিহ্নিতকরণ আর ছিটমহল বিনিময় চুক্তি সহজে সমাধান করা গেছে। তিস্তার পানিবণ্টন সমস্যার সমাধান না হওয়ার পেছনে কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। আসলে মমতা তিস্তার পানিবণ্টনকে কেন্দ্রের সঙ্গে দর-কষাকষি করার জন্য একটি রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছেন। ভারতের আর বাংলাদেশের মধ্যে আমদানি-রপ্তানিতে একটা বিরাট বৈষম্য রয়েছে, যা সব সময় ভারতের পক্ষে। এটি দূর করা কঠিন নয়। ভারতের বাজারে বাংলাদেশের কিছু পণ্যের কার্যকর শুল্কমুক্ত রপ্তানির সুযোগ দিলে উভয় দেশই লাভবান হবে। বাংলাদেশের অনেক ভোগ্যপণ্যের ভারতে ভালো চাহিদা আছে।

‘হিন্দুত্ববাদ’ বিজেপির মূল স্লোগান। এর অর্থ হচ্ছে ভারত হবে একটি হিন্দু রাষ্ট্র। এটি হচ্ছে জিন্নাহর দ্বিজাতিতত্ত্বকে মেনে নেওয়া। জিন্নাহ যখন পাকিস্তান মুসলমানদের জন্য পৃথক রাষ্ট্র হিসেবে সৃষ্টি করেছিলেন তখন ভারতে মুসলমানের সংখ্যা পাকিস্তানের চেয়ে বেশি ছিল। বর্তমানে ভারতের ১০০ কোটি ৪০ লাখের মধ্যে ১৪.২ শতাংশ মানুষ মুসলমান, যা পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। মোদি ও তাঁর দলের নেতারা যখন সাম্প্রদায়িক স্লোগান তুললেন তখন ভারতের মুসলমানরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, বিশেষ করে উত্তর ভারতে। গরুর মাংস খায় এমন অজুহাতে অনেক স্থানে বিজেপির কর্মীদের হাতে মুসলমানরা শুধু লাঞ্ছিতই হননি, একাধিক স্থানে তাদের পিটিয়ে হত্যাও করা হয়েছে। একই ভাগ্য ঘটেছে ভারতের দলিত সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রে। তারা উচ্চবর্ণের  হিন্দুদের হাতে নিয়মিত লাঞ্ছিত হচ্ছেন। এর সঙ্গে সম্প্রতি যোগ হয়েছে ভারতে অবস্থানরত তথাকথিত ‘বাংলাদেশিদের’ বিতাড়িত করার তোড়জোড়। ভারতে কোনো বাংলাদেশি স্থায়ীভাবে বসবাস করছে, তা একটি কল্পনাপ্রসূত চিন্তাধারা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভারতের সমকক্ষ না হলেও ভারতের চেয়ে তেমন খারাপ নয় যে এখান থেকে শরণার্থী হয়ে ভারতে কেউ বসবাস করতে চলে যাবে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত আমাদের এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল। যুদ্ধ শেষে তারা সবাই ফিরে এসেছে। কয়েক পুরুষ ধরে আসামে বসবাসরত বাংলাভাষী মুসলমানদের বিতরণ করার একটা প্রস্তুতি চলছে। এটি সম্পূর্ণভাবে একটি অবাস্তব চিন্তা। দেশভাগের সময় আসাম পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হওয়ার কথা ছিল। কারণ তখন আসাম একটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা ছিল কিন্তু তা হয়নি। তখন ওই অঞ্চলে এর প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হলে সেখানে গণভোট হয়। রায় আসে পাকিস্তানের পক্ষে। কিন্তু তা না করে আসামকে ভাগ করে করিমগঞ্জ-কাছাড় অঞ্চল ভারতকে দিয়ে দেওয়া হয় আর সিলেট পায় পাকিস্তান। এর পেছনে যুক্তি ছিল আসাম পুরোটা পাকিস্তানকে দিয়ে দিলে ভারতের ভাগে পরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকাগুলো ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এখনো সিলেট বা আসামের অনেক পরিবার আছে, যারা দেশভাগের সময় পৃথক হয়ে গিয়েছিল। হিন্দুত্ববাদী স্লোগানের কারণে ভারতের মুসলমান আর তার সঙ্গে দলিতরা এই নির্বাচনে পরে কিছুটা হলেও আতঙ্কে আছে। এই আতঙ্ক দূর করার দায়িত্ব মোদি সরকারের। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে একজন সাংবাদিক মোদিকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে উত্তরে তিনি বলেছিলেন, নির্বাচনের সময় অনেক কথা বলা হয় কিন্তু ভারতে কিভাবে শাসিত হবে তা ভারতের নেতারা দেশভাগের পরেই স্পষ্ট করে বলে গিয়েছেন। সংবিধানে যার মূল চেতনা হচ্ছে ভারত হবে একটি ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র, যেখানে জাত বা ধর্মকে ভিত্তি করে কোনো বিভাজন থাকবে না। ভারতের সব নাগরিকের সুযোগ সর্বক্ষেত্রে সমান থাকবে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় যখন এটা পরিষ্কার হয়ে গেল মোদিই দ্বিতীয়বার সরকার গঠন করছেন, তখন তিনি দলীয় কর্মীদের এক বিশাল সমাবেশ ঘোষণা করেন, তিনি দেশের সব মানুষকে নিয়ে সামনে চলতে চান। এ কাজটি করার জন্য তাঁর দলের পাণ্ডাদের লাগাম টেনে ধরতে হবে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও দলিত সম্প্রদায়ের মধ্যে যে আতঙ্ক বিরাজ করছে তা দূর করেত হবে। মনে রাখতে হবে, ভারত আগামী কয়েক বছরের মধ্যে একটি অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। দেশের মানুষের একটি বিরাট অংশ যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে, তাহলে সেটি অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়বে। একটি বিভাজিত দেশ খুব বেশি দূর যেতে পারে না। মোদিকে মনে রাখতে হবে এই নির্বাচন তাঁর জন্য শেষ নির্বাচন নয়। তিনি চাইলে বহুদূর যেতে পারেন, হতে পারেন একজন সফল রাষ্ট্রনায়ক। তাঁর এটিও মনে রাখা উচিত, তাঁর দেশের মানুষ যত না বিজেপিকে ভোট দিয়েছে তার চেয়ে বেশি ভোট পড়েছে তাঁর কারণে। বিজেপির চেয়ে মোদি ভারতের মানুষের কাছে অনেক জনপ্রিয়, অনেকটা বাংলাদেশের শেখ হাসিনার মতো। আগামী ৩০ তারিখ মোদি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেবেন। তাঁর এই দ্বিতীয় মেয়াদ আগের মেয়াদের চেয়ে আরো বেশি সফল হোক, দেশের মধ্যে বিরাজমান অসংখ্য সমস্যা দূর হোক, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে জনগণ নিরাপদে থাকুক—সে প্রত্যাশাই রইল।

লেখক : বিশ্লেষক ও গবেষক

এই বিভাগের আরো সংবাদ