ফিফা আন্তর্জাতিক প্রীতি ফুটবল ম্যাচে ভুটানকে ৪-১ গোলে হারিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় দল

ভারতের রাজনীতি কোন পথে?

  আহমদ রফিক

৩০ মে ২০১৯, ১২:২৪ | অনলাইন সংস্করণ

সম্প্রতি ভারতীয় নির্বাচন শেষে হিন্দুত্ববাদী-সম্প্রদায়বাদী বিজেপির অধিক শক্তি নিয়ে বিজয় মিশ্র প্রতিক্রিয়ার প্রকাশ ঘটিয়েছে। মিশ্র প্রতিক্রিয়া বলতে নির্বাচনী ফল নিয়ে কারো বিস্ময়, কারো দুশ্চিন্তা, কারো পক্ষে বাস্তব সত্যকে গ্রহণ ও তা জায়েজ করার চেষ্টা। বাংলাদেশের পত্রিকাগুলো সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছে ভারতীয় লোকসভার নির্বাচন—এর জয়-পরাজয়ের বিষয়টিকে।

প্রতিটি দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় মোটা হরফে মোদির বিজয়বার্তা পরিবেশিত। যেমন—‘মোদিতেই আস্থা ভারতের’, ‘গদি মোদিরই’, ‘মোদিতেই মাতোয়ারা ভারত’, ‘মানচিত্রজুড়ে গেরুয়া রঙ’। লক্ষ করার বিষয় যে বাংলাদেশের সংবাদ মহলের এ বিজয়ের তিক্ততার কোনো প্রকাশ ঘটেনি একটি উগ্র সম্প্রদায়বাদী রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া বিজয় সত্ত্বেও। বরং আছে পূর্বাবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষার প্রত্যাশা এবং তা একটু বেশি আস্থার সঙ্গেই।

আর সে ধারায়ই রচনার শিরোনাম ‘বিজেপির আবার নির্বাচন বিজয় এবং আমাদের প্রত্যাশা।’ সে প্রত্যাশা বাজপেয়িদের মতো অধিকতর উদারতার। একটি স্ববিরোধিতা প্রায়শ বিশ্বরাজনীতিতেও স্বীকৃত যে নির্বাচনী প্রচারে উগ্রতার লক্ষ্য থাকে বিজয় অর্জনের জন্য প্রতিপক্ষকে ধরাশায়ী করার কৌশল হিসেবে। কৌশল আর শাসনব্যবস্থার বাস্তবতা এক বিষয় নয়। তাই দেখা যায় নির্বানোত্তর দেশ শাসনে উগ্রতা থেকে পিছু হটা এবং বাস্তব উদারতাকে গ্রহণ করার উদাহরণ।

এমনটাই প্রবীণ সাংবাদিকের প্রত্যাশা রাজনৈতিক ইতিহাসের ঐতিহ্য বিচারে। অবশ্য এ পার্শ্বপরিবর্তন সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে দেখা যায় না, তবু আশা দুর্মর। তাই আরেকটি অনুরূপ ধারার শিরোনাম—‘ভারতে গেরুয়া ঝড় : প্রতিবেশী দেশ ও মানুষের চাওয়া।’ এতে সতর্কবাণী আছে, ‘পাশাপাশি প্রত্যাশাও আছে যে মোদি এত বড় বিজয়ের পর পাঁচ বছর শাসনে বিচক্ষণতার পরিচয় দেবেন, উগ্র হিন্দুত্ববাদের ফাঁদে পা দেবেন না।’ সবই স্বাপ্নিক প্রত্যাশা।

অন্য একটি শিরোনাম—‘মোদি কোন ক্রান্তিকালের দূত।’ এখানেও স্বাধীন ভারতীয় রাজনীতির ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় সহিষ্ণুতা-ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতি আস্থা ও হিন্দু ধর্মের বহুমাত্রিকতার উল্লেখ রয়েছে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন ধরে রাখতে ধর্মীয় উগ্রতা যে পরিপন্থী সে বিবেচনাও রয়েছে। এমন যুক্তিও কারো কারো যে নির্বাচন শেষে প্রধানমন্ত্রী তো শুধু দলীয় সমর্থকদের নন, তিনি দেশের সবারই প্রধানমন্ত্রী সাংবিধানিক সূত্রে, ধর্ম-সম্প্রদায়-নির্বিশেষে। কিন্তু সবাই কি হিতোপদেশ মানেন? মেনে ছিলেন কি হিটলার, মুসোলিনি? মানছেন কি নাৎসিবাদী ট্রাম্প? তাঁর চোখে তো উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ পরম আকাঙ্ক্ষার ধন।

আমাদের সংবাদপত্রের পাতায় মূলত যে মতামত ‘মোদি ঝড়ের বিজয়কে কেন্দ্র করে প্রতিফলিত তার প্রায় সবটাই ইতিবাচক। তাতে এমন ধারণারই প্রকাশ যে মোদি ২০১৪ সালে ক্ষমতায় এসে ভারত-বাংলাদেশ নিয়ে যে ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন বাণিজ্য, বিনিয়োগ, ছিটমহল, সীমান্ত, ট্রানজিট ইত্যাদি বিষয়ে, সে ধারাটিই এবার আরো শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনাই প্রত্যাশা করা যায়।

দুই.

গোটা বিষয়টিই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির। সে দৃষ্টিভঙ্গি নিজ নিজ রাজনৈতিক চেতনাপ্রসূত, সেখানে বাস্তবতা কতটা অবাঞ্ছিত মাত্রায় প্রতিফলিত তার চুলচেরা হিসাব প্রায়ই মেলে না। আমরা স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি। প্রত্যাশার রঙে তাকে রাঙিয়ে তুলে। বাস্তবতা তখন প্রায়ই পিছু হটে। কংগ্রেস প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং যখন প্রবল প্রত্যাশা জাগিয়ে তুলেছিলেন তিস্তা চুক্তি নিয়ে, বারবার আশ্বস্ত করছিলেন বাংলাদেশকে এই বলে যে সামান্য বাধা, এটা কিছুটা সময়ের ব্যাপার। সে সময় মোদির বাংলাদেশ সফর সত্ত্বেও তাঁর পাঁচ বছর শাসনকালে আসেননি।

তবু বাংলাদেশের এবারও প্রত্যাশা তিস্তা চুক্তি বাস্তবায়ন নিয়ে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্বাচনী বিপর্যয়ের পরিপ্রেক্ষিতে। মোদি গতবার বিজয় শেষে যে শুভবার্তাগুলো তাঁর বক্তৃতায় প্রকাশ করেছিলেন, সেগুলো কি তাঁর স্বদেশে বাস্তবায়িত হয়েছিল? নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রধান অংশের সুফল কি বেকার যুবক, নিরন্ন কৃষক পেয়েছিল? যদি পাবেই তাহলে তাদের প্রতিবাদ করতে হবে কেন, কারো কারো আত্মহত্যার মতো ভয়ংকর অবাঞ্ছিত পথ ধরতে হবে কেন?

হিন্দুত্ববাদিতা সমাজে এত প্রকট আকার ধারণ করবে কেন, যে গো-মাংস রাখা বা ভক্ষণের প্রচারণার সত্যাসত্য যাচাই না করে নিরীহ একজন ভারতীয় নাগরিককে পিটিয়ে মারা হলো, তার কোনো বিচার হয়েছিল কি? এসব ঘটনার ক্ষেত্রে মহান সর্বোচ্চ আদালত স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে আসেননি কেন, যা তাঁদের নৈয়ায়িক অধিকারের মধ্যে পড়ে? অসহায় কিশোরী ফেলানি হত্যার বিচার এখনো ঝুলে আছে কেন?

ব্যক্তিজীবনে অর্থনৈতিক দিক থেকে সৎ হওয়া সত্ত্বেও মোদি আমলে দুর্নীতির প্রকাশ ঘটবে কেন? বিমান কেনা তো একটি মাত্র উদাহরণ। বৃহৎ ব্যবসায়ী মহলে দুর্নীতির প্রকাশ কি কম? মোদির শাসন কি ধনিক শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতা করেনি বিগত পাঁচ বছরে? ধনীকে অতি ধনী হতে সাহায্য করেনি? ভার্টিক্যাল অর্থনৈতিক উন্নয়নকে শিরোধার্য করে তোলেনি?

ঐতিহ্যবাহী একটি দেশকে নিছক ক্ষমতা দখলের জন্য হিন্দুত্ববাদী স্লোগানে বিভাজিত করে তোলেনি বিজেপি ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো। মুসলমান ও খ্রিস্টানদের সামাজিক অবস্থান ধর্মীয় দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলেনি? কতটা নিরাপত্তায় আছে ভারতের অহিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়? মোদি কি তার খবর রাখেন বা প্রয়োজনে প্রতিকারের হাত প্রসারিত করে থাকেন? কোনো ঘটনা তো তেমন সাক্ষ্য দেয় না? তিনি তো তাহলে ভারতীয় হিন্দু সম্প্রদায়েরই প্রধানমন্ত্রী, অন্য ভারতীয়ের নন। এ এক অদ্ভুত স্ববিরোধিতা।

বিগত মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ঢাকায় এসে তাঁর মধুর ভাষণে আমাদের মোহিত করে গিয়েছিলেন। সেটা ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর মর্যাদা রক্ষার রাজনৈতিক কৌশল। বাংলাদেশের প্রাণ নদীর জলধারা ন্যায্য হিসসার একটা ফয়সালা আজ পর্যন্ত হয়নি। তিস্তা তো মরণের দশায়। যে শক্তিশালী দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কথা দুই পক্ষ থেকেই বলা হয়ে থাকে ভারত-বাংলাদেশকে নিয়ে তার সর্বোচ্চ সুফলভোগী তো ভারত। যেমন বিনিয়োগে, তেমনি বাণিজ্যে, তেমনি ট্রানজিট সুবিধায়। বাংলাদেশ যা পেয়েছে তা দেওয়ার তুলনায় কতটুকু তা পাল্লায় তুলে হিসাব করলে খুশি হওয়ার কারণ ঘটবে বলে মনে হয় না। তবু বৃহৎ প্রতিবেশী বলে কথা। তার আশ্বাসের ওপর আস্থা রাখতেই হয়। আমরাও রাখছি। অপেক্ষায় আছি আগামী পাঁচ বছরে তিস্তা চুক্তিসহ অন্যান্য কি প্রাপ্তি বাংলাদেশের ভাগ্যে জোটে? আরেকটি কথা, ক্ষমতার আসনে বসে মোদি যদি উগ্র হিন্দুত্ববাদের গৈরিক ঝাণ্ডাকেই আঁকড়ে ধরেন, তাহলে বাংলাদেশের শাসন-প্রশাসন যা-ই বলুক—তা বাংলাদেশের জনগণের মনে ক্ষোভ-অসন্তোষই সৃষ্টি করবে। এ সত্যটি আমার ধারণা, মোদি জানেন।

তিন.

বিজেপির এ অভাবিত বিজয়কে কেউ কেউ বলেছেন মোদির ব্যক্তিগত বিজয়। আমার বিশ্বাস, এটা তাঁর হিন্দুত্ববাদী প্রচারণারই বিজয়। সেই সঙ্গে পাকিস্তানবিরোধী যুদ্ধংদেহি ঘোষণারও সুফল। যে হিংসা ও হিংস্রতার মধ্য দিয়ে ভারত-পাকিস্তানের জন্ম—সেই শত্রুতার আবহ দুই রাষ্ট্রের শাসকদের অনেকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেছেন। মোদিও এবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক যুদ্ধের প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কারণ ভারত-পাকিস্তানি জনতার পরস্পর বিরোধিতা এক ঐতিহাসিক সত্য, নেতারা তা ভালোই জানেন।

নির্বাচনের ঠিক আগে কয়েকটি ভারতীয় বিশ্লেষণে এমন সম্ভাবনার কথা পড়েছিলাম যে এবারকার লোকসভার নির্বাচনে দুই পক্ষে জবর লড়াই হবে। ছত্তিশগড়সহ একাধিক নির্বাচন-উপনির্বাচনে বিজেপির হার ওই সব সম্ভাবনা ইঙ্গিত টেনেছিল। এরই মধ্যে কী এমন ঘটল যে মোদি তাঁর পক্ষে ঝড় তৈরি করতে সক্ষম হলেন। যে প্রিয়াঙ্কাকে নিয়ে কংগ্রেস মহলে, সাংবাদিক ভুবনে এত প্রত্যাশা, তা-ও ব্যর্থ হয়ে গেল।

এমনকি গান্ধী পরিবারের দুর্গ হিসেবে বিবেচিত উত্তর প্রদেশের আমেথি আসনে কংগ্রেস সভাপতি রাহুলের নির্বাচনী পরাজয় সবার জন্যই বিস্ময়। পূর্বোক্ত জয়ী এলাকাগুলোতেও লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ও বিরোধী জোটের বিস্ময়কর পরাজয়। আবারও প্রশ্ন—কেন? অনেক কংগ্রেসির দৃঢ় বিশ্বাস ছিল ‘প্রিয়াঙ্কা ফ্যাক্টর’ তাদের বৈতরণি পার করিয়ে দেবে। কিন্তু সেখানেও ব্যর্থতা।

স্বভাবতই প্রশ্ন, কী জাদু ছিল মোদির আহ্বানে? সাধারণত যে কারণগুলো এ ব্যাপারে আলোচিত, তা হলো মোদিবিরোধীদের মধ্যে আঞ্চলিক দৃঢ় ঐক্যের অভাব, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, রাহুলের ম্লান ব্যক্তিত্ব, যা মোদির বিপক্ষে যথেষ্ট ক্যারিসমেটিক নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচারে ব্যর্থতা, সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির অভাব, পরিবারতন্ত্র ইত্যাদি। আসলে মোদির বিরুদ্ধে কংগ্রেস সংঘবদ্ধ কার্যকর লড়াই জমিয়ে তুলতে পারেনি। মোদির বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ বিকল্প নেতৃত্ব দাঁড় করাতে পারেনি কংগ্রেস।

সেই সঙ্গে আমার বিশ্বাস, মোদির হিন্দুত্ববাদের জোরালো আহ্বান, হিন্দু ভারতের ডাক ভোটারদের আকর্ষণ করেছে, মন জয় করেছে। আর তাতে জ্বালানি যোগ করেছে রাহুল-প্রিয়াঙ্কার প্রতীকী হিন্দুত্ববাদী আচরণের বিভ্রান্তিকর অর্বাচীনতা। তাঁদের উচিত ছিল সেক্যুলার মতাদর্শের সঠিক পন্থা নিজস্ব ধারায়ই বলিষ্ঠ প্রকাশ ঘটানো, জলো-ফিকে হিন্দুত্ববাদ নয়। একজন ভোটারের মনে হতে পারে হিন্দুত্ববাদেই যদি ভোট দিতে হয়, তাহলে তার কড়া রংই বেছে নেওয়া উচিত, ফিকে বা জলো কিছু নয়। রাহুল-প্রিয়াঙ্কার উচিত ছিল নিজেদের রাজনৈতিক মতাদর্শকে যুক্তিতথ্যে সমৃদ্ধ করে ভোটারদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তুলে ধরা। তাতে কিছু সুফল ফলতেও পারত। কৌশল নির্ধারণে তাঁরা ভুল করেছেন বলে আমার বিশ্বাস। যে ভুলের মাসুল গুনতে হয়েছে তাঁদের। সেই সঙ্গে রয়েছে আরো একাধিক কারণ। তাঁদের উচিত, নীতি ও কৌশলের সঠিক পোস্টমর্টেম। শেষ কথা হলো, কংগ্রেসের এখন চাই একজন ক্যারিসমেটিক নেতা, যিনি মোদির সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার যোগ্যতা রাখেন। অন্যথায় বুড়োবট কংগ্রেস আর দাঁড়াতে পারবে না। পরবর্তী পাঁচ বছরও গঙ্গার গৈরিক জলে ভেসে যেতে পারে।

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

এই বিভাগের আরো সংবাদ