কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে

  ড. আতিউর রহমান

০৩ জুন ২০১৯, ১০:২৮ | অনলাইন সংস্করণ

কয়েক সপ্তাহ ধরে কৃষকের উৎপাদিত ধানের মূল্য নিয়ে গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ খুবই সক্রিয়। কৃষক এক টন ধান উৎপাদন করতে যে পরিমাণ অর্থ খরচ করেছে (প্রায় ২৪ হাজার টাকা), এই মুহূর্তে খোলাবাজারে তার চেয়ে অনেক কম দামে (প্রায় ১৫ হাজার টাকা) বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। ধান উৎপাদনের জন্য নেওয়া ধার শোধ করার জন্যই তাদের মূলত নতুন ধান বিক্রি করতে হচ্ছে। মিল মালিকরাই খোলাবাজার থেকে ধান কিনছে কম দামে। টনপ্রতি ৯ হাজার টাকা ‘লোকসান’ হচ্ছে কৃষকের। সরকার যদি সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কেজিপ্রতি ২৬ টাকা দামে ধান কেনে, তাহলে কৃষক এক টন ধানের দাম পাবে ২৬ হাজার টাকা। এতে তার লাভ হবে দুই হাজার টাকা। কিন্তু কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাস্তবে তা হচ্ছে না। বোরো ফসলের বাম্পার ফলন হয়েছে। আমন ও আউশেও ভালো উৎপাদন হয়েছে। তাই সরবরাহ বেড়েছে। এর ওপর অবাধে চাল আমদানির সুযোগ থাকায় বিপুল পরিমাণ চাল ঢুকেছে বাংলাদেশে। আমদানি শুল্ক বাড়ানোর আগেই এই আমদানি হয়েছে। ২০১৭ সালের আমদানি করা ৪০ লাখ টন চাল এখনো গুদামে রয়ে গেছে। গুদামে চাল রাখার জায়গাও নেই বললেই চলে। এই পরিস্থিতিতে সরকার ধান-চাল সংগ্রহের যে নীতিমালা ঘোষণা করেছে, তা কৃষকের কাছ থেকে মাত্র দেড় লাখ টন ধান সংগ্রহ করা হবে। ২৫ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট সময়ের মধ্যে এই সংগ্রহের কর্মসূচি চালু থাকবে। অন্যদিকে মিল মালিকরা এই নীতির ফলে দুই দিক থেকেই বেশি লাভবান হচ্ছে। কম দামে কৃষকদের কাছ থেকে ধান কিনে লাভবান তো হচ্ছেই, অন্যদিকে বেশি দামে সরকারকে সরবরাহ করেও লাভবান হচ্ছে। সরকার তাদের কাছ থেকে সাড়ে এগারো লাখ টন চাল (যা প্রায় ২০ লাখ টন ধানের সমান) সংগ্রহ করার পরিকল্পনা করেছে। ফলে কৃষকদের উৎপাদিত চালের মূল্য সমর্থনের যে মূল লক্ষ্য নিয়ে এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছে, তা অর্জন করা যাচ্ছে না।

কৃষকের এই দুরবস্থার জন্য শুধু যে ধান সংগ্রহ নীতিমালাই দায়ী, তা কিন্তু নয়। তার উৎপাদন খরচও বেড়ে গেছে বহুগুণ। বীজ, সার, কীটনাশক, সেচসহ উপকরণগুলোতে ভর্তুকি দেওয়া সত্ত্বেও কৃষক কিছুতেই তার উৎপাদন খরচ কমাতে পারছে না। তার বড় কারণ কৃষি শ্রমিকের দাম বেড়ে গেছে ব্যাপক হারে। গ্রামে এখন কৃষি শ্রমিক পাওয়াই ভার। কৃষিবহির্ভূত নানা কাজে তারা ব্যস্ত। শহরে এসে শিল্পাঞ্চল ও অনানুষ্ঠানিক নানা কাজে তারা লিপ্ত। তাই কৃষিতে দ্রুত যান্ত্রিকীকরণের উদ্যোগ নিয়েও কৃষক তার উৎপাদনপ্রক্রিয়া চালু রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। তবে কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ রোধ করার কোনো প্রয়োজন নেই। শুধু চাই নীতিনৈতিকতা বজায় রেখেই সে রূপান্তর ঘটুক। আজকাল কলের লাঙলেই চাষ হচ্ছে। বীজ বপনেও যন্ত্র ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু ধান কাটার লাগসই যন্ত্র ঠিকঠাক পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার প্রচুর ভর্তুকি দিয়েও ফসল কাটার যন্ত্রের ব্যবহার বাড়াতে পারছে না। বিদেশি যন্ত্রগুলো বেশ বড়। আমাদের জন্য লাগসই করতে সময় লাগছে। আমাদের গবেষক ও কারিগররা নিশ্চয়ই কলের লাঙলের মতো স্বল্পকায় জমিতে ব্যবহার উপযোগী কর্তন যন্ত্র দ্রুতই চালু করে ফেলবেন। তবে এই মুহূর্তে ধান কাটার মৌসুমে চড়া দামে কৃষি মজুর নিয়োগ করতেই হচ্ছে কৃষকের। সে জন্য তার লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হচ্ছে। তবে উপর্যুপরি ধানের দাম কম থাকায় কৃষিতে দ্রুত রূপান্তর ঘটে চলেছে। উত্তরাঞ্চলে ধানের বদলে ভুট্টা, লিচু, আম, সবজি, ফল চাষে কৃষক আকর্ষিত হচ্ছে। ধানের জমিতে পুকুর কেটে মাছের চাষেও কৃষক ঝুঁকছে। এ প্রবণতা নিশ্চয়ই ইতিবাচক। এটা অধুনিকায়নের লক্ষণ। তবে এসব ফসল পচনশীল। উপযুক্ত সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের অভাবে কৃষির এই স্বাভাবিক রূপান্তরও ব্যাহত হচ্ছে, ঝুঁকিও বাড়ছে। হয়তো ধীরে ধীরে কৃষির এই রূপান্তর ঘটবেই। এতে দোষের কিছু নেই। কিন্তু মধ্যবর্তী এই সময়ে প্রান্তিক ও মাঝারি চাষিদের বড়ই দুর্দিন যাচ্ছে।

বর্তমান সরকার বরাবরই কৃষকবান্ধব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষকদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি সম্পূর্ণ সুস্থ থাকলে তিনি মাঠে গিয়ে ধান কাটতে নেমে পড়তেন বলেও জানিয়েছেন। তাঁর কৃষকপ্রীতির কথা আমাদের অজানা নয়। তাঁকে খুব কাছে থেকে দেখেছি। কৃষকের জন্য ভর্তুকি, তাদের জন্য সুদে ভর্তুকি, বর্গাচাষিদের জন্য ঋণসহ কৃষিঋণের সরবরাহ বাড়ানো, কৃষকদের ১০ টাকায় হিসাব খুলে দেওয়ার মতো বিষয়গুলোতে তাঁর কতই না আগ্রহ। ভুলে গেলে চলবে না, তিনি বঙ্গবন্ধুকন্যা। তিনি নিশ্চয়ই মনে রেখেছেন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাদের চাষিরা হলো সবচেয়ে দুঃখী ও নির্যাতিত শ্রেণি এবং তাদের অবস্থার উন্নতির জন্য আমাদের উদ্যোগের বিরাট অংশ অবশ্যই তাদের পেছনে নিয়োজিত করতে হবে।’ উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণাতেই ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল গঠিত হয়েছিল। কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে সমন্বয়ধর্মী এই প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব বহু আগেই অনুভব করেছিলেন। কৃষি গবেষণা ও উন্নয়নের এই ধারাবাহিকতা বঙ্গবন্ধুকন্যাও ধরে রেখেছেন। কৃষিবিজ্ঞানীদের নানা প্রণোদনা দিয়ে তিনি একদিকে যেমন জলবায়ু সহিষ্ণু নানা ফসলের বীজ উদ্ভাবনে কৃষিবিজ্ঞানীদের উৎসাহিত করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে বিরি, বারি, নাটা, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নানা মাত্রিক বাজেটারি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন প্রাসঙ্গিক গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য। তিনিও রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্বাস করেন, ‘আজ শুধু একলা চাষীর চাষ করিবার দিন নাই, আজ তাহার সঙ্গে বিদ্বানকে, বৈজ্ঞানিককে যোগ দিতে হইবে।’ (রবীন্দ্রনাথ, ‘ভূমিলক্ষ্মী’, রর, চতুর্দশ খণ্ড, পৃ. ৩৬০) তিনিও বঙ্গবন্ধু ও রবীন্দ্রনাথের মতো বিশ্বাস করেন যে কৃষক বাঁচলেই দেশ বাঁচবে। দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল কৃষির তথা সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য কিছু নীতি প্রস্তাব করছি।

১. ভূমিহীন-হতদরিদ্র কৃষকদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা দরকার : শোনা যাচ্ছে সরকার বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার পরিধি বাড়াবে। প্রস্তাব করছি হতদরিদ্র ও ভূমিহীন যেসব কৃষক ধান চাষ করেছে এবং ধানের কম মূল্য পেয়ে প্রায় সর্বস্বান্ত হয়ে গেছে, তাদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে আনা হোক। তাদের খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না। তবু স্থানীয় শিক্ষক, সামাজিক সংগঠক ও প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে তাদের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় আনা হোক। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি উদ্ভাবন ও বাস্তবায়নে আমাদের প্রচুর অভিজ্ঞতা রয়েছে। সে অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আমরা তাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে পারি।

২. ১০ টাকা সের চাল বিক্রি কার্যক্রম সচল করা : এ কর্মসূচিটি শুরুতে ভালোভাবে বাস্তবায়ন করা না গেলেও ধীরে ধীরে অনেকটাই মসৃণ হয়ে এসেছিল। হতদরিদ্র নগরবাসী, নদীভাঙা, উপকূলীয়, চরাঞ্চল, গার্মেন্টপল্লীতে এই কর্মসূচি জোরদার করলে একদিকে গুদাম খালি হবে ও তাতে নতুন চাল মজুদ করা সহজতর হবে এবং অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা আরো মজবুত হবে। 

৩. ধান সংগ্রহের পরিমাণ বৃদ্ধি : পশ্চিমবঙ্গ কৃষকদের কাছ থেকে পাঁচ-ছয় লাখ টন ধান সংগ্রহ করে। বাংলাদেশে করা হবে মাত্র দেড় লাখ টন। মিলারদের লাভবান করার এই পথ থেকে সরে এসে সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনার উদ্যোগ নিতে হবে। প্রয়োজনে মিলগেটেই সরকার নির্ধারিত ধান কিনে মিলে সরবরাহ করা হোক শুধু মাড়াই করার জন্য। তবে পুরোটা কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়তো সম্ভব হবে না। মিল মালিকদেরও সংগ্রহের সুযোগ দিতে হবে। কিন্তু তা হতে হবে উপযুক্ত মূল্যে।

৪. আমদানি নিয়ন্ত্রণ : সম্প্রতি দি এশিয়া ফাউন্ডেশন ও বিআরআইইএফের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে যে ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ২০ মাসে ভারত থেকে প্রায় ১৪ লাখ মেট্রিক টন চাল আমদানি করা হয়েছে বাংলাদেশে। স্বয়ং কৃষিমন্ত্রীও স্বীকার করেছেন যে চাল আমদানির এ হার অস্বাভাবিক। আমদানি শুল্ক সঠিক সময়ে না বাড়ানো এবং দেশের ভেতর কৃষি উৎপাদন পর্যবেক্ষণকারী কর্তৃপক্ষগুলোর সঙ্গে আমদানি নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের যথাযথ সামঞ্জস্য না থাকাই এর জন্য প্রধানত দায়ী। কাজেই আমদানির ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে হবে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। সম্প্রতি সরকার চাল আমদানির ওপর শুল্ক দ্বিগুণেরও বেশি করেছে। এর সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানির জন্য এলসি মার্জিন বাড়ালে আরো ভালো হতো। আর অনানুষ্ঠানিক আমদানি যাতে না বাড়ে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

৫. কৃষির যান্ত্রিকীকরণ : আধুনিক কৃষির প্রয়োজনীয় প্রায় সব যন্ত্রই দেশের ছোট কৃষক ও বর্গাচাষিদের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। ফলে অর্থবানদের কাছে জিম্মি হতে হয় এসব কৃষককে। ফলে সেচ পাম্প ছাড়াও থ্রেসার, কম্বাইন্ড হারভেস্টারের মতো আধুনিক কৃষি যন্ত্রগুলো যেন বর্গাচাষিসহ প্রকৃত কৃষকরা কিনতে পারে সে জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা ও উদ্যোগ প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাত, বেসরকারি খাত ও সরকারি খাতের মাঝে অংশীদারি গড়ে উঠলে ভালোই হয়।

৬. সহজ শর্তে স্বল্পমেয়াদি ঋণ : বেশির ভাগ সময়ই ক্ষুদ্র কৃষক ও বর্গাচাষিরা ঋণ নেয় অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে এবং এ ঋণের সুদের হারও হয় বেশি। ফলে কৃষক ফসল কাটার পরপরই যত দ্রুত সম্ভব ফসল বিক্রি করে ঋণ শোধ করার তাড়না অনুভব করে। এর সুযোগ নেয় স্থানীয় মধ্যস্বত্বভোগীরা। এর কারণে অনেক সময় ন্যায্য মূল্যে ধান কিনে নেওয়ার সরকারি উদ্যোগও প্রকৃত কৃষকদের কোনো সুফল দিতে পারে না। এ ক্ষেত্রে কৃষকদের জন্য বিশেষত প্রান্তিক কৃষক ও বর্গাচাষিদের জন্য সহজ শর্তে স্বল্পমেয়াদি (তিন থেকে ছয় মাস) ঋণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এ জন্য সুদ ভর্তুকিমূলক বিশেষ প্রকল্প হাতে নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রেও ব্যাংক ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাঝে অংশীদারি গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে এ জন্য সবার আগে কৃষকদের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে।

৭. কৃষকের জন্য সহায়ক মূল্য ও সরাসরি আর্থিক সহায়তা : আমাদের দেশে এক কেজি ধানের সংগ্রহমূল্য ঠিক করা হয়েছে ২৬ টাকা। পাশের দেশ ভারতের তুলনায় এই দর অনেকটাই কম। কৃষকরা যেন ধান উৎপাদন করে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তা নিশ্চিত করতে গেল বছরের জুলাই মাসে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার ধানের সহায়ক মূল্য কুইন্টালপ্রতি ২০০ রুপি বাড়িয়েছে। এ সহায়ক মূল্যে (১৭৫০ রুপি কুইন্টাল হিসাবে) কৃষকের কাছ থেকে ধান কিনছে সরকার। এ জন্য ভারত সরকারের অনুন্নয়ন বাজেট বাড়াতে হচ্ছে ১৫ হাজার কোটি রুপি। এর পরও উৎপাদনকারী ও ভোক্তা উভয়ের স্বার্থ সংরক্ষণের মাধ্যমে বৃহত্তর অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় তারা এ বিনিয়োগ করছে এবং এরই মধ্যে সুফল পেতে শুরু করেছে। তা ছাড়া ভারতে কৃষিপণ্যের দাম নির্ধারণ ও মনিটরিংয়ের জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে।

সরাসরি ধান কেনার দক্ষিণ কোরিয়া মডেলও পরীক্ষা করে আমরা দেখতে পারি। দক্ষিণ কোরিয়া সরকার ফুড গ্রেইন স্টেকহোল্ডিং প্রগ্রামের (পিএফএসপি) আওতায় দেশে মোট উৎপাদিত ধানের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনে নেয়। এ ছাড়া ওই দেশের সরকার রাইস ইনকাম কম্পেনসেশন অ্যাক্টের আওতায় যে পরিমাণ জমিতে ধান চাষ করা হয়, তার অনুপাতে কৃষককে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে (এরিয়া পেমেন্ট) এবং বাজারে যে দামে কৃষককে ধান বিক্রি করতে হয় তার সঙ্গে প্রত্যাশিত বিক্রয়মূল্যের যে পার্থক্য সে অর্থটুকুও কৃষককে দিচ্ছে ওই দেশের সরকার (ডেফিসিয়েন্সি পেমেন্ট)।

কৃষককে সহায়তা করার এসব উদ্ভাবনী উদ্যোগ নিয়ে আমাদের দেশেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে, যাতে সমস্যার একটি কার্যকর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান পাওয়া যায়। আমাদের কোটিখানেক কৃষকের ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব আছে। এজেন্ট ব্যাংকিং ও মোবাইল ব্যাংকিং প্রসারিত হচ্ছে। তাই ডিজিটাল পদ্ধতিতে তাদের কাছে সহায়তা পৌঁছানো মোটেও অসম্ভব নয়।

৮. প্রাকৃতিক কৃষির প্রসার : কৃষকদের মধ্যে অর্গানিক চাষের প্রসার ঘটানোর মাধ্যমেও আমরা বাংলাদেশের কৃষকদের আয় বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করতে পারি। সারা বিশ্বে, বিশেষত উন্নত দেশগুলোতে অর্গানিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত কৃষিপণ্যের জন্য বিক্রেতা ও ক্রেতারা বাড়তি দাম দিতে আগ্রহী। এই প্রেক্ষাপটেই বিশ্বব্যাপী ‘ভলান্টারি সাসটেইনেবিলিটি স্ট্যান্ডার্ডস (ভিএসএস)’ সার্টিফিকেশন শুরু হয়। একজন কৃষক যদি টেকসই ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে, তখন তার উৎপাদিত পণ্য ভিএসএস সার্টিফায়েড হয় এবং সাধারণ কৃষিপণ্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করতে সমর্থ হয়। ইথিওপিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে যে সেখানকার কফি উৎপাদনকারী কৃষকদের মধ্যে যারা ভিএসএস সার্টিফায়েড তারা তাদের উৎপাদিত কফির জন্য সাধারণ কফি উৎপাদকদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বেশি দাম পাচ্ছে।

৯. কৃষক শনাক্তকরণের মাধ্যমে লিকেজ প্রতিরোধ : বাংলাদেশে যেকোনো সহায়তা কার্যক্রম বা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ক্ষেত্রে ‘টার্গেটিং এরর’ একটি বড় সমস্যা। একই কথা প্রযোজ্য কৃষক সহায়তা কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও। এরই মধ্যে অভিযোগ এসেছে সরকারের ন্যায্য মূল্যে ধান কেনার কর্মসূচির ক্ষেত্রেও। এখানেও এ ধরনের ভুল হচ্ছে এবং প্রকৃত কৃষকরা সরকারি উদ্যোগের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র—স্মার্ট কার্ডই আমাদের সমাধান দিতে পারে। স্মার্ট কার্ড দিয়ে প্রকৃত কৃষক শনাক্তকরণ করলে এ ক্ষেত্রে অনিয়মের সুযোগ কমে যাবে। তবে কৃষক শনাক্তকরণের কাজটি করতে হবে ফসল কাটার পরে নয়, বরং ফসল চাষের শুরুতে। এতে মৌসুমের শুরুতেই কোন কৃষক কতটুকু জমিতে কী ফসল চাষ করছে, তা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যাবে এবং তাদের চাহিদা প্রক্ষেপণ করা সম্ভব হবে।

একটা সময় এসেছিল, যখন আমরা প্রকাশ্য কৃষিঋণ প্রদানে ব্যাংকগুলোকে উৎসাহিত করতাম। সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে প্রকাশ্য দিবালোকে এই ঋণ দেওয়া হতো। কৃষক নয়—এমন কেউ সমাজের অন্য দশজনের সামনে ঋণ নিতে এগিয়ে আসতে দ্বিধা করত।

এমন সামাজিক আয়না দাঁড় করাতে পারলে সত্যিকার কৃষকরাই যে ধান সংগ্রহ কর্মসূচির সুবিধা নিতে পারবে, সে বিশ্বাস আমার রয়েছে। এ জন্য স্থানীয় প্রশাসন, বিশেষ করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সক্ষম করে তুললে ভালো ফল নিশ্চয়ই মিলবে। এরই মধ্যে খবর আসছে, কোনো কোনো উৎসাহী প্রশাসনিক কর্মকর্তা কৃষকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ধান কেনার উদ্যোগ নিচ্ছেন। এসব উদ্যোগ নিশ্চয়ই স্বার্থান্বেষী মহলকে কিছুটা হলেও নিরুৎসাহ করবে। মাঠপর্যায়ে তরুণ প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মনিটরিংয়ের দায়িত্ব দিলে এবং তাঁদের সাহস দিলে নিশ্চয়ই ধান সংগ্রহ কর্মসূচির অব্যবস্থাপনা অনেকটাই কেটে যাবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ ও সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

dratiur@gmail.com

এই বিভাগের আরো সংবাদ