অসমে ৪০ লক্ষ বাঙালির এখন ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক

NRC: শ্রেণিকরণের উদ্দেশ্যেই কি নাগরিকপঞ্জি?

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০১৯, ১৫:৪৬

অসমে ৪০ লক্ষ বাঙালির এখন ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক। অজানা আতঙ্কেই গোটা অসমজুড়ে ‘১৪৪ ধারা’ জারি হয়েছে। কয়েকটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যকলাপ দেখা গেলেও বাঙালিদের বড় অংশে বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতা দেখা যায়নি। আটের দশকে ‘বাঙালি খেদাও আন্দোলন’-এ বরাক উপত্যকা ‘পৃথক’ রাষ্ট্র বা রাজ্যের দাবি তোলেনি। তাহলে এমন শ্রেণিকরণ কেন? 

হিটলারের জার্মানিতে ৬০ লক্ষ ইহুদির স্থান হয়েছিল কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। আজ অসমে ৪০ লক্ষ বাঙালির নাকের সামনে ঝুলছে ডিটেনশন ক্যাম্পের আতঙ্ক। অসমের ‘জাতীয় নাগরিকপঞ্জি’-র দ্বিতীয় খসড়া রিপোর্টটি প্রকাশের পর এই ৪০ লক্ষ অসমবাসীর রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছে। অজানা আতঙ্ক এদের বুকে। মধ্যরাতে হয়তো এঁদের বাড়িতে সেনার জওয়ান কিংবা পুলিশ কড়া নাড়বে। তারপর সেনাবাহিনীর গাড়িতে তুলে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার যে কোনও ডিটেনশন ক্যাম্পে তাদের ঢুকিয়ে দেওয়া হবে। এই ডিটেনশন ক্যাম্প যে হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পেরই পরিবর্তিত কোনও সংস্করণ, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। ইতিমধ্যে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে থাকা ডিটেনশন ক্যাম্পগুলিতে ৯০০ মানুষের ঠাঁই হয়েছে। তাঁদের দশা জেলখানার বন্দির মতোই। জাতীয় নাগরিকপঞ্জি প্রকাশের পর ৯০০ সংখ্যাটা ৪০ লক্ষে গিয়ে পৌঁছতে পারে।

বিশাল সংখ্যক মানুষের এই অজানা আতঙ্কেই গোটা অসম জুড়ে ‘১৪৪ ধারা’ জারি হয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় টহল দিচ্ছে আধাসেনা। ভারী বুটের শব্দ ও আতঙ্কের গন্ধমাখা বাতাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার অবশ্য আশ্বাস দিচ্ছে। সোমবার জাতীয় নাগরিকপঞ্জির রাজ্য কো-অর্ডিনেটর প্রতীক হাজেলা যে অসমের নাগরিকপঞ্জিটি প্রকাশ করেছেন, সেটিও একটি খসড়া মাত্র। যে ৪০ লক্ষ ৭ হাজার ৭১৭ জনের নাম এই খসড়ায় জায়গা পায়নি, তাদের এখনই ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠানো হচ্ছে না বা বাংলাদেশে পুশব্যাক করাও হবে না। ৩০ আগস্ট থেকে ফের নতুন করে আবেদনপত্র নেওয়া শুরু হবে। ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যা চলবে। নাগরিকপঞ্জির হয়তো আরও একটা খসড়া বের হবে। কিংবা এরপর হয়তো চূড়ান্ত রিপোর্টও বেরতে পারে। কিন্তু তাতে ৪০ লক্ষ কতটা কমবে? সেটা কমে হয়তো ৩০ লক্ষ হবে। কিন্তু এই ৩০ লক্ষ মানুষও তো দেশের মধ্যে থেকেও হঠাৎ ‘উদ্বাস্তু’ হয়ে যাবে। এদেরকে আমরা কাদের সঙ্গে তুলনা করব? হিটলার যে ৬০ লক্ষ ইহুদিকে কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে জায়গা করে দিয়েছিলেন, তাঁদের সঙ্গে? না কি সদ্য এইরকম রাষ্ট্রহীন ভাসমান মানুষ হয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের সঙ্গে? চট্টগ্রামের অদূরে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরগুলোর দুর্দশার কাহিনি কয়েক মাস আগেই সংবাদপত্রের পাতা জুড়ে ছিল। সেগুলোও তো এক ধরনের কনসেনট্রেশন ক্যাম্পই। যেখানে মৃত্যুই একমাত্র ভবিতব্য।

অসমের বাঙালিরা বরাবর শান্তিপ্রিয়। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় কিংবা বরাক উপত্যকায় যে লক্ষ লক্ষ বাংলাভাষী থাকেন, তাঁরা শান্তিতে থাকেন। জীবনযুদ্ধে নিয়োজিত থাকেন। অসমের বেশ কয়েকটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহী কার্যকলাপ দেখা গিয়েছে। বিচ্ছিন্নতাবাদ অসমের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রচুর রক্তক্ষরণ করেছে। কিন্তু বাঙালিদের বড় অংশের মধ্যে সেখানে কখনওই কোনও বিচ্ছিন্নতাবাদী মানসিকতা কাজ করতে দেখা যায়নি। কাছাড় রাজ্যের সব সমস্যার কেন্দ্র– এমন উসকানিমূলক মন্তব্যেও বঙ্গভাষীদের বৃহত্তর অংশ অশান্ত হয়ে ওঠেনি কখনও। কিংবা আটের দশকের ‘বাঙালি খেদাও আন্দোলন’-এর উত্তাল সময়েও বরাক উপত্যকা পৃথক রাষ্ট্র বা রাজ্যের দাবি তোলেনি। কিন্তু জাতীয় নাগরিকপঞ্জি হঠাৎ এমন এক ‘অসময়’ এনে হাজির করল অসমের বাঙালিদের সামনে, যার পরিণতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াতে পারে তা আমরা বুঝে উঠতে পারছি না।

আটের দশকের অগ্নিগর্ভ অসমকে ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধী শান্ত করেছিলেন প্রফুল্ল মহন্ত, ভৃগু ফুকনদের সঙ্গে ‘অসম চুক্তি’ স্বাক্ষর করে। সেই অসম চুক্তিতেই অসমের ‘বিদেশি’ অনুপ্রবেশের সমস্যাটি সমাধানের জন্য জাতীয় নাগরিকপঞ্জির সংশোধনের কথা বলা হয়েছিল ১৯৭১ সালে ২৪ মার্চকে ভিত্তি ধরে। অর্থাৎ ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে যাঁরা অসমে বসবাস করছেন, তারা ‘ভারতীয় নাগরিক’ হিসাবে বিবেচিত হবেন। তারপর যাঁরা সেখানে বাংলাদেশ থেকে এসে বসবাস করছেন তাঁরা নাগরিকত্ব পাবেন না। ১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধীর চুক্তির পর ব্রহ্মপুত্র দিয়ে অনেক জল বয়ে গেলেও নাগরিকপঞ্জির জটটা দূর হয়নি। ২০১৬-তে অসমে বিজেপি সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর নাগরিকপঞ্জি নিয়ে ভূরি ভূরি অভিযোগ উঠতে থাকে। সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে এই নাগরিকপঞ্জি তৈরির কাজ হলেও অভিযোগ ওঠে এই কাজে রাজ্য সরকারের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপকে ঘিরে। প্রশ্ন ওঠে, কেন্দ্রীয় সরকার কেন ২০১৬ সালে দেশের নাগরিকত্ব আইনের সংশোধন করে অ-মুসলিম অনুপ্রবেশকারীদের নাগরিকত্ব দিতে সম্মত হল? প্রশ্ন ওঠে, নাগরিকপঞ্জিতে নাম তোলার আবেদন জানিয়ে যে ৪৭ লক্ষ অসম-নিবাসী পঞ্চায়েত প্রধানের দেওয়া শংসাপত্র জমা করেছিল, তা কেন রাতারাতি বাতিল করে দেওয়া হল, তা নিয়েও।

২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর অসমের জাতীয় নাগরিকপঞ্জির প্রথম খসড়াটি প্রকাশিত হয়েছিল। তাতে দেখা গিয়েছিল দেড় কোটি বাঙালির নাম নেই। নাম ছিল না এমন বহু বাঙালির যাঁরা ১০০ বছরেরও উপর অসমে রয়েছেন। যেমন তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন অসমের কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য তপোধীর ভট্টাচার্যের নাম। যাঁর বাবা তাম্রপদকপ্রাপ্ত স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং যে পরিবারটি ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বরাক উপত্যকার নিবাসী। ২০১৭ সালের ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির খসড়া দেখে পরিবারটি হঠাৎই জানতে পারেন, আর তঁারা দেশের নাগরিক নন! এইভাবেই ওই রাতের অন্ধকারে নাগরিকত্ব খুইয়েছিলেন শিলচর মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ দেবীদাস দত্ত, প্রখ্যাত চিকিৎসক ধ্রুবজে্যাতি পাল, বিশিষ্ট নাট্যকর্মী শেখর দেবরায়, বিশিষ্ট ভাষা-শহিদ আন্দোলনের নেতা রাজীব কর-সহ অসমের বেশ কিছু নামজাদা বাঙালি।

কেন এই বিশিষ্ট বাঙালিরা রাতারাতি নাগরিকপঞ্জির বাইরে চলে গেলেন, তার কোনও সদুত্তর মেলেনি। কোনও কোনও মহল থেকে অভিযোগ ওঠে– পুরোটাই ‘রাজনৈতিক অভিসন্ধি’। রাজনৈতিক কারণেই বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশকে নাগরিক তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে। এর পিছনে ভোটব্যাঙ্কের ক্ষুদ্র ও সংকীর্ণ রাজনীতি রয়েছে। সোমবার জনপঞ্জির যে দ্বিতীয় খসড়াটি প্রকাশ হয়েছে তাতেও এমন বহু বাঙালির নাম বাদ পড়েছে, যাঁদের ‘অসমের ভূমিপুত্র’ বললেও কম বলা হয়। দেশভাগের ক্ষত আমরা বহুদিন ধরেই বয়ে বেড়াচ্ছি। এর সমাধান দেশের মধ্যে বাস করতে থাকা কিছু মানুষকে ‘রাষ্ট্রহীন’ করে দিয়ে মিলবে না। কিছু মানুষকে হিটলারের মতো কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে পাঠিয়েও সমস্যার মূলে পৌঁছনো যাবে না। সংকীর্ণ ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির স্বার্থে যদি একটি জনগোষ্ঠীকে নিশানা করা হয়, তাহলে সেটা হবে খুব দুর্ভাগ্যের। অসম সমস্যা যাতে নতুন করে জটিল না হয়, তা লক্ষ রাখাই এখন কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তব্য হওয়া উচিত।

এই বিভাগের আরো সংবাদ