শূন্য মাঠ ও চাপা অসন্তোষ

  আহমদ রফিক

২১ জুলাই ২০১৯, ০৯:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ

কেমন আছে বাংলাদেশের রাজনীতি? কিছুদিন আগে এ নিয়ে লিখেছিলাম- চারদিকে 'সুনসান নীরবতা' শিরোনামে। এখন আবার বিদ্যমান বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে নতুন করে মনে কিছু প্রশ্ন জেগেছে। কোন পথে দেশের রাজনীতি কিংবা সমাজটাই-বা কেমন আছে? বাংলাদেশের মানুষ সম্বন্ধে একটা প্রচলিত কথা- এরা বড় বেশি রাজনীতিপ্রবণ। এ উপলব্ধি প্রধানত বিদেশি বোদ্ধাদের বা বেড়াতে আসা সচেতন পর্যটকদের। সত্যই কি তাই! ঘটনা যদি এমনই হবে তাহলে সমাজে এই যে শিশু নির্যাতন, নারী নির্যাতন দৈনন্দিন খবর হয়ে দৈনিক পত্রিকার পাতায় ছোট-বড় নানান হরফে জ্বলজ্বল করছে, তাতে মানুষের মনে প্রতিক্রিয়া নেই কেন? বহুকথিত সুশীল সমাজ, নাগরিক ফোরাম কত কী নামের সংগঠন- তাদের কণ্ঠে আওয়াজ নেই কেন? উল্লিখিত এই একটি ধারার সমাজদূষণের পরিণামই তো বিশাল এক আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে সমাজ শোধন, সমাজবদলের প্রবল আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। যেমন কিছুটা দেখা গিয়েছিল দিনাজপুরে বহুকথিত ইয়াসমিন হত্যায়। প্রেস ক্লাবের ইটগুলো কেঁপে ওঠে না কেন? যে সচেতন ছাত্রসমাজ আমাদের গর্ব ও অহঙ্কার, তারা মাঝেমধ্যে বিশেষ দাবিতে রাজপথে নেমে এলেও এই ভয়ঙ্কর দূষণের বিরুদ্ধে রাজপথ কাঁপায় না কেন? অথচ সর্ববিস্তারী দুর্নীতি নিয়ে লেখালেখি কম হচ্ছে না, তাও চেতনায় দামামা বাজায় না কেন? আজকের (১৬ জুলাই, ২০১৯) একটি দৈনিকেই ভয়াবহ একটি খবর, শিরোনাম- 'ধাওয়া করে আদালত কক্ষে হত্যা'। অবিশ্বাস্য ঘটনা! কোথাও মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নেই। ইতিমধ্যে আমরা জীবনের নিরাপত্তার দাবিতে নিরাপদ সড়ক চাই বলে সোচ্চার হয়েছিলাম, এখন সেসবও স্তব্ধ। অথচ এবারও ঈদযাত্রায় সড়কে মৃত্যু অনেক পরিবারের ঈদ হারাম করে দিয়েছে স্বজন হারানোর কান্নায়, আর্তিতে। পরিসংখ্যান তুচ্ছ করার মতো নয়।

এখন দেখা যাচ্ছে, সমাজে সর্বশেষ পরিত্রাতা যে আদালত, সেখানেও মানুষ নিরাপদ নয়। বিচারকের কক্ষেও মানুষ হত্যা সম্ভব। পূর্বোক্ত শিরোনামটির সঙ্গে যুক্ত বক্তব্য :'হাজিরা দিতে আসা একজন অন্যজনকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। বিচারকের খাস কামরায় ঢুকেও জীবন রক্ষা হয়নি।' ভাবা যায়, এমন ঘটনার কথা! জানি না, অন্য কোনো দেশে এসব ঘটে কি-না। এ প্রসঙ্গে কথা একটাই- 'এ কোন বাংলাদেশ, যেখানে প্রতিদিন এ জাতীয় অবিশ্বাস্য ঘটনা, একটা না একটা ঘটে।' ওই ঘাতক একবারও ভাবল না এত লোকসমক্ষে হত্যা, ধরা তো পড়বেই, বিচারে জীবননাশের আশঙ্কা তারও! না, ঘাতক মানসিকতা সবকিছুর ঊর্ধ্বে। একই কাগজে খবর, 'প্রতিবন্ধী শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে তরুণ গ্রেফতার'। 

এর পরও নিস্তরঙ্গ সমাজ, নিরুত্তাপ তার রাজনৈতিক অঙ্গন। যতদূর দেখা যায়, পূর্বোক্ত ভাষ্যে 'সুনসান নীরবতা'। ঘটনাটির প্রতিক্রিয়ার ঢেউ উঠছে না, ঢেউ ভাঙছে না, প্রতিবাদের জোয়ারি কলস্বর শোনা যাচ্ছে না রাজনৈতিক মহলে। মনে হয়, সব ঠিকঠাক আছে, ঠিকঠাক চলছে। কেন বৃথা কলরব। শাসনযন্ত্র নির্বিকার চোখে সবকিছু দেখছে। কোনো ঘটনা যখন স্বাভাবিকতার সীমা-পরিসীমা ছাড়িয়ে সমাজে সাময়িক আলোড়ন তুলছে তখন সর্বোচ্চ প্রশাসন ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে আসছে, একটি, দুটি বা তিনটি ঘটনায়। তাতে অনাচারী ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। কিন্তু এসবের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার দায় তো রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর, যাদের কেউ ক্ষমতাসীন, অন্যরা ক্ষমতাবলয়ের বাইরে। শেষোক্তদেরও তো নড়েচড়ে বসতে দেখা যাচ্ছে না? কেন? কেমন আছেন তারা? ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ স্বস্তিতেই আছে। কারণ রাজপথে প্রতিবাদ নেই, হৈ-হুল্লোড় নেই। হরতাল- হরতাল তো দূরঅস্ত। তাদের সংগঠন, অঙ্গ সংগঠনে কিছু বুদবুদ উঠলেও তা সহজে মিলিয়ে যাচ্ছে। কারণ ক্ষমতায় থাকার অনেক সুবিধা। তবু তৃণমূল স্তরে অন্তর্কলহের বিরাম নেই। যেমন সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে। এসব ঘটনায় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বিকার। তারা জানেন, পুরনো বটগাছেও কিছু ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন থাকে। 

কিন্তু সুসংহত ক্ষমতার রশি হাতে থাকলে ছোটখাটো দ্রোহ সামলে দেওয়া মোটেই কঠিন কাজ নয়। তাছাড়া ক্ষয়ক্ষতি পূরণ হয় ডুবন্ত ডোঙ্গার কিছু আরোহীকে হাতের কাছে পেয়ে। এর মন্দের দিকটা তারা আমলে আনেন না। তাই নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমহলের সমালোচনায় মাথা ঘামায়নি তাদের কেউ। 

বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতি গত দুই দশক ধরে মূলত দুই দলভিত্তিক চরিত্র অর্জন করলেও ব্রিটেন বা আমেরিকা থেকে তা অনেক ভিন্ন। তুলনা চলে না। এরা গণতান্ত্রিক সহিষুষ্ণতার চরিত্র অর্জন করতে পারেনি। সংবাদপত্রের সাক্ষ্যে দেখা যায়, ক্ষমতাসীনের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষের কাজ শুধু হরতাল আর হরতাল। অথবা লাগাতার সংসদ বর্জন। একে শক্তিশালী বিরোধীদলীয় ভূমিকা বলে না, যেমনটা কথিত সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শলিপিতে। 

স্বভাবতই সংসদীয় রাজনীতির অঙ্গনে সুস্থ পরিবেশের অভাব, প্রতিহিংসার প্রভাবই বড়। তদুপরি দুর্নীতি আকাশছোঁয়া। এর কথিত ইতিবাচক দিক হলো কেনাবেচা, যা আসলে সুস্থ রাজনীতির জন্য, সুস্থ সমাজ গড়ার পক্ষে নেতিবাচক তারই প্রকাশ ঘটায়। এ প্রতিহিংসার লড়াইয়ে বিএনপির হার, সে এখন ভগ্ন মেরুদণ্ড। তাই যুক্তিসঙ্গত ইস্যুতেও প্রতিবাদের শক্তি হারিয়ে ফেলেছে। তার চেয়ে বড় কথা, এতকাল একনায়কী পারিবারিক নেতৃত্বে পরিচালিত বিএনপির ভেতরে শক্তিশালী দ্বিতীয় স্তরে বিচক্ষণ, নিঃস্বার্থ নেতৃত্ব গড়ে ওঠেনি। সামান্য ব্যতিক্রম হয়তো আছে; কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। অর্থাৎ ক্ষতবিক্ষত দুর্বল দলকে সবল করার মতো যথেষ্ট শক্তিমান নয়। তাই বিপদে-দুর্ভোগে শীর্ষ নেতৃত্বের প্রধান অংশকে দেখা যায় নীরব ও নিষ্ফ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করতে। অবাক হওয়ার মতো ঘটনা যে, তারাই ছিল ক্ষমতাসীন অবস্থায় দলের বিশেষ সুবিধাভোগী অংশ। 

এতটা ব্যক্তিক স্বার্থপরতা দলের জন্য শক্তিমান ভিত তৈরির সহায়ক নয়। এ সত্য বোঝেন তৃণমূল স্তরের কর্মীরা, বোঝেন রাজনীতিমনস্ক সাধারণ মানুষ। এটাই এখন বিএনপি রাজনীতির বড় সমস্যা। তাই দলের মহাসচিবকে দেখা যায় যুক্তিহীনভাবে তার অবস্থান পাল্টাতে। এমন এক অন্তর্দ্রোহে ঐক্য প্রক্রিয়া কি তাদের তরীডুবি থেকে উদ্ধার করতে পারে? সর্বোপরি তাদের জামায়াত-সঙ্গ কিছুতেই বিচ্ছিন্ন হওয়ার নয়, যা তাদের জন্য ইতির চেয়ে অধিকতর নেতিবাচক পরিণামই উপহার দিয়েছে। ক্ষমতাসীন সময়কার ব্যাপক দুর্নীতি, প্রতিহিংসাপরায়ণতা, সন্ত্রাসীপনা ও ঔদ্ধত্যের ভারবাহী বিএনপি এখন সেসব ভুলের মাশুল গুনছে। স্বভাবতই যে কোনো সঙ্গত জনবান্ধব ইস্যুতে আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষমতা তাদের নেই। কিংবা শক্তি কিছুটা থাকলেও মাঠে নামার সাহস নেতাদের নেই। এ অবস্থায় রাজনীতির মাঠ চারদিকে সুনসান থাকবে, এমনটাই স্বাভাবিক। এর মধ্যে তৃতীয় দল জাতীয় পার্টির ইন্দ্রপতন। দলের প্রতিষ্ঠাতা, দলের শক্তি, দলের মূল পরিচালক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যু। এমনিতেই দলটি বিচ্ছিন্নতার টানে ভুগছিল মূলত একনায়ক এরশাদের খেয়ালিপনায়। এখন তার অবর্তমানে চালিকাশক্তির যে শূন্যতা, তা পূরণ হওয়ার ক্ষেত্রে দ্বন্দ্বই বড় হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যে তার আলামত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, যা এরশাদের জীবদ্দশায় জিএম কাদেরকে তার রাজনৈতিক উত্তরসূরি ঘোষণা করায় দেখা দেয়, মূলত রওশন এরশাদের নিকট অনুসারীদের পক্ষ থেকে। সে অবস্থা এখনও বিরাজমান। এ সমস্যার নিরসন ঘটানোর কষ্টসাধ্য সম্ভাবনার মধ্যে নতুন বিভাজক বিদিশার রাজনৈতিক আগ্রহ দলের নেতৃত্বে যোগ দেওয়ার। 

তাহলে কি জাতীয় পার্টি ত্রিধাবিভক্ত হবে? কাজেই তারা শক্তিশালী বিরোধীদলীয় ভূমিকা পালন করবে কীভাবে? এরশাদ পারেননি তার মামলাগুলোর কারণে। বর্তমান নেতৃত্বের তো সে সমস্যা নেই। তবে আছে লোভ-লালসা, খ্যাতি-প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা। 

বাংলাদেশের রাজনীতি এখন তাই পূর্বোক্ত পরিস্থিতিচিত্র বিচারে একদলীয় চরিত্র অর্জন করেছে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন, আওয়ামী লীগ দেশ শাসন করছে। একই সঙ্গে গৃহপালিতদের নিয়ে বিরোধী দলের ভূমিকাও পালন করছে। বিএনপির গুটিকয় সদস্যের হাড়ে এমন শক্তি নেই যে, তারা প্রকৃত বিরোধীদলীয় রাজনীতির ভূমিকা পালন করেন। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের ওপর রাজনৈতিক দিকের চেয়ে নৈতিক দায়দায়িত্ব অনেক। সবই নির্ভর করছে তাদের সদিচ্ছার ওপর। তারা যদি সত্যিই সমাজে, রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে চান, জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চান, তাহলে নীতি-নৈতিকতার কষ্টসাধ্য পথ ধরে তাদের চলতে হবে। অন্ধ দলীয় স্বার্থবোধ থেকে প্রয়োজনীয় মাত্রায় সরে আসতে হবে। জানি না, এ কাজ তারা করবেন কি-না বা করতে পারবেন কি-না দলের অভ্যন্তরীণ চাপ উপেক্ষা করে। 

যেহেতু দেশে রাজনীতির ময়দানটা সংঘাতহীন শূন্যতায় অবস্থান করছে, মানুষ তাতে এক ধরনের স্বস্তি অনুভব করছে, যদিও বহু সমস্যা তাদের কণ্টকিত করছে। কৃষক তার পণ্যের উৎপাদন মূল্য পাচ্ছে না, অথচ জনগণের ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়েই চলেছে মুনাফাবাজ ব্যবসায়ীদের কল্যাণে। প্রতিবাদ করার, দাবি তোলার কেউ নেই। প্রশ্ন উঠতে পারে, এ অবস্থার পরিণাম কী? কোন পথে চলছে বাংলাদেশের রাজনীতি, এর পরিণাম শুভ না অশুভ? বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতি তার পরিচায়ক। কান পাতলে শোনা যায় উন্নয়ন সত্ত্বেও জনমনে চাপা অসন্তোষ। একটি শক্তিশালী জনবান্ধব পার্টি হয়তো পারবে পরিস্থিতির পরিবর্তন ও সমাজবদলের কাজটা সম্পন্ন করতে জনসমর্থনের ওপর নির্ভর করে। 

লেখক : ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্রগবেষক, কবি, প্রাবন্ধিক

এই বিভাগের আরো সংবাদ