উত্তর কোরিয়া, ট্রাম্প ও মানবাধিকার

নিকোলাস ক্রিস্টোফ, ১২ জুন, এবিনিউজ : প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন সিঙ্গাপুরে কিম জং উনের সঙ্গে বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তখন মূল ফোকাস পরমাণু অস্ত্রের ওপর। তবে আরও কিছু বিষয় ভুলে গেলে চলবে না- উত্তর কোরিয়া হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে সর্বাত্মকবাদী রাষ্ট্র। ট্রাম্পের উচিত এটি স্পষ্ট করা যে, কেবল ম্যাকডোনাল্ডের ভরপুর শাখা থাকলেই একটি দেশ আধুনিক হয় না, নির্যাতন বন্ধ এবং স্বাধীনতার বিভিন্ন পদক্ষেপও নিতে হয়।

২০১৪ সালে উত্তর কোরিয়াসংক্রান্ত এক রিপোর্টে জাতিসংঘ বলেছিল, ‘পদ্ধতিগত, বিস্তৃত পর্যায়ে এবং ক্রমবর্ধমান মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা সেখানে ঘটছে’ এবং এ ক্ষেত্রে ‘সমসাময়িক বিশ্বে উত্তর কোরিয়ার সমান্তরাল কোনো দেশ নেই’ বলে বর্ণনা করেছিল বিশ্ব সংস্থাটি। উত্তর কোরিয়ার নাগরিকরা আমাকে বলেছেন কীভাবে দেশটির পুলিশ নির্দিষ্ট সময় অন্তর একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়, যাতে সেখানে থাকা একটি যন্ত্রে ভিডিও বা ডিভিডি চালানো না যায় এবং পরে প্রতিটি ইউনিটে অনুসন্ধান করে যদি দক্ষিণ কোরিয়ার ‘সোপ অপেরা’ পাওয়া যায়, তবে পরিবারের সব সদস্যকে লেবার ক্যাম্পে (বন্দিশালা) মার্চ করানো হয়। পৃথিবীর কোনো দেশই এত কঠোরভাবে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য প্রযুক্তি, প্রচারণা ও পুলিশকে ব্যবহার করে না।

১৯৯০-এর দশকে যখন উত্তর কোরিয়া দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত হয়, তখন রাষ্ট্রীয় প্রচার মাধ্যমে ডায়েটের উপকারিতাকে স্বাগত জানানো হয়। সেসময় জাতীয় স্লোগান ছিল- ‘চলুন, দৈনিক কেবল দু’বার আহার করি’। একটি টিভি ডকুমেন্টারিতে রিপোর্ট করা হয়, একব্যক্তি বেশি ভাত খাওয়ায় তাকে বিস্ফোরণের মুখে পড়তে হয়। দেশটিতে রেডিও ও টিভি স্টেশনগুলো কেবল উত্তর কোরিয়ার অনুষ্ঠানই চালাতে পারে। চোরাইভাবে টেকনিশিয়ানরা যদি কোনো যন্ত্রের সাহায্যে দক্ষিণ কোরিয়া বা চীনের অনুষ্ঠান শুনত তাহলে ধরা পড়লে পরিবারের সব সদস্যকে লেবার ক্যাম্পে পাঠানো হতো। এমন এক লাখ মানুষকে জেল খাটতে হয়েছে। উত্তর কোরিয়ার কারাগার নিয়ে তদন্ত করা ইন্টারন্যাশনাল বার অ্যাসোসিয়েশনের টমাস বুয়েরজেনথাল বলেছেন, ‘আমার মতে উত্তর কোরিয়ার জেলখানাগুলো নাৎসি ক্যাম্পগুলোর মতোই বর্বর ও নিষ্ঠুর ছিল।’

আমার দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে, আপাতত পরমাণু অস্ত্রের ইস্যুতে জোর দেয়া এবং ভয়ের কারণে যারা কথা বলতে চাচ্ছেন না, তাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নয়নের বিষয়ে কথা না বলা। কিন্তু আমি আরও বিশ্বাস করি, ট্রাম্প পারেন এবং তার উচিত কিমের কাছে ব্যাখ্যা করা যে তার প্রশাসন কখনও পরিপূর্ণ শ্রদ্ধা পাবে না, যতক্ষণ না তারা মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন করবে এবং কয়েক বছর ধরে অপহরণের শিকার জাপানি নাগরিকদের অপহরণের বিষয়টিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবে। ১৯৯৪ সালে উত্তর কোরিয়ার সম্মত ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যস্থতাকারী বরার্ট গ্যালুচ্চি স্বীকার করেছেন, আপাতত পরমাণু ইস্যু মূল বিষয়; কিন্তু ‘ঘটনাবহুলভাবে কাজকর্ম স্বাভাবিক করার জন্য আপনি মানবাধিকার ইস্যু নিয়েই চুক্তি করতে যাচ্ছেন।’

একইভাবে ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের রবার্ট ম্যালি বলেছেন, মানবাধিকারকে যুক্ত করে পরমাণু আলোচনাকে জটিল করতে চান না তিনি; কিন্তু ‘যদি উত্তর কোরিয়ার উদ্দেশ্য হয় (সম্ভবত তা-ই উদ্দেশ্য) যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শেষ হোক এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হোক, তাহলে পিয়ংইয়ংয়ের জানা উচিত যে, তারা নিজেদের নাগরিকদের সঙ্গে বর্তমানে যেমন আচরণ করছে, তা দীর্ঘায়িত করে সম্পর্ক এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।’

বছরের পর বছর আমি মানবাধিকার নিয়ে উত্তর কোরিয়ার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি। দেশটির কর্মকর্তারা মানবাধিকার নিয়ে কথা বলতে ও শুনতে তখনই ইচ্ছুক, যখন তারা অনুভব করে তাদের প্রতি তর্জন-গর্জন করা হচ্ছে না বা তাদের খাটো করা হচ্ছে না। দীর্ঘ সময় ধরে এ সংক্রান্ত ইস্যু তারা ট্যাকল দিতে ইচ্ছুক ছিলেন। একসময় তারা দেশে লেবার ক্যাম্প বা বন্দিশালার বিষয় স্বীকার করতে চাইতেন না; কিন্তু এখন তারা সেগুলোর অস্তিত্বের বিষয়টি স্বীকার করছেন এবং বলছেন যে এগুলো নিয়ে পশ্চিমা প্রতিবেদনগুলো অস্বচ্ছ ও বাগাড়ম্বরপূর্ণ।

ভালো লক্ষণ হল, মানুষকে নির্যাতন করে পঙ্গু বানিয়ে ফেলার জন্য যদিও অতীতে উত্তর কোরিয়ার সমালোচনা করা হয়েছে, গত বছর দেশটি এ ইস্যুতে পরিদর্শন ও আলোচনার জন্য জাতিসংঘের বিশেষ এক প্রতিনিধিকে সফরের অনুমতি দিয়েছিল।

ট্রাম্প উত্তর কোরীয় নেতাকে উৎসাহী করতে পারেন লেবার ক্যাম্পগুলোতে রেডক্রসের প্রতিনিধিদের পরিদর্শনের অনুমতি দেয়ার বা অভিযুক্তদের পরিবারকে মুক্তি দেয়ার জন্য। এগুলো কঠিন বিষয় এবং আমরা চাই না পরমাণু আলোচনাকে আরও কঠিন করে তুলতে। কিন্তু যেন ভুলে না যাই, উত্তর কোরিয়া কেবল একটি পারমাণবিক দেশ নয় এবং যে বিষয়টি ঝুঁকিপূর্ণ তা কেবল পারমাণবিক ওয়ারহেডই নয়, মানুষের জীবনও। (দৈনিক যুগান্তরের সৌজন্যে)

নিউইয়র্ক টাইমস থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম

নিকোলাস ক্রিস্টোফ : নিউইয়র্ক টাইমসের অপ-এড কলামিস্ট, নারীঅধিকার, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিকবিষয় লেখক