পূর্ব বাংলার ছাত্র রাজনীতি ও বঙ্গবন্ধু

  স্বদেশ রায়

১৯ আগস্ট ২০১৯, ১২:৫৪ | অনলাইন সংস্করণ

১৯৪৭ সালে ১৪ অগাস্ট পাকিস্তান সৃষ্টির পরে স্বাভাবিকভাবে পূর্ব বাংলার ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হয়ে যায়। কংগ্রেস মূলত পূর্ব বাংলা থেকে তাদের রাজনীতি গুটিয়ে নেয়। যদিও কংগ্রেসের কিছু নেতা পূর্ব বাংলায় থেকে যান তবে তারা পূর্ব বাংলা কেন্দ্রিক রাজনীতি করার জন্যে খুব বেশি আগ্রহী ছিলেন না। কমিউনিস্টদের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইঙ্গ-মার্কিন শক্তিকে সমর্থন করা ও পাকিস্তান, ভারত সৃষ্টি হবার পরে কমিউিনিস্ট নেতা রনদীভের ‘এ আজাদি ঝুটা হ্যায় থিওরি’ দেয়া সব মিলিয়ে তাদের তরুণ ও ছাত্র সমাজ তখন বিভ্রান্ত।

তাছাড়া পাকিস্তানে তাদের প্রকাশ্যে রাজনীতি করার কোন সুযোগ ছিল না। পাকিস্তানে কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠনের রাজনীতি কী হবে সে সিদ্ধান্তও তারা নিতে পারেনি। অন্যদিকে পাকিস্তান সৃষ্টির মূল দল বা একমাত্র দল মুসলিম লীগের প্রতি তাদের দলের প্রগতিশীল মুসলিম ছাত্ররা শতভাগ আস্থা রাখতে পারছে না তখন। এই আস্থা না রাখার ক্ষেত্রে দুটো কারণ বেশি কাজ করছিল। এক, তরুণ প্রগতিশীল মুসলিম ছাত্ররা চেয়েছিল পূর্ব বাংলার দরিদ্র মুসলমানের অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য একটি রাষ্ট্র হবে পাকিস্তান। তার বদলে তারা দেখতে পায় এটা হিন্দু জমিদার ও বৃটিশ শাসকদের বদলে মুসলিম নবাব, নাইট ও পশ্চিম পাকিস্তানের ভূস্বামীদের একটি রাষ্ট্র হয়েছে এবং ততক্ষণে মুসলিম লীগের মূল কক্ষপথ থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম, শামসুদ্দিন আহমদের মত নেতরা ছিটকে পড়েছেন।

সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম প্রমুখের মুসলিম লীগের কেন্দ্র থেকে ছিটকে পড়ার কারণে মুসলিম ছাত্রলীগের প্রগতিশীল তরুণ অংশ তখন অনেকখানি দিশেহারা। শুধু দিশেহারা নয়, হতাশও। কারণ, তাদের কষ্টে সৃষ্ট পাকিস্তানের ভেতর তারা তখন কোন স্বপ্ন খুঁজে পাচ্ছে না। তবে তারপরেও তরুণরা সব সময়ই নতুন কোন কিছু খোঁজে। ঢাকা কেন্দ্রিক প্রগতিশীল মুসলিম তরুণ ছাত্ররা তখন তাই জড়ো হয়েছিল ১৫০ মোগলটুলিতে কমিউনিস্ট পার্টির আদলে গড়ে তোলা মুসলিম লীগের তরুণ কর্মীদের ক্যাম্পে। তারা ক্যাম্পে জড়ো হয়েছিলেন ঠিকই, প্রতিদিন তারা সাইকেল চেপে নানান স্থানে গিয়ে সাধারণ মানুষের সমস্যার খোঁজ খবর নিতেন। ভারত থেকে আসা রিফিউজিদের খোঁজ নিতেন। কিন্তু সত্যি অর্থে ছাত্র রাজনীতির কোন দিশা তারা তৈরি করতে পারছিলেন না। নতুন সৃষ্ট পাকিস্তানে কোন ধরনের ছাত্র রাজনীতি হবে, তার পথ কী হবে সেটাও তারা ঠিক করতে পারছিলেন না। তবে এই ১৫০ মোগলটুলি কেন্দ্রিক মুসলিম লীগের ছাত্ররা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক ছাত্ররা একটি শতভাগ প্রগতিশীল পথ না হলেও উদারনৈতিক কিছু খুঁজছিলেন। তারা কোনওমতেই নতুন সৃষ্ট পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি ধর্মের নামে নবাব, নাইট ও ভূস্বামীদের শোষণের কাজে ব্যবহার হবে এটা মানতে পারছিলেন না। এদের মধ্যে কেউ কেউ আবার তখন সমাজতন্ত্রের স্বপ্ন ও তার জন্যে বিপ্লবের পথ ধরার চিন্তা করছিলেন বটে, তবে তারাও দিশেহারা ছিলেন। অন্যদিকে যারা সমাজতান্ত্রিক পথে শতভাগ বিশ্বাসী ছিলেন না তারা পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি কীভাবে তাদের স্বপ্নের রাষ্ট্র হবে এমনটিই ভাবছিলেন।

পূর্ব বাংলার ঢাকা কেন্দ্রিক প্রগতিশীল মুসলিম তরুণরা যখন এমন একটি অবস্থায় ওই সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান কলকাতা থেকে ঢাকা আসেন এবং ১৫০ মোগলটুলিতে ওঠেন। এর আগে তরুণ শেখ মুজিবের রাজনীতি ছিলো ফরিদপুর ও কলকাতা কেন্দ্রিক। কলকাতায় তিনি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর স্নেহভাজন হিসেবে এবং নিজের ছাত্র রাজনীতির গুণে মুসলিম ছাত্র সমাজ শুধু নয়, সাধারণ ছাত্র সমাজেরও দৃষ্টি কেড়েছিলেন। কৃত্তিবাস ওঝার লেখায় পাওয়া যায়, নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর নেতৃত্বে হলওয়ে মনুমেন্ট সরানোর যে আন্দোলন হয়েছিলো সেখানে শেখ মুজিবুর রহমান এতই ভূমিকা রেখেছিলেন যে, অনেকে তখন তাকে ছোট সুভাষ চন্দ্র বলে অভিহিত করেন। এমনকি পরবর্তীতে তাকে কোলকাতায় অনেকে ছোট নেতাজী বলতেন। এছাড়া পাকিস্তান সৃষ্টির পরে সিলেট আসামের সঙ্গে যোগ হবে না পূর্ব বাংলার সঙ্গে থাকবে এ নিয়ে যে গণভোট হয় ওই গণভোটে অক্লান্ত পরিশ্রম করেন শেখ মুজিবুর রহমান সামগ্রিকভাবে পূর্ব বাংলার মুসলিম তরুণ সমাজে নিজের নেতৃত্বকে সামনের সারিতে নিয়ে আসেন। ততদিনে পূর্ব বাংলা কেন্দ্রিক মুসলিম ছাত্রলীগের নেতৃত্বে শাহ আজিজদেরকে তিনি ছাড়িয়ে অনেকখানি নিজের একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন। এ কারণে ১৫০ মোগলটুলিতে অবস্থান নিয়ে দুটো সিদ্ধান্ত তিনি খুব সহজে নিতে পারেন। যে দুটো সিদ্ধান্ত ছিলো পূর্ব বাংলার ছাত্র রাজনীতি শুরু এবং তার আদর্শ কী হবে?

বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত শান্ত মাথায় ভবিষ্যতমুখী রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতেন এবং রাজনৈতিক কর্মসূচি বা রাজনীতিকে এগিয়ে নেয়ার জন্যে তার সঠিক আদর্শ ও শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামোতে বিশ্বাস করতেন। পূর্ব বাংলায় ফিরে বিশেষ করে ঢাকায় অবস্থান নিয়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনুপস্থিতিতে তিনি তখন তরুণ হলেও প্রায় এককভাবে এ দুটি কাজ করেন।

তিনি দুটি ঘটনার সঙ্গে ছাত্রদের সম্পৃক্ত করে ছাত্র রাজনীতির আদর্শ ঠিক করেন। যার মধ্য দিয়ে তার আজীবনের রাজনীতির পথও অনেকটা স্থির হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু মুজিব অর্থাৎ তখনকার তরুণ শেখ মুজিব যখন ১৫০ মোগলটুলিতে আসেন ওই সময়ে পূর্ব বাংলার বুদ্ধিজীবী ও শিক্ষদের একটি অংশ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে পত্র পত্রিকায় লেখালেখিতে একটি বির্তকে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছিলেন। অন্যদিকে প্রগতিশীল ছাত্র সমাজও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সেটাকে সমর্থন করে। ওই সময়ে ভাষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক গুরু হিসেবে ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ একটি লেখার মাধ্যমে এই বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছেন পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বিশেষ করে পূর্ব বাংলার বাঙালিদের জন্যে রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়া প্রয়োজন। প্রগতিশীল ছাত্র সমাজ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর ওই লেখার ভেতর নিজেকে খুঁজে পায় ঠিকই তবে এটাকে তখনও অবধি তারা কোন সাংগঠনিক কাঠামোর মাধ্যমে আদায় করার পথ খুঁজে পাননি।

ঠিক এমন সময়ে ১৯৪৭ এর ১৪ অগাস্টের বেশ পরে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান ১৫০ মোগলটুলিতে এসে অবস্থান নেন। তিনি ওই ক্যাম্পের ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রগতিশীল মুসলিম ছাত্রদের বুকের ভেতরের ভাষা বুঝতে পারেন। তাদেরকে নিয়ে কোন পথে হাঁটবেন সেটাও তার ঠিক করতে সময় লাগে না। ১৫০ মোগলটুলিতে আসার তিন মাসের ভেতর তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে এই প্রগতিশীল মুসলিম ছাত্র সমাজকে নিয়ে তিনি পূর্ব বাংলায় প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন গড়বেন এবং পূর্ব বাংলার মুসলিম ছাত্র সমাজকে তিনি মুসলিম লীগের রাজনীতি থেকে বের করে প্রগতিশীল রাজনৈতিক ধারায় এগিয়ে নেবেন। আর তার যে মোক্ষম সময় এটাই তাও শেখ মুজিবুর রহমানকে উপলব্দি করতে কোন বাড়তি সময় লাগেনি। কারণ তিনি দেখতে পান অন্তত বিশেষ সংখ্যক তরুণ ছাত্রদের মনে ও বুদ্ধিজীবীদের মনে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করার আকাঙক্ষা জেগেছে যাকে খুব সহজে ভাষা কেন্দ্রিক জাতীয়তবাদের পথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কারণ, বঙ্গবন্ধুর আজীবনের রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, রাজনীতিতে তিনি শুধু ভবিষ্যতমুখী নন, নিকট ও দূর ভবিষ্যতে রাজনীতির গতি প্রকৃতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা বুঝতে তিনি কখনই ভুল করেননি এবং সব ক্ষেত্রে তিনি সঠিক সময়ে সঠিক কাজটি করেছেন। তাই বঙ্গবন্ধু অর্থাৎ সে সময়ের তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান বুঝতে পারেন, বাংলা ভাষা কেন্দ্রিক এই দাবি সহজে পাকিস্তান সরকার মানবে না। আর তাদেরকে দাবি মানাতে হলে অবশ্যই সাংগঠনিকভাবে এগুতে হবে। এছাড়া তিনি এটাও বুঝতে পারেন যে, পাকিস্তান সরকার যত বিরোধীতা করবে ততই বাঙালির মনে ভাষার দাবি ও ভাষার প্রতি ভালোবাসা আরো দৃঢ় হবে। আর ভাষার প্রতি ভালোবাসা যত দৃঢ় হবে ততই বাঙালি ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের দিকে এগুবে। তাই এ সময়ে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন গড়ে তুলতে পারলে তারা এই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ধর্মীয় রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে ধারণ করবে। বঙ্গবন্ধু যে এগুলো ঠিক এভাবেই চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তার কোন ডকুমেন্টস নেই। তবে তার রাজনীতির অন্য একটি সময়ের সিদ্ধান্তকে পর্যালোচনা করে এ রকম ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চরিত্র পাওয়া যায়। কমান্ডার আব্দুর রউফ (আগরতলা মামলার অন্যতম আসামী) তার বইয়ে লিখেছেন, আগরতলা মামলার অন্য আসামী শহীদ লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম আগরতলা মামলা চলাকালে একদিন যখন আসামীদের কোর্টে নেয়া হচ্ছে ওই সময়ে বঙ্গবন্ধুকে বলেন, “আমরা সবাই আদালতে স্বীকার করবো, আগরতলার ঘটনা সত্য ও আমরা স্বাধীনতা চাই। তাতে আমাদের ফাঁসি হবে ঠিকই কিন্তু আমাদের ফাঁসির ভেতর দিয়ে জাতির মনে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত হবে।”

বঙ্গবন্ধু বলেন, “তা ঠিক নয়, বরং পাকিস্তানিরা যত বেশি আমাদের নিপীড়ণ করবে ও তারা যত বেশি প্রমাণ করার চেষ্টা করবে আমরা স্বাধীনতা চেয়েছি, পাকিস্তানিদের ভাষায় যত বেশি এটাকে চক্রান্ত বলা হবে ততই জাতির মনে স্বাধীনতার চেতনা জাগ্রত হবে।”

বাস্তবে আগরতলা মামলাকে কেন্দ্র করে সেটাই ঘটেছিল। ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রেও তেমনটি দেখা যায়, অর্থাৎ পাকিস্তানিরা বাংলা ভাষার দাবিকে যত বেশি চক্রান্ত বলার চেষ্টা করে ততই বাঙালির মনে ভাষাকে ঘিরে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা জাগ্রত হয়। বঙ্গবন্ধুর আগরতলা মামলাকে কেন্দ্র করে তেমনিই স্বাধীনতার চেতনা বাঙালি জীবনে জাগ্রত হয়। সুতরাং বঙ্গবন্ধু যে প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন তৈরির আগে এই ছাত্র রাজনীতির ধারাকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ধারায় নেয়া যাবে এমনটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেটা স্পষ্ট হয়। কারণ, পরবর্তীতে পাকিস্তানিদের নিপীড়ণের মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদ জাগ্রতই হয়েছিল এবং ছাত্রলীগ সেটাই তাদের মূল আদর্শ বলে ধারণ করে। তাই এ সিদ্ধান্তে নিশ্চিত আসা যায় যে, ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু যখন মুসলিম ছাত্রলীগের পরিবর্তে ছাত্রলীগ গঠন করেন তখন তিনি নিশ্চিত যে ওই সময়ের চলমান ভাষার দাবিকে আন্দোলনে রূপান্তরিত করতে পারলে ওই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে ছাত্রলীগ বাঙালি জাতীয়তাবাদের আদর্শে নিজেকে পুষ্ট করবে এবং ছাত্রলীগই এদেশে একটি প্রগতিশীল না হোক, আধা প্রগতিশীল রাজনৈতিক দল গড়ে তোলার পথ উন্মুক্ত করবে। কারণ, বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের রাজনীতি পর্যালোচনা করলে এটাই পরিষ্কার হয় যে, বঙ্গবন্ধুর ধারণা খুব পরিষ্কার ছিল, তরুণরা যে বেগে এগুতে পারে প্রবীণরা ওই বেগে পারে না। তাই ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ নামে হলেও ওই মুহূর্তে শতভাগ ধর্মীয় আবরণের বাইরে এসে কোন বৃহত্তর রাজনৈতিক দল গড়ে তোলা সম্ভব নয়। আর এই সুচিন্তিত পথেই বাঙালি জাতীয়তাবাদের লক্ষ্যে পূর্ব বাংলায় প্রথম প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন গড়ে তোলেন বঙ্গবন্ধু । ৪ জানুয়ারি তৈরি ছাত্র সংগঠনকে নিয়ে তিনি তার মাত্র ২ মাস পরে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ রাজপথে নামেন। অর্থাৎ সেদিন ঢাকায় ভাষার দাবিতে তাঁর তৈরি ছাত্র সংগঠনকে তিনি হরতাল সফল করাতে সার্বিকভাবে রাজপথে নামান। সেদিন তাদের পিকেটিং এ সফল হরতাল হয়। এভাবে ভাষার দাবির আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগকে শুরু থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের আন্দোলনের ধারায় প্রবাহিত করেন ।

আবার বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি সব সময়ই বিশ্বাস করতেন, রাজনৈতিক সংগঠনে অবশ্যই রাজনৈতিক কর্মসূচীর মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটানোর পক্ষে কাজ করতে হবে। ওই সংগঠনের পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে কোন কর্মসূচি ও সঙ্গে সঙ্গে কর্মকাণ্ড না থাকে তাহলে ওই কোন মতেই তারা টিকে থাকবে না। বঙ্গবন্ধু তাই ছাত্রলীগ গঠন করে দেবার পরপরই তার সঙ্গে অর্থনৈতিক কর্মসূচি বা সাধারণ মানুষের জন্যে কর্মসূচি যোগ করার জন্যে সচেষ্ট থাকেন। আর এটা তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। তাই তিনি সহজেই একাত্ম হন ৩ মার্চ ১৯৪৯ এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা তাদের বেতন ভাতার দাবিতে আন্দোলন শুরু করলে তাদের নেতৃত্ব দিতে। বঙ্গবন্ধু মনেপ্রাণে সেটা শুধু সমর্থন করেন এবং নেতৃত্ব দেন না। তিনি তার সৃষ্ট তরুণদের সংগঠন ছাত্রলীগকেও সে কাজ নামিয়ে দেন। এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তার ছাত্রত্ব চলে যায়। বঙ্গবন্ধু সেটা মেনে নেন। বরং ঘৃণাসহ প্রত্যাখান করেন মুচলেকা দিয়ে ছাত্রত্ব ফিরিয়ে নেবার বিষয়টি। যে কারণে বঙ্গবন্ধু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বা চিত্তরঞ্জন দাশের মত বড় আইনজীবী হতে পারেননি। সেদিনের আইনের ছাত্র শেখ মুজিবের ছাত্রত্ব থাকলে তিনি আইনশাস্ত্রে মাস্টার্স করতেন। আর আইনজীবী হলে তিনি সোহরাওয়ার্দী বা চিত্তরঞ্জন দাশের মানেরই হতেন। তার বাগ্মীতা, তার দূরদৃষ্টি, প্রখর বুদ্ধি সেটাই বলে দেয়। অবশ্য তাতে তার কোন ক্ষতি হয়নি। বরং ওই দরিদ্র কর্মচারীদের পক্ষে আন্দোলন শুরু করার ভেতর দিয়ে তিনি যে পথে এগিয়েছিলেন সেটাই তাকে নিয়ে গেছে অন্য এক হিমালয়ের চূড়ায়। তিনি ছাত্রলীগসহ তার সৃষ্ট সব সংগঠন তাদের জন্যে যে আদর্শ রেখে গেছেন তা হলো- সাধারণ মানুষের মুক্তিই হবে যে কোনো আন্দোলনের ও রাজনীতির মূল লক্ষ্য। আর এই লক্ষ্যকে বুকে ধারণ করে সব কালের সব প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করবে এই বলে যে, তিনি শুধু আমাদের জাতির পিতা নন, সারা পৃথিবীর মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির অন্যতম এক দূত।

লেখক: কলাম লেখক, সাংবাদিক

এই বিভাগের আরো সংবাদ