বিশাল রোহিঙ্গা সমাবেশ কি স্বাভাবিক ঘটনা?

  আহমদ রফিক

০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:৪৪ | অনলাইন সংস্করণ

নির্যাতিত, নিপীড়িত, গণহত্যার শিকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছিল আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে, মানবিক বোধের বিবেচনায়। বিষয়টি তখনই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে নানা আশঙ্কার নিরিখে। সম্ভাব্য আশঙ্কার চেয়ে মানবিক মূল্যবোধই তখন প্রধান বিবেচ্য বিষয় হয়ে ওঠে জীবন রক্ষার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যুক্তিতে।

ক্রমে দেখা যেতে থাকল উখিয়া থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের শিবির ঘিরে একের পর এক সমস্যা। মাদক কারবার থেকে সন্ত্রাসী তৎপরতা, এমনকি অনৈতিকতার মতো বিষয়াদি, এমনকি তা নারীঘটিত। রোহিঙ্গা তরুণদের একাংশে চরম স্বেচ্ছাচারিতা। আশ্রয়শিবিরের কর্তৃপক্ষের নমনীয় আচরণের সুযোগে।

রোহিঙ্গাদের নিয়ে খেলা শুরু একাধিক শক্তির দেশি-বিদেশি; বিশেষ করে এনজিওগুলো হয়ে ওঠে অর্থনৈতিক স্বার্থ অর্জনের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান শক্তি। অন্যদিকে বিদেশি শক্তির রাজনৈতিক স্বার্থের খেলা। জনসংখ্যাটি তো যথেষ্ট বড় অঙ্কের। এবং ১০ লক্ষাধিক। আশঙ্কা হচ্ছে, অচিরেই তা দ্বিগুণ হতে বেশি কষ্ট পোহাবে না।

সর্বোপরি তখন বড় আশঙ্কা ছিল তাদের প্রত্যাবাসন নিয়ে, বিশেষ করে মিয়ানমারের শাসকগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি ও তৎপরতার কারণে। অনিশ্চয়তার আগুনে কে ঝাঁপ দেয়। কাজেই রোহিঙ্গারাও ওই একই নীতি অনুসরণ করে চলেছে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে। তা হলে পরিস্থিতি যা দাঁড়াবে, তা কি বাংলাদেশের পক্ষে গ্রহণযোগ্য হবে? নাকি তাদের জন্য বিহারিদের মতো অনুরূপ জেনেভা ক্যাম্প খুলতে হবে।

মনে হচ্ছে, আমাদের সূচনালগ্নের কথিত আশঙ্কাই সত্যে পরিণত হতে চলেছে। এ তো আসলে মূল সমস্যা—এককথায় ভূ-রাষ্ট্রনৈতিক সমস্যা। কিন্তু ঘটনার পর ঘটনায় পানি ক্রমেই ঘোলা হতে হতে তাৎপর্যপূর্ণ নতুন সমস্যার ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছে। এবং তা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সুসংগঠিত রোহিঙ্গা সমাবেশের মধ্য দিয়ে।

দুই.

কেউ ভাবেনি, কল্পনাও করেনি যে অর্থহীন, বিত্তহীন, আশ্রয়চ্যুত শিবিরবাসী রোহিঙ্গারা লক্ষাধিক সংখ্যায় একটি বিরাট সমাবেশে মিলিত হবে, হতে পারবে। কে বা কারা তাদের অর্থ জোগাবে, উৎসাহিত করবে সংঘবদ্ধ শক্তি নিয়ে বিশাল এক সুসংহত অপ্রত্যাশিত সমাবেশ ঘটাবে। অপ্রত্যাশিত ঘটনা সত্য হয়ে উঠেছে। তাদের মধ্যে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নেতারও আবির্ভাব ঘটে গেছে।

যুক্তিবাদী মানুষ বলতে পারেন, পরিস্থিতিই নেতার জন্ম দেয়। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিষয়টি এত সহজ, সরল ও যুক্তিসম্মত বলে মনে হয় না। স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদী চরিত্রের বলেও মনে হয় না। কারণ রোহিঙ্গাদের জন্য আশ্রয়শিবির খোলার পর থেকে এখানে একাধিক অশুভ শক্তির খেলা শুরু হয়ে গেছে। এ দূষিত খেলার অন্যতম একটি মাধ্যম শক্তিমান এনজিওগুলো।

স্বভাবতই বিশাল, সুসংহত এ সমাবেশ নিয়ে স্থানীয় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা দেখা দিচ্ছে। আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মনে প্রশ্ন, ঘটনার চরিত্র লক্ষ করে এটা কি স্বাভাবিক ঘটনা, নাকি কোনো ভবিষ্যৎ অঘটনের অশনিসংকেত? এ ঘটনাটিকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের কোনো সহজ-সরল তৎপরতা হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভবত সরকারের পক্ষে ঠিক হবে না। দরকার হবে সর্বাত্মক তীক্ষ নজরদারি।

কোনো দেশে গণহত্যার শিকার, আশ্রয়চ্যুত নর-নারী শরণার্থীর এ ধরনের বিশালায়তন সমাবেশ অনুষ্ঠান সম্ভবত এই প্রথম। তাই বিষয়টি নিয়ে সরকারি গোয়েন্দা তরফে বিশেষ অনুসন্ধান, উদ্দেশ্য ও নিহিত সংশ্লিষ্টতা উদ্ঘাটন জনস্বার্থে, রাষ্ট্রীয় স্বার্থে জরুরি বলে আমাদের মনে হয়।

তিন.

বাংলাদেশ সরকার নানা পন্থায় রোহিঙ্গাদের রাখাইনে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ বিষয়টি ঘনবসতিপূর্ণ ছোট আয়তনের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মাথায় এক ভারী বোঝা। এ বোঝা নামানোর জন্য শুধু সরকার নয়, দেশের এলিট শ্রেণি লেখালেখি ও পরামর্শদানে আন্তরিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সরকার সঠিক পদক্ষেপে এ ইস্যু সমাধানে বেইজিং পর্যন্ত ধাওয়া করেছে চীনের সদর্থক সমর্থন আদায় করতে। এবং চীনের আশ্বাস সত্ত্বেও কার্যকর সফলতা অর্জনের জন্য তাদের সঙ্গে অধিকতর রাজনৈতিক কূটনৈতিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। চলছে জাতিসংঘের সঙ্গে যোগাযোগ, কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য।

এ অবস্থায় এমন কী প্রয়োজন দেখা দিল বা নতুন কোনো ঘটনা ঘটল যে আপাত-নিরীহ রোহিঙ্গাদের উগ্র রূপ ধারণ করতে হলো বিশালায়তন সমাবেশ অনুষ্ঠান এবং প্রতিবাদী বক্তৃতার ফুলঝুরি ফোটানোর? এ ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন : তাদের বক্তব্যে কী বার্তা প্রকাশ পেয়েছে? শুধুই কি প্রত্যাবাসনের সমস্যা, নাকি আরো কিছু গভীর উদ্দেশ্য?

এ সমাবেশ অনেক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে এবং প্রতিটি প্রশ্ন বাংলাদেশের জন্য রাষ্ট্রনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিচারে গুরুত্বপূর্ণ। সে প্রশ্নগুলোর সঠিক মানবিক মোকাবেলা বাংলাদেশ সরকারকেই করতে হবে। জাতিসংঘ তার শরণার্থী তহবিল থেকে যত অর্থ সাহায্যই করুক না কেন, সামাজিক-নৈতিক-রাজনৈতিক শৃঙ্খলা রক্ষার দায়দায়িত্ব পুরোপুরি বাংলাদেশের। কারণ এর সঙ্গে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি জড়িয়ে আছে।

তাই আশ্রয়শিবিরের সদস্যদের সর্বপ্রকার নিরাপত্তার দায়িত্ব যেমন বাংলাদেশ সরকারের, তেমনি শিবির সদস্যদের বিশেষ করে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতীদের অবাধ চলাফেরা বন্ধের বা অন্তত নিয়ন্ত্রণের নৈতিক দায়িত্ব সরকারের, আর কারোর নয়।

দরকার এর সঙ্গে সম্পর্কিত এনজিওদের অবাধ তৎপরতা বন্ধ করা। তারা যদি সত্যি রোহিঙ্গাদের উপকারার্থে কিছু করতে চায়, তবে তা সরকারের মাধ্যমে করবে, নিদেনপক্ষে সরকারের জ্ঞাতসারে করবে। আশ্রয়শিবির এড়া পশু-প্রাণী বিচরণের মতো খোলা মাঠ নয়। এই নিয়ন্ত্রণ বিদেশিদের ক্ষেত্রে আরো কঠোরভাবে প্রযোজ্য।

আশ্রয়শিবির নিয়ন্ত্রণের জন্য এমন কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে নিশ্চিত করতে হবে, যারা হবে শতভাগ সৎ, নীতিবান, ন্যায়নিষ্ঠ, শ্রমনিষ্ঠ। সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতিমুক্ত মানসিকতার। এ ক্ষেত্রে যত ঘাটতি হবে, সর্বনাশের পাল্লা তত ভারী হবে। তাই আমরা দেখছি  দৈনিক পত্রিকাগুলোতে বিচিত্র সংবাদ শিরোনাম।

এর সবই নানা বিচারে তাৎপর্যপূর্ণ। আশ্রয়শিবির তদারকিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ কি এ প্রশ্নের জবাব দিতে পারবে, কেন ‘রোহিঙ্গা শিবিরগুলো (এত) দেশি অস্ত্রের ভাণ্ডার?’ এসব অস্ত্র কে বা কারা সংগ্রহ করেছে, কিভাবে সংগ্রহ করেছে? এত অস্ত্র কী কাজে লাগবে, কাদের কাজে লাগবে? এসব প্রশ্নের জবাবদিহি বাংলাদেশের সামাজিক বা রাষ্ট্রিক নিরাপত্তার স্বার্থে জানা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—উখিয়া-টেকনাফ অঞ্চলে এরই মধ্যে রোহিঙ্গারা জনসংখ্যায় স্থানীয়দের টপকে যাচ্ছে, ভবিষ্যতে আরো যাবে। যাবে কক্সবাজারেও। ইস্যু তৈরি হবে স্বার্থ-সংঘাতের—রোহিঙ্গা বনাম বাঙালি। সেটা কারোর জন্যই শুভ ফলদায়ক হবে না। এ ভবিষ্যৎ আশঙ্কার বিষয়টি এখনই সরকারের মাথায় রাখা দরকার। এর ভবিষ্যৎ পরিণাম বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বার্থের পরিপন্থী।

স্থানীয় কর্তৃপক্ষের দুর্নীতির মাধ্যমে রোহিঙ্গা তরুণ ও যুবকরা যে বাংলাদেশি নাগরিকত্বের কাগজপত্র তৈরি করে এ দেশের নাগরিকত্ব অর্জন করছে বলে শোনা যাচ্ছে, এটা বাংলাদেশের জন্য আরেক অশনিসংকেত। এদিকে অনুসন্ধান ও সতর্ক নজরদারি প্রয়োজন। উল্লিখিত প্রতিটি ঘটনা এ দেশের ভূ-স্বার্থের বিরোধী।

এ আলোচনা দীর্ঘ হওয়ার দাবি রাখে। তবু নির্ধারিত পরিসীমার কারণে শেষ করছি একটি চমকপ্রদ সংবাদ শিরোনামে : ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এত মধু’। দৈনিকটির দীর্ঘ প্রতিবেদনে মূলত এনজিওদের রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনবিরোধী ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তাতে মূল কথা, রোহিঙ্গারা এখানে থেকে গেলে তাদের সহায়তার নাম করে বৈশ্বিক সূত্রে বিপুল অনুদান আদায় করা যায় এবং এর বড়সড় অংশ নিজেদের ভোগবিলাসে ব্যয় করা যায়। অনেক তথ্যে এগুলো লিখিত। রোহিঙ্গারা চলে গেলে এ মধুর উৎস বন্ধ হয়ে যাবে। তাই প্রতিবেদকের অভিযোগ-রোহিঙ্গাদের নাকি প্ররোচিত করা হচ্ছে না যেতে। সরকার কি এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে?

লেখক : কবি, গবেষক, ভাষাসংগ্রামী

এই বিভাগের আরো সংবাদ