আমাদের সময় এখন এগিয়ে যাওয়ার

  সালেহউদ্দিন আহমেদ

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৮:২৩ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ এখন যে পর্যায়ে আছে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে যে আমরা একটা সন্তোষজনক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি। অন্যান্য দেশের তুলনায়, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় আমাদের অবস্থান ভালো। এখন আমাদের দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাওয়ার সময়। এটা অর্জন করতে অনেক সময় লেগেছে। এখন এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু আমাদের সামনে কতগুলো সমস্যা, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ আছে। সেগুলোকে মোকাবেলা করেই এগিয়ে যেতে হবে। চ্যালেঞ্জগুলো কী নিয়ে? সেটা হচ্ছে, কিভাবে আমরা দ্রুত এগিয়ে যাব- চ্যালেঞ্জ সেসব বিষয় নিয়েই। সর্বাগ্রে এ বিষয়গুলোর প্রতি আমাদের জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে আমি মনে করি।

এখানে প্রথমত আমি দুটো বিষয়ের ওপর জোর দিতে চাই। একটা হচ্ছে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ে। শুধু আর্থিক বা শুধু সামাজিক বিষয় নয়; একই সঙ্গে দুটো বিষয়—অর্থনৈতিক ও সামাজিক। এর মধ্যে প্রথমেই আছে রোহিঙ্গা প্রসঙ্গ। একটি বিশাল জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে এবং তাদের জীবনের সব রকম ব্যবস্থা সরকার করেছে। এটা কিন্তু বেশ চ্যালেঞ্জিং বিষয়। আমি রাজনৈতিক বিশ্লেষণের দিকে যাচ্ছি না। প্রায় ১২ লাখ মানুষকে বাংলাদেশ আশ্রয় দিয়েছে। এটা দীর্ঘদিন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। আমাদের ওপর এটা এখন বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে বিষয়টা বড় হয়ে সামনে এসেছে—রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে অনিশ্চয়তা। প্রত্যাবাসন যদি শুরুও হয়, মিয়ানমার যে শর্ত জুড়ে দিচ্ছে, প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণে রোহিঙ্গাদের তারা গ্রহণ করবে—সেটা কিন্তু খুবই কম। এভাবে করলে অনেক দিন সময় লেগে যাবে। এটা তো একটা জটিল ব্যাপার।

প্রথম কথা হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের একটা মানবেতর জীবন থেকে বের করে এনে তাদের জীবনযাপনের জন্য একটি ভালো ব্যবস্থা করা হয়েছে। এতে কিন্তু বাংলাদেশের একটি বড় সম্পদ, রিসোর্সের প্রয়োজন পড়ছে। এখানে দুটো বিষয় আছে—হিউম্যান রিসোর্স ও আর্থিক রিসোর্স। প্রথমে তো বাংলাদেশ একাই সব দায়দায়িত্ব নিয়েছে; পরে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক সংস্থা এগিয়ে এসেছে। এখন দেখা যাচ্ছে, রোহিঙ্গাদের যারা সাহায্য-সহযোগিতা করছিল, স্থানীয় এনজিও বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিষ্ঠানগুলো—তাদের সহায়তা ও সাহায্য আস্তে আস্তে কমে আসছে। এটা কিন্তু চিন্তার বিষয়। বেশ সময় অতিবাহিত হয়েছে। এর মধ্যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে দিতে যতটা আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি করা দরকার ছিল, সেটা আমরা করতে পারিনি। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখের বিষয়। এক হিসেবে আমরা ব্যর্থ হয়েছি যে আন্তর্জাতিক চাপটা সেভাবে তৈরি করতে পারিনি। এটা নানা কারণে হয়েছে। আবার দেশ-বিদেশের সাহায্য ও সহযোগিতা কমে আসছে, আবার রোহিঙ্গারা যে তাদের নিজ দেশে ফিরে যাবে, সে রকম কোনো লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। ফলে এটা কিন্তু একটা বড় ধরনের আর্থিক ও সামাজিক সমস্যা।

রোহিঙ্গারা আমাদের কক্সবাজারের একটা বিশাল অঞ্চল দখল করে আছে। তারা সেখানকার সুন্দর পরিবেশ প্রায় শেষ করে দিয়েছে, যেখানে বড় সম্ভাবনা ছিল পর্যটনশিল্পের জন্য। সেটা তো হলো না। আবার তারা সেখানে দীর্ঘদিন থাকার কারণে স্থানীয় মানুষের জন্য সমস্যা তৈরি হচ্ছে। তারা নানা ধরনের অকাজে জড়িয়ে পড়ছে; খুনের মতো ঘটনাও তারা সংঘটিত করছে। একটা বড় জনপদে তারা একধরনের অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করেছে। এটা আতঙ্কিত হওয়ার মতো বিষয় বটে। আবার আরো একটি বিষয় এখানে লক্ষ করার মতো—বিশাল রোহিঙ্গা গোষ্ঠীকে দেখভাল করতে গিয়ে সরকার ও প্রশাসনের কাজে ব্যাঘাত তৈরি হয়েছে। সেখানে সময় দিতে গিয়ে অন্যদিকে তারা আর সময় দিতে পারছে না। ফলে এটা একটা সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। এতে যেটা হয়েছে, সরকারের যে উন্নয়ন কৌশল বা সামাজিক উন্নয়ন, সেগুলো কিন্তু নানাভাবে ব্যাহত হয়েছে। আমাদের নিজেদেরই তো অনেক সমস্যা আছে, যেগুলোতে বিশেষভাবে নজর দেওয়া দরকার। অনেক দরকারি কাজ এগিয়ে নেওয়া দরকার। সেসব কিন্তু সেভাবে করা যায়নি রোহিঙ্গাদের জন্য আলাদা করে সময় দিতে গিয়ে। আর রোহিঙ্গা সংকট তো আমাদের নিজেদের সমস্যা নয়। এটা বাংলাদেশ তৈরি করেনি কিংবা রোহিঙ্গাদেরও এখানে সেভাবে কোনো দোষ নেই। এটা সম্পূর্ণভাবে মিয়ানমার সরকারের দোষ এবং তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক বিষয়। কারণ এটা তৈরি করেছে মিয়ানমার সরকার। ফলে এমন একটি উটকো সমস্যার কারণে আমাদের নিজেদের অনেক সমস্যা আটকে গেছে, যেগুলোর সমাধান করার বিশেষ দরকার ছিল।

আমাদের নিজেদের যে সমস্যাগুলো আছে—আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে তাকালে দেখতে পাব যে আর্থ-সামাজিক সমস্যা আছে, যেগুলোতে সেভাবে উন্নয়ন হয়নি। আমাদের এখানে বিনিয়োগ কম। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। সরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে। সরকারি বিভিন্ন মেগা প্রজেক্টে ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু সেগুলো তো কর্মসংস্থান তৈরিতে কোনো ভূমিকা রাখছে না বা জীবনধারণের ওপর সেগুলোর সরাসরি উপকার কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পাওয়া যাচ্ছে না। এগুলো হয়তো দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা আনবে, তাত্ক্ষণিক কোনো উপকার আনতে পারছে না। আমাদের কর্মসংস্থান কমে গেছে। ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে উন্নয়ন হয়েছে; কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়েনি, কমে গেছে। নতুন যারা আসছে তারা কাজ পাচ্ছে; কিন্তু যারা পুরনো শ্রমিক তাদের অনেকে ঝরে পড়ছে। এর পেছনে অনেক কারণ আছে। আমাদের ছোট ও মাঝারি শিল্প যেগুলো আছে, সেগুলোতে সরকারও খুব একটা উৎসাহ দিচ্ছে না, ব্যাংকগুলোও সেভাবে এগিয়ে আসছে না। রাজস্ব আয় কমে গেছে। এটা সরকারের বাজেটের ওপর চাপ পড়বে। বার্ষিক উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ প্রত্যাশা অনুযায়ী হচ্ছে না। এখানে নানা ধরনের অদক্ষতা ও অর্থ অপচয়ের ব্যাপার আছে। আর একটি বিষয় যেটা আমাদের সবাইকে পীড়িত করে, সেটা হচ্ছে খেলাপি ঋণ যে বেড়ে যাচ্ছে, নানাভাবে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। ফলে এ বিষয়ে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। ঋণখেলাপি যাঁরা করছেন, তাঁরা ধরেই নিয়েছেন যে তাঁদের ছাড় দেওয়া হবে এবং বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। ফলে তাঁদেরও অতটা জোর ইচ্ছা নেই শোধ দেওয়ার। এতে বরং সরকারের দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে, একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকেরও। এতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। ব্যাংকের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা কমেছে, ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আর এতে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা। তারা ঋণ পাচ্ছে না।

পুঁজিবাজারের অবস্থাও ভালো না, তার অবস্থান ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। ইদানীং শুনতে পাচ্ছি, সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করে কিছু আইপিওর অনুমোদন দিয়েছে। এতে যেটা হয়, টাকা-পয়সা উঠিয়ে নিয়ে বিনিয়োগকারীরা চলে যায়। এ সমস্যাগুলো আমাদের উতরে যেতে হবে। এ বিষয়গুলো দ্রুত ওভারকাম করতে না পারলে আমরা এগিয়ে যেতে পারব না।

পৃথিবীর নানা উন্নয়নশীল দেশ এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুতগতিতে। আমাদেরও সেভাবে এগোতে হবে। এখন যে বিষয়গুলোতে নজর দিতে হবে, সেটা হলো অভ্যন্তরীণ দরকারি বিষয়। বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর না করে নিজেদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে হবে। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করার ক্ষেত্রে আমাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি বলে মনে করি। আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা বাড়াতে হবে—সরকারি, আধাসরকারি, নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যাংকিং খাত—এসব প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এখন যে নানা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি হচ্ছে, সেই দুর্নীতি দূর করে দক্ষতা বাড়াতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা থাকলে কোনো সরকারই ভালো কিছু করতে পারবে না। আমাদের বড় বড় কাজের যে প্রক্রিয়া, এতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আছে। সরকারি লাইসেন্স নেওয়া বা অনুমোদন নেওয়ার ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা আছে। একজন বিনিয়োগকারী কোনো ব্যবসা খাতে বিনিয়োগ করতে গেলে ১২ থেকে ১৩ জায়গার অনুমতি বা লাইসেন্স নেওয়া লাগে এবং এসব ক্লিয়ারেন্স পাওয়া কিন্তু অত্যন্ত জটিল বিষয়। ফাইন্যান্স, ব্যাংকিং, বিডা, সিটি করপোরেশন, পরিবেশ অধিদপ্তর প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র লাগে। এসব স্তর পেরিয়ে সময় যেমন বেশি লাগে, নানা ধরনের হয়রানিরও ব্যাপার আছে। এসব জটিলতা দ্রুত কমিয়ে ফেলতে হবে। সব ধরনের কাজের জবাবদিহি দরকার। নানা ধরনের অস্বচ্ছতা আছে। এগুলো দূর করতে হবে। জটিল যেসব প্রক্রিয়া আছে, আইন ও বিধি আছে—সময় ও ধরন অনুযায়ী এগুলোর যথাযথ সংস্কার করে জনগণের ভোগান্তি কমিয়ে আনতে হবে। আর সব কিছুকে ছাপিয়ে রাজনৈতিক স্বচ্ছতাও দরকার। এখানে দোষারোপের রাজনীতি চলে। একদল আরেক দলকে দোষারোপ করে চলে, আর একদল ভাবে যে অন্যরা ষড়যন্ত্র করছে। এসব ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা নিজেরাই ঝগড়া করছি নিজেদের বিষয় নিয়ে। কাজেই মিয়ানমার তো সুবিধা নেবেই। মিয়ানমার আর্মি খারাপ ও ভালো যা-ই করুক, একমত নিয়ে করে। কোনো দ্বিমত নেই। আমাদের এখানে বহু মত। এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। জনগণের মতামতের ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে তাদের প্রতি সহমর্মিতা ধারণ করে যদি নীতি ও কৌশল নিয়ে যথাযথ বাস্তবায়ন করা হয়, তবেই এ দেশ দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। 

লেখক : বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর
অনুলিখন : মাসউদ আহমাদ

এই বিভাগের আরো সংবাদ