রাজনীতিহীনতায় রাজনীতি

  ফাহমিদ হক

২৭ অক্টোবর ২০১৯, ২০:১৭ | আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০১৯, ১৫:৫৯ | অনলাইন সংস্করণ

প্রিয় বাংলাদেশ, এতটাই নিষ্ঠুর তোমার রাজনীতি! একটা পরিবারে বাবা-মা, ভাই-বোন প্রত্যেকেরই আলাদা মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও; দেশের স্বার্থে, রাষ্ট্রের স্বার্থে কোন সরকারের আমলে তার জনগণের ভিন্ন মতামতকে নেয়ার মতো সভ্য, শিক্ষিত, সহনশীল আমরা আজো হইনি। রাজনীতি মানেই আজ অন্ধ অনুসরণ, জি হুজুর জি হুজুর, আর প্রতিক্রিয়াশীলদের মাত্রারিক্ত আস্ফালন। বিএনপি'র সমালোচনা করলে বলবে- দালাল, আর আওয়ামী লীগ-এর সমালোচনা করলে বলবে- জামাত, বিএনপি, রাজাকার। ইসলামের প্রসংশা করলে বলবে- মৌলবাদ। আর অন্য ধর্মের আনন্দ উৎসবে অংশগ্রহনে সহযোগিতা করলে বলবে নাস্তিক। এক অস্হির সময়ের গেরাকলে পিষ্ঠ হতে হতে বোধ শক্তি হারিয়ে আমরা নিজেরা আজ কি? সেটা নির্ধারণের বোধ শক্তিটুকুও আজ  হারাতে বসেছি। হায় রাজনীতি! এটাই তোমার নিয়তি!

ষাটের দশকে পাকিস্তানের সামরিক শাসক জেনারেল আইয়ুব খান ও তার গভর্নর মোনায়েম খান সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেডারেশন (এনএসএফ) তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনের সহযোগী হিসেবে ক্রমবর্ধমান গণপ্রতিরোধকে বাঁধা দেওয়ার কাজে নিয়োজিত ছিলো। এরা প্রতিবাদের সব তৎপরতা নিশ্চিহ্ন করার জন্যে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ত্রাস ছড়াত। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনকারীদের হামলা করতো। এমনকি শিক্ষকদেরও রেহাই দিতো না। 

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ছাত্র সংগঠনের সহিংস আচরণ ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর রাষ্ট্র সমর্থিত সহিংসতা সামরিক শাসনের সময় থেকে শুরু হয়েছে। দু:খজনক ভাবে দেশ স্বাধীন হয়েছে ঠিকই কিন্তু আজ অবধি সহিংসতা কমেনি বরং প্রত্যেক সরকারের আমলে আগের চেয়ে বেড়েই চলেছে। সরকার আসে সরকার যায় কিন্তু শিক্ষা, রাজনীতির নীতিতে গুনগত পরিবর্তন হয় না। মূল কথা হচ্ছে, যখন যেই সরকার ক্ষমতায়, রাজনীতিতে কেবল তার একছত্র আধিপত্য বিস্তার। সহমত সংস্কৃতি, তেলবাজীর সংস্কৃতি কোনকালেই কারো জন্যেই মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। পরিবার, রাষ্ট্র , সমাজে এরা সবচেয়ে ভয়াবহ রুপে ভোল পাল্টিয়ে সময়ের সাথে স্বার্থের  জন্যে নিজেদের পাল্টাতেও দ্বিধা বোধ করে না। স্বার্থের জন্যে এরা কখনো সত্য বলার সৎ সাহস রাখে না। এরা সর্বকালের মহান চাটুকার।

যারা অন্যায় করে, অপরাধ করে তারাই যে নিজের সমর্থন জোগানোর চিন্তা বেশী করে তার প্রমান প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি সাহসী এক নারী, সহজে বুঝা সত্যটুকু অকপটে বলতে দ্বিধা করেননি। স্পষ্ট করেই বলে দিয়েছেন, অপরাধীর দেয়া জন্মদিন উদযাপন তার প্রয়োজন নেই।
বুয়েটের ছাত্র আবরার ফাহাদকে তার নিজেরই ছাত্রাবাসে পিটিয়ে পিটিয়ে মেরে ফেললো। এমন ভয়াবহ ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলো, গোটা জাতিকে কাঁদিয়ে আবরারের খুনিরা প্রমান করলো, মেরুদন্ডটা সোজা রাখতে বিবেকের কাছে ক্ষমতার দম্ভে জিতা যায় না। পাঁচ বছরের শিশু সন্তানকে নিজের পরিবারের হাতে খুন হওয়ার মতো নির্মমতায় জাতি স্তব্দ! প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এমন পাশবিকতা !  এখানেও নিষ্ঠুর এক রাজনীতির খেলা। ধর্মের নামে সবচেয়ে বড় অধর্ম! ভোলায় চার জনকে মেরে ফেলা। একটা হাওয়ায় ভাসা পোষ্টের উপর ভিত্তি করে এমন ঘটনা প্রমান করে, এখানে মানুষ কতোটা অস্হির! সত্য মিথ্যা যাচাই করার সময় পর্যন্ত ধৈর্য্য রাখতে পারে না।

কয়েকজন মিলে একজনকে মারার দৃশ্যের একটি পরিচিত প্যাটার্ন আছে। প্রথমে একজন মারবে কি মারবে না এভাবে এগিয়ে যায়। কিন্তু একবার একজন মারতে শুরু করলে তখন মনস্তাত্বিকভাবে সেটি উপস্হিত অন্যদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং তারাও পেটানোতে অংশগ্রহণ করে। এটি মব সাইকোলজি বা জন-মনস্তত্ত্ব এবং মনস্তাত্তিক প্যাটার্নটি যুবাদের বয়সের ধর্মের কারণে খড়ের গাদায় আগুন লাগার মতো কাজ করে। আবার অপরাধকান্ডের একটি নিজস্ব চরিত্র আছে। দূর থেকে অপরাধকে অপরাধ মনে হয়, কিন্তু অপরাধের গন্ডির মধ্যে একবার ঢুকে গেলে তখন অপরাধ অপরাধীর মনে নিজস্ব একটি যুক্তিবোধ তৈরি করে। যার ফলে অপরাধকে অপরাধীর কাছে আর অপরাধ মনে হয় না। তখন যাকে তারা মারতে থাকে তাকে আর তাদের কাছে মানুষই মনে হয় না। যার কারণে নৃশংসতার নিষ্ঠুরতম উদাহরণ তৈরি হয়ে থাকে।

সবকিছুর পরেও আবরার হত্যার ঘটনাটা ব্যাতিক্রম। কারণ কেবল মেধার দিক থেকে বিবেচনা করলে নিশ্চিত করেই বলা যায় শীর্যস্হানীয় ফলাফল করা ছেলেমেয়েরা সবাই এখানকার । এরা কেউ এমন পিশাচ হয়ে আসেনি। সবাই আদর্শ নিয়ে পড়ালেখা করে নিজেদের যোগ্যতা যাচাই করেই এসেছে। এক্ষেত্রে আবরারকে যারা মেরে ফেলেছে তারাও কম মেধাবী ছিলো না,তাদের বাবা মায়েরাও তাদের সন্তানের এহেন কর্মকান্ডে কম বিস্মিত হননি। সারা দেশের মানুষের মতো শোকাতুর এখন আবরারের খুনিদের বাবা মাও। আবরার আর কোনদিন ইন্জিনিয়ার হয়ে তার বাবা মায়ের মুখ উজ্জ্বল করতে ফিরে আসবেনা একথা যেমন সত্যি তেমনি এতোগুলো ছেলে যারা আবরারকে মেরেছে তাদের সবার মা বাবাও একই কারনে লজ্জিত, এমন পাপ কিভাবে করতে পারলো তাদের এতো মেধাবী ভালো ছেলেরা। এরাও হয়তো আর তাদের সন্তানদের বাবা মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতে প্রকৌশলী হিসেবে দেখবেন না, হয়তো নিজেদের  বুকভরা যন্ত্রনা নিয়ে ছেলেদের চরম শাস্তি পেতেই দেখবেন।

আদর্শ, বায়বীয় একটি চেতনার মতো হলেও ক্ষমতা হচ্ছে প্রধানত অর্থনীতি সংশ্লিষ্ট  নিরেট বাস্তব। মধ্য যুগের সামন্ত প্রথার ভাষায় বললে, ক্ষমতা হচ্ছে নিরেট রাজমুকুট। সিংহাসন এবং রাজদন্ডের মতো বস্তুবাদী একটা বিষয়। এই প্রতিটি বস্তুর উপর অধিকার সে যুগে রাজার ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতো। মধ্যযুগ থেকে আধুনিক যুগ এবং উত্তরাধুনিক যুগে ক্ষমতার সংঙ্গে অর্থনীতির এই নেটওয়ার্কিংটা 
জটিল ও খানিকটা আন্তসাংঘর্ষিক । ক্ষমতা বজায় রাখা হয় সাধারণত একটি অনুসারী বা সমর্থক দল তৈরির মাধ্যমে। আদর্শের প্রকৃত অনুসারীরা সাধারণত এই জায়গাটায় মার খায়। অপর দিকে গজিয়ে ওঠা ফেইক, ভন্ড, আদর্শবদলকারী, ব্যাক্তিপূজায় বিশ্বাসী, দলবদলকারী স্বার্থান্ধ, সুযোগ সন্ধানীরাই মূলত মাঠ দখল করে ক্ষমতা প্রদর্শনে ওস্তাদ। এরা সময়ে শাসক সেজে নিজেদের রাজাধিরাজ ভাবে। সেখানে আদর্শের কথা বলে, গণতন্ত্রের কথা বলে মূলত মাঠটির দখলে আছে কিনা তা মূল বিষয়। সুশীল, আদর্শবাদী, রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিউক্লিয়াস এই অশুভ উপসর্গের মধ্যে উত্থান হোক তা মোটেও চায় না। কিন্তু যখন উপসর্গগুলোকে ফেলাও যায় না, গেলাও যায় না তখনই এরা ভয়ংকর ভাবে দৃশ্যমান হয়ে আসে সমাজে। এরা হাট ডাকা, টোল ডাকা, নির্মাণ কাজের তদারকি করা থেকে শুরু করে চাঁদাবাজী কোনটাই বাদ রাখেনি। আর ক্ষমতাশীলরা এদের আশকারা দিয়ে পালে নিজেদের স্বার্থে। আশকারা পেতে পেতে বেপরোয়া হয়ে যাওয়াও স্বাভাবিক।

বর্তমান সরকারের সফল অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির কারণে নানাভাবে ব্যাপক উন্নায়ন কাজ সম্পন্ন হয়েছে, হচ্ছে। আর ছাত্র রাজনীতির নামে যথারীতি নেতা হয়ে এরা এসব কাজে জড়িয়ে বরং উন্নয়নের কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। যার ফলে সব দায় আসে সরকারের কাঁধে। সব রাজনৈতিক দলের সাথে ক্ষমতার সম্পর্কটা ডান চোখ আর বাম চোখের মতো। আর এই ডান কিংবা বাম চোখের সব কর্মের সফলতা বা ব্যার্থতা যাচাইয়ের মাপকাঠি হচ্ছে নিয়ন্ত্রনের ক্ষমতা। আমরা সবাই সর্দি দেখতে পাই, নাক বা মুখ রুমালে যখন মুছতে হয় তখন কিন্তু এই যে দৃশ্যমান সর্দি নামক রোগ এটা কিন্তু লুকায়িতই থাকে। আর সর্দির ঔষধও ঐ অদৃশ্যকে লক্ষ্য রেখেই প্রয়োগ করা হয়।

এই যে আবরার হত্যাকান্ড এটাতে লক্ষ্য করলে দেখবো, সবগুলো ছেলেই মেধাবী কিন্তু তার মধ্যে কেউ কেউ 
তারা সরকারী দলের সমর্থনে এমন একটা কিছু করে তাদের প্রতি নেতৃত্বের মুগ্ধতা বাড়াতে চেয়েছিলো বলে আবরারকেই টার্গেট করেছিলো। এরা এটাই বোঝাতে চেয়েছিলো, আমাদের নেতৃ এমন একটি ভালো চুক্তি করে আসলো আর তুই কেন সমালোচনা করবি, তুই সমালোচনা করার কেউ না, ব্যাটা তোর এতো সাহস! তোর বিচার করেই প্রমান করা যাবে সরকারের সবচেয়ে বড় মঙ্গল কামনায় কারা? আর দৃষ্টি আকর্ষন মানেই ক্ষমতাটার কাছে যাওয়া। খাসঁ লোক প্রমান করা। কিন্তু এ ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি যে কেবলই অগণতান্ত্রিক,ফ্যাসিবাদি, এবং অন্যায়ের চর্চা এটা তারা খেয়াল করতেই পারেনি। কারণ এরা ক্ষমতার লোভে অন্ধ, এরা ভুলে গিয়েছিলো পাপ আর প্রায়চিত্তের ব্যাবধান। সীমা লঙ্ঘন করে ইতিহাসে কেউ পার পায়নি, সময়ের ব্যাবধানে কিন্তু ষোলআনা সুধে আসলেই ফিরিয়ে দেয়।

এখনো যারা মনে করে, অপরাধ করে সরকার প্রধানের সমর্থন নিয়ে পুলসিরাত নিশ্চিত করবেন এরা কেবলই বোকার স্বর্গরাজ্যের নীচেই বাস করে। প্রকৃত পক্ষে দল সংকটে থাকলে তখন এই স্বার্থবাদীরাই সবার আগে পিঠ বাঁচাতে উধাও হয়ে যায়, ভোল পাল্টায়। যা প্রকৃত আদর্শ অনুসারীরা কখনো করে না। এরা জানে এরা বালিতে মুখ গুঁজে নিষ্ঠুরতাকে আড়াল করতে পারবে না। টিকে থাকতে হলে অন্তত নুন্যতম আদর্শকে পূঁজি করেই টিকে  থাকা সম্ভব।

লেখক : নিউ মিডিয়া কোঅর্ডিনেটর, সিজিএস; পরিচালক, সিসিএন

এই বিভাগের আরো সংবাদ