সুভাষ সিংহ রায়ের জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

  মিল্টন বিশ্বাস

২৫ নভেম্বর ২০১৯, ১৮:৫২ | অনলাইন সংস্করণ

"জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা" (২০১৯) বইটি বাংলাদেশের স্থপতি  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতিসংঘ ভাষণের সংকলিত বই। লেখক, কলামিস্ট ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সুভাষ সিংহ রায় ভাষণগুলোর বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করেছেন।  শেখ হাসিনার ভাষণের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ১৯৭৪ সালের ভাষণ বইতে স্থান পেয়েছে।

সুভাষ সিংহ রায় ১৯৬৬ সালে যশোর জেলায় বিখ্যাত সিংহ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।  সাহিত্য, সংস্কৃতি, রাজনীতি আর লেখালেখির সাথেই তাঁর জীবন। তিনি প্রগতিশীল, মুক্তবুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার অধিকারী একজন মানুষ।  তাঁর এই বইতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণের মাধ্যমে যেসব তথ্য তুলে ধরেছেন সে বিষয়গুলো বিশদতভাবে আছে।  শেখ হাসিনার বাংলা ও ইংরেজিতে দেওয়া ভাষণ বাংলায় প্রকাশ করা হয়েছে।  শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ১৯৯৬ সালে প্রথমবার জাতিসংঘে ভাষণ রাখেন।  ২০০৯ সালে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে টানা  ভাষণ প্রদান করে এসেছেন।  বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হওয়াতে শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে বাংলাদেশ ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতির সমস্যা সমাধানের জন্য বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেছেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের সমস্যা এবং তার সরকার যে সমস্যা সমাধানে কতটা সফলতা পেয়েছে তা বিবরণ রয়েছে ভাষণে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ( জেনারেল অ্যাসেম্বলি) এমন একটা সময়, এমন একটি মঞ্চ, যে  মঞ্চে বিশ্বের সকল দেশের প্রধানগণ উপস্থিত থাকেন। সেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাগণ নিজ নিজ দেশের সমস্যা তুলে ধরেন।  সারা বিশ্বের মানুষ একসাথে শ্রবণ করেন- বক্তারা সেসব বিষয় তুলে ধরেন যা সারা বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়। সেখানে বিশ্ব নেতাদের সামনে দেশের সমস্যা সমাধান তথা বিশ্বের  সমস্যা সমাধানে করণীয়  তুলে ধরা হয়। এই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ভাষণ দান করেন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।  তাঁর মাধ্যমে জাতিসংঘে বাংলাদেশের রাষ্ট্রের পদযাত্রা শুরু হয়।  বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করার মাত্র তিন বছর পর বঙ্গবন্ধু বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের চিত্র তুলে ধরতে পেরেছিলেন। সাহায্য করার জন্য বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানান ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ভাষণে।  বঙ্গবন্ধু বাংলায় ভাষণ দানের মাধ্যমে বাংলাকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন। 

তিনি তুলে ধরেছিলেন যুদ্ধে বাংলার মানুষের উপর নির্যাতনের চিত্র, বাংলাদেশের মানুষের জীবন নিয়ে কিছু মানুষের স্বার্থপরতা, যুদ্ধে মানুষের প্রাণ হারানোর কথা, যুদ্ধ করে দেশের মানুষের না খেয়ে জীবন-মৃত্যুর সাথে সংগ্রামের কথা। এসব অবস্থা থেকে উন্নতি করার জন্য মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান ছিল বিশ্ববাসীর কাছে।

পিতার ভাষণের ২৩ বছর পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা ১৯৯৬ সালের ২৪  অক্টোবর জাতিসংঘে প্রথমবার ভাষণ রাখেন। জাতিসংঘের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি প্রথমে তাঁর বাবার কথা স্মরণ করেন। সেইসাথে দেশে মানুষের কথা বলেন যারা বাঙালির মুক্তির জন্য জীবন দান করেছেন।  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের করুণ ইতিহাস, বাবা হারানোর ঘটনা, নিজের নির্বাসনের কথা তুলে ধরেন। তাঁর ভাষণে দেশের মানুষের কথা  তুলে সবসময়ই ছিল।

জাতিসংঘের ১৩৬ তম সদস্য দেশ বাংলাদেশ।  এই সদস্যপদ পেতে  স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে অনেক সমস্যা হয় চীন ও আমেরিকার জন্য।  সে সময় চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি।  আবার জাতিসংঘের সদস্যপদ পেতে দেয়নি। সদস্যপদ পাওয়ার কিছুদিন পরে বঙ্গবন্ধু জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বাংলায় ভাষণ দেন।  তাঁর ভাষণের কিছু অংশ এমন ছিল এমন " শান্তির  প্রতি যে আমাদের পূর্ণ আনুগত্য তা  এই উপলব্ধি থেকে জন্মেছে যে, একমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই আমরা ক্ষুধা-দারিদ্র্য, রোগ-শোক, অশিক্ষার ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য আমাদের সকল সম্পদ ও শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হব।" বাংলাদেশ বিশ্ব শান্তির জন্য কাজ করেছে সে কথা বলে গেছেন বঙ্গবন্ধু।

 ২০১৭ সালের ভাষণে শেখ হাসিনা উল্লেখ করেন বিশ্ববাসীর শান্তির কথা। সে সময়ে চলছিল মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলিম নির্যাতন। মিয়ানমার সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের নিজের ভূখণ্ড থেকে বের করে দেয়। শারীরিক-মানসিক অকথ্য নির্যাতন চালায়।  ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়, দেশ থেকে বের করে দেয়। তারা প্রাণে বাঁচতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসে।  মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদের দেশে আশ্রয় দেন। এতে বাংলাদেশের সমস্যার কথা চিন্তা করে শেখ হাসিনা বিশ্ববাসীকে  রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়ানোর আহবান জানান ।

বিশ্ববাসী অনেকেই শেখ হাসিনার আহবানে সাড়া দেন। বাংলাদেশের সরকারি সহায়তার পাশাপাশি বেসরকারি   সংস্থাগুলো রোহিঙ্গাদের সাহায্য করে।  তবে বর্তমানে তারা প্রাণে বেঁচে থাকলেও তাদের জীবনের অনেক মৌলিক সমস্যা দেখা দিচ্ছে।  তারা স্বাধীনতা পাচ্ছে না জীবনে চলার পথে। রোহিঙ্গাদের সমস্যা সমাধানে শেখ হাসিনা পাঁচটি প্রস্তাব পেশ করেন। তার প্রথমটি ছিল অনতিবিলম্বে এবং চিরতরে মিয়ানমারে  সহিংসতা এবং জাতিগত নিধন নিঃশর্তে বন্ধ করা।   ২০১৮ ও ২০১৯  সালের ভাষণে তিনি রোহিঙ্গা মুসলিমদের নির্যাতনের কথা বলেন।  রোহিঙ্গারা যে কষ্টে জীবন যাপন করছে তার  বর্ণনা দেন প্রধানমন্ত্রী।

 ২০০৯ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকার দেশে যে সকল অগ্রগতির জন্য কাজ করেছে তাও ভাষণে তুলে ধরেন। এ সময়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রধান কাজ ছিল দেশের দারিদ্র্য সমস্যার সমাধান করা এবং শিক্ষার অগ্রগতি বিশেষ করে নারী শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং বৃত্তি প্রদান করা । স্বাস্থ্য খাতেও অগ্রগতির কথা তুলে ধরেছেন তিনি। শিক্ষাকে সর্বজনীন করার জন্য 'শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য/ শিক্ষার বিনিময়ে টাকা কর্মসূচি চালু করেন।  স্বাস্থ্য সুবিধা বৃদ্ধি করার লক্ষ্যে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক চালু করা হয় । শিশু মৃত্যুর হার কমিয়ে আনা হয়। সুবিধা বঞ্চিতদের সহায়তা দেওয়া হয়। বিভিন্ন ভাতা কর্মসূচি চালু করা হয়। কৃষির উন্নতি করার জন্য  বিভিন্ন কৃষি উপকরণ স্বল্প মূল্যে সরবরাহ  করা হয়।। বীজ বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।  কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহার বৃদ্ধি করা হয়।  কৃষিঋণ প্রদান করা হয়।  

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে যে সকল সমস্যা দেখা দিচ্ছে সেসব সমস্যা মোকাবিলা করার জন্য সহায়তা চান তিনি । প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের কাছে সেইসাথে বিভিন্ন অঞ্চলের জলবায়ু মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানান ।

 ২০১৪ সালের ৬৯ তম অধিবেশনের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী দেশে বিভিন্ন বিষয়ে উন্নতির কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান বাংলাদেশের সরকার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেখানো স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।  তিনি উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে জানান যে বাংলাদেশ অচিরেই উন্নত দেশের কাতারে স্থান করে নিবে।  প্রধানমন্ত্রী প্রত্যেক ভাষণেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের কথা উল্লেখ করেছেন।  বঙ্গবন্ধুর  স্বপ্ন ছিল যে বাঙালি জাতি  শান্তিপূর্ণ  সহ-অবস্থান,  সামাজিক ন্যায়বিচার এবং দারিদ্র্য ক্ষুধা- আগ্রাসনমুক্ত এবং বৈষম্যহীন একটি  সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে অঙ্গীকারবদ্ধ।

আওয়ামী লীগ সরকার দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নির্মূল করার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কারণ শান্তি ও উন্নয়নের পথে বাধা সৃষ্টি করে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস।  সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সরকার জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। দেশে    যুদ্ধোপরাধীদের  বিচার কাজ সম্পন্ন হয়েছে।  দুর্নীতি কমানোর জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরো বেশি তৎপর হতে বলা হয়েছে।  নারী ক্ষমতায়ন বৃদ্ধি, শাসন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।  

সুভাষ সিংহ রায়ের গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই প্রতিটি ভাষণে দেশের উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।  পদ্মা সেতু নির্মাণ, মাথাপিছু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা, তথ্য প্রযুক্তি  প্রয়োগ করা ইত্যাদি কাজের কথা বলেছেন। গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণ, সমুদ্রসীমা জয়ের কথা তুলে ধরেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি এমডিজির কথা উল্লেখ করেন। এমডিজি’র  লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশের সাফল্যের কথা বলেছেন। তিনি ভাষণে ভারতের সাথে ছিট মহল বিনিময়, সমুদ্রসীমা জয়, যুদ্ধপরাধীদের শাস্তি, মাথাপিছু আয়, শিক্ষার হার বৃদ্ধি, মৃত্যু হার কমানো, রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয় তুলে ধরেছেন।  এসব উন্নয়নের জন্য বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের রোল মডেল।

 প্রধানমন্ত্রীর কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার পেয়েছেন তারও একটি বিবরণ দিয়েছেন লেখক এ বইতে। আর প্রধানমন্ত্রী অর্জন করেছেন বাংলাদেশের মানুষের জন্য, সর্বোপরি বিশ্ববাসীর এবং মানব জাতির উন্নতির জন্য।  ১৯৯৯ সালে কৃষিতে অবদানের জন্য সেরেস পদক পান। ২০০০ সালে পার্ল এস বাক  পদক লাভ করেন । তাঁর শাসনামলে বাংলা ভাষা  আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা লাভ করে।  ২০১৪ সালে শান্তি  বৃক্ষ পদক পান । ২০১৫ সালে  চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ পুরস্কার পান । ২০১৩ সালে ক্ষুধা ও দারিদ্র্য  বিমোচনে বিশেষ অবদানের জন্য সাইথ সাউথ পুরষ্কার পান।  ২০১০ সালে এমডিজি অ্যাওয়ার্ড পান। এখন পর্যন্ত তিনি  ৪৩ টি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন । কিন্তু এ বইতে ২০১৫ সাল পর্যন্ত পুরস্কারগুলোর চিত্র রয়েছে। সর্বোপরি এই বইয়ে শেখ হাসিনার অবদানগুলো বৈশ্বিক পরিমণ্ডলের আলোয় তুলে ধরেছেন লেখক সুভাষ সিংহ রায়।গ্রন্থটির বহুল প্রচার কাম্য।

(জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সুভাষ সিংহ রায়, অনন্যা, প্রচ্ছদ : ধ্রব এষ, ২০১৯, মূল্য : ৪০০ টাকা।)

লেখক : কলামিস্ট, প্রাবন্ধিক, কবি।

এবিএন/জসিম/তোহা

এই বিভাগের আরো সংবাদ