ভারত-মার্কিন সহযোগিতাই ঠেকাতে পারবে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের বিপদ

  কেনেথ আই জাস্টার

২৭ নভেম্বর ২০১৯, ১৭:২২ | অনলাইন সংস্করণ

কেউ কি ভাবতে পেরেছিল, সামান্য একটি ছাতাপড়া ‘মেলন’ জাতীয় ফলের ভিতর লুকিয়ে রয়েছে অগণিত মানুষের জিয়নকাঠি? হ্যাঁ, পেনিসিলিন—এটাই হল সর্বপ্রথম অ্যান্টিবায়োটিক। আবিষ্কৃত হয়েছিল ১৯২৮-এ। আমরা জানি, আবিষ্কার করেছিলেন ব্রিটিশ বিজ্ঞানী আলেকজান্দার ফ্লেমিং। তবু ১৯৪২-এর আগে অবধি ক্যানটালোপের ভিতরে সঞ্চিত রহস্যের সাহায্যে পেনিসিলিয়ামের বাণিজ্যিক উৎপাদন সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হাজার হাজার অসুস্থ সৈনিকের জীবনদায়ী পেনিসিলিয়াম উৎপাদনের সূত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের ঔষধ শিল্প দ্রুত বিকশিত হতে পেরেছিল।

আমরা জানি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আহত সৈনিকরা যত সংখ্যায় না মরেছিল, তার তুলনায় বেশি সৈনিকের বেঘোরে প্রাণ গিয়েছিল নানাবিধ ইনফেকশন সারাতে না-পারার কারণে। উল্লেখযোগ্য ঘটনা এই, পেনিসিলিয়াম মিরাকল বা চমৎকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকাল থেকে মানবসভ্যতার কাছে বিরাট এক আশীর্বাদ হয়ে উঠল, আমরা আগের বিপদটির পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সক্ষম হলাম। নিউমোনিয়া এবং নানা ধরনের চর্মরোগের মতো সাধারণ অসুখে মৃত্যুর ব্যাপক হারটিও হঠাৎ করে কমিয়ে আনা সম্ভব হল। এই যে অগ্রণী এক যুগ এসে গেল, অনেকের মতে, সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইতে আমরা নিশ্চিতরূপে জয় ছিনিয়ে আনতে পারলাম। পেনিসিলিনের কার্যকারিতা হ্রাসের প্রাথমিক লক্ষণগুলির মোকাবিলা করা গিয়েছিল নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের মাধ্যমে। তার ফলে, ১৯৮৫ সালে এসেও ইনফেকশাস ডিজিজেস সোসাইটি অফ অ্যামেরিকা তার বার্ষিক অধিবেশনে—সংক্রামক ব্যাধির জন্য স্পেশালিস্ট বা বিশেষজ্ঞদের আদৌ প্রয়োজন আছে কি না—এরকম একটি প্রশ্ন তোলার অবকাশ পেয়েছিল।

অথচ, তার পর ৩৫ বছর পেরনোর আগেই আমাদের সামনে নতুন এক কঠিন বাস্তব এসে হাজির হয়েছে যে, এই সমস্ত জীবনদায়ী ওষুধ আর বেশিদিন কার্যকরী নাও থাকতে পারে। এই যে নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসায় নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে যাচ্ছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এর নাম দিয়েছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্টান্স (এএমআর)। সারা পৃথিবীতে মানুষের স্বাস্থ্যের সামনে যে ভয়ঙ্কর দশটি বিপদ উপস্থিত হয়েছে, এএমআর তারই একটি। বছরে ২ লক্ষ ১৪ হাজার নবজাতকের মৃত্যুর কারণ এএমআর প্যাথোজেনস অথবা ‘সুপারবাগস’। ‘প্যাথোজেন’ শব্দের বাংলা করা যায় ‘রোগের জনক’ বা যে ‘এজেন্ট’ রোগসৃষ্টির জন্য দায়ী। অন্যদিকে, ‘সুপারবাগ’ হল সেইসব মারাত্মক জীবাণু—নির্দিষ্ট জীবাণুপ্রতিরোধী ওষুধ প্রয়োগের পরেও যারা নির্বিকার থাকতে পারে। অর্থাৎ প্রতিটি ‘এএমআর প্যাথোজেন’ই হল জীবনঘাতী ‘সুপারবাগ’। বিশ্বজুড়ে এএমআর বেড়ে চলেছে। বলা দরকার, এটা পৃথিবীর যে-কোনও জায়গার যে-কোনও বয়সি মানুষের ক্ষতি করতে পারে। সামান্য ব্যাকটিরিয়াসংক্রমণের কারণে একসময় হরবখত মানুষ মারা যেত। ভয় হচ্ছে যে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টান্সের বিপদ সেই ফেলে আসা দুঃসময়কেই না ফিরিয়ে আনে!

সোজা করে বললে বলতে হয় যে, অ্যান্টিবায়োটিকের মতো অমূল্য সম্পদের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে আমরা একেবারে ‘কেয়ারলেস’। আমরা এতটাই অবিবেচক যে অ্যান্টিবায়োটিক নিজেদের উপর এবং পশুদের উপরেও মুড়িমুড়কির মতো প্রয়োগ করে থাকি। এই যে সমস্যা তার মূলে আমাদের মধ্যে চারিয়ে যাওয়া কিছু সাধারণ ভুল ধারণা, যেমন ঠান্ডালাগা বা জ্বরজ্বালাতেও অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে—অথচ, বাস্তবটা হল, এইসব অ্যান্টিবায়োটিক কোনোভাবে ভাইরাসের ক্ষতি করতে পারে না। এবংবিধ ভুল ধারণা থেকেই আমাদের ভিতর অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহারের বদঅভ্যাস গড়ে উঠেছে এবং কিছু ডাক্তারও প্রয়োজনের অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ার বা ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে চলেছেন। সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে, হাসপাতালগুলিতে যত ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল’ ব্যবহার হচ্ছে তার প্রায় অর্ধেকের কোনও প্রয়োজন নেই অথবা যেমনভাবে ব্যবহার করা দরকার ঠিক সেইভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে না।

অ্যান্টিবায়োটিকের আনাড়ির মতো এবং লাগামছাড়া ব্যবহার চলছে অন্যপ্রাণীদেরও উপর। যখন অগণিত মানুষের জীবনরক্ষার তাগিদে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা অক্ষুণ্ণ রাখা কর্তব্য, তখন এই ধরনের অনেকগুলি ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে—খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত কিংবা খাদ্যপ্রদায়ী পশুপাখিদের দ্রুত দৈহিক বৃদ্ধির লোভ নিয়ে। পশুপাখির রোগসংক্রমণের চিকিৎসায় যত না তারা এইসব ওষুধ ব্যবহার করছে, তার চেয়ে বেশি করছে উপরোক্ত বাণিজ্যিক কারণে। চার দশকের বেশি হয়ে গেল, নতুন শ্রেণীর কোনও অ্যান্টিবায়োটিক ‘ডেভেলপ’ করা সম্ভব হয়নি, তার মধ্যে চলা এই কাণ্ডটিকে উপদ্রবকর বলেই মনে হচ্ছে।

‘এএমআর থ্রেট’-এর মোকাবিলায় ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পারস্পরিক সহযোগিতার নেপথ্যে রয়েছে একটি ‘কমন ইন্টারেস্ট’। বিশ্বজুড়ে যেসব দেশে মাথাপিছু অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, যুক্তরাষ্ট্র তাদের অন্যতম একটি। অন্যদিকে, অ্যান্টিবায়োটিকের সবর্মোট ব্যবহারের প্রশ্নে ভারত অন্য সমস্ত দেশকেই পিছনে ফেলে দিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জিং সিচুয়েশনেও বলতে চাই যে, আশা হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থায় কিন্তু আমরা পৌঁছে যাইনি। একটা সম্ভাবনাময় সমাধানের লক্ষ্যে পৌঁছনোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত দুই দেশই অভিনব শক্তিতে সমুজ্জ্বল হয়ে উঠতে অভ্যস্ত।

ওষুধ আবিষ্কারের প্রশ্নে এবং সংক্রামক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াইতে যুক্তরাষ্ট্র একটি অগ্রণী দেশ। ভারতের রয়েছে সমৃদ্ধ ফার্মাসিউটিকাল সেক্টর এবং প্রাণচঞ্চল পাবলিক হেলথ কমিউনিটি। সমস্যাগুলিকে বিভিন্ন দিক থেকে মোকাবিলা করার কাজটি আমরা ইতিমধ্যেই শুরু করেছি। এর মধ্যে রয়েছে হাসপাতালগুলির রোগসংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আরও চাঙ্গা করা, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল-রেজিস্টান্ট ইনফেকশনের উপর নজরদারির ব্যবস্থা গড়ে তোলা, এএমআর সল্যুশানের বিষয়ে যেসব বিজ্ঞানী ও গবেষক কাজ করছেন তাঁদের পাশে দাঁড়ানো এবং জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় নতুন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ডেভেলপমেন্টের জন্য তহবিল জোগানো।

এএমআর বিষয়ে গবেষণা ও নীতিনির্ধাণের উদ্দেশ্যে কলকাতায় একটি নতুন হাব গড়ে তোলা হয়েছে। সেটির উদ্বোধন উপলক্ষে গত মাসে আমার সঙ্গে সচিব তথা ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অফ মেডিকেল রিসার্চ (আইসিএমআর)-এর ডিরেক্টর জেনারেল বলরাম ভার্গবের সাক্ষাৎ হয়েছিল। সেখানেই এই বিপদ মোকাবিলার অঙ্গীকারটি পুনরাবৃত্ত হয়েছিল। আমি আশ্বস্ত করেছি যে, আমাদের ভারতীয় অংশীদারদের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিবিড়ভাবেই কাজ চালিয়ে যাবে। উল্লেখ্য যে, এএমআর-এর বিপদ মোকাবিলায় আমাদের ইন্ডিয়ান পার্টনারদের মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রক, আইসিএমআর এবং বায়োটেকনোলজি ডিপার্টমেন্ট।

যখন আমাদের সরকার দুটি পদ্ধতি মেনে পরিকল্পিত উপায়ে এই সমস্যার সমাধানে একযোগে কাজ করে, তখন এএমআর-এর মতো কঠিন বিপদটি নিয়ে আমাদেরও ব্যক্তিগত স্তর থেকে সমষ্টিগতভাবে জরুরি ভিত্তিতে সোচ্চার হতে হবে, সচেতন হতে হবে। স্বাস্থ্যপরিষেবার গ্রহীতা হিসেবে যে-কোনও অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া বা অন্যভাবে নেওয়ার আগে আমাদের কর্তব্য হল উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ। সংক্রামক ব্যাধি ছড়ানো ঠেকাতে প্রত্যেককেই বিরত থাকতে হবে। এজন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের যথাযথ ধারণা। এই ধারণা থাকলে আমরা হাত পরিচ্ছন্ন রাখব, মুখ খুলে কাশি দেব না, অসুস্থ শরীর নিয়ে বাইরে বেরব না। রোগসংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত দায়িত্ব পালন করতে হবে, চিকিৎসার স্বীকৃত গাইডলাইন বা নির্দেশিকা অনুসরণ করতে হবে, প্রেসক্রিপশনে অপ্রয়োজনেও অ্যান্টিবায়োটিক লেখায় ক্ষান্ত দিতে হবে। আর যেটা দরকার তা হল, সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে চালু ভ্যাকসিন বা টিকাগুলি যাতে মানুষ ঠিকমতো নেয় তার জন্য প্রচার বাড়াতে হবে। কৃষকদের উচিত গবাদি পশুপাখিদের টিকাকরণের উপর গুরুত্ব দেওয়া। কেবলমাত্র সংক্রামক ব্যাধি নিরাময়ের প্রয়োজনেই গবাদি পশুপাখিদের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া দরকার এবং অবশ্যই তা প্রয়োগ করতে হবে উপযুক্ত পশুচিকিৎসকদের পরামর্শ নিয়ে। নতুন নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের উদ্ভাবনের উদ্দেশ্যে আমাদের শিল্পও গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে আমাদের দায়িত্বশীল অভিভাবক হয়ে ওঠাও প্রয়োজন। অব্যবহার্য অ্যা঩ন্টিবায়োটিকের ‘ডিসপোজাল’-এর বিষয়েও বিবেচনাপূর্ণ ভূমিকা থাকা দরকার।

এই বিরাট চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় আমাদের ব্যক্তিগতভাবে এবং সমষ্টিগতভাবে—দু’ভাবেই সক্রিয় হতে হবে। এএমআর মোকাবিলায় আমাদের সহযোগিতা দুই দিক থেকে প্রতিনিধিত্ব করবে। একদিকে, ইউএস-ইন্ডিয়া কোঅপারেশন একটি সিম্বল হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, এমন একটি ‘লঞ্চ প্যাড’ হিসেবে ভাস্বর থাকবে, যেখানে দুই দেশ একযোগে কাজ করবে এবং যেখান থেকে আমাদের দুটি দেশ তো বটেই সারা পৃথিবীও উপকৃত হবে।

-লেখক ভারতে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত 

এই বিভাগের আরো সংবাদ