সংঘাতের মুখে মধ্যপ্রাচ্য

  ড. দেলোয়ার হোসেন

০৬ জানুয়ারি ২০২০, ১৮:৪৯ | অনলাইন সংস্করণ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বৈরিতায় আবারও নতুন করে অশান্ত হয়ে উঠেছে মধ্যপ্রাচ্য। ইরাকের বাগদাদে ইরানি সামরিক শীর্ষ কমান্ডার কাসেম সোলাইমানির ওপর মার্কিন হামলার পরিপ্রেক্ষিতে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, এর প্রভাব পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে চলমান অস্থিতিশীল সম্পর্কের ওপর আরেকটি আঘাত। এই হামলার প্রভাব শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বড় ধরনের সংঘাতের কারণও হতে পারে। পশ্চিমা বিশ্ব বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের ফলে গত ২০ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। একদিকে সেখানে ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব চলছে। এতে ফিলিস্তিনিরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্নকে তারা ভেঙে দিয়েছে। এমনকি জেরুজালেমকে ইসরায়েলি রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। অন্যদিকে লিবিয়া, ইরাক ও সিরিয়ার মতো রাষ্ট্রে গৃহযুদ্ধ ও সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন এই রাষ্ট্রগুলোর অস্তিত্ব প্রায় বিপন্ন। লিবিয়া এই মুহূর্তে কাদের দ্বারা শাসিত হচ্ছে, সেটি কেউ বলতে পারবে না। এমন পরিস্থিতিতে লিবিয়া তার ভৌগোলিক পরিচয় না হারালেও রাজনৈতিক পরিচিতি হারাতে বসেছে। দেশটিতে এখন আমরা বিভিন্ন গোষ্ঠীর শাসন দেখতে পাচ্ছি। ইরাকের ভেতরেও একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ইরাকের যে ধরনের সভ্যতা, সংস্কৃতি, শক্তি ও সামর্থ্য ছিল; সেগুলো হারিয়েছে দেশটি। সিরিয়ার মতো প্রাচীন সভ্যতার একটি দেশও গৃহযুদ্ধের ফলে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে মূলত বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের ফলে। এর দায় পশ্চিমা বিশ্ব বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও নাগরিক সমাজ মধ্যপ্রাচ্যের এই পরিণতির জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভুল নীতিকে দায়ী করে।

ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও শীর্ষ সামরিক কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার যে ঘটনা ঘটেছে, তা অনেকটা কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার মতো। এ ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান অশান্ত পরিস্থিতিকে নিঃসন্দেহে আরও বেশি সংঘাতময় ও অস্থির করে তুলবে। ইরান মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে ভারসাম্যপূর্ণ ও অন্যতম ক্ষমতাধর রাষ্ট্র। তাদের কূটনীতি ও নেতৃত্ব অত্যন্ত শক্তিশালী। ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়াকে ঘিরে সৌদি আরব, তুরস্ক ও ইরানের মধ্যে এক ধরনের আঞ্চলিকভাবে ক্ষমতার লড়াই বা প্রতিযোগিতা রয়েছে। এই প্রতিযোগিতাকে ছাপিয়ে সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা রাশিয়া, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের প্রভাব রয়েছে। এ ঘটনার ফলে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক আরও বেশি অবনতির দিকে যাবে। গত বছর ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে প্রত্যাহার করে দেশটির ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। আর এ হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে পরোক্ষ যুদ্ধ ঘোষণা করল। ইরানও সময়-সুযোগ অনুযায়ী প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। তার মানে, দেশ দুটি তাদের 'প্রক্সি পাওয়ার' ব্যবহার করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটরা এ হত্যাকাণ্ড সমর্থন করেনি। সেখানে অনেকেই এ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলছেন। যদিও ইরান ও সোলাইমানির ভূমিকা নিয়ে তাদের প্রশ্ন আছে, তবুও তারা এ হত্যাকাণ্ডকে সমাধান হিসেবে দেখছেন না। ফলে সোলাইমানিকে হত্যার মাধ্যমে ইরানকে দমানোর যে কৌশল ট্রাম্প বাস্তবায়ন করলেন, তা বহুলাংশে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০২০ সালের নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া, নির্বাচনে অবস্থান করে নেওয়া এবং অভিশংসনের কবলে পড়ে ট্রাম্প যে সংকটে পড়েছেন, তা থেকে উঠে আসতেই তিনি ইরানকে ট্রাম্পকার্ড হিসেবে বেছে নিয়েছেন। ট্রাম্প বক্তব্যের দিক থেকে অনেক বেশি আক্রমণাত্মক হলেও কাজের দিক থেকে আমরা অনেক ক্ষেত্রেই তাকে সামরিক আক্রমণের পক্ষে দেখিনি। আমরা ট্রাম্পকে উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে অনেক উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় করতে দেখেছি। শেষ পর্যন্ত প্রথমবারের মতো উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তিনি পরপর দুইবার আলোচনায় বসেছেন। ফলে সোলাইমানিকে হত্যার ঘটনায় আমরা ট্রাম্পের একেবারেই ভিন্ন মূর্তি দেখতে পেলাম। কাজেই এটি নিঃসন্দেহে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এবং অধিক জনপ্রিয়তা পেতেই ট্রাম্প এই হামলার নির্দেশ দিয়েছেন। বারাক ওবামা দীর্ঘ সময় পর ইরানের সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন; কিন্তু ট্রাম্প সেই সম্পর্ককে আগের জায়গায় নিয়ে গেলেন। এই নতুন সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যে হয়তো সরাসরি যুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করবে না। কারণ সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ হবে; দেশ দুটির নেতৃত্ব তা ভালো করেই জানে।

ইরান ইরাকের সঙ্গে প্রায় এক যুগ যুদ্ধ করেছে। এর পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের অনেক নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়ে ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর দেশটি নিজের মতো কূটনৈতিক তৎপরতা ও আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলা করেছে। ফলে ইরানকে এ রকম একটি ভুল উপায়ে পরাস্ত করা কখনোই সম্ভব না। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি ইরান কর্তৃক যে কোনো ধরনের সমস্যা বা হুমকির সমাধান করতে চায়। এটি এক ধরনের পলিসি। বারাক ওবামা এই পলিসিই ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বর্তমানে ইরানের ব্যাপারে মার্কিন প্রশাসনের স্পষ্ট ভুল নীতি প্রত্যক্ষ করছি। অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের যে তৎপরতা তা কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। সেখানকার একটি খারাপ দিক হচ্ছে; ইরান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে এক ধরনের আধিপত্যের লড়াই চলছে। এই লড়াই নিঃসন্দেহে মুসলিম বিশ্ব ও মধ্যপ্রাচ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং বহিঃশত্রুকে প্রভাব বিস্তার ও আক্রমণের সুযোগ করে দিচ্ছে। এর ফলে মুসলিম বিশ্ব আরও দুর্বল হচ্ছে। ইরান, সৌদি আরব ও তুরস্ক বুঝতে পারছে না যে, এ ধরনের আত্মঘাতী লড়াই বা প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে তারা নিজেরাই বেশি দুর্বল ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই বিষয়গুলো এখন নতুন মোড় নেবে। ইরানকে আরও বেশি মাত্রায় চীন ও রাশিয়ার দিকে ঠেলে দেবে। পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তার মিত্র রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে দূরত্ব কমানোর পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করবে।

আমার মনে হয়, এ ঘটনায় ট্রাম্পের দীর্ঘমেয়াদি কোনো উচ্চাশা নেই; ইরানকে মূলত নির্বাচনের ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে চাচ্ছেন। ট্রাম্প হয়তো ভেবেছেন, এর মাধ্যমে তিনি জনতুষ্টি অর্জন করতে পারবেন; মার্কিন জনগণ নিজেদের নিরাপত্তা ইস্যুতে তার ওপর আস্থা রাখবেন; তাকে খুবই শক্তিশালী শাসক ও শক্ত নেতা ভাববেন। এ ধরনের একটি ভুল বার্তা মার্কিন জনগণকে অনেক আগে থেকেই দেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে বলতে গেলে এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। মধ্যপ্রাচ্যকে আরও বেশি অস্থিতিশীল করার জন্য এ হামলা চালানো হয়েছে। এর ফলে ট্রাম্প সাময়িক জনপ্রিয়তা পেলেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে মার্কিন-ইরান সম্পর্কের আরও অবনতি হওয়ার মাধ্যমে বৈশ্বিকভাবে ক্ষমতার যে মেরুকরণ, তা আরও স্পষ্ট হবে। রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে। এ পরিস্থিতিতে সব পক্ষ দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন না করলে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি হবে ভয়াবহ। এতে সবচেয়ে লাভবান হবে ইসরায়েল। দখলদার এ দেশটি আরও ক্ষমতাধর ও আগ্রাসী হয়ে উঠবে। ফলে ফিলিস্তিনিদের স্বপ্ন আরও দূরে সরে যাবে। এ ক্ষেত্রে ইরান যে ভূমিকা রাখবে, তার ওপরেও অনেক কিছু নির্ভর করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের একটি বড় ধরনের শ্রমবাজার রয়েছে। সেখানকার সংঘাতময় পরিস্থিতি এখনও প্রাথমিক অবস্থায় থাকায় বাংলাদেশের উদ্বেগের কিছু নেই। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্য যেহেতু দীর্ঘদিন থেকে সংঘাতের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে এবং নতুন করে সংঘাত সৃষ্টিরও আশঙ্কা রয়েছে; সে বিবেচনায় আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশে হয়তো আমাদের শ্রমিক না থাকলেও লিবিয়া ও ইরাকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শ্রমিক রয়েছেন। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে কীভাবে শ্রমবাজার তৈরি করা যায়, সে জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে হবে।

 লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

এই বিভাগের আরো সংবাদ