আরো বেশি বাঙালি হয়ে গেছি

  দেবদ্বীপ পুরোহিত

০৬ জানুয়ারি ২০২০, ২১:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

অনেক বছর আগের ঘটনা। ক্লাস ফাইভ বা সিক্সে পড়ি হয়ত। বাবা, মা, দাদা, দিদি আর আমি কলকা মেলে চেপে দিল্লি যাচ্ছি, সেখান থেকে মামার বাড়ি জয়পুর যাবার ট্রেন ধরবো বলে।

পরোটা ,আলুর সবজি ,ভুজিয়া, আমেরআচার দিয়ে খাওয়া শেষ করার পর মার কাছে লাড্ডু খাওয়ার জন্য বায়না শুরু করেছি সবে, এমন সময় এক সহযাত্রী —অনেক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকার পর — জানতে চাইলেন, আপকো কোল্কাত্তা কাইসা লাগা?

আমরা কেউ কিছু বলার আগেই উনি একটু সবজান্তার মত বললেন, বাংগাল বহুৎ আচ্ছা জায়গা হে।

নির্ভুল বাংলা উচ্চারণে আমার বাবা, শান্তিনিকেতনের পাঠভবনের এবং পরে প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র ,অল্প কথায় উত্তর দিয়েছিলেন ,"আপনি বাংলায় বলতে পারেন। আমরা সবাই বাংলা বলতে পারি।”

অনেক আগের ঘটনা, কিন্তু বেশ মনে আছে প্রশ্ন কর্তা বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে ছিলেন। তারপর বাবার দিকে হাত বাড়ালেন করমর্দনের জন্য। একটু লাজুক মুখে বললেন, কি ভালো বাংলা বলেন আপনি।

কাকু, আমিও পারি, আমি বলেছিলাম।

বাংলা অনেকেই ভালো বলেন।ঐ ঘটনার আগে বাংলা বলতে পারা যে একটা আ্যচিভমেন্ট, তা জানতাম না।

পরে বাবা বুঝিয়েছিলেন, পাঁচজন নিজেদের মধ্যে মাড়োয়ারি তে কথা বলছেন, ঘী দেওয়া পরোটা ,আচার, ভুজিয়া আর লাড্ডু খাচ্ছেন,তারা যদি হঠাৎ নির্ভেজাল বাংলায় কথা বলেন, তাহলে যিনি অনেক্ষণ ধরে আমাদের ভিন রাজ্যের মানুষ ভাবছিলেন, তিনি অবাক হতেই পারেন।

বাবা আর মা দুজনেই আদতে রাজস্থানের মানুষ। কিন্তু মা কুচবিহারের দিনহাটা এবং বাবা বীরভূমের বোলপুরে বড় হয়েছিলেন। তাই যদিও বাড়িতে আমরা মাড়োয়ারি তে কথা বলতাম, ছোটবেলা থেকেই বাংলা ছিল আমাদের মাতৃভাষা।

কলকাতার অদূরে রহড়াতে যে বাড়িতে থাকতাম সেখানে ছোটবেলায় দেখেছি মাঝে মাঝে নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলন এর মিটিং হত। সন্ধ্যাবেলায় মা নিজের বান্ধবীদের নিয়ে গীতবিতান খুলে গান গাইতেন।বাড়ির সামনের বারান্দায় দিদি পাড়ার কচিকাঁচাদের নিয়ে রবীন্দ্র নজরুল জয়ন্তী অনুষ্ঠান করতেন। পাশের বাড়ির ছাদে শাপমোচন এর রিহার্সালের সময় “আজি দখিনো দুয়ার খোলা” গ্রুপ ডান্সে সখি কম পড়লে ,আমি অনেক প্রক্সি দিয়েছি। রিহার্সাল শেষে অনেক সখিকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার গুরু অথচ মিষ্টি দায়িত্ব ও কম পালন করিনি।

কিন্তু খেলার মাঠে বন্ধুদের সাথে ঝামেলা হলে আমাকে মেড়ো শুনতে হত।রহড়ার একমাত্র “নন বেঙ্গলি” পরিবারের সদস্য হওয়ার কারণে একটা আলাদা পরিচিতি ছিল, সেটা উপভোগ করতাম, কিন্তু মেড়ো বললে বেশ রেগে যেতাম।

যেহেতু নিরামিষ খেতাম ,তাই খুব সহজেই প্রোফাইলিং করা যেত। তখনও ব্যুফের উৎপাত শুরু হয়নি, তাই সামাজিক অনুষ্ঠানে পাত পেরে খাওয়ানো হত। আমি বসতাম বিধবাদের সাথে, কারণ নিরামিষ।

মাকে বলতাম কেন আমরা মাছ মাংস খাইনা? (পরে বড় হয়ে সিগারেট মদের সাথেই মাছ মাংস চেখেছি ,কিন্তু স্বাদটা রোচেনি, তাই খাদ্যাভ্যাসে আজও আমি নিরামিষ)
খাওয়ার কথা থাক।মেড়োর গল্পে আসি। মা-বাবার কাছে কম অভিযোগ করিনি যখন মেরো শুনতে হত। ওরা হাসতেন, বলতেন ,তুমি বলবে ,আমি বাঙালি, কারণ বাংলায় আমার জন্ম।

বড় হতে থাকলাম রহড়ার অলিতে গলিতে। রামকৃষ্ণ মিশনে বাংলা স্যারদের কাছে শুদ্ধ ভাষা শেখার সাথে সাথেই মাঠে-ঘাটে ঘুরে বাছা বাছা গালাগালি শিখলাম। (সত্যি বলছি, চুতিয়া শব্দ টা শেখার আগে আমি বোকাচোদা শিখেছি।)

ক্রমে আরো বেশি বাঙালি হতে লাগলাম। যারা ছোটবেলায় মেরো বলতো, তারা বলা শুরু করলো, তুই শালা, আমাদের থেকে বেশি বাঙালি।

মাড়োয়ারি আজকাল বলাই হয় না। কারণ যাদের সাথে বলতাম ,বাবা, মা আর দাদা তারা চলে গেছেন। হিন্দি কোনদিন তেমন ভালো বলতাম না।

বাংলাই আমার মাতৃভাষা ।যদিও ইংরেজি কাগজে কাজ করি তবুও আমি বাংলায় ভাবি।তাই নিজেকে বাঙালি ভাবি।

গত কয়েক বছরে কাজের সুবাদে অনেকবার বাংলাদেশ গিয়ে — আর ওপার বাংলার মানুষের ভালোবাসায় — আরো বেশি বাঙালি হয়ে গেছি।

আজ যদি হঠাৎ করে কেউ আমায় ডকুমেন্ট দিয়ে বাঙালিয়ানা প্রমাণ করতে বলেন, ভীষণ ঝামেলায় পড়বো। ভাবতেই ভয় লাগছে, যদি এমন হয়!!

আমার বাঙালিয়ানা প্রমাণ করার কথা ভাবলে যদি রাতের ঘুম চলে যায় ,তাহলে যাদেরকে নিজেদের ভারতীয়ত্ব প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ নিয়ে রোজ রাতে ঘুমোতে হচ্ছে, তাদের কি অবস্থা ভাবলেই শিউরে উঠছি।

এই লেখা পড়ে অনেকেই নানা ভাষায় আমাকে গালাগালি দিতে পারেন। বলতেই পারেন এক নতুন ন্যাকামো। কিন্তু যদিও মেড়ো শুনতে শুনতে বড় হয়েছি, যে বাংলায় আমার সব জ্ঞান আহরণ, সেখানে মনের কথা বলতে কেউ কোনদিন বাধা দেয়নি।তাই বললাম, লিখলাম।

লেখক:  সাংবাদিক, টেলিগ্রাফ

এই বিভাগের আরো সংবাদ