মুজিববর্ষে সুশাসনের অঙ্গীকার

  মিল্টন বিশ্বাস

১৫ জানুয়ারি ২০২০, ১৪:৩৮ | অনলাইন সংস্করণ

১৪ জানুয়ারি (২০২০) আইনমন্ত্রী আনিসুল হক ‘মানুষের জন্য মানবাধিকার পদক-২০২০’ বিতরণ অনুষ্ঠানে বলেছেন, বর্তমান সরকার ধর্ষণসহ নারী নির্যাতনের অন্যান্য ঘটনাকে কোনোভাবেই বিচারহীন অবস্থায় রেখে দিতে চায় না এবং রেখে দেবেও না। এই অঙ্গীকার মুজিববর্ষের গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার সরকার বিশ্বের কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। বর্তমানে নিজেদের দলীয় ব্যক্তির অপরাধ দমনে যেমন আইনি প্রক্রিয়া নিজস্ব গতিতে চলছে তেমনি চাঞ্চল্যকর অপরাধ দমনে কঠোর হয়েছেন শেখ হাসিনা। এর দৃষ্টান্ত হচ্ছেÑ ক্যাসিনো অপরাধে জড়িত সরকারদলীয় নেতাদের গ্রেফতার এবং বিদেশে পালিয়ে যাওয়া খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে আইনি প্রক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেয়ার মধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অপরাধ করে কেউ রেহাই না পেলে অপরাধ কমবে; আর সুশাসন প্রতিষ্ঠার পথে দেশের অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে এটা পরিস্কার। নারী ধর্ষণের ঘটনায় আসামিদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। উপরন্তু শিশু নির্যাতনের অভিযোগে অনেকেই কারাগারে রয়েছে। আবার অনেকেরই বিরুদ্ধে নির্যাতনের মামলা চলছে। জঙ্গিবাদে জড়িত কিংবা সন্ত্রাসী মামলার পলাতক আসামি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে। এমনকি কোনো কোনো অপরাধে পুলিশ কিংবা ‘র‌্যাব’ সদস্যের সংশ্লিষ্টতাকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এরকম অসংখ্য উদাহরণ দিয়ে বর্তমান সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার কথা আলোচনা করা যায়। প্রকৃতপক্ষে শেখ হাসিনার সরকার বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে মানুষের মঙ্গলে কাজ করে যাচ্ছে।

আমাদের দেশের অগ্রযাত্রায় শেখ হাসিনার নানা ধরনের সুশাসনের প্রত্যয় ঘোষণা গত দুই দশকের রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনার একটি বিরল ঘটনা।  সংবাদ থেকে জানা গেছে মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতির প্রমাণ পেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাদের সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের খোঁজ রাখতে গঠন করা হয়েছে বিশেষ গোয়েন্দা টিম। সিনিয়র মন্ত্রী বা প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন বলে কেউ-ই এ ক্ষেত্রে ছাড় পাবেন না। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের সুশাসনের প্রমাণ রয়েছে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পূর্বে ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারেও। যেমনÑ ‘আমাদের এবারের অগ্রাধিকার : সুশাসন, গণতন্ত্রায়ন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রায়ন’ শীর্ষক উপবিভাগে বলা হয়েছে, ‘দুর্নীতি প্রতিরোধে, আইনি, রাজনৈতিক, সামাজিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ জোরদার করা হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের ক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা আরও বাড়ানো হবে। ঘুষ, অনোপার্জিত আয়, কালো টাকা, চাঁদাবাজি, ঋণখেলাপি, টেন্ডারবাজি ও পেশিশক্তি প্রতিরোধ এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়ন নির্মূলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। নিজেদের সম্পদ, আয়-রোজগার সম্পর্কে সর্বস্তরের নাগরিকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে।’ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিগত ১১ বছর সরকারের নেতৃত্ব দেবার সময় লক্ষ করেছেন জনগণের প্রত্যাশা আসলে কী? জনগণ শেখ হাসিনার পাশে অপরাধীদের দেখতে পছন্দ করে না। একারণে বর্তমান মন্ত্রী পরিষদে ক্লিন ইমেজের ব্যক্তিরা রয়েছেন। উপরন্তু দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অতীতে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবার জন্য তদন্ত শুরু করলে সরকারপ্রধান হস্তক্ষেপ না করে নীরবে তা পর্যবেক্ষণ করেছেন। একথা ঠিক যে সরকার প্রধান নির্লোভ হলেও তাঁর নির্ভরযোগ্য বা আশেপাশের অনেকেই ক্ষমতার অপব্যবহার করে অপরাধে মেতে উঠতে পারেন; জনগণের প্রত্যাশা ধূলিস্যাৎ করে নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারেন। অথচ সরকার অতীতের ভুলত্রুটি শুধরে, জনগণের সেবা নিশ্চিত ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে আগামী চার বছর ক্ষমতায় থাকতে চায়। এই প্রত্যাশা ফলপ্রসূ করতে হলে জনগণ যে আশা-ভরসা নিয়ে আওয়ামী লীগকে ভোট দেয়, সেটা রক্ষা করতে হবে। কোনো ধরনের অন্যায়কে বর্তমান সরকার প্রশ্রয় দিলে তা হবে আত্মঘাতী। এ জন্য কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যক।    

সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অতীতের ভুল শোধরানোর দায়িত্ব অবশ্যই নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের কাঁধে থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে অন্যায় কর্মকা- কিংবা ঘুষ বাণিজ্যের মধ্য দিয়ে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার প্রবণতা কঠোর ব্যবস্থায় রুখতে হবে। সচিবালয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং তাদের পিএস-এপিএস সকলের বিষয়ে নজরদারি দরকার। কারণ নিয়োগ-বদলিকে কেন্দ্র করে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ যেমন আছে তেমনি রয়েছে প্রতারণার ঘটনা। জনগণের সেবার মানসিকতা নিয়ে সরকারি প্রশাসন যে কাজ করে না তার প্রমাণ তো আমরা প্রতিদিনের হয়রানি থেকে তীব্রভাবে উপলব্ধি করি। রাস্তা-ঘাট, বাজার-বিপণিতে অব্যবস্থাপনা ও অরাজকতা থাকলেও অফিস-আদালতের সর্বত্রই দেখা যায় নিয়ম-কানুনের কড়াকড়ি। কিছু কিছুক্ষেত্রে সেখানে ফাইল নড়তে টাকা দিতে হয়। তবে এসব ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিস্তারই কেবল হয়রানি সৃষ্টি করে না বরং তা হয়ে ওঠে প্রতারণার শ্রেষ্ঠ জায়গা। আমাদের প্রশ্ন ডিজিটাল বাংলাদেশে কেবল যন্ত্র আর কাগজের মধ্যেই কি সব সেবা লুকিয়ে আছে। রাস্তার ফুটপাত কি চিরদিন দখলদারিত্বের কবলে থাকবে?      

মনে রাখা দরকার আমরা সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতিবন্ধক সৃষ্টিকারীদের শোষণ-বিরোধী বয়ান শুনে শুনে আতঙ্কিত হয়েছি। প্রতিনিয়ত মুক্তবাজার, বেসরকারিকরণ, বাজার উন্মুক্তকরণ, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সরকারি সেবাগুলোর ওপর ব্যক্তিমালিকানা প্রতিষ্ঠার জন্য উন্নয়ন সহযোগী আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান চাপ প্রয়োগ করছে। এমনকি রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠানসমূহকে অকার্যকর করার জন্য এবং দেশের রাজনীতিকে কলঙ্কিত করতে রাজনীতিবিদদের ক্রয়-বিক্রয়ে মেতে উঠছে অনেকেই- সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এ সম্পর্কেও সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। এছাড়া ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তুলতে হবে এমনভাবে যেন তারা মনে না করে টাকা থাকলেই সমাজ সম্মান করবে। কারণ লেখাপড়ার উদ্দেশ্য যদি ভাল চাকরি পাওয়া হয় তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতি কখনো উচ্ছেদ করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি সরকার নিজের দলের নেতা কর্মীকে পদ-পদবী থেকে সরিয়ে দিয়ে সুশাসনের সদিচ্ছা প্রকাশ করেছে। বিশেষত বদলে যাওয়া বিশ্বের চ্যালেঞ্জ নিয়ে সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। এ জন্য মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য অনিয়ম ও দুর্নীতি করলে প্রধানমন্ত্রী তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেনÑ এ প্রত্যাশা আমাদেরও। কারণ বিগত মন্ত্রিসভায় যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে, তাদের এবার রাখা হয়নি। যেহেতু অতীতের অনিশ্চয়তা, সংকটের চক্রাবর্ত এবং অনুন্নয়নের ধারা থেকে বের করে এনে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শান্তি, গণতন্ত্র ও উন্নয়নের গতিপথে পুনঃস্থাপিত করা বর্তমান সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

একটা ভিন্ন প্রেক্ষাপটে অনেক আশাবাদ নিয়ে ২০১৯ সালে পুনরায় সরকার গঠন করেছেন শেখ হাসিনা। সুশাসনের অন্তরায় ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমল। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মন্ত্রী, এমপি এবং দলীয়/অঙ্গ/সহযোগী সংগঠনের দুর্নীতি, দৌরাত্ম্য দেশবাসীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছিল। জোট সরকারের পাঁচ বছরের শাসনামলের পাঁচ বছরই টিআইবির রেটিংয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করেছিল। উল্লেখ্য, দেশ পরিচালনায় বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সামগ্রিক ব্যর্থতা, অদক্ষতা, দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাকেই উল্টে দিয়েছিল। নস্যাৎ করে দেয় সব সম্ভাবনা। তারেক রহমানের উদ্যোগে গড়ে তোলা হয়েছিল রাষ্ট্রক্ষমতার সমান্তরাল বা বিকল্প কেন্দ্র ‘হাওয়া ভবন’। এই হাওয়া ভবন থেকেই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা করে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা নেয়া হয়। ‘হাওয়া ভবন’ হয়ে উঠেছিল সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি ও কমিশন সংগ্রহ, প্রশাসনের নিয়োগ-বদলি, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক ব্যবসা প্রভৃতি দেশবিরোধী অবৈধ কর্মকা-ে অঘোষিত হেড-কোয়ার্টার। মহাজোট সরকারের সেই পাঁচ বছরের দুর্নাম বহুলাংশে মোচন হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন করেছে। দুর্নীতির তদন্ত, অনুসন্ধান, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দুদক প্রয়োজনে মন্ত্রী, আমলাসহ যে-কোনো ক্ষমতাধর ব্যক্তিকে তলব করে জিজ্ঞাসাবাদের নজির স্থাপন করেছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের উৎসমুখগুলো বন্ধ করার লক্ষ্যে অনলাইনে টেন্ডারসহ বিভিন্ন সেবা খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহারের ফলে দুর্নীতির সর্বগ্রাসী প্রকোপ কমেছে।

সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ও রাষ্ট্রপরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অবদানই অনন্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দীর্ঘ সংগ্রামের চালিকাশক্তি ছিল একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ সমাজের স্বপ্ন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর দীর্ঘ ২১ বছরের ইতিহাসে সেই স্বপ্ন বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে, পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং মুখ থুবড়ে পড়েছে। জাতির পিতার শাহাদাত, সামরিক শাসন এবং স্বৈরাচারী, গণবিরোধী ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির ক্ষমতা দখল জনগণের সেই স্বপ্নের বাস্তবায়নকে বারবার দূরে সরিয়ে দিয়েছে। জনগণের জীবনে এ ধরনের শাসনের কুফল প্রতিফলিত হয়েছিল অনুন্নয়নে, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্যে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের অবদমনে, রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনায়, দুর্নীতিতে এবং সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শুদ্ধাচারের অভাবে। ১৯৯৬, ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ সালে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গ্রহণের পর আওয়ামী লীগ সরকার ওই দুঃশাসনের বিরুদ্ধে, অব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং রাষ্ট্রীয় দুর্নীতির বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। এই যুদ্ধকে শেখ হাসিনা চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তাঁর শাসনামলে একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালের ২৫ ডিসেম্বরে জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘...সুখী ও সমৃদ্ধিশালী দেশ গড়তে হলে দেশবাসীকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে হবে। কিš‘ একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না- চরিত্রের পরিবর্তন না হলে এই অভাগা দেশের ভাগ্য ফেরানো যাবে কি না সন্দেহ। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও আত্মপ্রবঞ্চনার ঊর্ধ্বে থেকে আমাদের সকলকে আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি করতে হবে।’ শেখ হাসিনাও তাঁর রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সকল কাজে আত্মশুদ্ধি ও চরিত্রনিষ্ঠার ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন।   

মূলত ‘মুজিববর্ষে’ সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সে আলোকে আইনকানুন, নিয়মনীতি, পরিকল্পনা ও বিভিন্ন কৌশল প্রণয়ন করা হয়েছে এবং তা বাস্তবায়ন অব্যাহত আছে; দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে। কিš‘ সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য কেবল রাষ্ট্রীয় নিয়মনীতি, আইনকানুন প্রণয়ন ও প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; তার জন্য সামগ্রিক এবং নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ প্রয়োজন। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সামগ্রিক উদ্যোগের সহায়ক কৌশল হিসেবে ‘সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়: জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল’ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই কৌশলটি বাস্তবায়নের জন্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ এবং বেসরকারি শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসমূহের সক্রিয় অংশগ্রহণ প্রয়োজন। চরিত্রনিষ্ঠা আনয়নের জন্য মানুষের জীবনের একেবারে গোড়া থেকে, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। রাজনীতিতেও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।  স্বাধীনতার পর থেকেই সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিভিন্ন সময় বহুবিধ আইন, বিধি-বিধান প্রণয়ন করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর আরো কিছু নতুন আইন প্রণয়ন করেছে, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কিছু নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছে এবং এগুলির ব্যবস্থাপনা ও পদ্ধতির উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে।

একুশ শতকে এ দেশে ক্ষুধা, বেকারত্ব, অশিক্ষা, বঞ্চনা ও দারিদ্র্য থাকবে না। দেশে বিরাজ করবে সুখ, শান্তি, সম্প্রীতি ও সমৃদ্ধি। সংবিধানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ‘এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা’ হবে, ‘যেখানে সকল নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত’ হবে। এই লক্ষ্য পূরণে সুশাসন প্রতিষ্ঠা রাষ্ট্রের অবশ্য-কর্তব্য এবং সেই সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি দমন একটি গুরুত্বপূর্ণ এবং অপরিহার্য পরাকৌশল। কেবল আইন প্রয়োগ ও শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, তার জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ক্ষেত্রে একটি আন্দোলন গড়ে তোলা, যাতে নাগরিকগণ চরিত্রনিষ্ঠ হয়, রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন ও সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠানসমূহে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা পায়। অন্যায় প্রতিরোধে মানুষকে নৈতিক জীবন-যাপনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সততা দ্বারা প্রভাবিত আচরণগত উৎকর্ষ যেন সে অনুসরণ করে চলে। তার যেন সমাজের কালোত্তীর্ণ মানদ-, নীতি ও প্রথার প্রতি আনুগত্য থাকে। ব্যক্তি-পর্যায়ে কর্তব্যনিষ্ঠা ও সততা, তথা চরিত্রনিষ্ঠা খুব দরকার। এজন্য বিদ্যমান আইনকানুন, নিয়মনীতির সঙ্গে অপরাধ দমনকে একটি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করতে হবে। সেই অঙ্গীকারকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকারের সদিচ্ছার সঙ্গে সঙ্গে জনগণের প্রচেষ্টা গুরুত্ববহ। বর্তমান সরকারের সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা তথা আইনের শাসন দৃঢ় করার অঙ্গীকার মানুষের জীবনকে আরো স্বস্তিকর করে তুলেছে।

লেখক : ড. মিল্টন বিশ্বাস,  অধ্যাপক  এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, email- writermiltonbiswas@gmail.com)

এই বিভাগের আরো সংবাদ