মুক্তিযুদ্ধের মহাকাব্য

  তোফায়েল আহমেদ

০৭ মার্চ ২০২০, ১৭:০৭ | অনলাইন সংস্করণ

এবারের ৭ মার্চ ফিরে এসেছে জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ তথা ‘মুজিববর্ষ’ উদযাপনের পূর্বাহ্নে। ফলে এ বছরের ৭ মার্চের রয়েছে বিশেষ আবেদন। স্মৃতির পাতায় অনেক কথা ভেসে ওঠে। সৌভাগ্যবান মানুষ আমি। ইতিহাসের মহামানব দুনিয়ার নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য লাভ করেছি। কেন যেন এবার আরো বেশি করে বঙ্গবন্ধুকে মনে পড়ছে। প্রতিটি দিন যখন যায় স্মৃতির পাতায় বঙ্গবন্ধুর ছবি ভেসে ওঠে। কাছে থেকে দেখেছি মানুষের প্রতি তাঁর ভালোবাসা। ছোট-বড় সবাইকেই তিনি সম্মানের চোখে দেখতেন। পৃথিবীতে কত নেতা এসেছেন, আসবেন; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মতো এমন বিশাল হৃদয়ের অধিকারী মানুষ দুর্লভ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। আমার মনে হয়, ১৯২০-এর ১৭ মার্চ, যেদিন তিনি জন্মগ্রহণ করেন, সেদিনই প্রিয় মাতৃভ‚মি বাংলাদেশের জন্মের সূচনা হয়। তা না হলে কে বুঝেছিল যে, ভারতে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন হবে, সে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ’৪৭-এর ১৪ আগস্ট ‘পাকিস্তান’ নামক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হবে এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গে অর্থাৎ ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় অনুষ্ঠিত মুসলিম লীগের যুবকদের উদ্যোগে গঠিত গণতান্ত্রিক যুবলীগের কর্মী সম্মেলনে ভাষাবিষয়ক কিছু প্রস্তাব উত্থাপন করে সেদিনের ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের বীজ রোপণ করবেন এ কথা কী কেউ ভেবেছিল? রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে সেদিন তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘বাংলা ভাষাকে পূর্ববঙ্গের লিখার বাহন ও আইন-আদালতের ভাষা করা হোক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কি হবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের ওপর ছেড়ে দেয়া হোক এবং জনগণের সিদ্ধান্তই চ‚ড়ান্ত বলে গ্রহণ করা হোক।’ (সূত্র ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভ‚মিকা, গাজীউল হক)। সেজন্যই আমার মনে হয়, বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনটির সঙ্গে বাংলাদেশের জন্মও যুক্ত। এই দিনটির জন্যই বঙ্গবন্ধু জীবনভর সংগ্রাম করেছেন। দীর্ঘ ১৩টি বছর কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটিয়েছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর তিনি উপলব্ধি করেছেন, ‘এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয়নি। একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালিদের হতে হবে।’ সেই লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যই এত আন্দোলন, এত সংগ্রাম। যার একটি চ‚ড়ান্ত পর্যায় ১৯৭১-এর ৭ মার্চ। ভাবতে আজ কত ভালো লাগে, ২০১৮-এর ৩০ অক্টোবর ইউনাইটেড নেশন এডুকেশন, সায়েন্টিফিক এন্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন (ইউনেস্কো) ’৭১-এর ৭ মার্চে প্রদত্ত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষণকে বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্যের (ওয়ার্ল্ড ডকুমেন্টারি হেরিটেজ) অংশ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। যা সমগ্র জাতির জন্য গৌরবের এবং আনন্দের।
৭ মার্চ দিনটির সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। ঢাকা সিটি আওয়ামী লীগ নেতা গাজী গোলাম মোস্তফা, মণি ভাই, সিরাজ ভাই, রাজ্জাক ভাই, আমি এবং স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা আমরা এই সভা সংগঠিত করার জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। ৭ মার্চ সকাল থেকেই রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জন¯্রােত আসতে থাকে। তখন মানুষের মুখে মুখে স্বাধীনতা। আমরা ধানমন্ডির ৩২ নম্বর থেকে রওনা করি পৌনে ৩টায়। রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছাই সোয়া ৩টায়। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা আরম্ভ করেন সাড়ে ৩টায়। ১০ লক্ষাধিক লোকের গগনবিদারী স্লোগানে মুখরিত রেসকোর্স ময়দান। সেদিনের সভামঞ্চে জাতীয় চার নেতাসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা দেয়ার জন্য দাঁড়ালেন, চারদিকে তাকালেন। মাউথপিসের সামনে পোডিয়ামের ওপর চশমাটি রাখলেন। হৃদয়ের গভীরতা থেকে যা তিনি বিশ্বাস করতেন, যার জন্য তিনি সারাটা জীবন সংগ্রাম করেছেন, ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন, সেই বিশ্বাসী আত্মা দিয়ে বাংলার মানুষকে তিনি ডাক দিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার’।
তারপর একটানা ১৯ মিনিট ধরে বলে গেলেন মহান মুক্তিযুদ্ধের অমর মহাকাব্য। বক্তৃতায় তিনি মূলত স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। বঙ্গবন্ধুর সামনে ছিল দুটি পথ। এক. স্বাধীনতা ঘোষণা করা; দুই. পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব না নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে আখ্যায়িত না হয়ে সুচিন্তিত বক্তব্য প্রদান করা। তিনি দুটোই করলেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন সেদিনের পরিস্থিতি। যেটা তিনি আমাদের বলেছিলেন। সেনাবাহিনী তখন প্রস্তুত। মাথার ওপর বোমারু বিমান এবং হেলিকপ্টার গানশিপ টহল দিচ্ছে। যখনই বঙ্গবন্ধু এই ভাষায় বলবেন যে, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’, তখনই তারা গোলাবর্ষণ শুরু করবে। সেজন্য বঙ্গবন্ধু সবকিছু জেনেই বক্তৃতা করেছেন। এত বিচক্ষণ নেতা ছিলেন যে, সমস্ত ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সামরিক শাসকের উদ্দেশে চারটি শর্ত আরোপ করলেনÑ মার্শাল ল’ প্রত্যাহার কর, সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরিয়ে নাও, এ কয়দিনে যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত কর এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর কর। এই চারটি শর্ত আরোপ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত হলেন না। পাকিস্তানিরা তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায় আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন সদাসতর্ক এবং সচেতন। অপরদিকে পুরো বক্তৃতাটি জুড়ে ছিল আসন্ন জনযুদ্ধের রণকৌশল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ ‘আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।’ ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো।’ ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে’ তোলার আহ্বান জানিয়ে বললেন, ‘সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো ওয়াপদা কোনোকিছু চলবে না।’ নির্দেশ দিলেন ‘আটাশ তারিখে কর্মচারীরা যেয়ে বেতন নিয়ে আসবেন।’ সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেয়া হলো কেউ দেবে না।’ গরিবের কথা খেয়াল রেখে বলেছেন, ‘গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে’ সেজন্য শিল্প কলকারখানার মালিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘এই সাত দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছেন প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছায়া দিবেন।’ জীবনভর লালিত প্রগাঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে বিরোধী রাজনীতিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।’ আর রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, প্রত্যেক ইউনিয়নে, প্রত্যেক সাবডিভিশনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাক। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো, এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ।’ বক্তৃতা শেষ করেছেন মূলত স্বাধীনতা ঘোষণা করেই। বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতা সংগ্রাম।’ অর্থাৎ সামগ্রিকতায় জাতীয় মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে জনসাধারণ কর্তৃক নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার ভারসাম্যপূর্ণ বক্তৃতা।
সেদিনের সেই স্মৃতি মানসপটে ভেসে ওঠে। অভ‚তপূর্ব দৃশ্য, কল্পনা করা যায় না। এটিই মানুষ প্রত্যাশা করেছিল। একটা কথা আমার বারবার মনে হয়। একজন নেতা কত দূরদর্শী যে, তিনি সবসময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে জানতেন। কোন সময় কোন কথা বলতে হবে এটা তার মতো ভালো জানতেন এমন অভিজ্ঞ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ এই ক্ষুদ্র জীবনে দেখিনি।
৭ মার্চের বক্তৃতার দিকনির্দেশনা অনুযায়ী নয় মাস জনযুদ্ধ ও গেরিলাযুদ্ধের পথ অনুসরণ করে ৩০ লক্ষাধিক প্রাণ আর ৪ লক্ষাধিক মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা মহত্তর বিজয় অর্জন করেছি। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আমাদের জাতীয় চেতনার ভিত্তি হয়ে আজ পবিত্র সংবিধানের অংশ। এই বক্তৃতাই ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের চলার পথের প্রেরণা। বঙ্গবন্ধু কখনোই আক্রমণকারী হতে চাননি, চেয়েছিলেন আক্রান্ত হতে। সেজন্যই ২৫ মার্চের শেষ রাতে এবং ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে যখন অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করে, ঠিক তার পরপরই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর শেষ বার্তায় স্বাধীনতা ঘোষণা করে বলেন, ‘এটাই হয়তো আমার শেষ বার্তা, আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’

লেখক : আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।
tofailahmed69@gmail.com

এই বিভাগের আরো সংবাদ