অসুস্থ মানবিকতা করোনায় মৃত্যু পথযাত্রী

  ফাহমিদা হক

০৯ এপ্রিল ২০২০, ১৬:০৩ | অনলাইন সংস্করণ

‘মানুষ মানুষের জন্য, জীবন জীবনের জন্য’ এমন চমৎকার গান  হয়তো আজকের মতো এই কঠিন সময়ের জন্যেই  রচিত হয়েছিলো।দেশ ,সংস্কৃতি, জাত, ধর্ম, বর্ণ কিংবা ভাষা ভিন্ন হতে পারে কিন্তু একটা জায়গায় আমরা সবাই এক ও অভিন্ন। সবাই আমরা এই বিশ্বের মানুষ। অনুভূতিগুলোর জায়গায় সবাই এক। বিশ্বের  যে কোন প্রান্তে মানুষের রক্ত ঝরলে সারা বিশ্বের হৃিদয়ে রক্ত ক্ষরণ হয়, বহু দুরদেশ থেকে কান্নার শব্দ শুনলে, অন্য কোন দেশের  মানুষের কান্নার জল মুছে দিতে না পারলেও কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করে যায়, কিছুটা কষ্ট লাগবের আশায়। লক্ষ্য করলে দেখা যায়, মানুষে মানুষে সীমারেখাগুলো আসলে মিথ্যা, সত্য একটাই মানবতার কোন ধর্ম নেই, জাত-কাল-পাত্রভেদ নেই।

বিশ্ব আজ গভীর সংকটে নিমজ্জিত, সৃষ্টির শুরু থেকে আজ অবধি বহু ভাঙ্গা গড়ার খেলা দেখেছে এই বিশ্ব। কতো সভ্যতা বিলীন হয়ে গেছে, কতো অঘাট ঘাট হয়েছে কিন্ত এমন একসাথে একই সময়ে সারা পৃথিবীতে নেমে আসা এমন ভয়ংকর দুর্ভোগ আগে কখনো দেখেনি এই পৃথিবীর মানুষ। কোথায় যেন নিমিষেই উড়ে গেলো আধিপত্য, ভোগবাদীদের ক্ষমতার দাপট। জল, স্হল , মহাকাশকে জয় করতে পারলেও ছোট এক কণা অণুজীবের কাছে আজ সকল অহংকার দাম্ভিকতা চূর্ণ বিচূর্ণ। মোড়লীপনা,নিজেদের সুনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো, সুনিশ্চিত জীবন, উন্নত সমাজব্যবস্হা, সুপরিকল্পিত স্বাস্হ্য সেবা, এর সবকিছুই তুচ্ছ প্রমাণ করে, হাসপাতালের বিছানা না পেয়ে জৌলুসময় জীবন আজ মেঝেতে লুটুপুটি খাচ্ছে। তারপরও জীবন অনিশ্চিত। বেঁচে থাকা আর বাঁচিয়ে রাখার সংগ্রাম চলছে নিরন্তর। সকলের প্রার্থনা, তবে দূর হোক এই অন্ধকার অমানিশা।

চীনের উহানে জন্ম নেয়া করোনা ভাইরাস সবকিছু তছনছ করে দিচ্ছে। কয়েক মাসের ব্যবধানে তা চীনের গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে। দূর্বার গতি নিয়ে ছুটে চলা এই বিশ্ব আজ স্তব্দ হয়ে আছে। আনবিক, পারমানবিক সকল ক্ষমতা বগল দাবা করে যারা মানব ক্লোন তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন, তারাও আজ বড় অসহায়, দিশেহারা হয়ে পরেছে করোনার কাছে। সেবাকে ধর্ম জ্ঞান বলে মানা দেশ, স্বাস্হ্য সেবায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব বিবেচনায় নেয়া সরকারও কতটুকু অসহায় হলে পরে, বয়ষ্কদের পিছনে রেখে কম বয়সীদের বাঁচিয়ে রাখার জন্যে এমন অমানবিক সিদ্ধান্ত নিতেও বাধ্য হয়! চোখের সামনে লাশের পর লাশ কিচ্ছু যেন করার ক্ষমতা নেই কারোর। মরণ কালে প্রিয়জনকে ছুঁয়ে দেয়ার, একটু ‘বিদায়’ বলার মতো অবস্হাও কারো নেই।

করোনার কাছে সত্যিই মানুষ আজ বড় অসহায়। দু:সময়ে মানুষের আসল চরিত্র উন্মোচিত হয়। খারাপ ভালো মিলিয়েই মানব চরিত্র হলেও পরিবেশ, শিক্ষা, অর্থনৈতিক অবস্থান, পারিবারিক মূল্যবোধ মানুষকে মানুষ হিসেবে তার সমাজে অবস্হান নির্ধারণ করে। খারাপ সময়গুলো কখনো স্হায়ীহয়ে আসে না। কিন্ত এই ক্ষনস্হায়ী সময়গুলোই কখনো কখনো ইতিহাসের পাতায় অমোচনীয় কালিতে লেখা হয়। 

করোনার এমন দূর্যোগকালে আমরা দেখেছি উন্নত বিশ্বের মানুষগুলো তাদের আসল চেহারায় ফিরে এসেছে। মহামারী ঘোষণা করার সাথে সাথে বা তার আগেই কেমন করে স্বার্থপরের মতো হুমরি খেয়ে পরেছে সুপার শপে। নিমিষেই শপের সকল টয়লেট পেপার সহ বহু নিত্যপণ্য, বেঁচে থাকবার জন্যে অতি নগণ্য সব পণ্যের সেলফ শুন্য করে দিয়েছে। আর আমাদের মতো দরিদ্র দেশের মানুষগুলো করোনা আতংকে বাজারের সব খাদ্যপণ্য, বেঁচে থাকার জন্য যাদের কাছে চাল, ডাল, তেল, নুনই মহা মূল্যবান বলে মনে হয়েছে, তা তারা ঘরে গুদাম বানিয়ে নিয়েছে। ক্ষুদার জ্বালা পেটে সইতে পারলে যারা পিঠে গাদার বোঝা বইতে পারে, এদেশে যারা দিন আনে দিন খায়, পুঁজি বলতে যারা নিজের শরীরকে বোঝে, বরাবরের মতো তারা ছিলো নির্বিকার।দুই ধরনের দেশের মৌলিক পার্থক্য কেবল শারীরিক দূর্বলতা আর আর্থিক দূর্বলতা। ক্ষমতা আর সামর্থ্যবানরা সবারই দেশ ভিন্নহলেও চারিত্রিক বৈশিষ্ট কিন্তু এক।ঐসব দেশের বয়সের ভারে নুয়ে পরা মানুষগুলো শূন্যতাকে ছলছল চোখে দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বরন করতে বাধ্য হয়েছে। মানবতার বুলি আউরিয়ে জীবন পার করলেও সঠিক মানবতার শিক্ষা থেকে তারাও দূরে। ব্যবধান কেবল সময়ের, পরিস্হিতির, অবস্থানের।

করোনা সমগ্র বিশ্বকে  নতুন কিছু শিক্ষা দিবে। সেই শিক্ষা থেকে মানুষকেই ভাবতে হবে নিজেদের তারা কোথায়  রাখবে। সবই হবে মানুষের স্বাধীন চেতনা আর ইচ্ছার উপর ভিত্তি করে। তাদের চিন্তা করে বের করতে হবে, তাদের সম্পদ তারা বিলিয়ে দেবে নাকি অন্যেরটা ছিনিয়ে নেবে। তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কি স্বার্থপর হবে, না পরোপকার করবে। তাঁরাই চিন্তা করে বের করবে তারা ভালোবাসবে না বিশ্বময় ঘৃণা ছড়াবে। আর এসবই স্বাধীন বিবেকের ব্যাপার। মানবতা বোধে হাত বাড়িয়ে দেবে না স্বার্থপরতায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখবে এমন চরম সিদ্ধান্তে পৌছার সময় এখন। প্রতিটা যুগের পরিবর্তন হয় প্রয়োজনের তাগিদে।এখন বড় প্রয়োজন মানবিক পৃথিবীর।

করোনা আমাদের গোটা বিশ্বকে বুঝিয়ে দিয়েছে, যে যতো বড় ক্ষমতাবান আর খ্যাতিবানই হোক না কেন, যে কোন সময় কঠিন সংকচময় মুহূর্ত এসে সব কিছু তছনছ করে দিতে পারে। ক্ষমতা, অর্থ, বিত্ত কখনোই মানুষকে অনেক কিছু দিলেও জীবন দিতে পারেনা। প্রকৃতির কাছে মানুষ বড় অসহায়। জীবন খুব অনিশ্চিত হলেও মৃত্যুটা খুবই নিশ্চিত। দামি বাড়ি গাড়ি লাক্সারিয়াস জীবন এসবের কোনটাই কাজে আসে না। যখন কঠিন রোগ মানুষকে আক্রমণ করে, তখন একমাত্র আশা-ভরসা  সেবা বা চিকিৎসা। প্রয়োজন হয় হাসপাতালের একটা ছোট্ট বিছানা সাথে চিকিৎসক সেবকের করুণা। একবার ভেবে দেখুন, যেই জীবনের কোন নিশ্চয়তা নেই সেই জীবনে ভোগবাদী হবার কি মানে? করোনা কেবল আমাদের জীবন নিতেই আসেনি, আমাদের শিক্ষাও দিতে এসেছে- কি করে মানুষ আরো মানবিক হবে, মানবতার হাত দেশের গন্ডি পেরিয়ে ভিনদেশীকেও কিভাবে রক্ষা করবে।

আমাদের দেশ এই মুহূর্তে করোনা আক্রমণের চতুর্থ ধাপে অবস্হান করছে, এই কঠিন সময়ে আমরা দেখছি দু:খক্লিষ্ট অবস্হায় আতংক আর মৃত্যুভয় মাথায় নিয়েও কিছু মানুষ মানবতা আর সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। পরিচিত আপনজন, কাছের অনেক মানুষ রাতদিন কাজ করে যাচ্ছে। অসহায়, দরিদ্র মানুষকে অর্থ, খাবার, ঔষধ এবং যা যা দরকার যথাসম্ভব ক্লান্তিহীনভাবেই স্বেচ্ছায় সেসব নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। আমরা দেখেছি করোনায় মানবতার হাত কতো লম্বা হতে পারে, ইন্ডিয়ান ডাক্তার দেবী শেঠী বাংলাদেশী ৫০০ অসহায় মানুষকে দুই বেলা প্রতিদিন খাবার দিচ্ছেন, চিকিৎসার জন্যে গিয়ে যারা ঐখানে আটকে পরেছে তাদের।এদের এই কঠিন দু:সময়ে ভিনদেশী ভিন্নধর্মের হয়েও পাশে দাঁড়িয়েছেন; এসবই মানবতা, এখানে কোন ধর্ম নয়, হয়েছে কেবল মানবতার জয় ।

ঠিক উল্টা দিকে দেশে কিছু মানুষ তেলেসমতি সব কান্ড করেই যাচ্ছে। আজ দেখলাম, চট্টগ্রামের এক চেয়ারম্যান কিছু মানুষকে ত্রান দিয়ে ছবি তোলার পর সেসব ফিরিয়ে নিয়েছে। একজন ঢাকার রাস্তায় একশত টাকার নোট ছড়িয়ে দিয়েছে, অসহায় মানুষগুলো কাড়াকাড়ি করছে। হাসপাতালে এক প্রসূতিমাতা প্রসব বেদনায় চিৎকার করছে, অথচ ডিউটি ডাক্তার, নার্স কেউ তাদের রুম থেকে বের  হচ্ছেনা।অসুস্হ হয়ে মেইন রাস্তার পাশে একজন  পরে আছে, করোনার ভয়ে কেউ ধরছে না। হাসপাতাল করার জন্য একদল প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করতে গেলে এলাকার কিছু লোক মিলে তাতে বাঁধা দিলো। ত্রানের সামগ্রী লুটপাট করে নিয়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আরো দেখলাম মানুষ কতটুকু অমানবিক হলে মৃত ব্যক্তিকে কবর দেয়া নিয়েও তুলকালাম কান্ড ঘটাচ্ছে। এতো কিছু দেখে মনে হচ্ছে, কোথায় মানুষের মূল্যবোধ, এতোকাল ধরে চলে আসা সামাজিক আর ধর্মীয় শিক্ষা আমাদের কি কেবলই বাহ্যিক প্রলেপ। ধর্মের নামে আমরা জীবন দিতে পারি, কিন্তু ধর্মের আদর্শ মানতে পারি না, সঠিক ধর্মীয় মূল্যবোধ কি তাই জানিনা।

পৃথিবীর মানুষ আজ এমন এক ব্যাধির মুখামুখি হয়েছে, যা ধনী গরীব সকলের জন্যই সমান আতংকের জন্ম দিয়েছে।সম্পদের পাহাড় থাকলেও এই রোগে চিকিৎসা নিশ্চয়তা কিংবা রোগ প্রতিরোধ করার জন্য আলাদা কোন উপায় কারো জানা নাই। শরীরের ইমিউনিটি ছাড়া বাঁচার আর কোন সাধ্য কারো নাই।

মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। সৃষ্টিকর্তা মানুষকে সারা জীবন চাকরের মতো নিজের সংসারের, পরিবারের, আপন জনের জন্যে সম্পদের পাহাড় গড়ার জন্যে সৃষ্টি করেননি। তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে অন্য মানুষের পাশে থাকবার জন্য, অন্য মানুষকে  রক্ষা করবার জন্যে এবং একে অপরের কাছে উপকৃত আর সহমর্মী হয়ে থাকবার জন্যে। যুগ যুগ ধরে পৃথিবীতে চলে আসছে ভাঙ্গাগড়ার খেলা। আমরা বিশ্বাস করি  সবকিছুর পরে সৃষ্টকর্তার এই খেলা যতটুকু ধ্বংসের, ততটুকুই সৃষ্টির, কল্যানের। আমরা জানি, পৃথিবীর শেষ এখানে নয়। তাই মানুষকে নতুন করে ভাবতে হবে, হয়তো নতুন দিনের মানুষ হবে কেবল  মানুষের জন্যে। মানুষের বোধ হবে মানবতার কল্যানে, মানুষের ভালোবাসা থাকবে সৃষ্টির সকল প্রানে।

লেখক: নিউ মিডিয়া কোঅর্ডিনেটর, সিজিএস; পরিচালক, সিসিএন

এই বিভাগের আরো সংবাদ