শুভ জন্মদিন লতাবাঈ

  গোকুল দাস

২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:৪৫ | অনলাইন সংস্করণ

একদিন লতাজীর বাবা পণ্ডিত দীননাথ মুঙ্গেশকারের কাছে কয়েকজন এসে এক গানের অনুষ্ঠানে তাঁকে গান গাইতে অনুরোধ করলেন। লতাজী ছিলেন তখন ওখানে। বাবা কিছু বলার আগেই লতা বলে উঠলেন- ‘বাবা, আমি তোমার সাথে যাব এবং গাইব!’ 

বাবা হতবাক, জিজ্ঞেস করলেন তুই কী গাইবি? 

লতা’র সহজ উত্তর- তুমি আমাকে যে খাম্বাবতি রাগটি শিখিয়েছ তাই গাইব। 

কথা শেষ ।লতাজীর বয়স তখন মাত্র নয়।

ঐ দিনের ঘটনা। লতা সাদা জমিনের উপর ছোট ছোট প্রিন্ট করা এক ফ্রক পরে কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে বের হয়ে যাচ্ছেন। দরোজার কাছে মা আটকালেন, পারলেন না ঠেকাতে- বেরিয়ে গেলেন লতা।বাসার পাশেই এক ফটো স্টুডিও, ওখানে গিয়ে ছবি উঠিয়ে বাসায় ফেরত।কয়েকদিন পর বাবার ছবির পাশে লতাজীর ঐ ছবিটিই ছাপা হয়েছিল স্থানীয় এক পত্রিকায়, ক্যাপশন ছিলো- ‘বাবা আর মেয়ের ক্ল্যাসিকাল পরিবেশনা’!

বাবা দীননাথ মুঙ্গেশকার হাত দেখতেন। একদিন লতার হাত দেখে তাঁর মাকে বলেছিলেন- ‘তুমি চিন্তাও করতে পারবে না, ওর কতো নামডাক হবে।তোমার মেয়ে অনেক বড় গায়িকা হবে, তবে সে বিয়ে করবে না।’অক্ষরে অক্ষরে মিলে গিয়েছিল বাবার কথাগুলো।বাবা কি হাতের রেখা দেখে বলেছিলেন নাকি আশীর্বাদ করেছিলেন - কে জানে? 

১৯৪৭ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত দীর্ঘ ৪২ বছর সিনেমার গানের মূল কণ্ঠশিল্পী হিসেবে রাজত্ব করার রেকর্ড আর কার আছে জানি না। প্লে ব্যাকের আল্টিমেট হবার পেছনের কারণ গবেষকদের বিষয়। এতো লম্বা রেসের ঘোড়া হিসেবে টিকে থাকতে হলে কতদূর ডেডিকেশন আর পেশার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হয় তা পরিমাপ করার আমি কে!তাঁর ভাষায় ‘ঈশ্বরের কৃপা’! আশাজীর ভাষায়- ‘দিদি গান গাইলে মনে হয় মন্দিরে ঘন্টা বাজছে’! মান্না দে’র কথায়- ‘লতা নিজেই একটা ইনস্টিটিউশন’। আমি আদার বেপারী শুধু জানি তিনি একমেবোদ্বিতীয়ম, ঈশ্বরের বরপুত্রী।

তারপরও জীবন যতোই গতিময় আর দীর্ঘ হোক, একদিন মোড় নেবেই।লতা আশার জীবনেও মোড় নিয়েছে।দুবোন এখন আর রাজত্ব করছেন না।এক সময় শুনেছি তাঁদের জটিলতার কারণে অনেক ভালো শিল্পীরা সুযোগ পাননি। সুলক্ষণা পণ্ডিত, আরতী মুখার্জি,অনুরাধা পাড়োয়াল, সাধনা স্বরগম, অলকা ইয়াগনিক, কবিতা কৃষ্ণমুর্তিরা যথেষ্ট সুযোগ পাননি। জানি না কে কেমন ভাবেন, সুযোগ কেউ হাতে তুলে দেয় না আর দিলেও বারবার দেবে না। কেউ যদি হিমালয়ের চূড়ায় গিয়ে বসে থাকে তাহলে তাঁর কাছে যেতে পাহাড়টাতো ডিঙাতে হবে! 

ভাবুন তো- ২০ বছর বয়সে ‘মহল’ ছবিতে যিনি মধুবালার জন্য গেয়েছিলেন-‘আয়েগা আনেওয়ালা’, সেই তিনি ৪৪ বছর বয়সে ডিম্পল কাপাডিয়ার জন্য ‘ববি’ ছবিতে গাইলেন, ‘হাম তুম এক কামরেমে বন্দ হো’। ৬৯ বছর বয়সে একই শিল্পী ‘পেয়ার কিসিসে হোতা হ্যায়’ ছবিতে ডিম্পলের মেয়ে টুইঙ্কেল খান্নার জন্য গাইলেন, ‘মদহোশ দিল কি ধড়কন’, ।৭৫ বছর বয়সে বীরজারা ছবিতে প্রীতি জিনতার জন্য অবলীলায় গেয়ে দিলেন, ‘তেরে লিয়ে হাম জিয়ে!’ ২০১৫ সালে সর্বশেষ যখন ‘ডুন্নো ওয়াই টু’ ছবিতে ‘জানে ক্যায়া হে, জানা ম্যায়নে’ গানটি রেকর্ড করেন তখন তাঁর বয়স বেশি নয় মাত্র ৮৬ বছর! কী বলবেন- ইনি গান নিয়ে রাজনীতি করেন, না বর্ণ জিনিয়াস্! ভাগ্যিস, দিদিমা, মা আর মেয়ের লিগ্যাসি হয়নি তাঁর রাজত্বে হলে নানী টু নাতনি সবাই লিপ মিলাতেন তাঁর গলায়! 

আমি বলবো- নেহায়েত কপালগুনে এমন একটা সময়ে এই পৃথিবীতে এসেছিলাম যে- লতাজী’র সাথে আমিও হাওয়া নিয়েছি বুকভরে, আমি অশেষ ভাগ্যবান! আমি শুনেছি তাঁর অবিস্মরণীয় হিন্দি আর বাংলা গান যা আমাকে উথালপাতাল করেছে, আমাকে ভাসিয়েছে, আমাকে আন্দোলিত করেছে, আপ্লুত করেছে অপার্থিব ভালোলাগায়। কী নেই তাঁর গানে-ভালবাসা, নির্ভরতা, বন্ধুত্ব, প্রতীক্ষা, প্রকৃতি,দুঃখ–সুখ এর দোলাচল এ যেনো এক অপড়া বইয়ের পাতায় পাতায় লুক্কায়িত ভালোলাগার আবেশ।আপনি গেয়েছিলেন গান- ‘নাম গুম জায়েগা, চেহরা ইয়ে বদল জায়েগা, মেরি আওয়াজ হি পহচান হ্যায়, গর ইয়াদ রহে’। আপনি থাকবেন, আপনার আওয়াজ থাকবে অনেক অনেক দিন জনতার হৃদয়ে- ফর শিওর।

গতকাল ২৮ সেপ্টেম্বর ছিল এই কিংবদন্তী শিল্পীর জন্মদিন। শুভ জন্মদিন লতাবাঈ ! আরো অনেকবছর থাকুন আমাদের সাথে।

লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহিত।

এই বিভাগের আরো সংবাদ