জন্মদিনে নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে প্রণাম ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

  উৎপল কান্তি ধর

১৯ অক্টোবর ২০২০, ১৬:৪৬ | অনলাইন সংস্করণ

বিশিষ্ট বাঙালি কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী - এর শুভ জন্মদিন উপলক্ষে প্রণাম ও বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি 

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী {জন্ম: ১৯ অক্টোবর ১৯২৪ - মৃত্যু: ২৫ ডিসেম্বর ২০১৮ (বয়স ৬৬)} ছিলেন একজন  ভারতীয় বাঙালি কবি।  বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে আবির্ভূত আধুনিক বাংলা  কবিদের অন্যতম। 'উলঙ্গ রাজা' তার অন্যতম বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। এই কাব্যগ্রন্থ লেখার জন্য তিনি ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে সাহিত্য একাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। কবি পশ্চিমবঙ্গে বাংলা আকাদেমির সাথে দীর্ঘকাল যুক্ত ছিলেন।

তার শৈশব কেটেছে পূর্ববঙ্গে যা বর্তমান বাংলাদেশ, ঠাকুরদা আর ঠাকুমার কাছে। কবির ঠাকুরদা কর্মজীবন কাটিয়েছেন কলকাতায়।  কর্মজীবন শেষে ৫০ বছর বয়সে কলকাতার পাট চুকিয়ে বাংলাদেশের ফরিদপুরের বাড়ি চান্দ্রা গ্রামে চলে আসেন। তার বাবা কলকাতাতেই ছিলেন। কলকাতার একটা   বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাইস প্রিন্সিপাল হিসেবে তিনি কাজ করতেন। দুই বছর বয়সে   কবির মা বাবার কর্মস্থল কলকাতায় চলে যান। কবি থেকে যান তার ঠাকুরদা লোকনাথ   চক্রবর্তীর কাছে। গ্রামে কাটিয়েছেন মহা স্বাধীনতায়-ইচ্ছেমতো দৌড়ঝাঁপ   করে। কখনো গাছে উঠছেন; কখনো আপন মনে ঘুরেছেন গ্রামের এই প্রান্ত থেকে অন্য   প্রান্তে। চার বছর বয়সে কবির কাকিমা বলেছিলেন, ‌'তুই তো দেখছি কবিদের  মতোন  কথা বলছিস!' সেই সময়েই মুখস্থ করেছিলেন কবিগান, রামায়ণ গান।  গ্রামের  দিনগুলো খুব সুন্দর কাটিয়েছেন, তাই তিনি গ্রামের বাড়ি ছেড়ে  কলকাতায়  যেতে চাইতেন না।

তাঁর  প্রাথমিক লেখাপড়া ফরিদপুরের পাঠশালায়। পরে ঠাকুরদার মৃত্যুর  পর গ্রাম  ছেড়ে ১৯৩০ সালে কলকাতায় চলে এসেছিলেন। কলকাতায় এসে প্রথমে  কলকাতার  বঙ্গবাসী স্কুলে এবং পরে মিত্র ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। ১৯৪০  খ্রিস্টাব্দে  "প্রবেশিকা পরীক্ষা"য় উত্তীর্ণ  হন। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে  বঙ্গবাসী কলেজ থেকে আই. এ. পাশ করেন। ১৯৪৪  খ্রিস্টাব্দে সেন্ট পলস্ কলেজ  থেকে ইতিহাসে অনার্স নিয়ে বি. এ. পাশ করেন।  ছাত্রাবস্থায় "শ্রীহর্ষ"  পত্রিকার সম্পাদনা করে সংবাদপত্রের প্রতি তাঁর  নিবিড় ও গভীর অনুরাগের  সূত্রপাত হয়।

মাত্র  ৫ বছর বয়সে তিনি প্রথম কবিতা লেখেন। কিন্তু সেটা কোনো  পত্রিকায়  প্রকাশিত হয়নি। ১৬ বছর বয়স থেকে বিভিন্ন পত্রিকায় তিনি কবিতা  লিখে  এসেছেন। ১৬ বছর বয়সেই "শ্রীহর্ষ" পত্রিকায় কবিতা লেখার মধ্যে দিয়েই   সাহিত্যজগতে তাঁর প্রথম আত্মপ্রকাশ হয়। "দৈনিক প্রত্যহ" পত্রিকায় তাঁর   সাংবাদিকতার হাতেখড়ি। "সত্যযুগ" পত্রিকার সাংবাদিক  রূপে তিনি কর্মজীবন  শুরু করেন। এরপর তিনি একে একে "মাতৃভূমি", "স্বরাজ",  "ভারত", "ইউনাইটেড  প্রেস অফ্ ইন্ডিয়া" প্রভৃতি পত্রিকায় কাজ করা শুরু  করেন। ১৯৫১ সালে যোগ  দিয়েছিলেন ‘আনন্দবাজার’ পত্রিকায়। দীর্ঘ সময় তিনি  ‘আনন্দমেলা’ পত্রিকা  সম্পাদনা করেছেন। নীরেন্দ্রনাথের প্রথম কবিতার বই  ‘নীল নির্জন’, প্রকাশিত  হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। এরপর প্রকাশিত হয়েছে তার লেখা  ‘অন্ধকার বারান্দা’,  ‘নীরক্ত করবী’, ‘নক্ষত্র জয়ের জন্য’, ‘আজ সকালে’ সহ  অসংখ্য কবিতার বই।  সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার পেয়েছেন  তিনি।

তার  লেখা ‘উলঙ্গ রাজা’ কবিতায় সামন্ততান্ত্রিক জমিদার, জোতদার সমাজ   ব্যবস্থাকে তীব্র কটাক্ষের বাণে বিদ্ধ করেছিলেন নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী।   কবিতার শেষ লাইনে লেখা ‘রাজা তোর কাপড় কোথায়’ লাইনটি আজও মানুষের   মুখেমুখে।

পুরস্কার ও সম্মাননা
'উলঙ্গ   রাজা’ এই কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৭৪ সালে ‘সাহিত্য অকাদেমি’ পুরস্কার পান   কবি নীরেন্দ্রনাথ। তা ছাড়াও একগুচ্ছ পুরস্কার রয়েছে তার ঝুলিতে। ১৯৫৮   সালে ‘উল্টোরথ পুরস্কার’, ১৯৭০ সালে ‘তারাশঙ্কর স্মৃতি’ ও ১৯৭৬ সালে ‘আনন্দ   শিরোমণি’ পুরস্কার পান কবি। ২০০৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁঁকে   সাম্মানিক ডি. লিট প্রদান করে। পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁঁকে বঙ্গবিভূষণ   পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করেছিল।

নীরেন্দ্রনাথ  চক্রবর্তী আর বেঁচে নেই। বাংলা সাহিত্যের  অন্যতম  ধ্রুবতারা নীরেন্দ্রনাথ  চক্রবর্তী তার সৃষ্ট ‘অমলকান্তি’র মতোই যেন রোদ্দুর  হয়ে গেলেন। দীর্ঘদিন  ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগে ৯৪ বছর বয়সে  চিরপ্রস্থান ঘটলো এই  কিংবদন্তীর। ২০১৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর তিনি শেষ নিঃশ্বাস  ত্যাগ করেন।  অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল, পারেনি। আমাদের সমস্তটুকু  ঘিরে যে প্রলয়  অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, প্রিয় কবি, আপনি অন্তত আমাদের মাথার  উপরে, আকাশের  'নীল নির্জনে' রোদ্দুর হয়ে থাকুন।

লেখক: পরিচালক- জামালপুর গান্ধী আশ্রম।

এই বিভাগের আরো সংবাদ