করোনাভাইরাস : পরীক্ষা কেন দরকার আর তা কতটা নির্ভরযোগ্য?

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ এপ্রিল ২০২০, ১২:০৭

করোনাভাইরাস মহামারি আকারে ছড়ানোর পর থেকে কোভিড-১৯-এর জীবাণু কারো শরীরে আছে কিনা তা নির্ণয় করার জন্য যথেষ্টভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে না বলে বিশ্বের বহু দেশে বিভিন্ন মহল থেকে নানা অভিযোগ রয়েছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ কোভিড-১৯ পরীক্ষার ব্যাপারে বিভিন্ন ধরনের কৌশল ব্যবহার করেছে।

চীনে যেখান থেকে এই ভাইরাসের সূত্রপাত, সেখানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ব্যাপক সংখ্যক মানুষের শরীরে ভাইরাসের উপস্থিতি পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়া সেখানে সংক্রমণ শুরু হবার পর থেকেই দ্রুত সাধারণ মানুষের শরীরে পরীক্ষা চালিয়েছে।

ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে পরীক্ষার ব্যাপারে সবচেয়ে এগিয়ে জার্মানি। ব্রিটেনের সরকার যত সংখ্যক মানুষকে পরীক্ষা করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা পূরণ করতে পারেনি।

বাংলাদেশ এবং ভারতেও যথেষ্ট পরীক্ষা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশে পরীক্ষার সংখ্যা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে গত সপ্তাহে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত সারা দেশে ৪ হাজার ১১ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

কীভাবে পরীক্ষা করা হয়?
হাসপাতালগুলোতে যে পরীক্ষা পদ্ধতি বর্তমানে ব্যবহার করা হচ্ছে সেখানে দেখা হচ্ছে কার শরীরে কোভিড-১৯-এর জীবাণু রয়েছে। এতে নাক ও গলার ভেতর থেকে নমুনা নেয়া হচ্ছে এবং তার পর সেই নমুনা পাঠানো হচ্ছে গবেষণাগারে দেখার জন্য যে এই ভাইরাসের যে জেনেটিক গঠন তার কোন লক্ষণ ওই নমুনার মধ্যে রয়েছে কিনা। এই পরীক্ষার ফল জানতে কয়েকদিন সময় লাগে।

এ ছাড়া ব্রিটিশ সরকার আরও একটি পরীক্ষা শুরু করতে আগ্রহী। সেটি হলো অ্যান্টিবডি পরীক্ষা। এই পরীক্ষায় দেখা হবে কারো শরীরে ইতোমধ্যেই এই ভাইরাস রয়েছে কিনা। অর্থাৎ দেখা হবে কারো শরীরে এই রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কিনা। একটি যন্ত্রের মধ্যে এক ফোঁটা রক্ত নিয়ে এই পরীক্ষা চালানো হয়। এই পরীক্ষার ফল জানা যায় কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে। এতে ওই এক ফোঁটা রক্ত যন্ত্রে থাকা একটি তরল রাসায়নিকের সঙ্গে মেশানো হয় এবং এই পরীক্ষা বলে দেয় কারো শরীরে এই ভাইরাস প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি আছে কিনা। এই পরীক্ষায় ধরা পড়ে কারো ইতোমধ্যেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হয়েছিল কিনা।

এই পরীক্ষাগুলো কতটা নির্ভরযোগ্য?
বিবিসির স্বাস্থ্য বিষয়ক সংবাদদাতা রেচেল স্ক্রেরিয়ার বলছেন হাসপাতালগুলোতে যেসব পরীক্ষা চালানো হচ্ছে সেগুলো খুবই নির্ভরযোগ্য। কিন্তু তিনি লিখছেন এর মানে এই নয় যে এই পরীক্ষা থেকে করোনাভাইরাসের প্রত্যেকটি কেস ধরা পড়বে। কোন রোগীর নমুনা যদি সংক্রমণ ঘটার একেবারে গোড়ার দিকে নেয়া হয়ে থাকে অথবা যদি কারো সংক্রমণের মাত্রা খুব কম থাকে, তাহলে তার পরীক্ষার ফল ‘নেগেটিভ’ আসতে পারে। অথবা গলার ভেতর থেকে নমুনা নেওয়ার সময় যদি ওই লালায় যথেষ্ট পরিমাণ ভাইরাস না থাকে তাহলেও পরীক্ষার ফল ‘নেগেটিভ’ আসতে পারে। এখনো পর্যন্ত অ্যান্টিবডি পরীক্ষাকে খুব নির্ভরযোগ্য বলে মনে করা হচ্ছে না।

ব্রিটেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক বলেছেন অ্যান্টিবডি পরীক্ষার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য যে পরীক্ষাগুলো আছে, তার মধ্যে ১৫টি পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। কিন্তু এর কোনটাই তারা খুব নির্ভরযোগ্য মনে করছেন না।

অধ্যাপক জন নিউটন, যিনি ব্রিটেনে পরীক্ষার বিষয়টি সার্বিকভাবে তত্ত্বাবধান করছেন, তিনি দ্য টাইমস সংবাদপত্রকে বলেছেন চীন থেকে যে অ্যান্টিবডি পরীক্ষার কিটগুলো কেনা হয়েছে, তাতে যেসব রোগী করোনাভাইরাসে গুরুতরভাবে আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদের শরীরে পরীক্ষায় অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে। কিন্তু যাদের মধ্যে অল্প উপসর্গ দেখা গিয়েছে তাদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষায় তেমন কিছু পাওয়া যায়নি।

ব্রিটিশ সরকার ৩৫ লাখ অ্যান্টিবডি পরীক্ষার কিট কিনেছিল দেখার জন্য কত লোক দেশটিতে করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছিল। সেটা জানা গেলে তারা এই তথ্য পেত যে ব্রিটেনে কত মানুষের এই ভাইরাস প্রতিরোধের ক্ষমতা তৈরি হয়েছে।

কিন্তু দেশটির সরকার বলছে এই পরীক্ষার ফলাফল নির্ভরযোগ্য না হওয়া পর্যন্ত তারা এই পরীক্ষা চালাবে না।

পরীক্ষা কেন গুরুত্বপূর্ণ?
পরীক্ষার দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। প্রথমত কে আক্রান্ত সেটা নির্ণয় করা, এবং দেখা যে ভাইরাস কতটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে, জানাচ্ছেন বিবিসির স্বাস্থ্য বিষয়ক সংবাদদাতা।

দ্বিতীয় তথ্য অর্থাৎ ভাইরাসে কোন দেশে কত ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে তা জানা গেলে, বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এই মহামারি সামাল দিতে কতটা প্রস্তুত এবং হাসপাতালগুলোর ওপর বাড়তি চাপ এলে বা নিবিড় পরিচর্যা ব্যবস্থা আরও বাড়াতে হলে কী ধরনের প্রস্তুতি প্রয়োজন সে বিষয়ে দেশগুলো যথাযথ পরিকল্পনা করতে পারবে।

পরীক্ষার পরিসর যত বাড়ানো যাবে, অর্থাৎ যত বেশি মানুষকে পরীক্ষা করা সম্ভব হবে তত সামাজিক দূরত্ব কোন্ মাত্রায় বজায় রাখতে হবে সে বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া যাবে। উদাহরণস্বরূপ, যদি দেখা যায় জনগোষ্ঠির একটা ব্যাপক অংশ আক্রান্ত, তাহলে লকডাউন হয়ত অপ্রয়োজনীয় হয়ে দাঁড়াবে। কারণ বেশিরভাগ মানুষ আক্রান্ত হয়ে থাকলে মানুষকে ঘরে বিচ্ছিন্ন করে বিস্তার ঠেকানোর ব্যাপারে লাভজনক কিছু অর্জন করা যাবে না।

আর পরীক্ষা না করা হলে অনেকে যারা হয়ত আক্রান্ত হবার আশংকা থেকে স্বেচ্ছায় নিজেদের সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে, তাদের আইসোলেশনে থাকাটা নিরর্থক হবে বলছেন বিবিসির স্বাস্থ্য বিষয়ক সংবাদদাতা রেচেল স্ক্রেরিয়ার।

কিছু দেশ কেন এ ব্যাপারে এগিয়ে?
ব্রিটেনের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জার্মানির উদাহরণ দিয়েছেন। তিনি বলছেন ব্রিটেনে পৃথিবীর সেরা গবেষণাগারের অভাব নেই। কিন্তু ব্যাপক সংখ্যায় পরীক্ষা চালানোর ব্যবস্থা আছে এমন গবেষণাগার ব্রিটেনে নেই।

এত বিশাল আকারে পরীক্ষা চালানোর আয়োজন আছে, জার্মানিতে এমন ১০০টা গবেষণাগারকে অল্প নোটিশে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ সরকার দিতে পারে। তাদের সেরকম আয়োজন ইতোমধ্যেই রয়েছে।

ফলে জার্মানি ইউরোপের অন্যান্য আক্রান্ত দেশগুলোর তুলনায় পরীক্ষা চালিয়েছে অনেক দ্রুত এবং অনেক বেশি।

ভাইরাস আছে কিনা দেখার জন্য যে পরীক্ষা দরকার, তা ব্যাপক সংখ্যায় চালাতে গেলে প্রয়োজন হয় যথেষ্ট সংখ্যক সোয়াব স্টিক (যেটি নাক ও গলার ভেতর ঢুকিয়ে নমুনা সংগ্রহ করা হয়), ওই নমুনা গবেষণাগারে পরীক্ষার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ সরঞ্জাম। এছাড়াও যে তরল রাসায়নিক এই ভাইরাসের জিন আলাদা করতে সক্ষম, যার দ্বারা বোঝা যাবে এই ভাইরাস কারো শরীরে সংক্রমিত হয়েছে কিনা, তার পর্যাপ্ত সরবরাহ।

সারা পৃথিবীতে এই তরল রাসায়নিকের এখন প্রচণ্ড চাহিদা বলে জানাচ্ছেন বিবিসির স্বাস্থ্য সংবাদদাতা। আর এই রাসায়নিক এখন ভীষণভাবে দুষ্প্রাপ্য হয়ে ওঠাই ব্যাপক পরিসরে পরীক্ষা চালানোর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে।

একই ধরনের সংক্রমণ দেখা দেবার পর দক্ষিণ কোরিয়া পরীক্ষার দিক দিয়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। সংক্রমণ ছড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত তারা টেস্টিং কিট তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছিল, যাতে পরীক্ষা করার জন্য তারা অনেক কিট মজুত করে ফেলতে পেরেছিল।

জনসংখ্যার দিক দিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা ব্রিটেনের থেকে কম। কিন্তু সেখানে এই পরীক্ষার জন্য ব্রিটেনের তুলনায় দ্বিগুণ সংখ্যক গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাজ করেছে এবং ফলে মড়ক যখন তুঙ্গে তখন দক্ষিণ কোরিয়ায় পরীক্ষা চালানোর সক্ষমতা ছিল ব্রিটেনের থেকে আড়াইগুণ বেশি।
খবর বিবিসি

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ