যে ‘সেক্স স্ক্যান্ডাল’ ভিক্টোরিয়া যুগে কাঁপিয়ে দিয়েছিল ভারতকে

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০১৯, ১২:৩১

১৮৯২ সালের এপ্রিল মাস। ব্রিটিশ-শাসিত ভারতের সবচেয়ে বড় এবং ধনী রাজ্য হায়দ্রাবাদে হঠাৎ করে ছড়িয়ে পড়েছিল ইংরেজিতে লেখা ৮ পৃষ্ঠার এক প্যাম্পলেট বা পুস্তিকা।

যার বিষয়বস্তু ছিলেন হায়দ্রাবাদের একজন সম্ভ্রান্ত মুসলমান মেহেদী হাসান এবং তার ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত স্ত্রী এলেন গারট্রুড ডোনেলি।

১৯ শতকের ভারতে ভিন্ন বর্ণের মধ্যে প্রেম বা বিয়ে একেবারেই গ্রহণযোগ্য ব্যাপার ছিল না। তা ছাড়া সে সময়কার শাসক ব্রিটিশদের সঙ্গে দেশীয় কারো প্রেমকাহিনির কথাও শোনা যায়নি।

কারা এই যুগল?
এই যুগল ছিলেন হায়দ্রাবাদে পরিচিত মুখ। সমাজের এলিট শ্রেণির মানুষদের সঙ্গে ছিল তাদের ওঠাবসা। হায়দ্রাবাদের ‘নিজাম’ বা রাজ্য সরকারের পদস্থ চাকুরে মেহেদি এবং এলেনের ব্রিটিশ সংযোগ- এই দুই মিলে তারা হয়ে উঠেছিলেন ১৯ শতকের ভারতের অত্যন্ত ক্ষমতাধর এক দম্পতি।

শোনা যায় রানি ভিক্টোরিয়া একবার তাদের লন্ডনে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। হায়দ্রাবাদের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে করতে এক সময় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন মেহেদী। অনেকেই তার সাফল্যে ঈর্ষান্বিত ছিলেন।

হায়দ্রাবাদ হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি হয়েছিলেন মেহেদী, পরে রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।

স্বাভাবিকভাবেই ভালো মাইনে পেতেন, আর সেটাও অনেকের ঈর্ষাকে উস্কে দিতো।

অন্যদিকে এলেনও সেই সময়কার রক্ষণশীল সমাজের অবগুণ্ঠন ভেঙে বেরিয়ে এসেছিলেন এবং সমাজের উঁচু শ্রেণির মানুষদের সঙ্গেই ছিল তার ওঠাবসা।

অনেকেই এসব অপছন্দ করত, কিন্তু মেহেদী এবং এলেনের তা নিয়ে ভ্রুক্ষেপ ছিল না।

কী ছিলে আলোচিত সেই পুস্তিকায়?
১৮৯২ সালে হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়া সেই পুস্তিকার কারণে নাটকীয়ভাবে মেহেদী ও এলেনের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব এবং সুনাম হঠাৎ করেই মলিন হয়ে গিয়েছিল। ধারণা করা হয় মেহেদীর সাফল্যে ঈর্ষান্বিত ছিলেন পুস্তিকার বেনামী লেখক। মেহেদীর কাজে কোনো ত্রুটি খুঁজে না পেয়ে তিনি এলেনকে টার্গেট করেন এবং পুস্তিকায় তিনটি অভিযোগ তোলেন।

এক. মেহেদীকে বিয়ের আগে এলেনের পেশা ছিল পতিতাবৃত্তি এবং এক সময় পুস্তিকার বেনামী লেখক ও তার কয়েকজন বন্ধুর রক্ষিতাও ছিলেন এলেন।

দুই. পুস্তিকায় অভিযোগ তোলা হয় যে মেহেদী এবং এলেনের মধ্যে কখনই বিয়ে হয়নি।

এবং সবশেষে, মেহেদী হায়দ্রাবাদের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে এলেনকে পাঠিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করতেন বলে পুস্তিকায় অভিযোগ তোলা হয়।

প্রতিবাদ করেছিলেন মেহেদী
পুস্তিকা প্রচারের পর মেহেদীর বন্ধুরা তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন বিষয়টিকে একেবারেই পাত্তা না দিতে, পাল্টা কিছুই না করতে। কিন্তু তাদের কথায় কান না দিয়ে পুস্তিকার প্রকাশক এসএম মিত্রর নামে মেহেদী রেসিডেন্সি কোর্টে মামলা ঠুকে দেন।

একজন ব্রিটিশ বিচারপতি ওই আদালত পরিচালনা করতেন।

মামলার বাদী ও বিবাদী উভয়েই নামী বিখ্যাত ব্রিটিশ আইনজীবী নিয়োগ দিয়েছিলেন।

সাক্ষীদের ঘুষ দেয়া, তাদের দিয়ে মিথ্যা বক্তব্য দেয়ানো এবং মামলা প্রভাবিত করার চেষ্টায় কেউ কারো চেয়ে কম যাননি।

কিন্তু বিস্ময়কর হলো বিচারপতি প্রকাশক মিত্রকে পুস্তিকা প্রকাশের দায় থেকে অব্যাহতি দিয়েছিলেন।

শঠতা, পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করা, অবৈধ সহবাস, মিথ্যা সাক্ষী দেয়া, ঘুষ দেয়াসহ বহু অভিযোগ থাকার পরও এসএম মিত্রর কোনো সাজা হয়নি।

চাঞ্চল্যকর মামলা
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সে সময় এ মামলা খুবই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল।

হায়দ্রাবাদে নিজাম বা রাজ্য সরকার, ব্রিটিশ ভারতের সরকার, লন্ডনে ব্রিটিশ সরকার এবং সারা পৃথিবীর খবরের কাগজের চোখ ছিল নয় মাস ধরে চলা সেই মামলার দিকে।

শেষ পরিণতি
মামলা শেষ হবার কয়েকদিন পরেই মেহেদী এবং এলেন উত্তর ভারতের লখনৌ চলে যান, যেখানে তাদের দুজনেরই শৈশব কেটেছিল। পেনশন পাবার জন্য মেহেদী লখনৌ এর স্থানীয় সরকারে চাকরি পাবার চেষ্টা করেন কয়েকবার, সেখানে একদা তিনি চাকরিও করেছেন। কিন্তু তার চাকরি হয়নি সেখানে।

রানি ভিক্টোরিয়াকে খুশি করার জন্য মেহেদী একবার ভারতের জাতীয় কংগ্রেস পার্টিকে ‘বিপজ্জনক’ বলে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন, কিন্তু তার বিপদের দিনে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল।

হায়দ্রাবাদে নিজাম বা রাজ্য সরকারও তার পাশে দাঁড়ায়নি। তাকে স্বরাষ্ট্র সচিবের পদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় এবং তাকে কোনো পেনশন বা কোনো রকম আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়নি।

৫২ বছর বয়সে মৃত্যুর সময় এলেনের জন্য কোনো সম্পদ রেখে যেত পারেননি তিনি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এলেনের অবস্থাও খারাপ হতে থাকে। বৃদ্ধ অবস্থায় নিজাম এবং হায়দ্রাবাদের প্রধানমন্ত্রীর কাছে অর্থ সাহায্য চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন এলেন।

সরকার দয়াপরবশ হয়ে সামান্য অর্থ বরাদ্দ দিয়েছিল তাকে, কিন্তু অল্পদিন পরেই প্লেগ আক্রান্ত হয়ে এলেন মারা যান।

মেহেদী ও এলেনের প্রেম কাহিনি যে স্ক্যান্ডাল বা কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটেছিল, সে সময়টি ছিল তৎকালীন উপনিবেশিক ভারতের রাজনীতির জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ১৮৮৫ সালে ভারতীয় কংগ্রেস পার্টির জন্ম হয় এবং এলেনের মৃত্যুর পরে মহাত্মা গান্ধী ভারতে ফিরে আসেন। ক্রমে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন চাঙ্গা হতে থাকে। আর এই বিপুল ডামাডোলে চাপা পড়ে যায় ভিক্টোরিয়া যুগে ভারত কাঁপানো এক ‘সেক্স স্ক্যান্ডাল’, যা শেষ পর্যন্ত অমীমাংসিত থেকে যায়।
খবর বিবিসি বাংলা

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ