কানাডা নির্বাচন : জাস্টিন ট্রুডো কি বিপদে?

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১৩:০৪

চার বছর আগে, সত্যিকারের পরিবর্তনের অঙ্গীকার করে বিশাল এক বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন জাস্টিন ট্রুডো। লিবারেল পার্টির এ নেতা এবং তার দল কি আবারও কানাডার জনগণের সমর্থন আদায় করতে পারবেন?

যেদিন ট্রুডো শপথ গ্রহণ করেন, তখন তিনি তার মন্ত্রিসভায় নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণের কারণে বিশ্বের সংবাদমাধ্যমে শিরোনাম হয়েছিলেন, যা তার দলের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য বলে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন।

‘কারণ এটা ২০১৫ সাল’ হালকা হাসির সঙ্গে মন্তব্য করেছিলেন প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী। ওই তিনটা শব্দ সারা বিশ্বে খুব চমৎকার জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।

এটা ছিল ট্রুডোর মধুচন্দ্রিমার শুরু। এর পর প্রধানমন্ত্রী ট্রুডো বারাক ওবামার সঙ্গে সেলফি তুলেছেন, ভোগ ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিবেদনের বিষয় হয়েছেন, যেখানে তাকে কানাডার রাজনীতির নতুন তরুণ মুখ বলে বর্ণনা করা হয়েছে।

পরবর্তী সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দক্ষিণের দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হলেন, তখন রোলিং স্টোন ম্যাগাজিনের একটি প্রচ্ছদে প্রত্যাশা করা হয় যে, মুক্ত বিশ্বের নতুন নেতা হতে পারেন ট্রুডো- যিনি আমেরিকান প্রেসিডেন্টের নতুন ধরনের জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে, জলবায়ু পরিবর্তনের পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে জোরালো কণ্ঠ এবং সামাজিক নানা বিষয়, অভিবাসনের পক্ষে প্রগতিশীল চিন্তাভাবনা ধারণ করেন।

কিন্তু এটা ২০১৯ সাল এবং এখনকার ভোটাররা ট্রুডোর লিবারেলকে আর চার বছর আগের মতো করে দেখেন না।

তখন দেশটি প্রায় এক দশক ধরে রক্ষণশীল নেতা স্টিফেন হারপারের নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে এবং ভোটাররা অনেকটা সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল।

‘তখন পরিবর্তনের জন্য সত্যিই একটা মনোভাব তৈরি হয়েছিল যে, হারপারের শাসন থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, রক্ষণশীলদের ক্ষমতার অবসান ঘটাতে হবে আর সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে,’ বলছেন ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির রাজনৈতিক বিশ্লেষক লরা স্টিফেনসন।

ট্রুডোর প্রথম ফেডারেল কর্মসূচি ছিল জোরালো প্রতিশ্রুতি- বিনোদনের জন্য গাঁজাকে বৈধতা দেয়া, ক্ষমতা গ্রহণের এক সপ্তাহের মধ্যে ২৫ হাজার সিরিয়ান শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়া এবং কানাডার নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর মতো পদক্ষেপ।

ভোটাররা তার এসব ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং দৃষ্টিভঙ্গিকে সমর্থন জুগিয়েছে, যা ছিল আগের প্রধানমন্ত্রী হারপারের একেবারে বিপরীত।

এ সপ্তাহে ফেডারেল কর্মসূচি শুরুর সময় ট্রুডো তার বিজয়ী রাতের বক্তব্যে আবার ফিরে যান এবং আবারও হারপারের সময় ফিরে আসার ব্যাপারে সতর্ক করে দেন, যাকে তিনি বর্ণনা করেছেন বছরের পর বছর ধরে চলা ‘ব্যর্থ রক্ষণশীল নীতি’।

তিনি বলেন, ‘কানাডার বাসিন্দারা একটি নতুন দলকে বাছাই করেছে, মানুষ এবং নিজেদের সমাজের পেছনে বিনিয়োগ করতে চাইছে, যে দল বুঝতে পারে যে, বিশ্বের সেরা দেশটিতে বসবাসের পাশাপাশি সেটিকে আরও সেরা করে তোলা যায়। যদিও এখনো আমাদের অনেক কাজ করার বাকি রয়েছে, তবে গত চার বছর ধরে আমরা সব কিছু আরও উন্নত করার চেষ্টা করেছি এবং সেটা প্রমাণ করার মতো তথ্য আমাদের রয়েছে।’

তবে ট্রুডো এসব দাবি করলেও তার সরকারের সময়কে নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন স্টিফেনসন। গত বছরের এসএনসি-লাভালিনের নৈতিকতাজনিত কেলেঙ্কারির বড় প্রভাব পড়েছে তার সমর্থনের ওপর।

গত মাসে নৈতিকতা-বিষয়ক একটি পর্যবেক্ষণ সংস্থা দেখতে পেয়েছে, কানাডার বৃহৎ প্রকৌশল কোম্পানি এসএনসি-লাভালিনের ফৌজদারি মামলার ব্যাপারে সাবেক একজন মন্ত্রীকে অন্যায্যভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছিলেন।

আগস্টে অ্যাঙ্গুস রেইড ইন্সটিটিউট বলেছেন, কানাডার মাত্র ৩০ শতাংশ মানুষ তার এ কাজকে অনুমোদন দিয়েছে আর ৬০ শতাংশ অনুমোদন করেনি।

গত শরতে ওই ঘটনার সময় লিবারেল পার্টির জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যদিও দলটি কিছুটা সমর্থন ফিরে পেয়েছে এবং এখন জাতীয় নির্বাচনে রক্ষণশীল দলের সঙ্গে বেশ শক্ত লড়াই শুরু করেছে।

তার যেসব সিদ্ধান্তে প্রগতিশীলরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন, সেসব সিদ্ধান্তের ব্যাপারেও ট্রুডোকে ব্যাখ্যা করতে হবে।

ট্রান্স মাউন্টেন ওয়েল পাইপলাইন সম্প্রসারণ প্রকল্পে তার সমর্থন দেয়া এবং পাইপলাইন অবকাঠামো ক্রয়ে অসন্তুষ্ট হয়েছে পরিবেশবাদীরা। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউজ গ্যাস ২০০৫ মাত্রার নীচে নামিয়ে আনতে প্যারিস চুক্তিতে সম্মত হলেও, দেশটি সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এখনো যথেষ্ট কাজ করতে পারেনি।

নির্বাচনী সংস্কারের বেশ কিছু প্রতিশ্রুতি শুরুর পরপরই বাতিল করা হয়, যা অনেক বাম ঘরানার ভোটারকে ক্ষুব্ধ করেছে, যারা আশা করছিলেন যে, বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পেয়ে হাউজ অব কমন্সে নির্বাচিত হওয়ার রীতির বদল হবে।

সৌদি আরবের সঙ্গে করা বিতর্কিত একটি অস্ত্র চুক্তি বাতিল না করার জন্যও ট্রুডো সমালোচনার শিকার হয়েছেন।

বিরোধী বামপন্থি দল এনডিপির নেতা জগমিৎ সিং ট্রুডোর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে বলেছেন, ‘তার মিষ্টি কথা থাকলেও কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।’

তবে সাবেক লিবারেল নেতা বব রে বলছেন, ট্রুডো অব্যাহতভাবে এগিয়ে যাচ্ছেন, যার মাধ্যমে তিনি নিজের এবং কানাডার একটি পরিচিতি তুলে ধরেছেন। অন্য দলগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে বলা যেতে পারে যে, তিনি (জাস্টিন ট্রুডো) এটা বোঝাতে পেরেছেন যে, তিনি কে এবং তার দেশ কেমন? বিশ্বের অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গেও এ ব্যাপারে তুলনা করা যায়।

রাজনীতিতে আর নতুন ছেলেটি নয়
তার সরকার বেশ কয়েকটি অঙ্গীকারের বাস্তবায়ন করেছে। গাঁজাকে বৈধতা দেয়া হয়েছে, কানাডার মানবাধিকার আইনের ফলে নারী-পুরুষের বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং লিঙ্গ সমতার ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।

অর্থনৈতিক বিষয় আলোচনায় আনলে, উত্তর আমেরিকান মুক্তবাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে মেক্সিকো আর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে গেছে কানাডা, যদিও যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের বাজারের ব্যাপারে রক্ষণশীল নীতি নেয়ার চেষ্টা করেছে। কানাডায় বেকারত্ব ইতিহাসের যে কোনো সময়ের চেয়ে এখন কম।

এখন প্রশ্ন হলো, ট্রুডো কি মধ্য-বাম এবং বামপন্থি প্রগতিশীল ভোটারদের তার নিজের এবং লিবারেল পার্টির সমর্থনে নিয়ে আসতে পারবেন, যেমনটা হয়েছিল চার বছর আগে।

‘এখন আর তিনি নতুন মুখ নন,’ বলছেন স্টিফেনসন। ‘তা হলে এখন ব্যাপারটা কেমন হবে?’

লিবারেল ও কনজারভেটিভদের মধ্যে পরিষ্কার পার্থক্য বোঝানোর জন্য ট্রুডো প্রতিটা সুযোগের সদ্ব্যবহার করেছেন। তিনি এনডিপি, গ্রিন পার্টি, ব্লক কুইবেকোসিস দলগুলোকে লিবারেল পার্টির ব্যানারে নিয়ে এসে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। পাশাপাশি তিনি এই চেষ্টাও অব্যাহত রেখেছেন যেন, লিবারেল ভোটাররা অবশ্যই ভোটকেন্দ্রে আসে।

যদি প্রগতিশীলদের ভোট ভাগ হয়ে যায়, তা হলে তার সুবিধা পাবে রক্ষণশীলরা।

কনজারভেটিভ প্রার্থীদের ব্যাপারে বিব্রতকর তথ্য বের করার ব্যাপারে বেশ মরিয়া হয় কাজ করছে লিবারেল পার্টির কর্মীরা। যার ব্যাপারে কনজারভেটিভ নেতা অ্যান্ড্রু স্কেহের নির্বাচনী প্রচারণার সময় ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

‘লিবারেল নেতাদের এখন প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে ভোটারদের বোঝানো যে, ভোট অনেক ভাগ হয়ে যাওয়ার মানে হলো কনজারভেটিভদের বিজয়ী হওয়া,’বলছেন মি. রে।

কানাডার নির্বাচনের বাকি রয়েছে আর মাত্র ৫ সপ্তাহ। ২১ অক্টোবর ওই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, যেটির জন্য এখন সবচেয়ে উত্তেজনাকর প্রচার চলছে। তবে ট্রুডো বেশ কিছু সুবিধাও পাচ্ছেন।

কনজারভেটিভদের সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পরেও, জরিপে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে যে, ভোটার সমৃদ্ধ কুইবেক ও অন্টারিও প্রদেশে এগিয়ে রয়েছেন লিবারেল প্রার্থীরা। হাউজ অব কমন্সের ৩৩৮টি আসনের মধ্যে ১৯৯টি আসন রয়েছে এই দুটি প্রদেশে।

সাধারণত কানাডায় সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো সরকারকে এক মেয়াদের পরে ক্ষমতা থেকে সরতে হয় না।

তবে নির্বাচনী প্রচারণার অনেক গুরুত্ব আছে। মি. রে বলছেন, মি. ট্রুডোর রাজনৈতিক প্রচারণার ব্যাপারে ব্যাপক সহজাত ক্ষমতা রয়েছে- কঠিন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং ইস্যুর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা রয়েছে।

‘আমি মনে করি, যারা এই নির্বাচনের প্রচারণায় অবহেলা করবে, তারা বড় ধরনের ভুল করবে।’

অনেক সময় অপ্রত্যাশিত অনেক ঘটনা নির্বাচনী প্রচারণায় প্রভাব তৈরি করে, নেতাদের সক্ষমতার পরীক্ষা করে দেখে, শেষপর্যন্ত যার প্রভাব পরে ফলাফলে।

‘এমন অনেক বিষয় রয়েছে, যা হয়তো মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে এবং আমি মনে করি, সেসব ঘটনায় দলগুলো কী করবে, সেটাই তখন ভোটারদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে,’ বলছেন স্টিফেনসন।

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ