তুর্কি অভিযান ঠেকাতে কুর্দিদের সঙ্গে সিরিয়ার চুক্তি

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ১১:১৮ | আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ১১:৫৩

সিরিয়ার কুর্দিরা বলছে, সিরিয় সরকার দেশের উত্তরাঞ্চলের সীমান্তে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে তাদের কুর্দিদের বিরুদ্ধে তুরস্কের চালানো আগ্রাসন প্রতিহত করার চেষ্টা করবে।

সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এর আগে জানায়, উত্তরাঞ্চলে সরকারি বাহিনী নিয়োগ করা হয়েছে।

গত সপ্তাহে শুরু হওয়া তুর্কি অভিযানের মূল উদ্দেশ্য কুর্দি বাহিনীগুলোকে সীমান্ত এলাকা থেকে উৎখাত করা।

কুর্দি নেতৃত্বাধীন সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস বা এসডিএফের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকাগুলো গত সপ্তাহে তীব্র বোমা হামলার শিকার হয়েছে। সীমান্তবর্তী দুটি শহরে তুরস্কের বাহিনী শক্ত অবস্থান নিতে শুরু করেছে। সীমান্তের দুই প্রান্তেই বেসামরিক নাগরিকসহ অনেক যোদ্ধা নিহত হয়েছে।

রবিবার কুর্দি কর্মকর্তারা বলেছেন, বিদেশি ইসলামিক স্টেট যোদ্ধাদের পরিবারের প্রায় ৮০০ সদস্য যুদ্ধের সুযোগ নিয়ে উত্তরাঞ্চলের আইন ইসা ক্যাম্প থেকে পালিয়ে গেছেন।

তুরস্কের আগ্রাসন এবং ওই এলাকা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা প্রত্যাহার করে নেয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। কারণ সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পশ্চিমা জোটের প্রধান সহযোগীই ছিল এসডিএফ। কিন্তু তুরস্ক এসডিএফের কুর্দি সেনাদের সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করে। 

তুরস্কের বক্তব্য, তারা সিরিয়ার ভেতরে অন্তত ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত কুর্দিদের হটিয়ে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ তৈরি করতে চায়।

তুরস্কের ভেতরে থাকা ৩০ লাখের বেশি সিরিয় শরণার্থীকে ওই অঞ্চলে পুনর্বাসিত করার পরিকল্পনার কথাও বলেছে তুর্কি কর্তৃপক্ষ।

সমালোচকরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এর ফলে ওই অঞ্চলে বসবাসরত কুর্দিরা জাতিগত নিধনের শিকার হতে পারে।

চুক্তি সম্পর্কে কী জানা যাচ্ছে?
উত্তর সিরিয়ার কুর্দি নেতৃত্বাধীন প্রশাসন বলছে যে চুক্তি অনুযায়ী পুরো সীমান্ত জুড়ে সিরিয় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হবে। এ সেনা মোতায়েন এসডিএফকে ‘তুরস্কের সেনা এবং ভাড়াটে বিদেশি সেনাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এবং সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলো মুক্ত করতে সহায়তা করবে’ বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে তারা।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, এই পদক্ষেপ আফ্রিনের মতো যেসব সিরিয় শহর তুর্কি বাহিনীর অধীনে রয়েছে, সেসব শহরমুক্ত করতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে।

তুরস্কের সেনাবাহিনী এবং তাদের সমর্থক সিরিয়ার বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো ২০১৮ সালে দুই মাসের এক অভিযানের পর আফ্রিন শহর থেকে কুর্দি যোদ্ধাদের বিতাড়িত করে।

এই চুক্তি কুর্দিদের জোট পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা রাখতে পারে- বিশেষ করে ওই এলাকায় দীর্ঘসময় ধরে থাকা মার্কিন সেনাবাহিনীর সমর্থন হঠাৎ শেষ হয়ে যাওয়ার পর। তবে সিরিয়ার সরকার কুর্দি বাহিনীদের সঙ্গে কী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।

এসডিএফ-প্রধান মাজলুম আবদি ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের জন্য লেখা এক প্রতিবেদনে স্বীকার করেছেন যে, আসাদ সরকার ও তাদের রুশ মিত্রদের সঙ্গে ‘যন্ত্রণাদায়ক আপস’ করবে তারা।

তিনি লিখেছেন, ‘আমরা তাদের প্রতিশ্রুতি বিশ্বাস করি না। সত্যি বলতে কাকে বিশ্বাস করবো তা ঠিক করা খুবই কঠিন। কিন্তু আমাদের আপস এবং আমাদের মানুষের গণহত্যা- দুটির একটি বেছে নিতে হবে। তাই আমরা আমাদের মানুষের ব্যাপারেই চিন্তা করেছি।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে হঠাৎই উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার কিছু অঞ্চল থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেয়ার পরপর তুরস্ক সিরিয়ার সেসব অঞ্চলে আগ্রাসন চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

সে সময় মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের বিষয়টিকে এসডিএফ ‘পিঠে ছুরি চালানো’র সঙ্গে তুলনা করেছিল।

তুরস্ক এখন পর্যন্ত কতদূর অগ্রসর হয়েছে?
তুরস্ক সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে আরও শক্ত অবস্থান নিচ্ছে। রবিবার প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেছেন, তার বাহিনী ১০৯ বর্গকিলোমিটার এলাকা দখল করে নিয়েছে, যার মধ্যে ২১টি গ্রামও রয়েছে।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, অন্যতম প্রধান সীমান্তবর্তী অঞ্চল রাস আল-আইন তুরস্কের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। যদিও এসডিএফ বলেছে তারা তুরস্কের সেনাদের শহরের বাইরে হটিয়ে দিয়েছে। তুরস্কের বাহিনী তাল আবইয়াদ শহরও ঘেরাও করে রেখেছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক পর্যবেক্ষক গ্রুপ সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস বলেছে, তুরস্ক ওই এলাকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

এসডিএফের বিরুদ্ধে অভিযানে তুরস্কের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য রাস আল-আইন এবং তাল আবইয়াদ শহর দুটি।

এখন পর্যন্ত হতাহতের সংখ্যা
ওই এলাকায় সংঘাতের ফলে হতাহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সীমান্তের দুই পাশেই বেসামরিক নাগরিকসহ সেনারাও নিহত হয়েছেন। উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় ৫০ জনের বেশি বেসামরিক নাগরিক এবং ১০০ জনের বেশি কুর্দি যোদ্ধা মারা গেছে বলে বলছে সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটস। এসডিএফ বলেছে, কুর্দি বাহিনীর ৫৬ জন মারা গেছে এবং তুরস্কের দাবি সংখ্যাটা ৪৪০ জন। 

তুরস্ক থেকে পাওয়া খবর অনুযায়ী, দক্ষিণ তুরস্কে ১৮ জন বেসামরিক নাগরিক মারা গেছে। 

তুরস্ক জানিয়েছে, তুরস্কের ৪ জন সেনা এবং তুরস্ক সমর্থক ১৬ জন সিরিয়ান সৈন্য নিহত হয়েছেন। 

জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা বলছে, প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার বেসামরিক নাগরিক এখন ভাসমান রয়েছেন এবং এই সংখ্যা বাড়তে পারে। ওই অঞ্চলে তাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত তারা।
তথ্যসূত্র : বিবিসি

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ