‘আমি কখনো অসহায় বোধ করি না’

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২০, ১৭:৫২

যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি ফাউসি। ছবি : সিএনবিসি
করোনাকালীন এ সময়ে ব্যাপক আলোচিত একটি নাম ড. অ্যান্থনি ফাউসি। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ের এই সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ মহামারীর শুরু থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে পরামর্শ দিয়ে আসছেন। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে দুপক্ষের মাঝে দূরত্বের খবরও সামনে এসেছে। এর মাঝে মহামারী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ অনেক জনস্বাস্থ্য বার্তাও দিয়েছেন ফাউসি। সেসব নিয়ে ডার স্পিয়েগেলের সঙ্গে আলাপ করেছেন তিনি। সেই সাক্ষাৎকারের চুম্বকাংশ এখানে তুলে ধরা হলো।

ডার স্পিয়েগেল: ড. ফাউসি আপনি একবার বলেছিলেন যে আপনার সত্য বলার সুনাম রয়েছে। আমরা কি আজ আশা করতে পারি যে তেমন কিছু নমুনা পাব, যা আগে বলা হয়নি?

ড. অ্যান্থনি ফাউসি: অবশ্যই! আমি আপনাকে সব সময় সত্য বলব। আপনি কেবল প্রশ্ন জিজ্ঞেস করুন এবং আমি সত্যিটাই বলব। অন্তত আমি সেটাকে সঠিক বলে মনে করি।

স্পিয়েগেল: আচ্ছা, চেষ্টা করে দেখি তবে। আপনি ২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রশাসনকে পরামর্শ দিয়েছিলেন মহামারীর প্রস্তুতি বাড়াতে। আপনি কি এমন একটি মহামারী যে আসছে তা দেখতে পেয়েছিলেন। আর, সেটা কি এমন একটি দৃশ্য যেখানে গোটা পৃথিবী লকডাউনে আছে, হাসপাতালগুলো উপচে পড়ছে?

ড. অ্যান্থনি ফাউসি: উত্তরটা হচ্ছে, একটি নতুন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব আসার ব্যাপারে ভবিষ্যদ্বাণী ও আশঙ্কার কথা বলেছিলাম। কারণ আমি এ রকম সংকটের সাক্ষী। ইনস্টিটিউটের পরিচালক থাকাকালীন এই ৩৬ বছরে আমি এইচআইভি দেখেছি, ফ্লু মহামারী দেখেছি, ইবোলা দেখেছি, জিকাও দেখেছি। আমি সব সময় জানতাম যে ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাবের অনিবার্য চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে থাকবে।

স্পিয়েগেল: সে সময় আপনার সবচেয়ে বাজে দুঃস্বপ্নটা কেমন ছিল?

ড. অ্যান্থনি ফাউসি: ৩০ বছর আগে আমি আমার সবচেয়ে খারাপ ভয়ের কথা বলেছিলাম যে একটি নতুন সংক্রমণ সামনে আসবে, যা প্রাণীর শরীর থেকে মানুষের শরীরে স্থানান্তরিত হবে, সেটা ১. শ্বাসপ্রশ্বাসজনিত, ২. মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়বে, ৩. উচ্চমাত্রার অসুস্থতা ও মৃত্যু বয়ে আনবে—অন্তত জনগণের কিছু অংশের মাঝে। এখন হঠাৎ করেই এই ঝড়টি আমাদের ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য একটি মহামারী দেখাল। মানে, এটা ১৯১৮ সালের পর ১০২ বছরের মধ্যে আমার দেখা সবচেয়ে মারাত্মক ঘটনা।

স্পিয়েগেল: এইডসের একজন গবেষক হিসেবে আপনি কি মনে করেন, করোনাভাইরাস এইচআইভির চেয়ে খারাপ?

ড. অ্যান্থনি ফাউসি: এইডস সম্পূর্ণ ভিন্ন ব্যাপার। করোনাভাইরাস যে কারণে সবচেয়ে স্বতন্ত্র তার কারণ হচ্ছে বিশ্বব্যাপী এটি যেভাবে বিস্ফোরিত হয়েছে তা। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে সবাই দুর্বল। সাত-আট মাস ধরে করোনাভাইরাস গোটা বিশ্বকে স্থবির করে রেখেছে। এটা অর্থনীতিকে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে।

স্পিয়েগেল: ৫.৫ মিলিয়ন সংক্রমণ এবং ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি মৃত্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ। কেন এমনটি ঘটল বলে আপনার মনে হয়?

ড. অ্যান্থনি ফাউসি: আমার দেশ বেশ বড় ও বৈচিত্র্যময়। এটা আমাদের শক্তি। কিন্তু প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে এটি আমাদের দুর্বলতায় পরিণত হয়। আমাদের সংক্রমণের বিভিন্ন ওয়েভ ছিল এবং কেসের সংখ্যাও জার্মানি কিংবা ইতালির মতো নিচু বেসলাইনে ফিরে যায়নি। আমাদের বেসলাইনে প্রতিদিন ২০ হাজার কেস বজায় ছিল। আমরা সতর্কতার সঙ্গে অর্থনীতি খুলে দেয়ার নির্দেশনা তৈরি করেছি। কিছু স্টেট সেসব নির্দেশনা পালন করেছে এবং তারা বেশ ভালো করেছে। কিন্তু কিছু স্টেট করেনি, অন্য কিছু স্টেট এবং তাদের নাগরিকরা যেমন খুশি তেমন আচরণ করেছে। ফলে আমরা যা দেখেছি তা হলো দিনপ্রতি সংক্রমণের কেসের সংখ্যা ৪০ হাজার, ৫০ হাজার, ৬০ হাজার এমনকি ৭০ হাজার পর্যন্ত উঠেছে।

স্পিয়েগেল: সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোলও টেস্ট শুরু করতে সমস্যা করেছিল। তাই শুরুতে অলক্ষেই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে।

ড. অ্যান্থনি ফাউসি: হ্যাঁ, আমাদের টেস্টিংয়ের শুরুটা খারাপ ছিল অবশ্যই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে কারণে পরিস্থিতি এখন খারাপ তা হলো জনস্বাস্থ্যের সাধারণ বার্তাও এখন রাজনৈতিক বিভাজনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

স্পিয়েগেল: যেমন ফেস মাস্ক পরা?

ড. অ্যান্থনি ফাউসি: একদম। কিছু মানুষ বলল, যদি আপনি মাস্ক পরেন এটা একটা রাজনৈতিক বার্তা হবে এবং কিছু বলল, আপনি যদি মাস্ক না পরেন তবে সেটা অন্য একটা রাজনৈতিক বার্তা দেবে। না, এটা কোনো রাজনৈতিক কাজ নয়। এটা জনস্বাস্থ্যের মূলনীতির বিষয়।

স্পিয়েগেল: আমাদের জার্মানিতেও একই সমস্যা।

ড. অ্যান্থনি ফাউসি: আমি জানি। আপনি যখন জনস্বাস্থ্যের প্রতিক্রিয়াকে রাজনৈতিকীকরণ করবেন, তখন আপনি ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকরীভাবে লড়াই করতে পারবেন না।

স্পিয়েগেল: আমেরিকার বর্তমান অবস্থা দেখে আপনার অসহায় লাগে না? আপনি কি বিমর্ষ ও হতাশ হয়ে পড়েন না?

ড. অ্যান্থনি ফাউসি: আমি কখনো অসহায় বোধ করি না। অসহায় মানে আপনি কিছু করতে পারেন না। কিন্তু আমাদের করার মতো অনেক কিছু আছে। এসব কাজ করা আমাদের ওপর নির্ভর করে। আমি হতাশ হই না। আমি একজন বিজ্ঞানী এবং জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা। মহামারী নিয়ে আমার কোনো আবেগী প্রতিক্রিয়া নেই। প্রাদুর্ভাবের প্রতি আমার জনস্বাস্থ্যসংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া আছে এবং আমি কখনো হতাশ না। আমি সতর্কতার সঙ্গে আশাবাদী মানুষ। আমি একজন বাস্তববাদী।

স্পিয়েগেল: অনেকেই এ পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য ভ্যাকসিনেই সমাধান দেখছেন। সাধারণ মানুষের জন্য কখন করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন উপলব্ধ হবে? সেটা কতটা ভালো হবে? এবং এটা কি সত্যি আমাদের জীবনকে আগের মতো করতে পারবে?

ড. অ্যান্থনি ফাউসি: আপনি তিনটি প্রশ্ন করেছেন, যার নির্দিষ্ট কোনো উত্তর এখনো নেই। আমি বলছি, কোথায় আমরা আছি। অনেকগুলো ভ্যাকসিন অ্যাডভান্স টেস্টিংয়ে আছে। এখন আপনি যদি দৃষ্টি দেন যে, ভ্যাকসিনের কার্যকারিতা জানার জন্য কত সময় লাগবে, এটা এই বছরের শেষে কিংবা ২০২১ সালের শুরুতে জানা উচিত।

স্পিয়েগেল: যা গুরুত্বপূর্ণ সেটি হলো ভ্যাকসিন কতটা কার্যকর সেটি।

ড. অ্যান্থনি ফাউসি: অ্যাডভান্স টেস্টিংয়ের ফল না পাওয়া পর্যন্ত আমরা এটা জানি না। কিন্তু আমার সহকর্মীরা এবং আমি সতর্কতার সঙ্গে আশাবাদী। আমি বলছি না আমরা আত্মবিশ্বাসী। বলছি, আমি সতর্কতার সঙ্গে আশাবাদী যে আমরা সঠিক পথে আছি।

স্পিয়েগেল: কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের এক-তৃতীয়াংশ জনগণ ভ্যাকসিন নিতে চায় না।

ড. অ্যান্থনি ফাউসি: এটা আরেকটা চ্যালেঞ্জ। ভ্যাকসিন গ্রহণ করে সুবিধা নেয়ার জন্য জনগণকে রাজি করাতে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।

স্পিয়েগেল: যুক্তরাষ্ট্রে প্রাদুর্ভাবের শুরুতে আপনি প্রতিদিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে মিটিং করতেন। কিন্তু কেন তাকে বাজে পরামর্শ পাওয়া লোক বলে মনে হতো, মহামারীকে পাত্তা না দেয়া, এমনকি বিপজ্জনক উপদেশও দিয়েছেন। বিজ্ঞান বোঝার ক্ষেত্রে তিনি কি অসহায় ছিলেন? নাকি আপনি নিজেকে দোষ দেবেন যে আপনি ভালোভাবে বোঝাতে পারেননি।

ড. অ্যান্থনি ফাউসি: না, প্রেসিডেন্ট বিচক্ষণ মানুষ। তিনি বোঝেন। কোনো কিছুর ব্যাপারে তার নিজস্ব ধারণা আছে। তিনি সেসব ভিন্ন উপায়ে প্রকাশ করেন। কিন্তু তিনি যথেষ্ট বিচক্ষণ।

এবিএন/জনি/জসিম/জেডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ