আবরার হত্যার এক মাস

প্রস্তুত চার্জশিট, জমা দুই একদিনের মধ্যে

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০১৯, ০৯:৪৯

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে গত ৬ অক্টোবর শেরেবাংলা হলে ছাত্রলীগের ঘোষিত টর্চাল সেলে ডেকে নিয়ে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করেছিল শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী। চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের এক মাস পূর্ণ হয়েছে আজ (বুধবার)। এরই মধ্যে শেষ হয়েছে তদন্ত কার্যক্রম। তবে এখনও জমা হয়নি হত্যা মামলার চার্জশিট।

জানা গেছে, চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডে বুয়েটের ২৪ ছাত্রকে আসামি করা হয়েছে। দণ্ডবিধির ৩০২, ১০৯ ও ৩৪ ধারায় তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে।

প্রথমে এই হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আসামি ছিল ১৯ জন। তবে পরবর্তীতে তদন্তে আরও পাঁচজনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। তাদের চার্জশিটে আসামি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে মামলার তদন্ত সংস্থা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

চার্জশিটে যে ২৪ জনকে আসামি করা হয়েছে, তারা সবাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী। এর মধ্যে ২১ আসামি কারাগারে রয়েছে। এর মধ্যে এজাহারভুক্ত ১৬ জন এবং এজাহারের বাইরে পাঁচজন আসামি রয়েছে। এজাহারভুক্ত তিন আসামি এখনও পলাতক।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আবরার হত্যা মামলায় বুয়েটের চিকিৎসক, শেরেবাংলা হলের প্রভোস্টসহ আরও অনেককে সাক্ষী করা হবে। এরই মধ্যে মামলায় জব্দ সব আলামত ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেফতার আসামিদের মধ্যে এজাহারভুক্ত আটজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডে অপর আসামিদের সম্পৃক্ততাও উঠে এসেছে। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দু'জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। এর বাইরে তদন্ত কর্মকর্তারা বুয়েটের শিক্ষক, শেরেবাংলা হলের প্রভোস্ট, চিকিৎসক, নিরাপত্তাকর্মীসহ বিভিন্নজনের সাক্ষ্য নিয়েছেন। চার্জশিটে তাদের সাক্ষী হিসেবে রাখা হচ্ছে।

ওই কর্মকর্তা জানান, চার্জশিটের সঙ্গে আলামত হিসেবে আবরারের রক্তমাখা জামা-কাপড়, মেসেঞ্জারে আসামিদের লিখিত যোগাযোগ, প্রযুক্তিগত অন্যান্য যোগাযোগ, শেরেবাংলা হলের সিসিটিভি ফুটেজসহ ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা আলামতও জমা দেওয়া হচ্ছে।

একাধিক সূত্রের দেওয়া তথ্য মতে, অক্টোবরের শেষ দিকে কিংবা নভেম্বরের শুরুর দিকে আবরার হত্যায় চার্জশিট আদালতে দাখিল করার কথা।

এ বিষয়ে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার আব্দুল বাতেন জানান, বুয়েটে আবরার ফাহাদকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় আমরা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অভিযোগপত্র দেওয়ার কথা বলেছিলাম। আমরা এ লক্ষ্যেই কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের তদন্ত কাজ প্রায় সম্পন্ন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।

আবরার হত্যাকাণ্ডের মোটিভের বিষয়ে প্রশ্নের উত্তরে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত কমিশনার বলেন, মোটিভ যাই থাকুক, কাউকে হত্যা করার অধিকার কারও নেই। আমরা এখন পর্যন্ত যা পেয়েছি, শিবির সন্দেহে আবরার ফাহাদকে মারধর করা হয়েছিল।

এ পর্যন্ত মামলার এজাহারভুক্ত ১৯ আসামির মধ্যে ১৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে উল্লেখ করে পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, এজাহার বহির্ভূত ৫ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই ২১ জনের মধ্যে ৮ জন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডস্থল বুয়েটের শেরে বাংলা হলের ক্যান্টিন বয়, শিক্ষক, গার্ডসহ কয়েকজন ১৬১ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। মামলার বস্তুগত সাক্ষ্য এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। মামলার তদন্তে যেসব প্রক্রিয়া অবলম্বন করা দরকার, তা সম্পন্ন করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডে জড়িত গ্রেফতার ২১ জনের বিরুদ্ধেই প্রাথমিকভাবে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে জানিয়ে ডিবি কর্মকর্তা বাতেন বলেন, তাদের নাম উল্লেখ করেই আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হবে।

ঢাকা মহানগর দায়রা আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (মহানগর পিপি) মো. আবদুল্লাহ আবু বলেন, আবরার হত্যা মামলার চার্জশিট চূড়ান্ত হয়েছে। শিগগিরই চার্জশিট দেওয়া হবে। তিনি জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ইতোমধ্যে আলাপ-আলোচনা সেরে ফেলেছেন। মামলার আসামিদের ভূমিকা, তদন্তের সার্বিক বিষয় নিয়ে তার সঙ্গেও কথা হয়েছে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, আসামিদের অন্তত ১১ জন বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের বিভিন্ন পদে ছিল। অপর আসামিরাও ছাত্রলীগের কর্মী বা সমর্থক ছিল। তবে আবরার হত্যাকাণ্ডের পর ছাত্রলীগ থেকে পদধারীদের স্থায়ী বহিস্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া ঘটনার পর বুয়েটে ছাত্র রাজনীতিও নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু মামলার তদন্তের সময়ে রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে তাদের অপরাধী হিসেবেই বিবেচনা করা হয়েছে। চার্জশিটেও এর প্রতিফলন থাকছে। কার কী অপরাধ, কতটুকু অপরাধ- তা চার্জশিটে উল্লেখ করা হচ্ছে।

ডিবি পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সোমবার তদন্ত কর্মকর্তারা সংশ্নিষ্ট আইনজীবীদের নিয়ে চার্জশিট পর্যালোচনা করেছেন। মঙ্গলবার তা আদালতে জমা দেওয়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। তবে এত বড় ঘটনায় চার্জশিট দেওয়ার আগে তদন্ত তদারকি কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারীর অনুমতি নিতে চান। কিন্তু পুলিশপ্রধান দেশের বাইরে থাকায় আজ চার্জশিট জমা দেওয়া নাও হতে পারে। ওই কর্মকর্তা বলেন, ৭ নভেম্বর পুলিশপ্রধানের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। তিনি ফিরলে ওই দিনই আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়া হতে পারে।

এ হত্যা মামলার চার্জশিট জমা দেওয়ার প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করি খুব শিগগিরই, খুব স্বল্প সময়ের মধ্যেই এই মামলার পূর্ণাঙ্গ চার্জশিট প্রদান করতে পারব। আমাদের পুলিশ সেই কাজটি করছে। চার্জশিট যাতে নিখুঁত হয়, সবকিছু যাতে নির্ভুল হয়; সেজন্য পুলিশ কাজ করছে। একটা নিখুঁত চার্জশিট দিয়ে বিচারের কাজটি যাতে দ্রুততার সাথে শেষ করা যায়, সেই কাজটি আমরা সহজতর করব।’

গত ৬ অক্টোবর বুয়েটের শেরেবাংলা হলের কক্ষে ডেকে নিয়ে নির্মমভাবে নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে। এ ঘটনায় আবরারের বাবা মো. বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে ১৯ জনকে আসামি করে চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।

চার্জশিটভুক্ত আসামিরা: মেহেদী হাসান রাসেল, মুহতাসিম ফুয়াদ, অনিক সরকার, মেহেদী হাসান রবিন, ইফতি মোশররফ সকাল, মনিরুজ্জামান মনির, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, অমিত সাহা, মাজেদুল ইসলাম, মুজাহিদুর রহমান, তাবাখারুল ইসলাম তানভীর, হোসেন মোহাম্মদ তোহা, মো. জিসান, আকাশ হোসেন, শামীম বিল্লাহ, এ এস এম নাজমুস সাদাত, এহতেশামুল রাব্বি তানিম, মো. মোর্শেদ, মোয়াজ আবু হুরায়রা, মুনতাসির আল জেমি, মিজানুর রহমান, শামসুল আরেফিন রাফাত, ইশতিয়াক আহমেদ মুন্না এবং এস এম মাহমুদ সেতু।

পলাতক তিন আসামি: তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা বলছেন, মামলার এজাহারভুক্ত তিন আসামি মো. জিসান, মোর্শেদ ও এহতেশামুল তানিম এখনও পলাতক।

যে ৮ জন স্বীকারোক্তি দিয়েছে: এ মামলায় এজাহারভুক্ত আট আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তারা হলো নাজমুস সাদাত, ইফতি মোশাররফ, মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন, অনিক সরকার, মুজাহিদুর রহমান, মেহেদি হাসান রবিন, তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর ও মনিরুজ্জামান মনির।

এবিএন/শংকর রায়/জসিম/পিংকি

এই বিভাগের আরো সংবাদ