ট্রেন দুর্ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্র থাকলে সরকার খতিয়ে দেখবে : প্রধানমন্ত্রী

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১০:২৭ | আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ১০:৩৮

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা বলেছেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় এবং সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনার পেছনে কোন ষড়যন্ত্র থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেবে।

তিনি বলেন, ‘এই দুর্ঘটনার পেছনে অন্য কোন দুরভিসন্ধি বা চক্রান্ত রয়েছে কি না তা তদন্ত করা হবে এবং যথাযথ ব্যবস্থা আমরা নেব।’ 

বৃহস্পতিবার রাতে একাদশ জাতীয় সংসদের পঞ্চম অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। 

ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী এ সময় স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন।

প্রধানমন্ত্রী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় রেল দুর্ঘটানার প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমরা দেখি এ ধরনের ঘটনার পরপরই আরো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকে। কেন ঘটে তা আমাদের ভেবে দেখতে হবে।’

‘শীতকাল এলেই কুয়াশার কারণে ট্রেন দুর্ঘটনা বৃদ্ধির বিপরীতে কি করা যেতে পারে তাঁর সরকার সেটা ভেবে দেখবে’ উল্লেখ করে তিনি বিএনপি আমলের কথা স্মরণ করে বলেন, ‘এক সময় আমাদের দেশের রেল যোগাযোগটা প্রায় বন্ধই করে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল।’

তাঁর সরকার ক্ষমতায় আসার পর রেলের পুনরুজ্জীবন ঘটে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পুরনো যে সব রেললাইন ও ব্রীজ রয়েছে সেগুলোকে মেরামতের পাশাপাশি নতুন লাইনসহ রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা আমরা করে দিচ্ছি।

যেখানে যত পুরনো রেললাইন ও রেল ব্রীজ রয়েছে সেগুলো সংস্কার এবং মানসম্মত করতে একটি প্রকল্প গ্রহণের জন্যও রেলমন্ত্রীকে নির্দেশ দেয়ার কথা জানান। প্রধানমন্ত্রী এ সময় রেলের জনবল বৃদ্ধি এবং তাদের প্রশিক্ষণেও তাঁর সরকারের পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপি এক সময় রেল বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলে সেখানে লোক নিয়োগ এবং রেললাইন মেরামতের কাজও বন্ধ ছিল। এতে বিরাট শূন্যতার সৃষ্টি হয়ে গেছে। এখন সেটাই আমরা পূরণের ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

উল্লেখ্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মন্দবাগ রেলওয়ে স্টেশনে মঙ্গলবার ভোররাতে সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী ট্রেন উদয়ন এক্সপ্রেস এবং চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী তুর্ণা নিশিথা ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে আজ বৃহস্পতিবার সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় রংপুর এক্সপ্রেস ট্রেনের ৭টি বগি লাইনচ্যুত হয়। তবে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।

প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদ এবং সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে পেঁয়াজের মূল্য বৃদ্ধি, খাদ্যে ভেজাল, চলমান সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও মাদক বিরোধী অভিযান, মেট্রো রেল, দেশে পারমাণবিক এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ, বুয়েটের ছাত্র আন্দোলন এবং শিক্ষক আন্দোলন নিয়ে বক্তব্য রাখেন।

পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি সম্পর্কে বিরোধী দলের এক সংসদ সদস্যের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ভারতের একটি রাজ্যে পেঁয়াজের দাম ৮/১০ টাকা আছে। কিন্তু সেখান থেকে বাইরে পেঁয়াজ যেতে দেয়া হচ্ছে না। তবে, ভারতের অন্যত্র পেঁয়াজের দাম বেশি। সমগ্র ভারতবর্ষে পেঁয়াজ প্রায় একশ’ রুপিতে বিক্রয় হচ্ছে।’

তাঁর সরকারের উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে টিসিবি’র মাধ্যমে ৪৫ বা ৫০ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রয়ের তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পাশাপাশি আমরা মিশর এবং তুরস্কসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশ থেকেও পেঁয়াজ আনার উদ্যোগ নিয়েছি। ইতোমধ্যে ৫০ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ আমদানির এলসি খোলা হয়েছে।’

বিদেশ থেকে আমদানি করা পেঁয়াজকে জনগণের নাগালের মধ্যে আনতে সরকারের উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমি নির্দেশ দিয়েছি- টিসিবি সে পেঁয়াজ নেবে এবং বিতরণের ব্যবস্থা করবে। সব জেলায় ট্রাকে করে এই পেঁয়াজ চলে যাবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা এ ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন আছি। যাতে মানুষের সমস্যা না হয়।’

ইতোমধ্যে এক মৌসুমের পরিবর্তে ১২ মাস যেন পেঁয়াজ হতে পারে গবেষকরা পেঁয়াজের সে ধরনের বীজ উদ্ভাবন করতে সমর্থ হয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে আমরা এটি বাজারজাত করবো এবং তখন আর কারো মুখাপেক্ষী হয়ে থাকেতে হবে না। নিজেদের চাহিদা মত আমরা উৎপাদন করতে পারবো।’

খাদ্যে ভেজাল প্রসংগে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ সম্পর্কে বিরোধীদলের নেতাও বলেছেন, এটা ঠিক। আসলে মানুষের চরিত্র বদলায় না, বারবার অভিযান চালানোর পরেও। তবে, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং থাকবে।’

অতীতে বিএনপি সরকারের সময় চিংড়িতে লোহা ঢুকিয়ে ইউরোপে রপ্তানির প্রেক্ষিতে সেখানে চিংড়ি রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রসংগে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার বেজাল বন্ধ করে আবারো এই রপ্তানি চালু করেছে। বিএসটিআই’র মানোন্নয়ন করে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে বিএসটিআই’র টেস্টিং ল্যাব চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তিনি স্থল ও নদী বন্দরসহ দেশের বিভিন্ন ‘এন্ট্রি’এবং ‘এগজিট পয়েন্টে’ টেস্টিং ল্যাব স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন।

শিক্ষকদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইতোমধ্যেই তাঁর সরকার প্রায় আড়াই হাজার স্কুল এমপিওভুক্ত করে অন্য সকল শ্রেণী পেশার সঙ্গে শিক্ষকদের বেতনও বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে এমপিওভুক্তির একটি মানদন্ড দেয়া হয়েছে যারা এটা পূরণ করবে বাকি থাকলে তারাও এমপিওভুক্ত হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, ‘৬৫ হাজার ৬২৬ জন হেড মাস্টারকে ১১তম গ্রেড দেয়া হয়েছে। ৩ লাখ ৮২ হাজার সহকারী শিক্ষককে ১৩তম গ্রেড দেয়া হয়েছে। শিক্ষকদেরও আমরা আপগ্রেড করে দিয়েছি। তাদের বেতনের পরিমাণ এখন অনেক বেশি।’

শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান ও প্রশিক্ষণকালীন ভাতা প্রদান এবং ট্রেনিং গ্রহণ করলে তাঁদের চাকরির আপগ্রেডেশনেরও তথ্য দেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী রেল দুর্ঘটনা সম্পর্কে বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মাথায় ব্যথা থাকলে মাথা কেটে ফেলা বা দু,একটা দুর্ঘটনার জন্য রেল বন্ধ করে দেয়ার মনোভাবের সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, গাড়িতে তো প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে। তাহলে কি বিরোধীদলীয় নেতা গাড়িতে চড়া বা বিমান দুর্ঘটনা ঘটেছিল বলে কি বিমানে চড়া বন্ধ করে দেবেন?

শেখ হাসিনা বলেন, ‘দুর্ঘটনা নিছকই দুর্ঘটনা, কাজেই এই দুর্ঘটনা প্রতিরোধে মানুষের পক্ষে যতটুকু করা সম্ভব সেটুকু করতে পারটাই বড় কথা।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সরকার মেট্রো রেল তৈরী করছে। কবে কোথায় মেট্রো রেলে দুর্ঘটনা ঘটেছে বলে এটাও তৈরী বন্ধ করে দিতে হবে? তাহলে আমাদের যানজট দূর হবে কিভাবে? স্বল্প সময়ে মানুষ দূর দূরান্তে যাত্রা করবে কিভাবে?

শেখ হাসিনা দৃঢ়কন্ঠে বলেন, ‘সময়ের গতির সাথে তাল-মিলিয়ে চলতে গেলে আধুনিক প্রযুক্তি আমাদেরকে ব্যবহার করতে হবে। সাথে সাথে দুর্ঘটনা যেন না ঘটে সেদিকেও আমাদের বিশেষভাবে সচেতন থাকতে হবে।’

দেশের রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন দেশে এ ধরনের পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে। এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।

আর এটি নির্মাণের সময়ই রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্জ্যটা রাশিয়া নিয়ে যাবে। এ বিষয়ে আমাদের চুক্তিও হয়েছে এবং এই পাওয়ার প্লান্টকে ঘিরে তিন স্তর বিশিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি সংশ্লিষ্টদের রাশিয়া এবং ভারতে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ বঙ্গে আরেকটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র করার জন্য সরকার জায়গা খুঁজছে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র কোনভাবেই সুন্দরবনের পরিবেশ এবং জীব-বৈচিত্রের কোন ক্ষতি করবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটি আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল প্লান্ট। এর ছাইও সিমেন্ট কারখানায় ব্যবহার হবে এবং সেটা কেনার জন্যও হিড়িক পড়েছে, টেন্ডারও দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এর চিমনি অনেক উপরে রাখায় প্রায় ১৪ কি.মি. দূরে থাকা সুন্দরবনের দিকে কোনভাবেই এর ধোঁয়া যাবে না এবং প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৫ লাখ বৃক্ষ রোপণ করা হবে।

প্রধানমন্ত্রী বুয়েটের ছাত্র আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আবরার নিহত হওয়ার পর পরই ছাত্রদের আন্দোলন শুরুর আগে আইজিপিকে ডেকে ঘটনাস্থলের ফুটেজ সংগ্রহ করে জড়িত সকলকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেও পুলিশের ফুটেজ আনায় বাধাদানকারীদের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি দুর্নীতি বিরোধী অভিযান এবং কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থিতিশীল পরিবেশ প্রসংগে বলেন, ‘এখানে আমি দলমত কোন কিছু দেখবো না। এটা আমার নীতির ব্যাপার। অপরাধী যেই হোক শাস্তি তাকে পেতে হবে। কারণ এই সমাজকে তো দুষ্ট চক্রের হাত থেকে রক্ষা করতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘ব্যক্তি স্বার্থ কখনো বাংলাদেশের কারো কারো জন্য বড় হয়ে যায় এবং যেটা দুর্ভাগ্যের বিষয়।’
খবর বাসস

এবিএন/সাদিক/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ