মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে বাধা দেওয়াতেই ব্যবসায়ী খুন

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২১, ১৭:৩৬

মাদক ব্যবসা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে বাধা দেওয়াতেই ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার মাকড়াইল গ্রামের বাসিন্দা ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেনকে খুন করা হয়েছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবী করা হয়েছে।

এদিকে ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর হোসেনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় জাহাঙ্গীর হোসেনের পিতা হারুনুর রশীদ হিরু মিয়া বাদী হয়ে গতকাল রোববার রাতে মধুখালী থানায় মামলা দায়ের করেছেন। হত্যাকান্ডে জড়িত ওয়ালিদ হাসান মামুনকে প্রধান আসামী করে ১৬ জনের নামে এবং অজ্ঞাত আরো ১০-১৫ জনকে আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।

নিহত জাহাঙ্গীর হোসেনের ফুফাতো ভাই মনিরুজ্জামান বলেন, জাহাঙ্গীর ঢাকাতেই বসবাস করতো। করোনার কারনে রোজার শুরুতে জাহাঙ্গীর মধুখালীতে চলে আসেন এবং মধুখালী বাজারে পার্টসের ব্যবসা শুরু করেন।

তিনি বলেন, এলাকায় এসে দেখতে পান পুরো এলাকা মাদকে সয়লাব হয়ে গেছে। সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বেড়ে গেছে। জাহাঙ্গীর খোঁজ নিয়ে দেখেন এসব অপকর্মের পেছনে রয়েছে ওয়ালিদ হাসান মামুন। মামুনের বিভিন্ন অপকর্ম বাধা দেওয়ায় জাহাঙ্গীরের উপর ক্ষীপ্ত হয় মামুন। মামুনের পথের কাটা হয়ে দাড়ায় জাহাঙ্গীর, একারনেই জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করে মামুন ও তার লোকজন।

নিহত জাহাঙ্গীর হোসেনের পিতা হারুনুর রশীদ হিরু মিয়া বলেন, জাহাঙ্গীর খুব নরম প্রকৃতির ছেলে। কারো সাথে ঝামেলা করতো না, কিন্তু সে প্রতিবাদী ছিল। এলাকায় মামুনের সকল অপকর্মের প্রতিবাদ করায় মামুন আমার ছেলেকে নির্মমভাবে মেরে ফেলেছে। তিনি বলেন, মামুনের দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না করলে আরো অনেকের পিতার বুক খালি হয়ে যাবে। তাই প্রশাসনের নিকট দাবী জানাই দ্রুত মামুন ও তার সহযোগিদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হোক।

কামালদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুল বাশার বলেন, মামুন এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। মাদক ব্যবসা ও নারী পাচারের সাথে জড়িত মামুন। জাহাঙ্গীরকে নির্মমভাবে হত্যার আগেও এলাকায় একাধিক অপকর্ম করেছে মামুন। এলাকায় মামুনের একটি বাহিনী রয়েছে। মামুন ও তার বাহিনীর অত্যাচারে এলাকার মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে।

তিনি আরো বলেন, কয়েকদিন আগে ছোরাফ হোসেন, রেজাউল শেখ ও বিল্লাল হোসেনের বাড়িতে গিয়ে হামলা চালায় মামুন ও তার লোকজন। এসময় তাদের মারপিট ও বাড়ির আসবাবপত্র ভাংচুর করে তারা। নয়াবাড়ী এলাকার রবিউল এর বাড়িতে হামলা চালিয়ে তার খেড়ের পালায় আগুন ধরিয়ে দেয়। এছাড়া পারুল নামে একটি মেয়েকে জমিজমা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে প্রকাশ্যে মারপিট করে। এসকল ঘটনা ঘটালেও ভয়ে তার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলে না। প্রতিবাদ করলেই তার উপর চলে অমানষিক নির্যাতন।

ইউপি চেয়ারম্যান আরো বলেন, জাহাঙ্গীর হোসেনকে হত্যার আগের দিন তারা মেছোড়দিয়ায় তাঁর ভগ্নিপতির বাড়িতে বসে গোপন বৈঠক করে। এরপর তারা পরিকল্পিতভাবে জাহাঙ্গীর হোসেনকে হত্যা করে। এর আগে এই মামুন ঢাকায় ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে জেলও খেটেছে। র‌্যাবের হাতে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছে। এখনো সে এলাকায় তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে এসব অঘটন ঘটিয়ে চলেছে। তিনি জাহাঙ্গীর হোসেনের খুনিদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তি দাবি করেন।

মাকড়াইল গ্রামের বাসিন্দা আফসার শেখ বলেন, মামুন ও তার বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকা- করে আসছে। কেউ প্রতিবাদ করলেই তার উপর চলে অত্যাচার নির্যাতন। মামুন এলাকায় মাদকে সয়লাব করে দিয়েছে। যুব সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এছাড়া নানা অপকর্মে জড়িত মামুন।

তিনি আরো বলেন, জাহাঙ্গীর একজন উচ্চ শিক্ষিত ভদ্র ছেলে। সে এলাকায় আসার পর এসব অপকর্ম দেখে প্রতিবাদ করায় তাকে নির্মমভাবে হত্যা করলো মামুন ও তার লোকজন। মধুখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোঃ শহিদুল ইসলাম বলেন, নিহত জাহাঙ্গীর হোসেনের পিতা হারুনুর রশীদ হিরু মিয়া বাদী হয়ে হত্যাকান্ডে জড়িত ওয়ালিদ হাসান মামুনকে প্রধান আসামী করে ১৬ জনের নামে এবং অজ্ঞাত আরো ১০-১৫ জনকে আসামী করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। আসামীদের গ্রেফতারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে।

এদিকে জাহাঙ্গীর হোসেনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে এলাকাবাসী। হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ  করেছে বিক্ষুদ্ধ গ্রামবাসী। তারা দ্রুত হত্যাকান্ডে জড়িত মামুন ও তার সহযোগিদের গ্রেফতারের দাবী জানিয়েছে।

কে এই ওয়ালিদ হাসান মামুন ঃ মধুখালী উপজেলার মাকড়াইল গ্রামের বাসিন্দা শামসুল আলমের ছেলে ওয়ালিদ হাসান মামুন। দীর্ঘদিন ঢাকায় বসবাস করতো মামুন। ঢাকায় থাকা অবস্থায় ব্যাংক ডাকাতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে জেলও খেটেছেন তিনি। এছাড়া র‌্যাবের হাতে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হন। ওই মামলাতেও কারাদন্ড ভোগ করেন তিনি। এরপর নিজ এলাকা মাকড়াইলে চলে আসেন মামুন। এলাকায় এসে গড়ে তোলেন নিজস্ব একটি ক্যাডার বাহিনী।

তিনি ও তার বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় মাদকের ব্যবসা শুরু করেন। মাদকে সয়লাব করে দেন পুরো এলাকা। এছাড়া নারী পাচারের সাথেও জড়িত রয়েছে মামুন। এলাকায় বিভিন্ন অপকর্মের সাথে জড়িত মামুন ও তার বাহিনীর সদস্যরা। মামুনের বিরুদ্ধে মধুখালী থানায় একাধিক অভিযোগ দেওয়া রয়েছে বলে এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে।

প্রসঙ্গত, মধুখালী উপজেলার কামালদিয়া ইউনিয়নের মাকরাইল গ্রামের সম্ভ্রান্ত গৃহস্থ হারুনুর রশীদ হিরু মিয়ার বড় সন্তান জাহাঙ্গীর হোসেন (৫২)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করে তিনি দীর্ঘদিন যাবত ঢাকাতেই পার্টসের ব্যবসা করতেন। তবে সা¤প্রতিক করোনাভাইরাস এর মহামারীর কারণে তিনি ঢাকা থেকে নিজ গ্রাম মাকরাইলে ফিরে আসেন এবং মধুখালী বাজারে পার্টসের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলেন।

তার স্ত্রী সাজেদা মাহমুদ বিথী ঢাকার ভিকারুন্নেসা স্কুলের ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন। গত বছরের ৪ নভেম্বর সাজেদা মাহমুদ বিথী ক্যান্সাওে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। জাহাঙ্গীর হোসেনের বড় মেয়ে মাহমুদা জাহান ভিকারুন্নেসা স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্রী। আর তার ছোট মেয়ে জান্নাতুল জাহান স্মৃতি একই স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। শাফিন মাহমুদ সামী নামে তাদের চার বছরের একটি শিশু পুত্র রয়েছে।

শনিবার দুপুরে মধুখালী বাজার থেকে ভ্যানযোগে বাড়ি আসছিলেন জাহাঙ্গীর। মাকরাইল গ্রামের উত্তর পাড়া পৌঁছামাত্রই রাস্তার উপরে প্রকাশ্যে দিবালোকে মামুন ও তার লোকজন জাহাঙ্গীরের উপর হামলা চালিয়ে পৈচাশিকভাবে পিটিয়ে তাকে গুরুতর আহত করে মৃত ভেবে ফেলে যায়।

পরে গ্রামের লোকজন তাকে উদ্ধার করে মধুখালী হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানে তার শারিরীক অবস্থার অবনতি হলে সন্ধ্যায় ফরিদপুর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাত দেড় টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জাহাঙ্গীর হোসেন।

এবিএন/কে এম রুবেল/জসিম/জুয়েল

এই বিভাগের আরো সংবাদ