জাল সাক্ষরে চাকরি, লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২১, ২১:৫৮ | আপডেট : ১৩ জুন ২০২১, ২২:০৬

রাতের আধারে কলেজের গাছ কেটে নিজের বাড়ি নির্মাণের কাজে ব্যবহার ও বিক্রির অভিযোগ উঠেছে এক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, স্বাক্ষর জাল, ডিজি প্রতিনিধি ছাড়াই নিয়োগ, রশিদ ছাড়াই সনদের জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ নানা অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ওই প্রতিষ্ঠান প্রধানের নাম মু. মাজেদ আলী খান। তিনি বদরগঞ্জ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, টাকা ছাড়া সনদ দেন না এই অধ্যক্ষ। কলেজের পাসকৃত শিক্ষার্থীদের চারিত্রিক সনদ ও প্রশংসাপত্র তুলতে ৫০০ টাকা করে দিতে হয়। তবে টাকা জমাদানের কোনো রশিদ দেয়া হয় না শিক্ষার্থীদের। শতভাগ সরকারি বেতন পাওয়ার পরও বাংলা ও হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রধানদের যোগসাজসে বিভাগের তহবিল থেকে প্রতিমাসে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাতা নেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কলেজ অধ্যক্ষের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হচ্ছেন শিক্ষকরা। মাজেদ আলীর বিভিন্ন দুর্নীতি, অনিয়ম, জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাতের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় শিক্ষকদের হেনস্তার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

সূত্র জানায়, বদরগঞ্জ সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক শামীম আল মামুনের শিক্ষক নিবন্ধনের সনদ সঠিক থাকলেও তার সনদ জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন এই অধ্যক্ষ। পরবর্তী শামীমকে হেনস্থা করার জন্য তার শিক্ষক নিবন্ধনের সনদ যাচাইয়ের করতে এনটিআরসিএতে পাঠান। এনটিআর সনদ যাচাই শেষে সনদটি সঠিক বলে জানায়।

বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষক রংপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিসেট্রেট আদালতে অভিযোগ করেন। এতে আরও ক্ষিপ্ত হন অধ্যক্ষ মাজেদ। প্রভাষক শামীমকে হেনস্থা করার উদ্দেশ্যে অধ্যক্ষ তার অনুসারীদের অনুপ্রেরণায় শিক্ষক নিবন্ধনের জাল সনদ (রোল নং-১১০৭০০৩৩, রেজিঃ নং-৭০০৩৪৯৭, পরীক্ষার সাল-২০০৭ইং) তৈরি করেন। এছাড়া সেটি সঠিক কিনা তা যাচাইয়ের জন্য গেল বছরের ২৯ আগস্ট এনটিআরসিএ’র কাছে প্রেরণ করেন। সনদটি যাচাই শেষে সেটি জাল বলে জানায় এনটিআরসিএ। 

তবে এই সনদটি বাংলা বিভাগের প্রভাষক মামুনের নয়। মামুনের প্রকৃত এনটিআরসিএ সনদের রোল নম্বর ৪০১২৬০৭৭ আর রেজিষ্ট্রেশন নম্বর ২০১২৮৪৭৮৫৮। যা এনটিআরসিএর বৈধ সনদ বলে তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।

এদিকে গত বছরের ২৭ আগষ্ট বদরগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষকবৃন্দ অধ্যক্ষ মু. মাজেদ আলী খানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থ আত্মসাত ও স্বেচ্ছারিতার অভিযোগে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক বরাবর অভিযোগ জমা দেন। অভিযোগের ভিত্তিতে বদরগঞ্জ সরকারি কলেজের একাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চারজন কলেজ শিক্ষককে অভ্যন্তরিণ অডিট সম্পন্ন করতে দায়িত্ব দেয়া হয়।

অডিট কমিটির সদস্যরা ২০১০ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মোট ১০ বছরের অডিট সম্পন্ন করেন। মোট আয়-ব্যয়ের নয়টি খাত চিহ্নিত করে অডিট সম্পন্ন করেন সদস্যরা। আর এতেই অধ্যক্ষের ৪৬ লাখ ৩৬ হাজার ৭৩৯ টাকার নয়ছয় ধরা পড়ে। তবে ২০১২ সালে গঠিত বাংলা অনার্স এবং হিসাব বিজ্ঞান অনার্স শাখার অডিট সম্পন্ন করা হয়নি।

কারণ হিসেবে অডিট কমিটির সদস্যরা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, বাংলা বিভাগের প্রধান মকবুল হোসেন খান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রধান মোস্তফা কামালের অসহযোগিতা এবং অনীহার কারণে ওই অডিট সম্পন্ন হয়নি। শুধুমাত্র উচ্চ মাধ্যমিক ও পাস কোর্সভুক্ত তহবিলের হিসাব-নিকাশ এতে উপস্থাপন করা হয়েছে।

অডিট কমিটির সদস্যরা প্রতিবেদনে আরও জানান, বাংলা ও হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও অধ্যক্ষ শিক্ষার্থীদের বেতন এবং অন্যান্য ফি কলেজের অফিস সহকারী বা ক্যাশিয়ারকে বাদ দিয়ে নিজেরা রশিদমূলে বা রশিদবিহীন আদায় করেছেন।

এসব বিবেচনায় নিয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে মাউশি। গত বছরের ১৮ অক্টোবর তদন্ত কমিটির সদস্যরা এক দফা তদন্ত করেন। এরপর একই বছরের ১৫ নভেম্বর দ্বিতীয় দফা তদন্ত সম্পন্ন করেন। তবে তদন্ত প্রতিবেদন এখনো প্রকাশ না করায় বিষয়টি ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। 

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বরাবরের ন্যায় অধ্যক্ষ মাজেদ আলী খান নিজেকে নির্দোষ দাবী করে বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং আমাকে হয়রানী করার জন্য উদ্দেশ্য প্রনোদিতভাবে এই সকল অভিযোগ আনা হয়েছে। এইগুলো তদন্ত চলছে- আশা করছি মিথ্যা প্রমাণিত হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে মাউশি মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ মো. গোলাম ফারুক বলেন, বিষয়টি অনেক আগের। এ বিষয়ে বিস্তারিত জেনে পরে জানাব।

এবিএন/মমিন/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ