আজ ঘিওরের তেরশ্রী গণহত্যা দিবস

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২২ নভেম্বর ২০২১, ১৩:৫৭

আজ ২২ নভেম্বর মানিকগঞ্জের ঘিওরের তেরশ্রী ঐতিহাসিক গণহত্যা দিবস। পাক হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসর এবং রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনীর সদস্যরা ১৯৭১ সালের এই দিনে বর্বরোচিত নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার তেরশ্রী গ্রামের তৎকালীন জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীসহ ৪৩ জন গ্রামবাসীকে গুলি করে এবং বেয়নেটের আঘাতে নির্মম ভাবে হত্যা করে।

হাত পা বেঁধে শরীরে পেট্রোল ঢেলে জালিয়ে পুড়িয়ে নির্মম ভাবে হত্যা করা হয় জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীকে। নিরীহ গ্রামবাসীর উপর বর্বরোচিত হামলা ও হত্যাকান্ডের কারণ জানতে চাওয়াতে ঘাতকরা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমানকে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, স্বাধীনতার ৫০টি বছর অতিবাহিত হওয়ার পরেও নিহতদের পরিবারের খোঁজ খবর রাখেনি কেউ। এমনকি বিচার হয়নি হত্যাকান্ডের। করোনা ভাইরাসের কারণে এবার সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে দিবসটি উদযাপন করা হচ্ছে নানা আয়োজনে।

জানা গেছে, ঘিওরের তেরশ্রী গ্রামের মানুষগুলো ছিল সংস্কৃতিমনা। বাম রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল তেরশ্রী গ্রাম। মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা ছিল জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি। ১৯৭১ সালে পাক হানাদার বাহিনীর দোসররা টার্গেট করে এই গ্রামটিকে। গোপনে শিক্ষানুরাগী, মুক্তিযোদ্ধা, ভাষাসৈনিক, রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবীদের তালিকা প্রস্তুত করে দালালরা। নীল নকশা করে এই গ্রামটিকে ধ্বংস করার।

১৯৭১ এর ২১ নভেম্বর রাতের অন্ধকার শেষে ২২ তারিখের দিনের আলোর আশায় যখন রাতের শেষ প্রহর আর সোনালি সূর্য উদিত হওয়ার রক্তিম আভা পূর্ব আকাশে উঁকি দিচ্ছিল, ঠিক তেমন সময়ে ঘিওর থেকে পাকহানাদার আর তাদের সহযোগীরা আক্রমণ চালায় তেরশ্রী গ্রামে। শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরে হায়েনার দল ঝাঁপিয়ে পড়ে সেনপাড়ার ঘুমন্ত মানুষের উপর।

ঘর বাড়িতে আগুন, প্রচণ্ড গুলির শব্দ, চিৎকার আর আর্তনাদে পরিবেশ ভারি হয়ে যায়। আতংকিত গ্রামবাসী প্রাণভয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকে। আত্মরক্ষাও করতে পারে না তারা। হানাদার বাহিনী যাকে যেখানে পেয়েছে তাকে সেখানেই হত্যা করেছে। বাড়িতে, রাস্তায়, ঝোপে ঝাড়ে, শিশু, নারী ও বৃদ্ধা, যুবকসহ সবাইকে হত্যা করেছে। আহাজারি আর আর্তচিৎকারে তেরশ্রী গ্রাম ডুবে যায় নারকীয় অবস্থার মধ্যে। পাক বাহিনীর এ দেশীয় সহযোগীরা দিনের আলো ফুটলে, তাদের মুখে মুখোশ পরে নেয়।

ভবিষ্যতে সুবিধামতো রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়ার বিষয়টি তাদের মাথায় ছিল বলে। অনেক লোক কোনমতে পালিয়ে বাঁচলেও সেদিন ৪৩ জনকে প্রাণ দিতে হয়েছিল হায়েনার হাতে নৃশংসভাবে। তেরশ্রী এলাকার উন্নয়নের পৃষ্ঠপোষক জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরীকে তারা হত্যা করে পৈশাচিক ভাবে। জমিদার বাবুকে তার শয়ন কক্ষ থেকে বের করে লেপ কম্বল দিয়ে পেঁচিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারে।

এ সময় তেরশ্রী কলেজের অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান এগিয়ে যান ঘটনাস্থলে। তিনি জানতে চান জমিদার বাবুকে হত্যা করা হচ্ছে কেন? হায়েনার দল তখন অধ্যক্ষ সাহেবকে ধরে নিয়ে আসে তেরশ্রী বাজারে এবং বেয়নেট চার্জ করে। পরক্ষণেই তাকে তার বাসায় নিয়ে শিশুপুত্র এবং স্ত্রীর সামনে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে। এই দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে তার স্ত্রী বাসার উত্তর পাশের পুকুরে লাফিয়ে পড়ে কোনোরকমে প্রাণ বাঁচান।
ওই দিন নিহত হওয়ার আগে সাধুচরণ দাস, যিনি হানাদার বাহিনী রাইফেল কেড়ে নিয়ে এ জুলুমের প্রতিবাদ করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শতাধিক অত্যাচারী দলের কাছে তাকেও প্রাণ দিতে হয়। দুপুর ১২টা পর্যন্ত হানাদার বাহিনী এবং দোসররা হত্যাযজ্ঞ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজ সম্পন্ন করে ফিরে যায় ঘিওরে।

লাশের গ্রামে পরিণত হয় পুরো তেরশ্রী গ্রাম। এ হত্যাযজ্ঞ যারা দেখেছেন তারাই বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। পরে স্থানীয় হিন্দু মুসলমান মিলে লাশগুলোকে কবর দেয় গণকবরের মতো।

কিন্তু দুঃখের বিষয় ২২ নভেম্বর কেন্দ্র করে সঠিক ভাবে কোন ইতিহাস রচিত হয়নি আজ পর্যন্ত। স্থানীয়ভাবে ৪৩ জনের মধ্যে ৩৭ জনের নামের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তাঁরা হলো, জমিদার সিদ্ধেশ্বরী প্রসাদ রায় চৌধুরী, অধ্যক্ষ আতিয়ার রহমান, স্থানীয় স্কুলের দপ্তরী মাখন চন্দ্র সরকার, যাদব চন্দ্র দত্ত, তার পুত্র মাধব চন্দ্র দত্ত, সাধুচরণ দাস, শ্যম লাল সূত্রধর, নিতাই চন্দ্র দাস, জগদীশ চন্দ্র দাস, সুধন্য চন্দ্র দাস, সুরেন্দ্র নাথ দাস, প্রাণ নাথ সাহা, যোগেশ চন্দ্র ঘোষ, সাধন কুমার সরকার, যোগেশ চন্দ্র দাস, রামচরণ সূত্রধর, রাধাবল্লভ নাগ, জ্ঞানেন্দ্র ঘোষ, যোগেশ চন্দ্র সূত্রধর, মো. কছিম উদ্দিন, মো. গেদা মিয়া, একলাছ মোল্লা, শ্যামা প্রসাদ নাগ, নারায়ণ চন্দ্র সূত্রধর, শচীন্দ্রনাথ গোস্বামী, যোগেশ দত্ত, গৌড় চন্দ্র দাস, মো. তফিল উদ্দিন, মনীন্দ্র চন্দ্র দাস, তাজু উদ্দিন, রমজান আলী, দেলবর আলী, ওয়াজ উদ্দিন, শ্যামল সূত্রধর, বিপ্লব সরকার, মহেন্দ্র নাথ দাস, শ্রীমন্ত কুমার দাস।

প্রতি বছরের মতো এবারেও এসেছে ২২ নভেম্বর। আসবে চিরকাল। ৪৩ জন শহিদ ঘুমিয়ে রয়েছে তেরশ্রীতেই। তাদের স্মৃতি নিয়ে আজও বেঁচে রয়েছে কেউ কেউ। স্মৃতির মণিকোঠায় হাতড়িয়ে তারা মেলাতে পারে না অনেক কিছুই। স্বজনহারা লোকগুলো স্বপ্ন দেখে তেরশ্রীর ইতিহাস রচিত হবে, সেখানে ধ্রুব তারার মতো জ্বলজ্বল করবে তাদের প্রিয় লোকটির স্মৃতি।

তেরশ্রীর শহীদের স্মরণে ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে ঐতিহ্যবাহী তেরশ্রী বাজারে ঘিওর দৌলতপুর টাঙ্গাইল আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভ। ৩০ ফুট উচ্চতার ২টি স্তম্ভ মূল বেদির উপর দন্ডায়মান দৃষ্টিনন্দন নকশায় নির্মাণ করা হয়েছে।

এবিএন/মো: সোহেল রানা/গালিব/জসিম

এই বিভাগের আরো সংবাদ