ইউপি নির্বাচন

আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ

  ওয়াসিম আকরাম

১৭ নভেম্বর ২০২১, ১১:০৫ | অনলাইন সংস্করণ

হেমন্তের হিমেল হাওয়ায় ভাসছে নির্বাচনী আমেজ আর সরগরম কর্থাবার্তা। কথার খই ফুটছে যেন মাঠে-ময়দানে, চায়ের দোকানে আর আড্ডা আসরে। সবখানে শুধু নির্বাচনে প্রার্থীদের নিয়ে চলছে বাহাস। কারা কোন্ দল থেকে প্রার্থী হবেন সে নিয়ে তর্কবিতর্ক বেশ শাণিয়ে উঠছে। প্রার্থীদের হাসি হাসি মুখ আর পায়ের ধ্বনি বেশ প্রতি ধ্বনিত হচ্ছে লোকালয়জুড়ে। বাগযুদ্ধ চলছে সর্বত্র। জনগণের দরবারে ভোট প্রার্থীদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। সভা-সমাবেশের অন্ত নেই গ্রাম-গঞ্জ, শহর নগর বন্দরজুড়ে। সবার লক্ষ্য ভোটারের মন জয় করা। এই মন জয়ের পথও পদ্ধতি সবার একরকম নয়। অর্থ, উপঢৌকনের ব্যবহারে কম যায় না অনেক প্রার্থী। যদিও তা আচরণবিধি লঙ্ঘনের শামিল। প্রতিশ্রুতির বহর বাড়ছে। নানা আশা-আশ্বাস জনগণের কর্ণকূহরে প্রবেশ করানোর চলছে নানা কসরত। যে জনগণকে একদা দূর দূর করে তাড়িয়ে দিতে দেখা গেছে কোন কোন প্রার্থীকে, সেই জনগণকে বুকে নিতে এখন উদগ্রীব তারা। ভাই-বন্ধু-স্বজন বলে কাছে টেনে নিতে নেই দ্বিধা। ভোটার আর প্রার্থী যেন তখন কত আপনজন হয়ে যায়। ভোটারের মন গলানোর মধ্যেই বুঝি নিহিত রয়েছে বিজয়ের পতাকাকে অর্জন করা। নির্বাচনের আকাশজুড়ে কখনও কখনও ভেসে আসে কালো মেঘ। মনোনয়ন যুদ্ধ শেষে যারা দলীয় প্রতীক পেয়েছেন তারা সর্বত্রই দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। থেমে নেই নির্দল প্রার্থীরাও। 

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে যারা আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন তারা মনের করছেন দলের প্রত্যেক ভোটাররা দলীয় নির্দেশ মেনেই ভোট দিবে এবং তারা নিশ্চিত জয়ী হবে। সে কারণে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের উপর হামালা, নির্যাতন, মালা, প্রচারণায় বাধা দিচ্ছে। যেহেতু দল তাদের মনোনয় দিচ্ছে সেহেতু তারা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ার জন্য সব ধরনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। মনোনয়ন পেলেই যে দলীয় ভোটরা ভোট দেবেন এমনটাই ধারণা। স্থানীয় পর্যায়ে নেতা হতে গেলে ব্যক্তি হিসেবে জনগণের ভালবাসা, বিশ্বাস ও আস্থা অর্জন করতে হবেই। তবেই জনসাধারণ ভোট দিবে। আসলে জনকল্যাণকর রাজনীতি ও নেতৃত্বই জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে নেতার। এটা মানুষের সঙ্গে সংযোগ সেতু। চলার পথ মসৃণ করার জন্য পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, সহমর্মিতার হাত বাড়াতেই হয়। বিরোধিতা শান্তি বিঘœ করে, হানাহানির পথ করে প্রশস্ত, ধ্বংসকে আনে ডেকে পতনের সিঁড়ি নিচে নামতে থাকে। এসব থেকে দূরত্ব দূরে থেকে জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে জনগণের ভাষায় কথা বলার মধ্যেই আছে বাস্তবতার দিকদর্শন। জনগণের দ্বারে দ্বারে গিয়ে নিজেকে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে একটি আদর্শ ও লক্ষ্য পেশ করার মাধ্যমে জনগণমন অধিনায়ক হওয়ার দিগন্ত হয় উন্মোচিত। মানুষের কাছে নিজের গ্রহণযোগ্যতা, অপরিহার্যতা তুলে ধরা গেলে, মানুষ নিশ্চয় কাছে টেনে নেবে, বুকে মেলাবে বুক। জনগণই নির্বাচিত করেন কে হবেন তার প্রতিনিধি। কে হবেন তার নেতা। ভোটের মাধ্যমেই এই নির্বাচন হয়ে আসছে। কিন্তু এই ভোট নিয়ে চলে নানা টালবাহানা। ভোটের রাজনীতি অনেক সময় হয়ে যায় বিপদসঙ্কুল। বিপথে চালিত হয় অনেকেই। ভোট নিয়ে তাই থাকে সংশয়, উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ। হানাহানি, সংঘর্ষ, হাঙ্গামারও অন্ত থাকে না। এদেশে নির্বাচন আয়োজন খুব সহজসাধ্য নয়। যদিও দেশবাসী নির্বাচনকে দেখে উৎসব হিসেবে। কিন্তু সেই উৎসবেও ভাটা পড়ে। শক্তিমত্তার প্রদর্শন যখন চলে, তখন ভোটে অংশগ্রহণ দুষ্কর হয়ে পড়ে। দুর্বৃত্তদের দাপট তীব্র হয়ে যখন ওঠে, তখন ভোট পরিণত হয় প্রহসনে। এসব কাজে রাজনৈতিক দলগুলোরই থাকে মুখ্য ভূমিকা। যে কোন মূল্যে বিজয় অর্জনের জন্য হীনপথ বেছে নিতে কসুর করে না তখন। ভোটার দলনের নির্মম দৃশ্যগুলো হয়ে যায় পীড়াদায়ক। এ দেশের জনগণ নির্বাচন ভীতিতে কাটিয়েছে সামরিক শাসনকালে, এমনকি গণতান্ত্রিক আমলেও। ক্রমশ সেসব অপসৃয়মান হয়ে আসছে। মানুষ তার ভোটাধিকার প্রয়োগের জন্য বাহুবলের বিপরীতে সংঘবদ্ধ শক্তিতে পরিণত হওয়ার দৃশ্যও দেখা গেছে। অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে ভোটদানের জন্য দেশবাসী অনেক আন্দোলন, সংগ্রাম এমনকি প্রাণদানও করেছে। সেসব ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।

ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তার উন্নয়ন কর্মকান্ড নিয়ে জনগণের কাছে হাজির হয়েছে। কিন্তু এতে চিড়ে ভিজবে কিনা সে নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। গত নির্বাচনে আওয়ামীলীগ থেকে যারা মনোনয়ন পেয়েছেন ও নির্বাচিত হয়ে ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতার মসনদে বসেছেন। গত পাঁচ বছরে তারা জনগণের সেবা করেছেন এবং কতটুকু আস্থা অজর্ন করতে পেরেছেন তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন রয়েছে। চেয়ারম্যান হওয়ার পর থেকে তারা হতদরিদ্রদের জন্য বরাদ্দ করা ত্রাণ সহায়তা, দুস্থভাতা, ভিজিএফ, প্রতিবন্ধীভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা এসব কার্ড করে দিতে তারা বা তাদের লোকেরা যে পরিমাণ অর্থ ভুক্তভোগির কাছ থেকে নিয়ে আত্মসাৎ করেছে বলে অভিযোগ তা বিস্ময়কর। মাদক, নারী কেলেঙ্কারিসহ অনিয়ম দুর্নীতির বহরও অনেক লম্বা। তা সত্ত্বেও তারা দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। এ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা-কর্মী ও জনসাধারণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রায়া দেখা দিয়েছে। ফলে ক্ষোভের বহির্প্রকাশ হিসেবে ঐ সকল ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমাহার ঘটেছে। অনেক জায়গায় অনিয়ম দুর্নীতির কারণে বর্তমান চেয়ারম্যানদের দল মনোনয়ন দেয়নি। ফলে মনোনয়ন না পেয়ে তারা  যে, নির্বাচন থেকে বিরত আছে তা নয়, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে তারাও নির্বাচনের মাঠে সক্রিয় রয়েছে।

স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংগঠনের নেতাদের কর্মকান্ড বিশ্লেষণ করেই জনগণ ভোট দেবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দলটির অবস্থা এমন যে, একই ইউনিয়নে অন্যান্য প্রার্থীর সমাহার ঘটছে। নব্য ধনী, নব্য লুটেরা, দুর্নীতিতে অর্থবিত্ত সম্পদের মালিক হয়েছে যারা, তারা মনোনয়ন পাওয়ার জন্য হেন কাজ নেই যে, তারা করেন নি। দলের মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলের বিদ্রোহী প্রার্থীর সংখ্যা এবার বেড়েছে। যার নিদর্শন সারা দেশে দেখা যাচ্ছে। আর এ নিয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে দলের নেতা-কর্মীরা যেভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করা যাচ্ছে না। ফলে সর্বত্র এখন দলের বিরুদ্ধে দল, নেতার বিরুদ্ধে নেতা, কর্মীর বিরুদ্ধে কর্মীর বিকাশ ও বিস্তার ঘটেছে। কারণ দর্শানোর নোটিশ, বহিষ্কার, ভবিষ্যতে দলীয় পদ-পদবী এবং মনোনয়ন না পাওয়া, দলের গঠনতন্ত্র পরিবর্তন করে কোনো নোটিশ ছাড়াই দল থেকে বহিষ্কার, তৃণমূল থেকে সমঝোতার ভিত্তিতে কেন্দ্রেনাম পাঠানো এতো সব উদ্যোগ নিয়েও বিদ্রোহী প্রার্থীদের দমন করতে পারছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। গত দুইধাপের নির্বাচনে যেভাবে হানাহানি ও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে তা শঙ্কিত হওয়ার মতো। আগামী পর্বগুলোতে এই পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা মুশকিল। আর ফলাফলের দিকে তাকালে বলতে হয় দুই ধাপের নির্বাচনে বিদ্রোহীপ্রার্থীদের বিজয়ী তালিকা যেভাবে দীর্ঘ হচ্ছে তাও আওয়ামী লীগের জন্য সুখকর হবে না। কারণ, যারা নৌকা প্রতীক না পেয়ে অন্য প্রতীকে বিজয়ী হয়েছে তাদের দলে না নেওয়া হলে স্বভাবতই তারা বিরোধী শিবিরে। তার মানে আগামীতে সরকারকে এই শক্তিকেও মোকাবেলা করতে হবে।

আর এদিকে একদা অতিকায় ডাইনোসরে পরিণত হওয়া বিএনপি এখন অবলুপ্তির পথে। নির্বাচনে প্রার্থী হবার মতো লোকেরও অভাব। অবস্থা দলটির এমন যে, আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হবার মতো অবস্থাও আর নেই। তাই এবারের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হবে আওয়ামী লীগ। সর্বত্র এখন একাধিক প্রার্থী নির্বাচনের মাঠে। এই প্রার্থীদের পক্ষে বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছে দলের নেতা-কর্মীরা। অনেকস্থানে হাঙ্গামাও হচ্ছে। স্থানীয় পর্যায়ে দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা অসম্ভব প্রায় এখন। নির্বাচনের আগে দলটি ঐক্যবদ্ধ অবস্থানে রাখার জন্য কোন পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। 
ঘরে শুয়ে-বসে থেকে মাঝে মাঝে গলা উঁচিয়ে হুঙ্কার ছেড়ে নিজের অস্তিত্ব জানান দিতে ক্লান্তপ্রায় বিএনপি। কিন্তু এই ক্লান্তি বুঝি ক্ষমাহীন। তাই শক্তিহীন ও অকর্মণ্য দলে পরিণত বিএনপিকে বেছে নিতে হয়েছে চোরাগুপ্তা পথ। ভোট বর্জনের ঘোষণা দিলেও মাঠের চিত্র পুরো উল্টো। এমনিতেই বিএনপির আন্দোলন ক্ষমতা সম্পর্কে অনেকের মূল্যায়ন খুব ইতিবাচক নয়। খোদ, বিএনপি নামক দলের কোন স্তরের নেতাকর্মীই দলের প্রতি এবং দলীয় কর্মকান্ডের প্রতি আস্থা রাখতে পারছে, তা নয়। মঞ্চের শোভা হতেন যেসব প্রবীণ নেতা দুরবীণে খুঁজে পেতে হয় তাদের এখন। বর্তমান অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে তাতে বিএনপি’র রাজনীতিতে নেই কোন অভিনবত্ব বা বৃত্তবন্দী রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার সহসী উদ্যোগ। শীর্ষ নেতৃত্ব ভুগছে প্রতিহিংসার এক প্রকার দুরারোগ্য বিকারে। সামান্য অসুখেও মানুষ তড়পায়। আর দুরারোগ্য ব্যাধি হলে তো উন্মাদনা বাড়ে, অস্থিরতা-অসহিষ্ণুতা নতুন মাত্রা পায়। এমনই অবস্থা আজ জাতীয়তাবাদী নামধারী দল বিএনপির। অসুখে-বিসুখে এমনই ধরাশায়ী হাল তার। কোন বদ্যি, কবিরাজেও হচ্ছে না কাজ। হোমিওপ্যাথ, এলোপ্যাথও সারাতে পারছে না এই রোগ। রোগাক্রান্ত দেহে তাই অক্ষমের আর্তনাদই শুনিয়ে যায়। তাই তার মুখনিঃসৃত হয়ে উঠে আসে প্রলাপ। এই দুরবস্থা থেকে উদ্ধারের কোন পথ বা পন্থা তারা পায় না, পাওয়ার চেষ্টাও নেই।

রাজনীতি যদি কেবল ক্ষমতায় গিয়ে জনগণকে কিছু সেবা দিতে পারে, ক্ষমতার বাইরে থেকে জনগণের পাশে থাকতে বা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অন্যায় বা ভ্রান্তির বিরুদ্ধে অক্ষম হয়- তা হলে এ কারণে রাজনীতি ঘিরে অনুদারতা ও অমানবিক বিকারের জন্ম ঠেকানো মুশকিল। বিএনপি নামক অবক্ষয়িত রাজনৈতিক দলটি ক্ষমতার বাইরে গিয়ে এ ফাঁদে পড়েছে। এই ফাঁদ থেকে উঠে আসার পথ খুঁজেও পাচ্ছে না। না পাওয়ার কারণেই দলটি একই বৃত্তে ঘুরপাক খেতে খেতে দিশা হারানোর বালুচরে পরিণত হতে যাচ্ছে। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে ভবিষ্যতের জন্য ক্ষমতা রক্ষা করতে গিয়ে একই ফাঁদে পা দিতে যাচ্ছে। এর পরিণতি যে, ভয়াবহ তা তারা অনুধাবন করতে পারলেই জাতির জন্য হবে কল্যাণকর।

লেখক : সাংবাদিক

এই বিভাগের আরো সংবাদ
ksrm