বাবার হোটেল ব্যবসা দুবাইয়ে, ছেলে করেন মানবপাচার

  অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫:৪২

দুবাইয়ের ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল এরিয়ায় ২৩ বছর ধরে হোটেল ব্যবসা করেন বাবা মোহাম্মদ ইয়াসিন মিয়া। সেই ব্যবসা দেখভালে ২০১৭ সালে ছেলে তোফায়েল আহমেদকে দুবাই নিয়ে যান তিনি। মহামারি করোনায় ব্যবসায় ভাটা পড়লে দেশে ফিরে আসেন তোফায়েল। জড়িয়ে পড়েন মানবপাচারে। নিজেই গড়ে তোলেন মধ্যপ্রাচ্য ভিত্তিক মানবপাচার সিন্ডিকেট। আর হাতিয়ে নেন লাখ লাখ টাকা।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগের পর কুমিল্লা ও রাজধানীর গুলশানে পৃথক অভিযান চালিয়ে এই চক্রের চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে পাসপোর্ট, চেক বই, স্ট্যাম্প, বিএমইটি কার্ড ও রেজিষ্ট্রার বই উদ্ধার করা হয়েছে।

র‌্যাব বলছে, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে উচ্চবেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনপ্রতি পাঁচ থেকে ছয়লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল তারা। বিদেশগামীদের ওয়ার্কভিসায় পাঠানোর কথা থাকলেও ভ্রমণ ভিসা দিয়ে পাঠানো হতো। কাঙ্খিত দেশে পৌঁছানোর পর নির্যাতন করে বেশি টাকা আদায় করা হতো। চক্রটির মাধ্যমে বিদেশে গিয়ে অনেকেই সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন।

মানবপাচার চক্রের অন্যতম হোতা তোফায়েল আহমেদ। তার সহযোগীরা হলেন- আক্তার হোসেন, আনিছুর রহমান, পিতা-জিল্লুর রহমান ও মোহাম্মদ রাসেল।

সোমবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজার র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক লে. কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ এসব তথ্য জানান।

কর্নেল আরিফ বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে উচ্চ বেতনে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে বিদেশগামী ও তাদের পরিবারকে প্রলুব্ধ করত এই চক্রটি। মধ্যপ্রাচ্যে পাঠাতে চার লাখ আর ইউরোপের যেকোনো দেশে পাঠাতে ছয় থেকে ৮ লাখ টাকা নেওয়া হতো।

চক্রের প্রলোভনে রাজি হলে প্রথমে বিদেশগামীর পাসপোর্ট এবং প্রাথমিক খরচ ৫০ হাজার বা ১ লাখ টাকা জমা দিতে হতো। এরপর পরিবহন, ভিসা, মেডিকেল খরচ ও বিএমইটি ক্লিয়ারেন্সের কথা বলে ধাপে ধাপে আরও টাকা নেয়া হতো। ফ্লাইটের আগে ভিকটিমের পাসপোর্ট, ভিসা বা টিকেট কোনো কিছুই দেওয়া হতো না। চাহিদা অনুযায়ী টাকা পেলে একটি নির্দিষ্ট তারিখে লাগেজ নিয়ে বিদেশগামীকে বিমানবন্দরে আসতে বলা হতো। ফ্লাইটের দিন তারা বিমানবন্দরের প্রবেশগেটে পাসপোর্ট, ভিসা এবং টিকেট হস্তান্তর করত। পরে বিদেশগামীরা ইমিগ্রেশনে যাওয়ার পর বুঝতে পারতেন তাকে ভ্রমণ ভিসায় বিদেশ পাঠানো হচ্ছে। তখন চক্রের সদস্যদের সঙ্গে ফোন ছাড়া আর কোনো মাধ্যমে যোগাযোগ করা সম্ভব হতো না। তখন চক্রের সদস্যরা এই বলে ভুক্তভোগীদের আশ্বস্থ করত যে বিদেশ যাওয়ার পর তাদের ওয়ার্কিং ভিসা করে দেওয়া হবে।

র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক বলেন, বিদেশে পৌঁছার পর দুবাই প্রবাসী জাহিদ ভিকটিমদের স্বাগত জানিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যেত। তারপর ভিকটিমের পাসপোর্ট এবং নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হতো। কিছু দিন পর একটি সাজানো কোম্পানীতে চাকরি দেয়া হতো। চার পাঁচদিন পর ভুক্তভোগীদের জানাতো হতো আইনি জটিলতার কারণে কোম্পানিটি বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।

এরপর জাহিদ আবারও তাদেরকে অজ্ঞাত স্থানে বন্দি করে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে দেশ থেকে টাকা আনতে বাধ্য করত। এ সময়ে তাদের কোনো খাবার দেয়া হতো না। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে অনেকে নিজেদের চেষ্টায় টিকেট জোগাড় করে দেশে ফেরার চেষ্টা করতো। তখন জাহিদের কাছ থেকে পাসপোর্ট ফেরত নিতে ৫০ হাজার টাকা দিতে হতো।'

এই চক্রটির ট্রাভেল এজেন্সি বা রিক্রুটিং এজেন্সি পরিচালনার কোনো লাইসেন্স ছিল না জানিয়ে র‌্যাব জানায়, তারা শুধুমাত্র সিটি কর্পোরেশন থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে 'সিটি এক্সপ্রেস ট্রাভেল এজেন্সি' খুলে মানবপাচার ব্যবসা করে আসছিল। বিশেষ করে স্বল্প সময়ে, বিনাশ্রমে অধিক লাভ বা অর্থ উপার্জনই তাদের লক্ষ্য ছিল।

দুবাই থাকাকালে চক্রের হোতা তোফায়েলের সঙ্গে বিভিন্ন ট্রাভেল ও রিক্রুটিং এজেন্সির পরিচয় হয়। সেসময় দুবাই প্রবাসী জাহিদের সঙ্গেও তার পরিচয় হয়েছিল। এই জাহিদ দীর্ঘদিন ধরে মানবপাচারের সঙ্গে জড়িত। তোফায়েল নিয়মিত দুবাই আসা যাওয়া করেন। গত আগস্টেও সে দুবাই গিয়েছিল। কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নিজের বাড়িতে একটি ট্রাভেল এজেন্সি চালু করে। যার কোনো লাইসেন্স নেই।

এবিএন/জনি/জসিম/জেডি

এই বিভাগের আরো সংবাদ