কাব্য-সাহিত্যে বিশ্বকবির জীবনদর্শন

  সুভাষ সিংহ রায়

০৮ মে ২০২২, ০৯:৪৯ | অনলাইন সংস্করণ

আজও বাঙালি মানেই রবীন্দ্রনাথ। বাংলা সাহিত্য, দর্শন, সংগীত, রূপময়তা, তারুণ্য, প্রেম, সৃজনশীলতার অপর নাম রবীন্দ্রনাথ। রবি ঠাকুর যিনি অগ্রণী বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার, চিত্রকর, ছোট গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কণ্ঠশিল্পী ও দার্শনিক। তাকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক মনে করা হয়। রবীন্দ্রনাথকে ‘গুরুদেব’, ‘কবিগুরু’ ও ‘বিশ্বকবি’ অভিধায় ভূষিত করা হয়। কিন্তু তার জীবন দর্শন তার কাব্য প্রতিভাকেও ছেড়ে গেছে।

রবীন্দ্রনাথের কাব্যসাহিত্যের বৈশিষ্ট্য- ভাবগভীরতা, গীতিধর্মিতা চিত্ররূপময়তা, অধ্যাত্মচেতনা, ঐতিহ্যপ্রীতি, প্রকৃতিপ্রেম, মানবপ্রেম, স্বদেশপ্রেম, বিশ্বপ্রেম, রোমান্টিক সৌন্দর্যচেতনা, ভাব, ভাষা, ছন্দ ও আঙ্গিকের বৈচিত্র্য, বাস্তবচেতনা ও প্রগতিচেতনা। রবীন্দ্রনাথের গদ্যভাষাও কাব্যিক। ভারতের ধ্রুপদী ও লৌকিক সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞানচেতনা ও শিল্পদর্শন তার রচনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে নিজ মতামত প্রকাশ করেছিলেন। সমাজকল্যাণের উপায় হিসেবে তিনি গ্রামোন্নয়ন ও গ্রামের দরিদ্রমানুষকে শিক্ষিত করে তোলার পক্ষে মতপ্রকাশ করেন। এর পাশাপাশি সামাজিক ভেদাভেদ, অস্পৃশ্যতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধেও তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। 

রবীন্দ্রনাথের দর্শনচেতনায় ঈশ্বরের মূল হিসেবে মানব সংসারকেই নির্দিষ্ট করা হয়েছে; রবীন্দ্রনাথ দেববিগ্রহের পরিবর্তে কর্মী অর্থাৎ মানুষ ঈশ্বরের পূজার কথা বলেছিলেন। সংগীত ও নৃত্যকে তিনি শিক্ষার অপরিহার্য অঙ্গ মনে করতেন। রবি ঠাকুরের সৃজন সমুদ্রে শতদলের মতোই জেগে আছে তার জীবন দর্শন। যা আমরা উপলব্ধি করি তার সৃজনে। বিশ্ব কবির শিল্প নৈপুণ্যেও সর্বোচ্চ প্রতিভা গীতাঞ্জলি কাব্য।

আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার

চরণধুলা তলে,

সকল অহংকার হে আমার

ডুবাও চোখের জলে।

এই দুটি চরণে খুঁজে পাওয়া যায় সর্বেশ্বরবাদী চেতনা, ঈশ্বরের ক্ষণদর্শনানুভূতি, ঈশ্বরের কাছে আত্ম-অহংকার বিসর্জন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (৭ মে ১৮৬১-৭ অগাস্ট ১৯৪১; ২৫ বৈশাখ ১২৬৮-২২ শ্রাবণ ১৩৪৮ বঙ্গাব্দ) কলকাতার এক ধনাঢ্য ও সংস্কৃতিবান ব্রাহ্ম পিরালী ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ঠাকুরদের আদি পদবি কুশারী। কুশারীরা ভট্টনারায়ণের পুত্র দীন কুশারীর বংশজাত। দীন কুশারী মহারাজ ক্ষিতিশূরের নিকট কুশ (বর্ধমান জেলা) নামক গ্রাম পেয়ে গ্রামীণ হন ও কুশারী নামে খ্যাত হন। রবীন্দ্রজীবনীকার শ্রী প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় তার রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্রসাহিত্য-প্রবেশক গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে ঠাকুর পরিবারের বংশপরিচয় দিতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন,

“কুশারীরা হলেন ভট্টনারায়ণের পুত্র দীন কুশারীর বংশজাত; দীন মহারাজ ক্ষিতিশূরের নিকট কুশ নামক গ্রাম (বর্ধমান জিলা) পাইয়া গ্রামীণ হন এবং কুশারী নামে খ্যাত হন। দীন কুশারীর অষ্টম কি দশম পুরুষ পরে জগন্নাথ।”

পরবর্তীকালে কুশারীরা ছড়িয়ে পড়ে বঙ্গদেশের সর্বত্র- যশোরের ঘাটভোগ-দমুরহুদা থেকে ঢাকার কয়কীর্তন থেকে বাঁকুড়ার সোনামুখী থেকে খুলনার পিঠাভোগ। পিঠাভোগের কুশারীরাই হয়ে উঠল সবচেয়ে প্রভাবশালী ও অবস্থাপন্ন।

বাল্যকালে প্রথাগত বিদ্যালয়-শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেননি; গৃহশিক্ষক রেখে বাড়িতেই তার শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। আট বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। তার রচনাতেই তিনি যেন তার জীবনকে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার ভাষায়,

 “নিজের গুণহীনতার বিষয়ে অনভিজ্ঞ এমন নির্গুণ শতকরা নিরেনব্বই জন, কিন্তু নিজের গুণ একেবারে জানে না এমন গুণী কোথায়?”

১৮৭৪ সালে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় তার ‘অভিলাষ’ কবিতাটি প্রকাশিত হয়। এটিই ছিল তার প্রথম প্রকাশিত রচনা। ১৮৭৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ প্রথমবার ইংল্যান্ডে যান। ১৮৮৩ সালে মৃণালিনী দেবীর সঙ্গে তার বিবাহ হয়। ১৮৯০ সাল থেকে রবীন্দ্রনাথ পূর্ববঙ্গের শিলাইদহের জমিদারি এস্টেটে বসবাস শুরু করেন। প্রথম জীবনে তার রচিত শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থে ‘মানসী’ (১৮৯০)। মানসীকাব্য রচনার পূর্বে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অনুকরণ প্রিয়। বৈষ্ণব পদাবলির চণ্ডীদাস ও বিদ্যাপতির প্রভাব তার ওপর ছিল স্পষ্ট। কবি কাহিনী, বনফুল, ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলি, প্রভাতসংগীত, সন্ধ্যাসংগীত, কড়ি ও কোমল ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান। একমাত্র মানসী কাব্যগ্রন্থে এসে কবি রচনা করলেন বিশ্বমানের কবিতা।

“এ চির জীবন তাই আর কোন কাজ নাই

রচি শুধু অসীমের সীমা-

আশা দিয়ে, ভাষা দিয়ে, তাহে ভালোবাসা দিয়ে

গড়ে তুলি মানসী-প্রতিমা।”

কবি খুঁজে পেলেন অসীম ঈশ্বরকে সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে আবদ্ধ করার শিল্পশৈলি। তাই মানসী কাব্যকে প পা-বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি বুদ্ধদেব বসু ‘রবীন্দ্র সাহিত্যের অনুবিশ্ব’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার পিতা ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মগুরু দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮১৭-১৯০৫) এবং মাতা ছিলেন সারদাসুন্দরী দেবী (১৮২৬-১৮৭৫)। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন পিতামাতার চতুর্দশ সন্তান। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল ব্রাহ্ম আদিধর্ম মতবাদের প্রবক্তা।

১৮৭৫ সালে মাত্র ১৪ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের মাতৃবিয়োগ ঘটে। পিতা দেবেন্দ্রনাথ দেশভ্রমণের নেশায় বছরের অধিকাংশ সময় কলকাতার বাইরে অতিবাহিত করতেন। তাই ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান হয়েও রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা কেটেছিল ভৃত্যদের অনুশাসনে। শৈশবে রবীন্দ্রনাথ কলকাতার ওরিয়েন্টাল সেমিনারি, নর্ম্যাল স্কুল, বেঙ্গল অ্যাকাডেমি এবং সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজিয়েট স্কুলে কিছুদিন করে পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু বিদ্যালয় শিক্ষায় অনাগ্রহী হওয়ায় বাড়িতেই গৃহশিক্ষক রেখে তার শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ছেলেবেলায় জোড়াসাঁকোর বাড়িতে অথবা বোলপুর ও পানিহাটির বাগানবাড়িতে প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যে ঘুরে বেড়াতে বেশি স্বচ্ছন্দবোধ করতেন রবীন্দ্রনাথ। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির ১৪ নম্বরের শিশুপুত্র ১৩ বছর ১০ মাস বয়সে মা-হারা হয়ে চাকর-বাকরদের মহলে এবং কনিষ্ঠ বৌদির যত্ন-সাহচর্যে বেড়ে ওঠার মধ্যেই তার ঘরোয়া অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। এবং এরই মাঝে তার কাব্যচর্চারও শুরু। শৈশবকালের ১৩ বছর থেকে ১৮ বছর বয়সের মধ্যের লেখা কাব্যগ্রন্থ- বনফুল, কবি কাহিনী, ভানুসিংহ ঠাকুরের পদাবলী, শৈশবসংগীত ইত্যাদি তার প্রথম পর্যায়ের কাঁচা লেখা। 

দ্বিতীয় পর্যায়ের কবিতার বই সন্ধ্যাসংগীত, প্রভাতসংগীত, কড়ি ও কোমল ১৮ থেকে ২২ বছরের মধ্যে লেখা। ১৮৮৩ সালে প্রভাতসংগীত কাব্যটির প্রকাশ। এ কাব্যগ্রন্থের কবিতায় হচ্ছে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’। শৈশব থেকে কবি হওয়ার বাসনা সাধরে সংশোধিত হতে হতে তিনি প্রভাতসংগীতের কাছে পৌঁছে যান।

          আজি এ প্রভাতে রবির কর

কেমনে পশিল প্রাণের পর,

কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!

না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।

জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,

ওরে উথলি উঠেছে বারি,

ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।

এ কাব্যগ্রন্থের কবিতা ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি তার কাব্যচর্চার সার্থক সৃষ্টি বলেই তিনি মতামত ব্যক্ত করে গেছেন। কবিতাটিতে বাইরের জিনিসকে অন্তরে এবং তার রসায়নই যে এই কবিতার মূল নির্যাস তা তার চিত্তের উচ্ছ্বাস থেকেই বোঝা যায়। এ কবিতায় কবি যেন গ্রহীতা আর প্রকৃতি হচ্ছে দাতা। প্রকৃতির অকৃপণ দান কবি আনন্দচিত্তে গ্রহণ করেছেন।

ইতিহাসের পৃষ্ঠায় মানুষের শিল্প, তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি সঞ্চিত থাকে। জগৎ স্রষ্টাকে চায় না, তার শিল্পকে সৃষ্টিকে চায়, এটাই চিরন্তন সত্য। মানবজীবনের এই চিরন্তন সত্যটি ধ্বনিত হয়েছে তার ‘সোনার তরী’ কবিতায়।

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।

কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।

রাশি রাশি ভারা ভারা

ধান কাটা হল সারা,

ভরা নদী ক্ষুরধারা 

খরপরশা।

কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

কবিতাটি রচনার সময় কবি জমিদারি দেখাশোনার কাজে কখনও শিলাইদহ, শাহাজাদপুর, কালিগ্রাম, পতিসরে বাস করেছেন। বাংলার পল্লী প্রকৃতি সমস্ত সৌন্দর্য্য ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে তার অনুভবে, রঙে, রূপে, কল্পনায়, নিত্য নতুন হয়ে প্রতিভাত হচ্ছে। পল্লীর নর-নারীর সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্নার সঙ্গে পরিচয় নিবিড় থেকে নিবিড়তর হচ্ছে। এই পরিচয় সূত্রেই ‘সোনার তরী’ কাব্য। ‘সোনার তরী’ কবিতা এই অনুভবের সৃষ্টি। কবিতাটির নামকরণ সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ‘সোনার তরী’ সোনায় তৈরি তরী অর্থে ব্যবহৃত হয়নি। এটি ব্যঞ্জনাগর্ভ। জীবনের সাধনায় যে স্বর্ণসম্ভার, তাই তো ফসল, সেই ফসল বহন করে যে তরী তা-ই সোনার তরী। সংসার-তরণীতে কবি তার সৃষ্টির সমস্ত সম্পদ তুলে দিলেও সংসার কবিকে গ্রহণ করলো না। মহাকালরূপী নেয়ে ইতিহাসরূপ সোনার তরী নিয়ে সোনার ধান রূপ জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকে তুলে নিলেও, স্রষ্টাকে গ্রহণ করে না।

ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই! ছোটো সে তরী

আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি’।

শ্রাবণগগন ঘিরে

ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,

শূন্য নদীর তীরে রহিনু পড়ি’,

যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।

১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ সপরিবারে শিলাইদহ ছেড়ে চলে আসেন বীরভূম জেলার বোলপুর শহরের উপকণ্ঠে শান্তিনিকেতনে। এখানে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৮৮ সালে একটি আশ্রম ও ১৮৯১ সালে একটি ব্রহ্মমন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আশ্রমের আম্রকুঞ্জ উদ্যানে একটি গ্রন্থাগার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ চালু করলেন ‘ব্রহ্মবিদ্যালয়’ বা ‘ব্রহ্মচর্যাশ্র’ নামে একটি পরীক্ষামূলক স্কুল। এই শান্তিনিকেতন পরবর্তিতে হয়ে ওঠে রবীন্দ্রসাহিত্য ও দর্শনের পুণ্যভূমি। এখানে বসে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন,

“প্রেমের দ্বারা চেতনা যে পূর্ণশক্তি লাভ করে সেই পূর্ণতার দ্বারাই সে সীমার মধ্যে অসীমকে, রূপের মধ্যে অপরূপকে দেখতে পায়, তাকে নূতন কোথাও যেতে হয় না।”

লোকাচার, কৌলিন্য, জাতিভেদ হিন্দুসমাজের নাভিমূলে বিরাজমান। এই সত্যকে উপলব্ধি করে রবীন্দ্রনাথ রচনা করলেন তার সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস ‘গোরা’। উপন্যাসের নায়ক গৌরিশঙ্করের আত্মোপলব্ধির মাধ্যমে হিন্দুসমাজের এই জাতিভেদ আর কৌলিন্য প্রথাকে তিনি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাই উপন্যাসের নায়ক গোরার মুখেই আমরা শুনি, “আমি আজ ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু-মুসলমান-খ্রিষ্টান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই। আজ এই ভারতবর্ষের সকলের জাত আমার জাত, সকলের অন্ন আমার অন্ন।” 

গোরা তার জীবন শুরু করেছিল হিন্দুত্ব দিয়ে, শেষ করলেন বিশ্ব মানবতায়। রবীন্দ্রনাথের বিশাল সৃষ্টি ভাণ্ডারে মনস্তত্বকেও তিনি স্থান দিয়েছেন। মানব মনকে রবীন্দ্রনাথ যতটা বিশ্লেষণ করেছেন এরূপ বাংলা সাহিত্যে আর কোনো সাহিত্যসত্তা করেননি। বলা হয় ‘চোখের বালি’ বাংলা সাহিত্যের প্রথম মনস্তাত্বিক উপন্যাস। মহেন্দ্র, বিনোদিণী, বিহারীলাল আর আশালতার সম্পর্কের সমীকরণে তিনি মানব মনের চিরায়ত মনস্তত্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। অপ্রকৃত ও অশোধিত প্রেম যা কেবল ইন্দ্রিয়ের রসদ জোগায়; কিন্তু যাকে সমাজে স্থান দেওয়া যায় না। কবি এখানে যেমন মহেন্দ্র-বিনোদিণীর প্রেমকে স্বীকৃতি দেননি, অনুরূপ বিহারী-বিনোদিণীর বিবাহকেও বাস্তবায়ন করাননি। অর্থাৎ কবি এখানে আবেগের দোহাই দিয়ে সমাজের বিরুদ্ধে যাননি। বরং পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ বিনোদিনীকে সমাজচ্যুত করে কাশিতে নির্বাসিত করেন। ‘চোখের বালি’ অর্থাৎ চক্ষুশূল বা চোখের পীড়া যেখানে তিনি গভীর ঈর্ষায় নিমজ্জিত প্রেমকেই বিশ্লেষণ করেছেন। কবির ভাষায়,

“যাহা যথার্থ গভীর এবং স্থায়ী তাহার মধ্যে বিনা চেষ্টায় বিনা বাধায় আপনাকে সম্পূর্ণ নিমগ্ন করিয়া রাখা যায় বলিয়া তাহার গৌরব আমরা বুঝিতে পারি না। যাহা চঞ্চল ছলনামাত্র যাহার পরিতৃপ্তিতে ও লেশমাত্র সুখ নাই তাহা আমাদিগকে পশ্চাতে ঊর্ধ্বশ্বাসে ঘোর দৌড় করাইয়া বেড়ায় বলিয়াই তাহাকে চরম কামনার ধন মনে করি।”

রবীন্দ্রনাথ নারীকেও বিশ্লেষণ করেছেন তার ‘দুই বোন’ উপন্যাসে। রবীন্দ্রনাথের মতে, নারীর দুটি রূপ- কখনও সে মাতৃরূপ, আবার কখনও সে প্রেয়সী। উপন্যাসে শর্মিলা মাতৃরূপের প্রতীক আর ঊর্মিলা প্রেয়সীরূপী, যা তাদের জীবনে শশাঙ্ক নামক পুরুষের আবির্ভাবে মনস্তাত্বিক দ্বন্দ্বে আবির্ভূত হয়েছে। ঋতুর সাথেও নারীকে তুলনা করে লেখক বলেছেন যে মায়ের জাত হলো বর্ষা ঋতু আর প্রিয়ার জাত হলো বসন্ত ঋতু। উপন্যাসটিতে পুরুষের পক্ষে দুই নারীকে দুভাবে ভালোবাসার ফলে জটিলতার সৃষ্টি হয় আর নারীর পক্ষে সেই জটিলতার সমাধান দেখানো হয়েছে। দুই বোন উপন্যাসে রবীন্দ্রনাথের চোখে নারী যেমন সব সময় অনন্য মর্যাদায় উন্নীত, তেমনি তার সূক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণশীল দৃষ্টিশক্তিও নারীকে বিচার করেছে নিজস্ব মহিমায়; ‘দুই বোন’ উপন্যাসটিতে তারই প্রতিফলন সুস্পষ্ট। পারিবারিক আধারেও আপন মনঃস্তত্ব জাহির করেছেন লেখক। রবি ঠাকুরের কর্মের মাঝেই আমরা তাকে বারংবার খুঁজে পাই। বলছি তার একমাত্র কাব্যধর্মী উপন্যাস ‘শেষের কবিতা’র কথা। এই উপন্যাসে নায়ক অমিতের চরিত্রের মধ্যে কিঞ্চিৎ যুবক রবীন্দ্রনাথের ছবি চিত্রিত। তবে অমিত চরিত্রের দ্বারাই রবি ঠাকুর সমালোচনা করেছেন নিজেকে এই উপন্যাসে। অমিত ও লাবণ্যের ভালোবাসা মহাসমুদ্রের স্রোতের মতো প্রবাহমান, জোয়ার-ভাটার প্রভাব যেখানে বিস্তর। স্রোতস্বিনী ভালোবাসাকে অমিত লাবণ্য সংসারের ছোট্ট ঘোটে আবদ্ধ করে রাখতে চায়নি। তাদের ভয় সংসারের জাঁতাকলে তাদের মহাসমুদ্রের মতো ভালোবাসা একদিন কুয়ায় আবদ্ধ জলের মতো নিঃতরঙ্গ হয়ে পড়বে। তাই তো তারা জুটি বেঁধেছে ভিন্ন যুগলের সাথে যেথায় ভালোবাসার চেয়ে কর্তব্যবোধই বেশি। তাই উপন্যাসের শেষ প্রান্তে এসে ঔপন্যাসিক নিজেই কাব্যের ছন্দে বলে গেছেন,

“হে ঐশ্বর্যবান,

তোমারে যা দিয়েছিনু তা তোমারই দান-

গ্রহণ করেছো যত ঋণী করেছো আমায়।

হে বন্ধু, বিদায়।”

 

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক; সাবেক সহ-সভাপতি- বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল, প্রধান সম্পাদক- সাপ্তাহিক বাংলা বিচিত্রা ও এবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম।

এই বিভাগের আরো সংবাদ