শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

  সুভাষ সিংহ রায়

১৬ মে ২০২২, ১২:৫৬ | আপডেট : ১৬ মে ২০২২, ১২:৫৭ | অনলাইন সংস্করণ

“শেখ হাসিনার নেতৃত্বই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মূল কারণ।”

নোবেল জয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন
আগামীকাল মঙ্গলবার ১৭ মে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৪২তম স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। ১৯৮১ সালের এই দিনে ছয় বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে স্বদেশে ফিরে আসেন তিনি। নেতাজী সুভাষ বসু বলেছিলেন, “বিপ্লবের পথ একেবারে ঋজুপথ নয়। এ পথে নিরবচ্ছিন্ন সাফল্য আসে না, এ পথ বহু বিঘ্নসংকুল, সুদীর্ঘ এবং সর্পিল।” 

২০১৭ সালের জুন মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘নারী রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী’ শীর্ষক গ্রন্থের অন্য ছয়জন বিশ্বনেতার সঙ্গে শেখ হাসিনার ছবি মুদ্রিত হয়েছিল। বইটি লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মানবাধিকারকর্মী ও শিক্ষাবিদ রিচার্ড ও’ ব্রেইন। ওয়াশিংটনের উইমেন্স ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ক্লাবে (ডব্লিউএনডিসি) বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

লেখক গ্রন্থটিতে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠায় একনিষ্ঠতা ও কঠোর পরিশ্রমী এবং বাংলাদেশের তিনবারের (সে-সময় তিনবার) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার অর্জন লিপিবদ্ধ করেছেন। ও’ ব্রেইন বাংলাদেশকে অধিকতর স্থিতিশীল ও অধিকতর গণতান্ত্রিক এবং অপেক্ষাকৃত কম হিংসাত্মক দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে শেখ হাসিনার আন্তরিক প্রয়াসের প্রশংসা করেছেন। আমাদের স্বীকার করা উচিত, ১৯৮১ সালের ১৭ মে-র আগের এ-রকম বাংলাদেশ তার কট্টর সমালোচকরাও ভাবতে পারেন নি। একবারেই অন্ধ না হলে স্বীকার করতেই হবে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর থেকে বাংলাদেশ ছিল পাকিস্তানের আদলে নামেই শুধু বাংলাদেশ। তিনি দেশে ফিরে না এলে অনেক আগেই বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত হতো।

গার্ডিয়ান পত্রিকায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল ‘বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যে বিশাল মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন তা বিরল।’ ২০১৬ সালে শান্তিতে নোবেলজয়ী কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট হোসে ম্যানুয়েল সান্তোষ শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্বমানবতার বিবেক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। আরেক নোবেলজয়ী কৈলাস সত্যার্থী শেখ হাসিনাকে ‘বিশ্বমানতার আলোকবর্তিকা’ হিসেবে তুলনা করেছেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান অভিহিত করেন ‘বিরল মানবতাবাদী নেতা’।

আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েই এখন দেশ পরিচালনা করছেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা। শেখ হাসিনার পক্ষেই সম্ভব হয়েছে বাস্তবায়িত ৬৮ বছরের কষ্ট আর ৪১ বছরের প্রতীক্ষিত সীমান্ত চুক্তি। তার শাসনামলে সমুদ্রসীমা জয় করেছে বাংলাদেশ, যা বাংলাদেশের ভৌগোলিক ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে থাকবে। শেখ হাসিনার আমলেই বিশ্বব্যাংককে চ্যালেঞ্জ করে নির্মিত হচ্ছে দেশের বৃহত্তম পদ্মাসেতু। এই মহাদুর্যোগের মধ্যেও পদ্মাসেতুর কাজ চলমান। ২৯তম স্প্যান বসে গেছে; আর মাত্র ১২টি স্প্যান বাকি আছে। শেখ হাসিনাই বাংলাদেশকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা আদায় করার সবক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন। তাকে ‘মানবিক বিশ্বের প্রধান নেতা’ বলেছে ‘অক্সফোর্ড নেটওয়ার্ক অব পিস’ নামক একটি সংস্থা। শ্রীলংকার গার্ডিয়ান পত্রিকা তুলনা করে ‘জোয়ান অব আর্ক’-এর সঙ্গে।

দুই

১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য নয়াদিল্লি থেকে ঢাকা রওয়ানা হওয়ার কয়েকদিন আগে মার্কিন সাপ্তাহিক নিউজউইক পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত কীভাবে গ্রহণ করেন এবং কোন উদ্দেশ্য সাধনে তা প্রয়োগ করবেন সে-সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা এক হৃদয়গ্রাহী ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। ১১ মে নিউজউইক-এ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বক্স-আইটেম হিসেবে প্রকাশিত এক রিপোর্টে বলা হয়: ১৯৭৫ সালে সামরিক চক্র কর্তৃক ক্ষমতাদখলকালে নিহত পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শেখ হাসিনা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তিনি নিহত হওয়ার আশঙ্কায় শঙ্কিত নন; এমন কী যে সরকারের মোকাবিলা করবেন তার শক্তিকে তিনি বাধা বলে গণ্য করবেন না। তিনি বলেন, ‘জীবনে ঝুঁকি নিতেই হয়। মৃত্যুকে ভয় করলে জীবন মহত্ব থেকে বঞ্চিত হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেসব কাজ অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য বলে আমি বিবেচনা করি, তার মধ্যে থাকবে দেশের প্রত্যেকটি মানুষের পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।’ নিজের কর্তব্য পালনে তার পিতার অবদান সহায়ক হবে বলে তিনি মনে করেন। ‘তার (বঙ্গবন্ধুর) প্রতি বাংলাদেশের জনগণের প্রীতি ও ভালোবাসা ছিল অপরিমিত’ বলেন শেখ হাসিনা। ‘আমাকে (আওয়ামী লীগের) সভানেত্রী নির্বাচিত করে পরোক্ষভাবে তাকেই সম্মান দেখানো হয়েছে। আমি তার অসমাপ্ত কর্মকা- সম্পন্ন করতে পারব।’ [নিউজউইক, ১১ মে ১৯৮১]

[Rahman, when he was murdered in a military coup in 1975…

Hasina says she in neither afraid of being killed nor deterred by the strength of the government she will face. “In one’s life”, she says, “risks must be taken. If a perosn is afraid of death, life has no dignity.” Hasina adds : “One of my priorities will be to restore the full democratic rights of all the people of the nation.” And she is convinced that her father’s legacy will strengthen their cause. “The people of Bangladesh had a lot of love and affection for him”, she says, “My election (as leader of the Awami League) is really another way of honouring him. I will be able to complete his work.”] – Newsweek, 11 May, 1981

 

তিন

এ পর্যন্ত ৪০টির অধিক আন্তর্জাতিক ডিগ্রি ও পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৯৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় তৎকালীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সম্মানসূচক ‘ডক্টর অব ল’ ডিগ্রিতে ভূষিত করে। এ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট জন্ ওয়েসলিং নিম্নে প্রদত্ত প্রমাণপত্র ‘সাইটেশান’ পাঠ করেন :

“বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

আপনার পিতা বাংলাদেশের জন্য নিজের জীবন বিসর্জস দিয়েছেন। আর আপনিও বারবার নিজের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে এবং নিজের জীবনকে বিপন্ন করে দেশে গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম ঘটিয়েছেন।

সরল অথচ তীক্ষ্ণ বাগ্মিতা দিয়ে আপনি দেশের জনগণের জন্য আপনার সংগ্রামের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন। তা হলো ‘ভাত ও ভোটের অধিকার’। প্রায়ই দেখা যায়, তৃতীয় বিশ্বের জনগণকে ভোটের বিনিময়ে ভাতের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা কিছুই পায় না। অথচ, আপনার সাহসী নেতৃত্বে বাংলাদেশের জনগণের ভাত ও ভোট দুটোর নিশ্চয়তাই পাবে।

বাংলাদেশের জনগণের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো তাদের সাহস, আর এই সাহস কেবল তাদের ধৈর্যের পরিচায়কই নয়, এর দ্বারা নিজেদের সমৃদ্ধিও বয়ে এনেছে তারা।

যে-বছর আপনি জন্মগ্রহণ করেন, সে-বছর জনগণ ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত হলেও পাকিস্তানের নাগপাশ থেকে মুক্ত হতে পারেনি। আর সেই কারণে আপনার পিতা সিকি শতাব্দী ধরে বাংলার স্বায়ত্তশাসনের জন্য আন্দোলন করেন। কিন্তু তাঁকে ও তাঁর জনগণকে একসঙ্গে স্বাধীনতার ফল ভোগ করার সুযোগ বেশি দিন দেওয়া হয়নি। যেসব অফিসার আপনার পিতা, মাতা ও তিন ভাইকে হত্যা করেছে, তারা ভেবেছিল, বাংলার মানুষের প্রতি আপনার পরিবারের সেবা-ভালোবাসার সুযোগ তারা খতম করে দিয়েছে এবং দেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আশা সুদূরপরাহত করতে পেরেছে। কিন্তু আপনাকে তারা গণনায় আনতে ব্যর্থ হয়েছিল।

আপনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পরবর্তী বছরগুলোতে বাংলাদেশ অস্থিতিশীল ধারায় প্রকাশ্য ও গোপন সামরিক শাসকদের দ্বারা শাসিত হয়েছে। আর এই অস্থির প্রেক্ষাপটের বিপরীত ধারায় ছিল দুটো জিনিস। প্রথমত; বাংলার জনগণ এবং দ্বিতীয়ত; শেখ হাসিনা। সে-সময় সেই গণতন্ত্রের কথা কেউ ভুলে যায়নি, যার পরিপ্রেক্ষিতেই জন্ম হয়েছে বাংলাদেশের। আপনার সত্য কথা বলার অবিচল দৃঢ়তা আপনাকে অপশাসকদের কাছে বিপজ্জনক করে তুলেছিল। তারা আপনাকে আপনার পিতার বাসভবনে বন্দী করে রাখলেও আপনার উদ্যমকে, আপনার চেতনাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। বিশাল দুর্গের মতো পৈতৃক বাড়ি ও তার উত্তরাধিকারের মধ্যে আটকে থাকলেও আপনার বসবাস ছিল সেই মুক্তির মধ্যে, যে মুক্তি হলো সাহসিকতার মুক্তি। আর আপনার পিতার একটি স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখার সিকি শতাব্দী পর আজ আপনি সেখানে গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছেন।

শেখ হাসিনা একজন মহান পিতার সুযোগ্য কন্যা, একটি যোগ্য জনগোষ্ঠীর মহান সেবক। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় গর্বের সঙ্গে আপনাকে ডক্টর অব ল ডিগ্রি প্রদান করছে।”

[দৈনিক ভোরের কাগজ, ঢাকা : ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭]

চার

যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় ফোর্বস ম্যাগাজিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের প্রশংসা করে লেখা হয়েছে: প্রায় ১৬ কোটিরও বেশি মানুষের বসবাস বাংলাদেশে। সেখানে দুর্যোগ কোনো নতুন ঘটনা নয়। আর এই করোনা মোকাবেলার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ভুল করেননি তিনি (শেখ হাসিনা)।” তার এই তড়িৎ সিদ্ধান্তের প্রশংসা করে ওয়ার্ল্ড ইকনোমিক ফোরাম (উই ফোরাম) বিষয়টিকে প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করেছে। বাংলাদেশে সবচাইতে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা শেখ হাসিনা ফেব্রুয়ারির শুরুতেই চীনে থাকা বাংলাদেশিদের দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসার পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। মার্চের শুরুতে প্রথম সংক্রমণের বিষয়টি নিশ্চিত হবার সঙ্গে সঙ্গে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেন এবং কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনলাইনে কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেন। তিনি দেশের সকল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে করোনা রোগী শনাক্ত করতে স্ক্রিনিংয়ের জন্য মেশিন ব্যবহার করেন, যেখানে এখন পর্যন্ত ৬ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে পরীক্ষা করা হয়েছে (এদের মধ্যে ৩৭ হাজার মানুষকে দ্রুত কোয়ারেন্টাইনে প্রেরণের নির্দেশ দেওয়া হয়), যা এখনও যুক্তরাজ্য কার্যকর করতে পারেনি।

[Bangladesh, a country of some 161 million people, led by Sheikh Hasina, is no stranger to crises. She was quick off her feet standing up to this one, with a response the World Economic Forum called “admirable”. Sheikh Hasina, the country’s longest serving Prime Minister, started evacuating Bangladeshi citizens from china in early February. After the first case was diagnosed in early March, she closed educational institutions and nudged all non-essential businesses to go online. Then she harnessed tech, installing screening devices across international airports which screened some 650,000 people (of which 37,000 were immediately quarantined), something the U.K. still isn’t doing.]

পাঁচ

১৯৮১ সালের ১৭ মে সে-সময়কার সরকারি মালিকানাধীন জাতীয় দৈনিক ‘দৈনিক বাংলা’য় একটা সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। সংবাদটি ছিলÑ ‘শেখ হাসিনা প্রতিরোধ কমিটি সংঘর্ষ এড়ানোর জন্যেই কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে প্রতিরোধ মিছিল ও বিক্ষোভ দেখানো কর্মসূচি প্রত্যাহার করেছে।’ বোধকরি এটা উল্লেখ করার প্রয়োজন নেই, সে-সময়কার সরকারের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় শেখ হাসিনার আগমন প্রতিরোধ কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু সে-সময়টাতে বঙ্গবন্ধু-কন্যার দেশে প্রত্যাবর্তন সংবাদে গণসমুদ্রে প্রবল জোয়ারের পূর্বাভাস দেখা দিয়েছিল; অসম্ভব হয়ে উঠেছিল তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন রোধ করা। আবার ১/১১-র সময়ও শেখ হাসিনা পাড়ি দিয়েছেন দুর্গমও গিরি কান্তার মরু পথ। ২০০৭ সালের ৭ মে ভয়ঙ্কর বিপদ জেনেও সমস্ত বাধা অতিক্রম করে দেশে ফিরে এসেছিলেন।

১৯৭২ সালে ১৮ জানুয়ারি নিউইয়র্ক টেলিভিশনে ‘ডেভিড ফ্রস্ট প্রোগ্রাম ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে বঙ্গবন্ধুর এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়। চার দশক পর শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার নিলেন সেই বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট। শেখ হাসিনাকে ডেভিড ফ্রস্ট প্রশ্ন করলেন : আপনি কি আবারও দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে চান?

শেখ হাসিনার উত্তর : এটা জনগণের ওপর নির্ভর করবে। আমাদের জনগণ যদি চায়, তবেই হতে পারি। এটা জনগণই ঠিক করতে পারে। আমি কীভাবে বলতে পারি? এটা ঠিক, আমি জনগণের সেবা করতে চাই। আর আপনি জানেন, জনগণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছি। কারণ আমাদের জনগণ খুবই গরিব, তারা সমস্যায় জর্জরিত। এ-মুহূর্তে তাদের রাজনৈতিক অধিকার নেই। তাদের কথা বলার অধিকার নেই। তারা অর্থনৈতিক সমস্যায় ভুগছে। তাই আমি তাদের পাশে দাঁড়াতে চাই। কারণ আপনি জানেন, আমার পিতার একটা স্বপ্ন ছিল : তিনি দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছিলেন। আমার আদর্শ একই রকম এবং আমার বাবাকে অনুসরণ করতে চাই। কারণ বাংলাদেশের মানুষ এজন্য লড়ছে। তারা গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও মৌলিক অধিকারের জন্য লড়ছে।

২০১৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ‘প্রজেক্ট সিন্ডিকেট’-এ প্রকাশিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখা দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার-এ ছাপা হয়েছিল। প্রজেক্ট সিন্ডিকেটের এই লেখা ১৫৫টি দেশে ১৩টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছিল। এ প্রতিষ্ঠানটির সারা পৃথিবীতে ৪৫৯টি মিডিয়া আউটলেট রয়েছে এবং বাংলাদেশের শুধু উল্লিখিত দুটি পত্রিকার সাথে চুক্তি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার লেখার শিরোনাম ছিল ‘অভিবাসন ব্যবস্থাপনা সঠিক হতে হবে’। লেখার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ লাইন এই পরিসরে উপস্থাপন করছি : “গন্তব্যে পৌঁছাতে গিয়ে ৪ হাজার ৩০০ জনেরও বেশি অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। কেবল ভূমধ্যসাগরেই প্রাণহানি হয়েছে ৩ হাজার ২০০ মানুষের। আর বঙ্গোপসাগরের ঠিক পূর্বে আন্দামান সাগরে হাজারো অভিবাসী কোথাও ভিড়তে না পেরে নৌকায় আটকে থেকেছে অথবা পাচারকারীদের হাতে জিম্মিদশায় পতিত হয়েছে।… এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের সদস্য-সরকারগুলোর উচিত গত বছর যেসব উচ্চাশার প্রতি সমর্থন জানানো হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান এবং বহু অভিবাসী যে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে, সে-বিষয়ে ওয়াকিবহাল হওয়া। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এ মাসের অধিবেশনে, বিশেষত অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ে এই অভূতপূর্ব সম্মেলন বিশ্বনেতারা এই দায় মেটাতে পারেন।…

… নীতি-নির্ধারকদের উচিত অভিবাসনের অর্থনৈতিক সুফল সর্বোচ্চকরণে কাজ করা; অভিবাসীরা যাতে বেআইনি বিকল্পের দিকে পা না বাড়ায়, তার জন্য আইনি পথ প্রশস্ত করা। উচিত কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রার বাধা কমিয়ে আনা; অনিয়মিত অভিবাসন প্রবাহকে সামলানো এবং এ বছর যেমনটা হয়েছে; বিশেষত যুদ্ধা লে অথবা যখন অভিবাসন সংকটজনক পর্যায়ে চলে আসে, তখন অভিবাসীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায়ই বলে থাকেন, ‘রিফিউজি জীবনের যন্ত্রণা কি আমার মতো কেউ জানে না।’ যার কারণে অভিবাসীদের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে লড়াই করে যাচ্ছেন। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটা গান লিখেছিলেন, সেই গানের প্রতিটি অক্ষর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য ভীষণভাবে প্রযোজ্য।

 

“তোর আপন জনে ছাড়বে তোরে,

তা ব’লে ভাবনা করা চলবে না।

ও তোর আশালতা পড়বে ছিঁড়ে,

হয়তো রে ফল ফলবে না ॥

আসবে পথে আঁধার নেমে, তাই ব’লেই কি রইবি থেমে

ও তুই বারে বারে জ্বালবি বাতি,

হয়তো বাতি জ্বলবে না ॥

শুনে তোমার মুখের বাণী আসবে ঘিরে বনের প্রাণী

হয়তো তোমার আপন ঘরে

পাষাণ হিয়া গলবে না।

বদ্ধ দুয়ার দেখলি ব’লে অমনি কি তুই আসবি চলে

তোরে বারে বারে ঠেলতে হবে,

হয়তো দুয়ার টলবে না ॥”

অনেকেই সুদীর্ঘ লড়াইয়ে ক্লান্ত হয়ে তাকে ছেড়ে চলে গেছে। কারও কারও বিবেক নেই; যদি বিবেক না থাকে পাণ্ডিত্যে কিছু হয় না। আর সারা পৃথিবীর মানুষ শেখ হাসিনার প্রশংসা করলেও আপন দেশে পাষাণ হিয়া গলে না।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক; সাবেক সহ-সভাপতি- বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল, প্রধান সম্পাদক- সাপ্তাহিক বাংলা বিচিত্রা ও এবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম।

এই বিভাগের আরো সংবাদ