বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব : স্রষ্টার দেওয়া অমূল্য দান

  সুভাষ সিংহ রায়

০৮ আগস্ট ২০২২, ১২:৫৬ | অনলাইন সংস্করণ

সুভাষ সিংহ রায়
শিষ্য তরুণ শেখ মুজিব রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নজরে পড়েছিল। ১৯৪৬-এ বিহারে দাঙ্গা উপদ্রুত অঞ্চলে তিনি শেখ মুজিবকে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তার আগে টুঙ্গিপাড়ার গ্রামের বাড়িতে অসুস্থ স্ত্রীর অনুমতি নিতে বলেছিলেন। স্ত্রী রেণু চিঠি লিখেছিলেন, যাতে তার পূর্ণ সম্মতি ছিল। চিঠির ভাষা প্রণিধানযোগ্য : “আপনি শুধু আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্যও জন্ম নিয়েছেন। দেশের কাজই আপনার সব চাইতে বড় কাজ। আপনি নিশ্চিত মনে সেই কাজে যান। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আল্লার উপর আমার ভার ছেড়ে দেন।”  এ চিঠির মর্মার্থ অবহিত হবার পর সোহরাওয়ার্দী মন্তব্য করতে বাধ্য হয়েছিলেন, “মুজিব, সে তোমার জন্য স্রষ্টার দেয়া অতি অমূল্য দান। অনুগ্রহ করে তাকে অবহেলা করো না।” (Mujib, she is a very precious gift to you from God. Don't neglect her, please.)  মুজিব কোনোদিন রেণুকে অবহেলা/উপেক্ষা করেননি; এমন মানসিকতা তার ছিল না বা তার সুযোগও তিনি পাননি।

বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে নিয়ে অসাধারণ দীর্ঘ লেখা লিখেছিলেন ড. নীলিমা ইব্রাহিম- “বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে আপনারা ক’জন চেনেন অথবা ক’জনই বা দেখেছেন? নিশ্চয়ই অল্পসংখ্যক মধ্যবয়সী নারী পুরুষ হয়তো বা তাঁর নাম শুনছেন। তিনি স্বাধীন বাংলার স্থপতি বিশ্ববরেণ্য দেশপ্রেমিক, পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী পরে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ধর্মপত্নী ফজিলাতুন্নেছা। আমরা মহাত্মা গান্ধীকে স্মরণ করলে সামনে এসে দাঁড়ান কস্তুরবা গান্ধী, জওহরলাল নেহেরু কমলা নেহেরুকে দূরে রাখতে পারেননি। কারণ তারা শুধু ধর্মপত্নী ছিলেন না, ছিলেন প্রকাশ্য রাজপথের সহযোদ্ধা।  কিন্তু কেউ কি কোনোদিন বিপ্লবী জঙ্গি মিছিলে ফজিলাতুন্নেছাকে নেতৃত্ব দিতে অথবা কমপক্ষে অংশগ্রহণ করতে দেখেছেন? না, না শুধু দেখা নয় এমন দৃশ্য কল্পনারও বাইরে। কোনো সত্যাগ্রহ আন্দোলনে স্বেচ্ছাসেবিকা বেশে দেখেছেন ফজিলাতুন্নেছাকে? না, তাও দেখেননি। তিনি তখন ব্যস্ত তার গার্হস্থ্য জীবনের কর্তব্য পালনে আর মন-মস্তিষ্কে স্বামীর কাজে সহযোগিতা করতে। সাধারণ মানুষ তার নাম শুনেছে, ছবি দেখেছে, তা-ও সম্ভবত ইন্তেকালের পর। স্বাধীনতার পূর্বে খুব কম মানুষই বিশেষত পরিবারের বাইরে তাঁকে দেখবার সুযোগ পেয়েছে। 

এ-কথা এখন সবাই জানেন, বঙ্গবন্ধু তার সহধর্মিণীকে অত্যন্ত সম্মান করতেন এবং ভালোবাসতেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থের অসংখ্য জায়গায় প্রাসঙ্গিকভাবেই বেগম ফজিলাতুন্নেছার কথা এসেছে। 
সময়ে সময়ে বঙ্গবন্ধুর অর্থের প্রয়োজন হলে কীভাবে ফজিলাতুন্নেছা হাত বাড়িয়ে দিতেন, এমনকি তিনি নিজে বেশিদূর লেখাপড়া না করলেও বঙ্গবন্ধুর শিক্ষার ব্যাপারে কতটা যত্নবান ছিলেন, তাও আমরা দেখি বঙ্গবন্ধুর স্বীকারাক্তি থেকে- “আব্বা ছাড়াও মায়ের কাছ থেকেও আমি টাকা নিতে পারতাম। আর সময় সময় রেণুও আমাকে কিছু টাকা দিতে পারত। রেণু যা কিছু জোগাড় করত, বাড়ি গেলে এবং দরকার হলে আমাকেই দিত। কোনোদিন আপত্তি করে নাই, নিজে মোটেই খরচ করত না। গ্রামের বাড়িতে থাকত, আমার জন্যই রাখত।”

‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে ১৯৬৬ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর ঘটনাবহুল জেল-জীবনচিত্র স্থান পেয়েছে। এই গ্রন্থেও বঙ্গবন্ধু তার সহধর্মিণী ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের প্রসঙ্গ এনেছেন বারবার। বঙ্গবন্ধুর জেলে থাকার সময়কালে তার ছেলেমেয়েদের নিয়ে জেলে আসতেন স্ত্রী। ১৫ জুন ১৯৬৬ তারিখে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “সাড়ে চারটায় জেলের লোক এসে বলল- চলুন, আপনার দেখা আসিয়াছে, আপনার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে বসে আছে জেল অফিসে। তাড়াতাড়ি রওয়ানা করলাম। দূর থেকে দেখি রাসেল, রেহানা ও হাচিনা চেয়ে আছে আমার রাস্তার দিকে। ১৮ মাসের রাসেল জেল অফিসে এসে একটুও হাসে না- যে পর্যন্ত আমাকে না দেখে। দেখলাম দূর থেকে পূর্বের মতোই আব্বা আব্বা বলে চিৎকার করছে। জেলগেট দিয়ে একটা মালবোঝাই ট্রাক ঢুকেছিল। আমি তাই জানালায় দাঁড়াইয়া ওকে আদর করলাম। একটু পরেই ভিতরে যেতেই রাসেল আমার গলা ধরে হেসে দিল। ওরা বলল, আমি না আসা পর্যন্ত শুধু জানালার দিকে চেয়ে থাকে, বলে আব্বার বাড়ি। এখন ওর ধারণা হয়েছে, এটা ওর আব্বার বাড়ি। যাবার সময় হলে ওকে ফাঁকি দিতে হয়। ছোট মেয়েটার শুধু একটা আবদার। সে আমার কাছে থাকবে। আর কেমন করে কোথায় থাকি, তা দেখবে।... কে বুঝবে আমাদের মতো রাজনৈতিক বন্দিদের বুকের ব্যথা। আমার ছেলেমেয়েদের তো থাকা-খাওয়ার চিন্তা করতে হবে না। এমন অনেক লোক আছে, যাদের স্ত্রীদের ভিক্ষা করে, পরের বাড়ি খেটে, এমনকি ইজ্জত দিয়েও সংসার চালাতে হয়েছে। জীবনে অনেক রাজবন্দির স্ত্রী বা ছেলেমেয়ের চিঠি পড়ার সুযোগ আমার হয়েছে। সে-করুণ কাহিনি কল্পনা করতেও ভয় হয়।” 

‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন- “জেল কারাগারে সাক্ষাৎ করতে যারা যায় নাই তারা বুঝতে পারে না সেটা কি বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক। ভুক্তভোগীরা কিছু বুঝতে পারে।... এ সাক্ষাৎকে প্রহসনও বলা চলে।” (পৃষ্ঠা : ১৯৬-৯৭) একই গ্রন্থের ৪০ পৃষ্ঠায় আমরা দেখতে পাই বঙ্গবন্ধু সেখানে লিখেছেন- “আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় একজন আইবি কর্মচারী বসে থাকত, আর জেলের পক্ষ থেকেও একজন ডিপুটি জেলার উপস্থিত থাকতেন।... স্ত্রীর সাথে স্বামীর অনেক কথা থাকে কিন্তু বলার উপায় নেই। আমার মাঝে মাঝে মনে হতো স্ত্রীকে নিষেধ করে দেই যাতে না আসে। ১৯৪৯ সাল থেকে ’৫২ সাল পর্যন্ত আমার স্ত্রীকে নিষেধ করে দিয়েছিলাম ঢাকায় আসতে, কারণ ও তখন তার দুইটা ছেলেমেয়ে নিয়ে দেশের বাড়ি থাকত।”

এপর তিনি গ্রেফতার হন ওই বছরেরই (১৯৪৯) শেষ দিনে। কারাগারে থাকেন দুই বছরের বেশি- ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত। বঙ্গবন্ধু নিজেই লিখেছেন- “স্ত্রীকে ঢাকা কারাগারে সাক্ষাৎ প্রার্থী হতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু স্ত্রী ও পিতা-মাতার মন কি মানে? এই জেল-জীবনের এক পর্যায়ে ১৯৫০ সালের শেষ দিকে একটি মামলায় বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জের আদালতে হাজির করার জন্য স্টিমারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “মধুমতি নদীর পাটগাতি স্টিমার ঘাটে নামার পর খবর মেলে- ‘পূর্বের রাতে আমার মা, আব্বা, রেণু ছেলেমেয়ে নিয়ে ঢাকায় রওনা হয়ে গেছেন আমাকে দেখতে। এক জাহাজে আমি এসেছি। আর এক জাহাজে ওরা ঢাকা গিয়েছে। দুই জাহাজের দেখাও হয়েছে একই নদীতে। শুধুু দেখা হল না আমাদের। এক বৎসর দেখি না ওদের। মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেল।” (পৃষ্ঠা : ১৭৬) ত্রিশ বছরের যুবক তখন বঙ্গবন্ধু। স্ত্রীর বয়স ২০ বছর। ‘কারাগারের রোজনামচা’য় লিখেছেন- ‘নিষ্ঠুর কর্মচারীরা বোঝে না যে স্ত্রীর সাথে দেখা হলে আর কিছু না হউক একটা চুমু দিতে অনেকেরই ইচ্ছা হয়, কিন্তু উপায় কি?” (পৃষ্ঠা : ৪০)

গোপালগঞ্জের আদালতে এ মামলা চলাকালে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব পরিবারের সদস্যদের নিয়ে থানায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কয়েকবার সাক্ষাতের সুযোগ পান। এ প্রসঙ্গে একটি মর্মস্পর্শী বিবরণ রয়েছে ১৮৪ পৃষ্ঠায় এভাবে- “আব্বা, মা, রেণু খবর পেয়ে সেখানেই আসলেন।... কামাল কিছুতেই আমার কাছে আসল না। দূর থেকে চেয়ে থাকে। ও বোধ হয় ভাবত, এ লোকটা কে?” ১৮৫ পৃষ্ঠায় আরেকবার সাক্ষাতের ঘটনা লিখেছেন এভাবে- “হাচু আমাকে মোটেই ছাড়তে চায় না। আজকাল বিদায় নেওয়ার সময় কাঁদতে শুরু করে। কামালও আমার কাছে আসে এখন। হাচু ‘আব্বা’ বলে দেখে কামালও ‘আব্বা’ বলতে শুরু করেছে।” ১৯০-১৯১ পৃষ্ঠাতেও রয়েছে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বেগম মুজিবের কয়েকবার সাক্ষাতের বিবরণ। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- “রেণু আমাকে যখন একাকী পেল, বলল, ‘জেলে থাক আপত্তি নাই, তবে স্বাস্থ্যের দিকে নজর রেখ। তোমাকে দেখে আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেছে।’’’

কতটা কষ্টের জীবন বেছে নিয়েছিলেন ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, জানতে পারি গোয়েন্দা প্রতিবেদন থেকে। ১৯৫৩ সালের ১৪ মে গোয়েন্দারা ‘অসাধারণ দক্ষতায়’ জিপিও থেকে ‘আটক’ করে একটি চিঠি, যাতে ৫ মে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন- “স্নেহের রেণু। আজ খবর পেলাম তোমার একটি ছেলে হয়েছে। তোমাকে ধন্যবাদ। খুব ব্যস্ত একটু পরে ট্রেনে উঠব। ইতি তোমার মুজিব।” (গোয়েন্দা রিপোর্ট, তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা : ২৩৩) বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয় পুত্র শেখ জামালের জন্মের পর লেখা এ চিঠিটি কি প্রাপক বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কাছে পৌঁছেছিল? পৌঁছালে চিঠিটা চোখের জলে কতটা সিক্ত হয়েছিল? গোয়েন্দা রিপোর্ট থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু ৫ মে ঢাকার ফুলবাড়িয়া রেলস্টেশন থেকে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীসহ ঈশ্বরদীগামী ট্রেনে ওঠেন। ৬ মে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ মাঠের জনসভায় ভাষণ দেন। (তৃতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা : ২২৪) এরপর বঙ্গবন্ধুর স্থান হয় কারাগারে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়- “৫ জুন আতাউর রহমান খান ও বেগম শেখ মুজিবুর রহমান বিচারাধীন বন্দী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাক্ষাৎ করেন। এ সময়ে শেখ মুজিবুর রহমান স্ত্রীকে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে এবং সন্তানদের যত্ন নিতে বলেন।” (চতুর্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা : ৪১-৪২)

১৯৫৪ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৫৮ সালের ১১ ডিসেম্বর- এ সময়টি বঙ্গবন্ধু মুক্ত জীবনে কাটিয়েছেন। একটানা চার বছর কিছুটা হলেও পরিবারের সান্নিধ্যে থেকেছেন। কিন্তু ষড়যন্ত্রের রাজনীতি পাকিস্তানকে ঠেলে দেয় অন্ধকার যুগে। ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক শাসন জারি হয়। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা হয় ১২ অক্টোবর। এরপর বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবন ফের পরিচিত ছকে- স্বামীকে ‘দেখা’র জন্য নাজিমুদ্দিনে রোডের জেলগেটে নিয়মিত হাজির থাকা। এ পর্ব চলে এক বছরের বেশি- ১৯৫৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

সামরিক শাসনামলে জেলগেটে দুজনের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ৩০ অক্টোবর। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বরাবরের মতোই বলা হয়- কোনো রাজনৈতিক আলোচনা হয়নি। পরের সাক্ষাতের তারিখ ছিল ২০ ও ২৮ নভেম্বর। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, বেগম মুজিব তাঁর স্বামীকে সাক্ষাতের সময় বলেন, সিদ্ধেশ্বরী এলাকার কোয়ার্টারে সন্তানদের নিয়ে বসবাস করা সম্ভব নয়। এলাকাটি ঝোপ-জঙ্গলে ভরা। পানির কষ্ট। তিনি দালালদের মাধ্যমে নতুন একটি বাড়ি ভাড়া নিতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সকলে বলছে- শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারকে বাড়ি ভাড়া দিলে বিপদ হবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯ মাস অসীম সাহসিকতা দৃঢ় মনোবল নিয়ে রেণু পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছিলেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৩ মার্চের পতাকা উত্তোলন- গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি মুহূর্তে বঙ্গবন্ধুর প্রধান উদ্দীপক ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করেছেন এই বঙ্গমাতা রেণু। নেপথ্যে থেকে ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে এবং ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সময় বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। বন্দী থেকেও পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার চোখ এড়িয়ে দলের নেতাদের নির্দেশনা পৌঁছে দিতেন। কয়েকবার গোয়েন্দা সংস্থা জিজ্ঞাসাবাদ ও শাস্তি-নির্যাতনের হুমকি দেয়, তবু তিনি ছিলেন অকুতোভয়। এরপর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে ও বঙ্গবন্ধুর পাশে দাঁড়ান তিনি।

১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এর রাতে একাকিত্বে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে তিনি বলেছিলেন, “তুমি ফিরে এসেছো সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ, আমি উল্লসিত; কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত ধূসর প্রান্তরে, ধ্বংসপ্রাপ্ত গ্রাম, ক্ষুধার্ত শিশু, বিবস্ত্র নারী আর হতাশাগ্রস্ত পুরুষ এবং সন্তানহারা জনক-জননী তোমার প্রতীক্ষায়।” শত কর্মব্যস্ততার মাঝেও তিনি নিজ হাতে রান্না করে খাইয়েছেন ভাসানীসহ দেশ-বিদেশের বরেণ্য ব্যক্তিদের, যা সম্পূর্ণ ইতিহাস, আদর্শ বাঙালি নারীর প্রতিকৃতি।
এমনও দিন গেছে মামলা চালাতে গিয়ে তার কাগজপত্র, উকিল জোগাড় করতে অনেক খরচ হয়ে গেছে। এদিকে বাজারও করতে পারেননি। কোনোদিন বলেননি যে টাকা নাই, বাজার করতে পারলাম না। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে পদে পদে তিনি আওয়ামী লীগকে শক্তিশালী করার ব্যাপারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে গেছেন। প্রকাশ্যে প্রচারে কখনোই আসেননি।

বঙ্গমাতা কতটা দৃঢ় মনোবলের অধিকারী ছিলেন সেটি বোঝা যায় এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্যে। তিনি বলেছিলেন, “মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস আম্মার যে মনোবল দেখেছি, তা ছিল কল্পনাতীত। স্বামীকে পাকিস্তানিরা ধরে নিয়ে গেছে। দুই ছেলে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করছে। তিন সন্তানসহ তিনি গৃহবন্দি। যোগাযোগ একেবারে বিচ্ছিন্ন; কিন্তু আম্মা মনোবল হারাননি।” 

দেশের অনেক, এমনকি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে নেতারা বেগম মুজিবের কাছে আসতেন দেখা করতে, পরামর্শ নিতে, নির্দেশনা জানতে। আইয়ুব খান ভুট্টোকে মন্ত্রিত্ব থেকে বের করে দিলে তিনিও ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাসায় ছুটে আসেন। পশ্চিম পাকিস্তানের নেতারা এলে পর্দার আড়াল থেকে তাদের সঙ্গে কথা বলতেন বেগম মুজিব। কখনোই সামনে আসতেন না। পরিবার ছিল তার কাছে সবার ওপরে। তবে কেবল ঘরের কয়েকজনকে নিয়ে নয়, গোটা দেশ ও দেশের জনগণ নিয়েই ছিল তার পরিবার। এই পরিবারের স্বার্থে তিনি যে কোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত ছিলেন। সংকল্পে ছিলেন অটল।

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল তার কবিতায় লিখেছিলেন, ‘‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।” বেগম মুজিবের জীবনী বিশ্লেষণে আমরা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের এই কবিতার যথার্থ প্রতিফলন দেখতে পাই। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতিটি ধাপে বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী হিসেবে নয়, একজন নীরব দক্ষ সংগঠক হিসেবে যিনি নিজেকে বিলিয়ে দিয়ে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে ভূমিকা রেখেছেন এবং বঙ্গবন্ধুকে হিমালয় সম-আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন তিনি বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। কালের বিবর্তনে সেই শেখ মুজিবকে যিনি জাতির পিতা বানিয়েছিলেন, ছায়ার মতো সারাজীবন ছিলেন পাশে, জুগিয়েছেন অনুপ্রেরণা, তিনিই আমাদের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক; সাবেক সহ-সভাপতি- বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল, প্রধান সম্পাদক- সাপ্তাহিক বাংলা বিচিত্রা ও এবিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম।

এই বিভাগের আরো সংবাদ